📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 অন্যের অনুসৃত সত্যকে অস্বীকার

📄 অন্যের অনুসৃত সত্যকে অস্বীকার


যখন তারা বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়, তখন প্রতিটি ফিরকা তাদের গৃহীত মতামতকে চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করতো এবং তাদের বিপক্ষীয় দলের নিকট বাস্তবিক কোনো সত্য থাকলেও তাকে অস্বীকার করতো।

কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন:
'ইয়াহূদীরা বলতো খৃষ্টানদের কোনো ভিত্তি নেই। তেমনি খৃষ্টানেরা বলতো ইয়াহুদীরা কোনো ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। অথচ তারা সবই আল্লাহর কিতাব (তাওরাত ও ইঞ্জীল) পড়তো। এমনি ধরণের কথা কেবল মুর্খরাই বলে থাকে। আল্লাহ তাদের মধ্যকার এই বিবাদ ফয়সালা করবেন কেয়ামতের দিন'। (সূরা আল-বাক্বারা, ২ : আয়াত ১১৩)

জাহেরী যুগের উপরোক্ত স্বভাব নিঃসন্দেহে বর্তমান যুগেও বহু লোকের মধ্যে বিদ্যমান। বিশেষ করে বিভিন্ন মাযহাবী নেতাদের মধ্যে। কেননা প্রত্যেক মাযহাবপন্থীই মনে করেন যে, দ্বীন কেবল তার মাযহাবেই আছে, অন্যের মধ্যে নয়। এজন্যই তো আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন- 'प्रत्यেক দলই নিজেরটা নিয়ে সন্তুষ্ট।'

কবি বলেন :
"প্রত্যেকেই লাইলীর প্রেমের দাবীদার। অথচ লাইলী তাদের কাউকে স্বীকার করে না।"

বুদ্ধিমানের কাজ হলো দলীল তালাশ করা। যে বিষয়ে সঠিক দলীল পাওয়া যাবে সেটাই সত্য ও গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে যার উপরে কোনো দলীল প্রমাণ পাওয়া যাবে না তা পিছনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ার প্রত্যেকের কথাই গ্রহণ বা বর্জন যোগ্য কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ব্যতীত।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 প্রত্যেক দলের এ দাবী করা যে, সত্য কেবল তাদের মাঝেই নিহিত

📄 প্রত্যেক দলের এ দাবী করা যে, সত্য কেবল তাদের মাঝেই নিহিত


আমার উম্মাত অদূর ভবিষ্যতে ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। প্রত্যেক দলই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ব্যতীত। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীস যখন লোকেরা শুনলো তখন প্রত্যেক দলই নিজেদেরকে “নাজী ফিরকা” বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল হিসাবে দাবী করলো। যদিও ঐ হাদীসের শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাবেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা হলো ঐ দল যারা আমার ও আমার ছাহাবাদের তরীকার উপর কায়েম থাকবে।

এমনি ভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা নিজ নিজ দলের "নাজী” বা মুক্তি প্রাপ্ত হওয়ার দাবীর অসারতা প্রতিপন্ন করে আল্লাহ বলেন-
'এসব তাদের খোশ-খেয়াল মাত্র। হে নবী! আপনি বলে দিন, তারা যদি নিজ নিজ দাবীতে সত্য হয়, তাহলে যেন দলীল পেশ করে। অবশ্য যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করেছে এবং সে যদি সৎকর্মশীল হয়, তাহলে তার রবের নিকট তার জন্য উত্তম পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই বা সংকিত হবারও কোনো কারণ নেই'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ১১১-১১২ আয়াত)

আবুল আব্বাস তাকীউদ্দীন ইবনে তাইমিয়াহ রহ. স্বীয় কিতাব "মিনহাজুস সুন্নাহ'র” মধ্যে নাজী ফিরকার বিষয়ে উপরোক্ত হাদীসটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যে হাদীসটির ভিত্তিতে শিয়া-রাফেযিরাও নিজেদেরকে 'নাজী ফিরকার' এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতকে বাতিল ফিরকা বলে দাবী করে। অথচ রাফেযিরা হচ্ছে বাতিল ফিরকা। যদি কেউ অধিক জানতে চান তবে যেন ইমাম ইবনে তাইমিয়াহর উক্ত কিতাবখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নেন।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বলে গৃহিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো বস্তুকে অস্বীকার করা

📄 দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বলে গৃহিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো বস্তুকে অস্বীকার করা


যেমন তারা হজ্জ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। এটাকে তারা তাদের দ্বীনের অংশ বলে স্বীকার করেছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তা করতে অস্বীকার করে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন-
যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য তীর্থ স্থান ও নিরাপত্তা স্থল হিসাবে গ্রহণ করলাম এবং লোকদেরকে বললাম যে, তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানো স্থানকেই 'মুছাল্লা' বা ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করো। (কিন্তু, কাফিররা তা না করে কাবা ঘরে প্রতিমা রাখে এবং ওর পূজা শুরু করে দেয়, যদিও মুখে ইবরাহীমের অনুসারী বলে দাবী করতো)। আল্লাহ তাদের এই আচরণের প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলেন-
'যারা নিজেদেরকে (ইচ্ছাকৃতভাবে) নির্বোধ গণ্য করেছে, কেবল তারাই ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, অথচ আল্লাহ তাকেই দুনিয়ার মধ্যে হতে নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি আখিরাতে অবশ্যই নেককার বান্দাদের মধ্যে গণ্য হবেন'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ১২৫-১৩০)

শেষোক্ত আয়াতটি নাযিলের কারণ হিসাবে বলা হয়ে থাকে যে, প্রখ্যাত ইয়াহূদী পন্ডিত (পরে মুসলিম) আব্দুল্লাহ ইবন সালাম সালমা ও মুহাজির নামীর স্বীয় দুই ভাতিজাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, তোমরা নিশ্চয়ই একথা জানো যে, আল্লাহ পাক তাওরাতে বলেছেন, আমি ইসমাঈলের বংশে আহমদ নামে একজন নবীকে পাঠাবো। যারা তার উপর ঈমান আনবে তারা হিদায়েত প্রাপ্ত হবে এবং যারা ঈমান আনবে না তারা হবে অভিশপ্ত। একথা শুনে ভাতিজা দু'জনেই মুসলিম হয়ে গেল। এ ঘটনার পরেই উক্ত আয়াত নাযিল হয়।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 নগ্নতার প্রদর্শনী

📄 নগ্নতার প্রদর্শনী


কাফিররা নগ্নতার প্রদর্শনী করতো এবং এর পক্ষে বিভিন্ন অপযুক্তি খাড়া করতো।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
'যখন তারা কোনো অশ্লীল কাজ করতো তখন বলতো, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এ কাজ করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এ কাজে অনুমতি দিয়েছেন। আপনি বলে দিন (হে নবী) নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অশ্লীল কাজের অনুমতি দেন না। তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতে চাও যা তোমরা জানো না'? (সূরা আরাফ, ৭: আয়াত ২৮)

মুফাসসীরগণ বলেন : এখানে অশ্লীল কাজ অর্থ প্রতিমা পূজা করা এবং কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) উলংগ হয়ে তাওয়াফ করা ইত্যাদি। শুধুমাত্র উলঙ্গ হওয়ার কথাই বলা হয়েছে। কাফিররা তাদের এই বেহায়াপনার পক্ষে দুটি যুক্তি খাড়া করেছে। (এক) বাপ-দাদাদের রীতি রেওয়াজের অন্ধ অনুসরণ এবং (দুই) আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ।

তাদের নেতাদের নিয়ম ছিল এই যে, তারা হজ্জের মওসুমে আরাফাতের ময়দানে না গিয়ে মুজদালিফায় যেয়ে অবস্থান (ওকুফ) করতো। তারা এই সময় ঘি গরম করতো না, পনির খেতো না, কোনো ছাগল-বকরী কিংবা গরু বাঁধতো না, উট বা ভেড়ার পশম দিয়ে সূতা কাটতো না, কোনো পশমের বা কাদার তৈরী ঘরে ঢুকতো না। তারা সম্মানিত চারটি মাস লাল গম্বুজওয়ালা ঘরে লুকিয়ে থাকতো। তারা আরবদের উপর কঠোরভাবে নিয়ম করে দিয়েছিল যেন হারাম শরীফে ঢুকবার পূর্বে তারা হালাল অবস্থার সমস্ত পরিধেয় বস্ত্র ফেলে দেয় এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করে। চাই সেই পোশাক ক্রয়ের মাধ্যমে হোক বা ধারসূত্রে কিংবা দানসূত্রে প্রাপ্ত হোক। যদি তা না পায় তবে সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় তাওয়াফ করতে হবে। মেয়েদের উপরোক্ত একই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। বরং মেয়েরা তাদের দু'পা ও নিতম্বদ্বয় ফাঁকা করে তাওয়াফ করতো। এমনিভাবে তাওয়াফ করা অবস্থায় যাবাআ বিনতে আমের নামক এক মহিলা গেয়েছিলঃ-
'আজকের দিনের (লজ্জাস্থানের) (কিছু অংশ বা সম্পূর্ণটা প্রকাশ হয়ে পড়লো। তবে যেটুকু প্রকাশিত হলো আমি তাকে হালাল করবো না।'

তারা নিজেরা মুযদালিফা থেকেই ফিরে আসত। অপর লোকেরা আরাফাতের ময়দান থেকে ফিরে আসত। এমনি ধরনের বহু নতুন নতুন রেওয়াজ তারা চালু করেছিল, যে সম্পর্কে আল্লাহ কোনরূপ নির্দেশ পাঠাননি। এতদসত্ত্বেও তারা পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাতের উপর কায়েম আছে বলে গালভরা দাবী করতো। আসলে এসব তাদের নিতান্তই মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই ছিল।

আজকের দিনেও যে সমস্ত লোক ইসলামের দিকে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করেন, তাদের অধিকাংশই দ্বীনের মধ্যে এমন এমন বিদ'আতী রেওয়াজ চালু করেছেন যে সম্পর্কে আল্লাহর কোনো নির্দেশ নেই। যেমন কেউ কেউ আল্লাহর ঘরসমূহে বাদ্য-বাজনার মাধ্যমে ইবাদত অনুষ্ঠান করে থাকে, কেউ কবর প্রদক্ষিণ করে থাকে, কেউ কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরে বের হয়, কেউ তার খালেছ আনুগত্য ঢেলে দিয়ে তার সর্বোত্তম কুরবানীটুকু কবরের উদ্দেশ্যে মানত করে। কেউ বা সাধুগিরি ও শয়তানী ধোকাবাজির পন্থা আবিষ্কার করেছে এবং মনে করছে যে, সে সূফী-দরবেশদের তরীকা অবলম্বন করেছে। আসলে তার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্বীয় পশু প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা এবং সংকীর্ণ দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল করা। এই ধরনের কত যে অপকীর্তি ধর্মের নামে চলছে, তার ইয়ত্তা নেই।

টিকাঃ
আজকের দিনে এরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল এবং নগ্নতা বিরোধীদেরকে সেকেলে কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল বলে থাকে। (অনুবাদক)।
আজকের তথাকথিত উন্নত সভ্যতার যুগে এই উলংগপনা হাটে, ঘাটে, শিক্ষাঙ্গনে, সাহিত্যে, সংবাদপত্রে, টিভি-সিনেমাতে সর্বত্র ব্যাপ্তি লাভ করেছে। (অনুবাদক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px