📄 দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বলে গৃহিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো বস্তুকে অস্বীকার করা
যেমন তারা হজ্জ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। এটাকে তারা তাদের দ্বীনের অংশ বলে স্বীকার করেছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তা করতে অস্বীকার করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য তীর্থ স্থান ও নিরাপত্তা স্থল হিসাবে গ্রহণ করলাম এবং লোকদেরকে বললাম যে, তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানো স্থানকেই 'মুছাল্লা' বা ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করো। (কিন্তু, কাফিররা তা না করে কাবা ঘরে প্রতিমা রাখে এবং ওর পূজা শুরু করে দেয়, যদিও মুখে ইবরাহীমের অনুসারী বলে দাবী করতো)। আল্লাহ তাদের এই আচরণের প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলেন-
'যারা নিজেদেরকে (ইচ্ছাকৃতভাবে) নির্বোধ গণ্য করেছে, কেবল তারাই ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, অথচ আল্লাহ তাকেই দুনিয়ার মধ্যে হতে নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি আখিরাতে অবশ্যই নেককার বান্দাদের মধ্যে গণ্য হবেন'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ১২৫-১৩০)
শেষোক্ত আয়াতটি নাযিলের কারণ হিসাবে বলা হয়ে থাকে যে, প্রখ্যাত ইয়াহূদী পন্ডিত (পরে মুসলিম) আব্দুল্লাহ ইবন সালাম সালমা ও মুহাজির নামীর স্বীয় দুই ভাতিজাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, তোমরা নিশ্চয়ই একথা জানো যে, আল্লাহ পাক তাওরাতে বলেছেন, আমি ইসমাঈলের বংশে আহমদ নামে একজন নবীকে পাঠাবো। যারা তার উপর ঈমান আনবে তারা হিদায়েত প্রাপ্ত হবে এবং যারা ঈমান আনবে না তারা হবে অভিশপ্ত। একথা শুনে ভাতিজা দু'জনেই মুসলিম হয়ে গেল। এ ঘটনার পরেই উক্ত আয়াত নাযিল হয়।
📄 নগ্নতার প্রদর্শনী
কাফিররা নগ্নতার প্রদর্শনী করতো এবং এর পক্ষে বিভিন্ন অপযুক্তি খাড়া করতো।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
'যখন তারা কোনো অশ্লীল কাজ করতো তখন বলতো, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এ কাজ করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এ কাজে অনুমতি দিয়েছেন। আপনি বলে দিন (হে নবী) নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অশ্লীল কাজের অনুমতি দেন না। তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতে চাও যা তোমরা জানো না'? (সূরা আরাফ, ৭: আয়াত ২৮)
মুফাসসীরগণ বলেন : এখানে অশ্লীল কাজ অর্থ প্রতিমা পূজা করা এবং কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) উলংগ হয়ে তাওয়াফ করা ইত্যাদি। শুধুমাত্র উলঙ্গ হওয়ার কথাই বলা হয়েছে। কাফিররা তাদের এই বেহায়াপনার পক্ষে দুটি যুক্তি খাড়া করেছে। (এক) বাপ-দাদাদের রীতি রেওয়াজের অন্ধ অনুসরণ এবং (দুই) আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ।
তাদের নেতাদের নিয়ম ছিল এই যে, তারা হজ্জের মওসুমে আরাফাতের ময়দানে না গিয়ে মুজদালিফায় যেয়ে অবস্থান (ওকুফ) করতো। তারা এই সময় ঘি গরম করতো না, পনির খেতো না, কোনো ছাগল-বকরী কিংবা গরু বাঁধতো না, উট বা ভেড়ার পশম দিয়ে সূতা কাটতো না, কোনো পশমের বা কাদার তৈরী ঘরে ঢুকতো না। তারা সম্মানিত চারটি মাস লাল গম্বুজওয়ালা ঘরে লুকিয়ে থাকতো। তারা আরবদের উপর কঠোরভাবে নিয়ম করে দিয়েছিল যেন হারাম শরীফে ঢুকবার পূর্বে তারা হালাল অবস্থার সমস্ত পরিধেয় বস্ত্র ফেলে দেয় এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করে। চাই সেই পোশাক ক্রয়ের মাধ্যমে হোক বা ধারসূত্রে কিংবা দানসূত্রে প্রাপ্ত হোক। যদি তা না পায় তবে সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় তাওয়াফ করতে হবে। মেয়েদের উপরোক্ত একই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। বরং মেয়েরা তাদের দু'পা ও নিতম্বদ্বয় ফাঁকা করে তাওয়াফ করতো। এমনিভাবে তাওয়াফ করা অবস্থায় যাবাআ বিনতে আমের নামক এক মহিলা গেয়েছিলঃ-
'আজকের দিনের (লজ্জাস্থানের) (কিছু অংশ বা সম্পূর্ণটা প্রকাশ হয়ে পড়লো। তবে যেটুকু প্রকাশিত হলো আমি তাকে হালাল করবো না।'
তারা নিজেরা মুযদালিফা থেকেই ফিরে আসত। অপর লোকেরা আরাফাতের ময়দান থেকে ফিরে আসত। এমনি ধরনের বহু নতুন নতুন রেওয়াজ তারা চালু করেছিল, যে সম্পর্কে আল্লাহ কোনরূপ নির্দেশ পাঠাননি। এতদসত্ত্বেও তারা পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাতের উপর কায়েম আছে বলে গালভরা দাবী করতো। আসলে এসব তাদের নিতান্তই মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই ছিল।
আজকের দিনেও যে সমস্ত লোক ইসলামের দিকে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করেন, তাদের অধিকাংশই দ্বীনের মধ্যে এমন এমন বিদ'আতী রেওয়াজ চালু করেছেন যে সম্পর্কে আল্লাহর কোনো নির্দেশ নেই। যেমন কেউ কেউ আল্লাহর ঘরসমূহে বাদ্য-বাজনার মাধ্যমে ইবাদত অনুষ্ঠান করে থাকে, কেউ কবর প্রদক্ষিণ করে থাকে, কেউ কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরে বের হয়, কেউ তার খালেছ আনুগত্য ঢেলে দিয়ে তার সর্বোত্তম কুরবানীটুকু কবরের উদ্দেশ্যে মানত করে। কেউ বা সাধুগিরি ও শয়তানী ধোকাবাজির পন্থা আবিষ্কার করেছে এবং মনে করছে যে, সে সূফী-দরবেশদের তরীকা অবলম্বন করেছে। আসলে তার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্বীয় পশু প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা এবং সংকীর্ণ দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল করা। এই ধরনের কত যে অপকীর্তি ধর্মের নামে চলছে, তার ইয়ত্তা নেই।
টিকাঃ
আজকের দিনে এরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল এবং নগ্নতা বিরোধীদেরকে সেকেলে কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল বলে থাকে। (অনুবাদক)।
আজকের তথাকথিত উন্নত সভ্যতার যুগে এই উলংগপনা হাটে, ঘাটে, শিক্ষাঙ্গনে, সাহিত্যে, সংবাদপত্রে, টিভি-সিনেমাতে সর্বত্র ব্যাপ্তি লাভ করেছে। (অনুবাদক)
📄 হালাল বস্তুকে হারাম করে ইবাদতে লিপ্ত হওয়া
জাহেলী যুগে এটা প্রচলিত ছিল (যেমন তারা তাওয়াফের সময় কাপড় পরতো না, হজ্জের মওসুমে চর্বি খেতো না ইত্যাদি)। আল্লাহ এ সবের প্রতিবাদ করে বলেন-
'হে বনী আদম! প্রত্যেক ছালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোষাক পরিধান করো। তোমরা নিয়মিত আহার করো, পান করো, কিন্তু অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেন না। (হে নবী) আপনি বলে দিন, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সম্ভার ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তাকে তাদের জন্য কে হারাম করেছে? বলে দিন, এ সবই মুমিনদের জন্য, তাদের পার্থিব জীবনে ও বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে। এইরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমরা নিদর্শনগুলি বিশদভাবে বিবৃত করি। (হে নবী) আপনি বলে দিন যে, আমার প্রভু নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন যাবতীয় প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, সকল প্রকারের পাপকার্য, অসংগত বিরোধিতা এবং আল্লাহর সাথে শির্ক- যে সম্পর্কে কোনো দলিল তিনি নাযিল করেননি এবং নিষিদ্ধ করেছেন, আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলা, যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই'। (সূরা আ'রাফ, ৭: আয়াত ৩১-৩৩)
প্রথম আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ হলো যে, বেদুঈন আরবদের অনেকে উলংগ হয়ে পবিত্র কাবাঘর 'তাওয়াফ' (প্রদক্ষিণ) করতো। এমনকি মেয়েরাও উলংগ হয়ে অনুরূপ করতো এবং গান গেতো। কালবী বলেন যে, হজ্জের মওসুমে আরবরা বেঁচে থাকার মত যৎসামান্য আহার করতো। তা হজ্জের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই সময়ে কোনো চর্বিযুক্ত খাবার খেতো না। এ অবস্থায় মুসলিমরা আল্লাহর নবীকে বললেন যে, আমরাই তো হজ্জের সম্মান রক্ষার অধিক হকদার। তখন আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন।
দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, মানুষের কল্যাণ ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সৃষ্ট সূতী, কাতান, রেশমী প্রভৃতি বস্তুসমূহ এবং খাসী ও গরুর গোস্ত, চর্বি, দুধ প্রভৃতি যাবতীয় হালাল খাদ্যসমূহ তাদের জন্য সব সময়ই হালাল। মু'মিনদের জন্য এগুলো খাছ এজন্য বলা হয়েছে যে, আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা সর্বাধিক। সুতরাং এ সকল নিয়ামতের প্রকৃত হকদার তারাই। তবে অবিশ্বাসীরাও এসব ভোগ করতে পারবে সাধারণভাবে মুমিনদের অনুসরণে। অবশ্য পরকালীন জীবনে এ সমস্ত সৌন্দর্য সম্ভার উপভোগের অধিকারী হবেন কেবলমাত্র মুমিনরাই।
তৃতীয় আয়াতে 'প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার' ব্যাখ্যায় কোনো কোন মুফাসসীর 'প্রকাশ্য ও গোপন ব্যাভিচার' বলেছেন। আরবরা প্রকাশ্য ব্যাভিচার অপছন্দ করতো। কিন্তু গোপনে একাজে অভ্যস্ত ছিল। মুজাহিদ বলেন, 'প্রকাশ্য অশ্লীলতা' অর্থে 'উলঙ্গ তাওয়াফ' এবং 'গোপন অশ্লীলতা' অর্থে ব্যাভিচার বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, 'প্রকাশ্য' অর্থে পুরুষদের দিবসে উলংগ তাওয়াফ বুঝানো হয়েছে।
'পাপকর্ম' বলতে সব ধরনের পাপাচার বুঝানো হয়েছে। তবে কেউ কেউ আরবদের কবিতায় ব্যবহৃত উক্ত শব্দের প্রচলিত অর্থের দিকে খেয়াল করে এখানে 'মদের' অর্থ করেছেন।
'শির্ক- যে সম্পর্কে কোনো দলীল আল্লাহ নাযিল করেননি' এর দ্বারা আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সম্বন্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন- তারা নিজেদের অপকর্মের সমর্থনে যুক্তি দেখিয়ে বলতো যে- 'আল্লাহ আমাদের এসব করতে বলেছেন'। (সূরা আ'রাফ, ৭: আয়াত ২৮)
একথা সবারই জানা যে, আমাদের যামানার সুফী ছাহেবদের মধ্যে জাহেলী যুগের ঐ সকল স্বভাব ঢুকে পড়েছে। তাঁরা লোকদের কাছে নিজেদের সুফীগিরি দেখানোর জন্য ভাল পোষাক ও ভাল খাবার ত্যাগ করেন। তাঁরা নিঃসঙ্গভাবে হুজরায় ও খানকায় বসে নিজেদের কপোলকল্পিত বিভিন্ন বিদ'আতী তরীকায় মুরাকাবা-মুশাহাদা, ইশ্ক ও যিকরে মশগুল থাকেন। অথচ তাঁরা জানেন না যে, এর দ্বারা তারা আল্লাহ বর্ণিত ঐ সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন- "যারা তাদের সারাটি জীবন বরবাদ করেছে অথচ ভাবছে যে, তারা অত্যন্ত ভাল কাজ করছে”। (সূরা কাহাফ, ১৮: আয়াত ১০৪)
📄 আল্লাহর নাম ও গুণাবলী বিকৃত করা
জাহেলী যুগের লোকদের এ স্বভাব ছিল। আল্লাহ তার প্রতিবাদ করে বলেন-
'উত্তম নামসমূহ আল্লাহর জন্যই, তোমরা তাঁকে সে সকল নামেই ডাকো এবং যারা তাঁর নামসমূহ বিকৃত করেছে তাদেরকে পরিত্যাগ করো। তারা অতিসত্ত্বর তাদের কৃতকর্মের ফল পাবে'। (সূরা আ'রাফ, ৭: আয়াত ১৮০)
আল্লাহর নাম বিকৃত করা অর্থ তাঁকে এমন নামে ডাকা যা উদ্দেশ্য নয়। অথবা যার দ্বারা কোনো বাজে অর্থ কল্পনা করা যেতে পারে। যেমন- কোনো বেদুঈনের ডাক 'ইয়া আবাল মাকারিম' (হে দানশীলদের পিতা) 'ইয়া আবয়াদাল ওয়াজহি' (হে সফেদ চেহারার অধিকারী) “ইয়া সাখিইউ' (হে দাতা) প্রভৃতি। এগুলো তারা তাদের ধারণা মাফিক বলতো। প্রকৃত অর্থে এগুলো আল্লাহর নাম নয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'ইতোপূর্বে বিভিন্ন জাতির নিকট যেমন (নবী) পাঠিয়েছিলাম, তেমনি আপনাকেও একটি জাতির নিকট পাঠিয়েছি, কেবল আমার অহীসমূহ তিলাওয়াত করে শুনাবার জন্য। অথচ তারা 'রহমান' কে অস্বীকার করেছে। আপনি বলে দিন যে, 'তিনিই আমার প্রতিপালক'। তিনি ব্যতীত আমার অন্য কোনো ইলাহ বা মা'বুদ নেই। তাঁর উপরই আমি নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন’। (সূরা আর- রা’দ, ১৩: আয়াত ৩০)
কাতাদাহ, ইবনু জুরায়েজ ও মুকাতিল হতে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত আয়াতটি মক্কায় মুশরিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে আলী রা. লিখিত পত্রে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ দেখে তাদের প্রতিনিধি সোহায়েল ইবন আমর বলে ওঠে আমরা ‘রহমান’ বলে কাউকে জানি না। কোনো কোন তাফসীরকারের মতে আবু জেহেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘ইয়া আল্লাহ’ ইয়া রহমান’ বলতে শুনে বলে ওঠে যে, ‘মুহাম্মাদ আমাদেরকে বহু মা’বুদের উপাসনা করতে নিষেধ করে, অথচ সে নিজে দুই মা’বুদকে ডাকছে। জওয়াবে উক্ত আয়াত নাযিল হয়। কারো কারো মতে- যখন কাফিরদেরকে বলা হলো ‘তোমরা রহমানকে সিজদা করো’ তখন তারা বলে ‘রহমান’ কি বস্তু? এই সময় উক্ত আয়াত নাযিল হয়।
এভাবে আল্লাহর নামসমূহ বিকৃত করার সাথে সাথে তারা আল্লাহর গুণাবলীরও বিকৃত অর্থ গ্রহণ করেছিল। যেমন- আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী প্রভৃতি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- একদা আমি কা'বা শরীফের আড়ালে বসেছিলাম। এমন সময় একজন কুরায়শী ও দু'জন ছাকাফী অথবা একজন ছাকাফী ও দু'জন কুরায়শী সেখানে এলো। বিরাট দেহধারী ছিল তারা। কিন্তু মগজে কিছুই ছিল না। তাদের একজন বলল, 'আচ্ছা আমাদের এই নীরব কথাবার্তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন'?
উত্তরে অন্যজন বলল, যদি আমরা জোরে বলি তাহলে শুনতে পাবেন নইলে পাবেন না'। আরেকজন বলল, যদি তিনি আমাদের কথাবার্তার কিছু অংশ শুনে ফেলেন, তাহলে তিনি সবই শুনে নিবেন'। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি এই ঘটনা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বর্ণনা করলে নিম্নের আয়াত নাযিল হয়-
'কিয়ামতের দিন আল্লাহর শত্রুরা স্ব-স্ব গাত্র চর্মকে লক্ষ্য করে বলবে, কেন তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ? উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ আমাদেরকে কথা বলবার ক্ষমতা দিয়েছেন, যেমন অন্য সকল বস্তুকে তিনি দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁর কাছেই তোমরা সবাই ফিরে যাবে। তোমাদের চক্ষু, কর্ণ ও গাত্রচর্ম তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, এই ভয়ে তোমরা সংগোপনে কথা বলে থাকো। আসলে তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা যা করো তার বেশীকিছু আল্লাহ জানেন না। এটা প্রতিপালক সম্পর্কে তোমাদের একটা ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। এই ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংস করবে। অতঃপর তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে'। (সূরা হা-মীম সিজদাহ, ৪১: আয়াত ২১-২৩)
উপরোক্ত আলোচনায় আল্লাহর (শ্রবনকারী, দর্শনকারী প্রভৃতি) গুণাবলী সম্পর্কে তাদের বিকৃত অর্থ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেল।
প্রিয় পাঠক! আপনি ভাল করেই জানেন যে, মুসলিম কালাম শাস্ত্রবিদগণের মধ্যে অধিকাংশ আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জাহেলী যুগের লোকদের চাইতেও অধিক বিকৃত ধারণা করে থাকেন। তারা আল্লাহর এমন সব নাম রেখেছেন, যার কোনো দলীল আল্লাহ নাযিল করেননি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে থাকেন- আল্লাহর নিজস্ব কোনো গুণ নেই। কেউ বলেন, 'গুণাবলী তার সত্ত্বা হতে পৃথক বস্তু।' কেউ বলেন, আল্লাহর কিতাবসমূহ আল্লাহর কালাম নয়। তারা 'কালামে নাফসী' নামে আল্লাহর পৃথক কালাম প্রমাণ করতে চান। তারা বলেন যে, আল্লাহ কখনোই কোনো নবীর সংগে কালাম করেননি। এইরূপ বহু ধরনের ইলহাদ ও বাজে বিতর্কে তাদের বই-কিতাবসমূহ পরিপূর্ণ করা হয়েছে। তাঁরা দাবী করেন যে, উপরোক্ত আয়াত কেবলমাত্র জাহেলী যুগের লোকদের জন্য। অথচ তারা একথা বুঝতে নারাজ যে, এ আয়াত সমস্ত মানবজাতিকে শামিল করে। আল্লাহ যাকে দেখবার মত চোখ ও বুঝবার মত মগজ দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই ঐ সব লোকদের বই-পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলীলসমূহ দ্বারা রচিত হকপন্থী আলেম- বিদ্বানদের বই-কিতাবসমূহ পড়বেন এবং আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় লাভে ধন্য হবেন।
টিকাঃ
৯. এখানে বিশেষ করে অদ্বৈতবাদী মুসলিম দার্শনিক ও তাদের অনুসারি তথাকথিত মারেফতী পরী ফকিরদের কথাই বলা হয়েছে। না, শুধু তা নয়, বরং এখানে জাহমিয়া, মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়কেও বুঝানো হয়েছে। [সম্পাদক]