📄 আল্লাহর প্রতি বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি আরোপ করা
জাহেলী যুগের আরবরা ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলতো। খৃষ্টানরা ঈসা মসীহ আলাইহিস সালামকে ও ইয়াহূদীরা ওযায়ের আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র বলতো। একদল দার্শনিক আল্লাহ থেকে আকল বা বিবেক জন্ম হওয়ার কথা কল্পনা করে থাকে। আল্লাহ এসব থেকে নিজের পবিত্রতা ঘোষণা করে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বহু আয়াত নাযিল করেছেন। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'তারা আল্লাহর সঙ্গে জিনকে শরীক করে, অথচ তিনিই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারা আল্লাহর জন্য ছেলে-মেয়ের অলীক কল্পনার জন্ম দিয়েছে। তারা যা বলে আল্লাহ সেব থেকে উর্দ্ধে ও সম্পূর্ণ পবিত্র। আসমান ও যমীনের স্রষ্টা তিনি। কেমন করে তাঁর সন্তান হতে পারে? যখন তার নেই কোনো স্ত্রী। তিনিই সব কিছুকে সৃষ্টি করেছেন এবং সকল বিষয়ে জ্ঞানী'। (সূরা আল-আন'আম, ৬: আয়াত ১০০-১০২)
তারা আল্লাহর প্রতি স্বজনপ্রীতি আরোপ করেছিল। অথচ তিনি এসব থেকে উর্দ্ধে। যেমন আল্লাহ বলেন-
'ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা দাবী করে থাকে যে, আমরা আল্লাহর বেটা ও তাঁর প্রতি প্রিয়জন। (হে নবী) আপনি ওদেরকে বলে দিন যে, যদি তাই হবে তাহলে অপরাধের জন্য তোমাদেরকে আযাব দেন কেন? তোমরা অন্যান্য সৃষ্টিকুলের মত সাধারণ মানুষ মাত্র। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন ও যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিয়ে থাকেন। আসমান-যমীন ও তন্মধ্যস্থিত সকল কিছুর মালিকানা কেবলমাত্র তাঁরই এবং তাঁর কাছেই সকলকে ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল- মায়েদাহ, ৫: আয়াত ১৮)
তারা আল্লাহর সৃষ্ট জীবকে আল্লাহর মূল সত্ত্বার অংশ সাব্যস্ত করেছিল। যেমন আল্লাহ বলেন-
"তারা আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর সত্ত্বার অংশ হিসাবে গণ্য করেছিল”। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ১৫)
কেননা তারা আল্লাহর ছেলে- মেয়ে সাব্যস্ত করেছিল এবং ছেলে- মেয়েরা বাপের সত্তার অংশ বৈকি। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'নিশ্চয়ই ফাতেমা আমার দেহেরই একটি টুকরা'। (হাদীস)
কালবী বলেন, এ আয়াত যিনদীকদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যারা বলতো, আল্লাহ ও ইবলীস দুইজন শরীক। আল্লাহ জ্যোতি, মানুষ ও জীবজন্তুসমূহের স্রষ্টা এবং ইবলীস অন্ধকার, হিংস্র, শ্বাপদ, সর্প ও বিচ্ছুসমূহের স্রষ্টা। কেউ কেউ বলতো যে, আল্লাহ ও জিনের মাঝে বিয়ের ফলে ফেরেশতাদের জন্ম হয়। আল্লাহ তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন। বলেন-
‘তারা আল্লাহ ও জিনের মাঝে বংশ সম্পর্ক কল্পনা করেছে। অথচ জিনেরা জানে যে, তাদেরকে আল্লাহর সম্মুখে হাজির হতে হবে। আল্লাহ এদের এই সব অলীক বর্ণনাসমূহ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র’। (সূরা আছ-ছাফফাত, ৩৭: আয়াত ১৫৮-১৫৯)
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার 'আল জাওয়াবুছ ছহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ' ও 'তাফসীরু সূরাতিল ইখলাছ' গ্রন্থসমূহে।
টিকাঃ
১০. বুখারী, হাদীস নং ২৯৪৩; মুসলিম, ২৪৪৯।
১১. পুণরুক্তি, পূনরাবৃত্তি ও একই মর্মের উল্লেখিত অনেক আয়াতের উদ্ধৃতি ও তরজমা কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে বাদ দেওয়া হলো। (অনুবাদক)
📄 স্রষ্টা সম্পর্কিত বিষয়সমূহ হতে সৃষ্টজীবের বিরত থাকা
নাসারাদের সাধু সন্যাসীরা স্ত্রী গ্রহণ ও সন্তান পালন হতে বিরত থাকতো এবং বলতো যে, ‘কামালিয়াত’ হাছিল করতে ইচ্ছুক পাদ্রী পুরোহিত ও সাধু-সন্যাসীদেরকে ঈসা মসীহের অনুকরণে স্ত্রী সংসর্গ হতে দূরে থাকতে হবে। এদের নির্বুদ্ধিতা ও বিভ্রান্তি বর্তমানে এতদূর অগ্রসর হয়েছে যে, তারা আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈবাহিক জীবন সম্পর্কেও আপত্তি তুলতে চায়। ত্রয়োদশ হিজরী শতকের ইরাকী কবি আব্দুল বাকী ফারুকী জনৈক খৃষ্টান পাদ্রীর সমালোচনার জওয়াবে কত সুন্দরই না বলেছেন-
‘তুমি তোমার পাদ্রী নেতাদের বলো যে, তোমরা বিবাহকে আল্লাহভীরু ও ত্রুটিহীন লোকদের জন্য একটি ত্রুটি বলে মনে করো। অথচ তোমরা তিন আল্লাহতে বিশ্বাসী ত্রিত্ববাদীরা একথা বেমালুম ভুলে বসেছো যে, মরিয়মকে তোমরা আল্লাহর স্ত্রী বানিয়েছো।' (নাউযুবিল্লাহ)
টিকাঃ
১২. লেখকের শেষের প্যারাটি অপ্রয়োজনে বাদ দেওয়া হলো। (অনুবাদক)
📄 নাস্তিক্যবাদ
এর অর্থ হলো- সৃষ্টি জগতের কোনো স্রষ্টা আছেন, একথা অস্বীকার করা। যেমন- ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের লোকেরা করতো। ফেরআউন বলেছিল-
'আমি ছাড়া তোমাদের আর কোনো প্রভু আছে বলে আমি জানি না।' (সূরা আল-ক্বাছাছ, ২৮: আয়াত ৩৮)
যুগে যুগে এই ধরণের মূর্খতা হতে পৃথিবী কখনোই খালি থাকেনি। কিছু সংখ্যক আল্লাহর বান্দা ছাড়া বর্তমান যুগের অধিকাংশ আদম সন্তানই উক্ত বাতিল আক্বীদা পোষণ করে থাকে। যদি তারা ন্যায় বিচার ও বিবেকের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখতো, তাহলে উপলব্ধি করতো যে, এ পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিই তার স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ। করিব ভাষায়-
'প্রতিটি বস্তুর মধ্যে রয়েছে তাঁর নিদর্শন, যা প্রমাণ দেয় যে তিনি এক।'
আসমান জগতে এবং আমাদের নিজেদের দেহে ও চরিত্রে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জটিলতা দেখতে পাই, তার প্রকৃত মর্ম উদঘাটন করা আমাদের পক্ষে কেমন করে সম্ভব? এসব আমাদের জ্ঞান ও চিন্তার সম্পূর্ণ বাইরে। আসলে লোকেরা যেসব কথা বলে, আল্লাহ সেসব থেকে বহু ঊর্ধ্বে।
📄 আল্লাহর মালিকানায় শরীক করা
যেমন মাজুসী-অগ্নি উপাসকরা জ্যোতি, আগুন, পানি ও মাটিকে সম্মান করতো। 'জরথস্তুকে' নবী মানতো। তাদের নিজস্ব শরীয়ত বা নিয়ম-নীতি ছিল তারা যার অনুসরণ করতো। তাদের মধ্যে বহু দল ছিল।
যেমন মাযদাকের অনুসারী মাযদাকিয়া দল। মাযদাক তাদের একজন বড় আলেমের নাম। তার মতে নারী জাতি ও ধন-সম্পদ হবে জাতীয় সম্পদ। প্রত্যেকের স্ত্রী ও ধন-সম্পদের উপর অন্যের সমান অধিকার থাকবে যেমন, আলো-বাতাস ও রাস্তা চলাচলে সকলের সমানাধিকার আছে।
তাদের আরেকটি দলের নাম 'খুররামিয়া'। এরা বাবেক খুররামীর অনুসারী। এরাই এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট দল। এরা কোনো সৃষ্টিকর্তা, আখিরাত, নবুওয়ত, হালাল-হারাম কিছুই মানে না। এদের মাযহাবেরই অনুসারী শাখাসমূহ হলো কারামতী, ইসমাইলিয়া, নাদীরিয়া, কিসানিয়া, যারারিয়া, হেকামিয়া এবং সমস্ত ওবায়দীগণ। যারা নিজেদেরকে 'ফাতেমীয়' বলে অভিহিত করেছে। এদের সবাই মূলতঃ উপরোক্ত একটি মাযহাবেরই অন্তর্ভুক্ত। যদিও ব্যাখ্যায় গিয়ে পৃথক হয়েছে। এদের সকলেরই নেতা, শায়খ ও ইমাম হলো মাজুসীরা। যদিও মাজুসীরা তাদের একটি নিজস্ব দ্বীন ও শরীয়তের বিধি-নিষেধের অনুসারী, কিন্তু এরা বিশ্বের কোনো দ্বীন-ধর্ম ও নিয়ম- নীতির ধার ধারে না।
টিকাঃ
* আজকের যুগের তথাকথিত সাম্যবাদী ও প্রগতিবাদীদের অনেকেই এই মত পোষণ করে থাকেন।