📄 দ্বীনের হেদায়েত ছেড়ে দ্বীন বিরোধী পথের অনুগমন
এ ছিল জাহেলী যুগের এক আজব স্বভাব। তারা খাটি দ্বীনের সংগে কঠিন শত্রুতায় লিপ্ত হতো। অন্যদিকে কাফিরদের দ্বীনের সংগে পূর্ণ প্রীতি স্থাপন করতো। যেমন ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে করেছিল। তিনি মূসার (আঃ) দ্বীন (উহার মূলনীতি) নিয়ে এসেছিলেন, অথচ তারা যাদু বিদ্যার বইসমূহ অনুসরণ করতে লাগলো যা ছিল ফিরাউনের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। মুসলিমদের মধ্যে আজকাল এরূপ লোকের কোনই কমতি নেই যার সুন্নাহ ত্যাগ করেছে। এমনকি তার সংগে শত্রুতাও করে থাকে। অথচ তারা দার্শনিকদের কথা ও নির্দেশসমূহের সহায়তা করে।
📄 অন্যের অনুসৃত সত্যকে অস্বীকার
যখন তারা বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়, তখন প্রতিটি ফিরকা তাদের গৃহীত মতামতকে চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করতো এবং তাদের বিপক্ষীয় দলের নিকট বাস্তবিক কোনো সত্য থাকলেও তাকে অস্বীকার করতো।
কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন:
'ইয়াহূদীরা বলতো খৃষ্টানদের কোনো ভিত্তি নেই। তেমনি খৃষ্টানেরা বলতো ইয়াহুদীরা কোনো ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। অথচ তারা সবই আল্লাহর কিতাব (তাওরাত ও ইঞ্জীল) পড়তো। এমনি ধরণের কথা কেবল মুর্খরাই বলে থাকে। আল্লাহ তাদের মধ্যকার এই বিবাদ ফয়সালা করবেন কেয়ামতের দিন'। (সূরা আল-বাক্বারা, ২ : আয়াত ১১৩)
জাহেরী যুগের উপরোক্ত স্বভাব নিঃসন্দেহে বর্তমান যুগেও বহু লোকের মধ্যে বিদ্যমান। বিশেষ করে বিভিন্ন মাযহাবী নেতাদের মধ্যে। কেননা প্রত্যেক মাযহাবপন্থীই মনে করেন যে, দ্বীন কেবল তার মাযহাবেই আছে, অন্যের মধ্যে নয়। এজন্যই তো আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন- 'प्रत्यেক দলই নিজেরটা নিয়ে সন্তুষ্ট।'
কবি বলেন :
"প্রত্যেকেই লাইলীর প্রেমের দাবীদার। অথচ লাইলী তাদের কাউকে স্বীকার করে না।"
বুদ্ধিমানের কাজ হলো দলীল তালাশ করা। যে বিষয়ে সঠিক দলীল পাওয়া যাবে সেটাই সত্য ও গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে যার উপরে কোনো দলীল প্রমাণ পাওয়া যাবে না তা পিছনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ার প্রত্যেকের কথাই গ্রহণ বা বর্জন যোগ্য কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ব্যতীত।
📄 প্রত্যেক দলের এ দাবী করা যে, সত্য কেবল তাদের মাঝেই নিহিত
আমার উম্মাত অদূর ভবিষ্যতে ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। প্রত্যেক দলই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ব্যতীত। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীস যখন লোকেরা শুনলো তখন প্রত্যেক দলই নিজেদেরকে “নাজী ফিরকা” বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল হিসাবে দাবী করলো। যদিও ঐ হাদীসের শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাবেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা হলো ঐ দল যারা আমার ও আমার ছাহাবাদের তরীকার উপর কায়েম থাকবে।
এমনি ভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা নিজ নিজ দলের "নাজী” বা মুক্তি প্রাপ্ত হওয়ার দাবীর অসারতা প্রতিপন্ন করে আল্লাহ বলেন-
'এসব তাদের খোশ-খেয়াল মাত্র। হে নবী! আপনি বলে দিন, তারা যদি নিজ নিজ দাবীতে সত্য হয়, তাহলে যেন দলীল পেশ করে। অবশ্য যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করেছে এবং সে যদি সৎকর্মশীল হয়, তাহলে তার রবের নিকট তার জন্য উত্তম পুরস্কার রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই বা সংকিত হবারও কোনো কারণ নেই'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ১১১-১১২ আয়াত)
আবুল আব্বাস তাকীউদ্দীন ইবনে তাইমিয়াহ রহ. স্বীয় কিতাব "মিনহাজুস সুন্নাহ'র” মধ্যে নাজী ফিরকার বিষয়ে উপরোক্ত হাদীসটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যে হাদীসটির ভিত্তিতে শিয়া-রাফেযিরাও নিজেদেরকে 'নাজী ফিরকার' এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতকে বাতিল ফিরকা বলে দাবী করে। অথচ রাফেযিরা হচ্ছে বাতিল ফিরকা। যদি কেউ অধিক জানতে চান তবে যেন ইমাম ইবনে তাইমিয়াহর উক্ত কিতাবখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নেন।
📄 দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত বলে গৃহিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো বস্তুকে অস্বীকার করা
যেমন তারা হজ্জ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। এটাকে তারা তাদের দ্বীনের অংশ বলে স্বীকার করেছিল, কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তা করতে অস্বীকার করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য তীর্থ স্থান ও নিরাপত্তা স্থল হিসাবে গ্রহণ করলাম এবং লোকদেরকে বললাম যে, তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানো স্থানকেই 'মুছাল্লা' বা ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করো। (কিন্তু, কাফিররা তা না করে কাবা ঘরে প্রতিমা রাখে এবং ওর পূজা শুরু করে দেয়, যদিও মুখে ইবরাহীমের অনুসারী বলে দাবী করতো)। আল্লাহ তাদের এই আচরণের প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলেন-
'যারা নিজেদেরকে (ইচ্ছাকৃতভাবে) নির্বোধ গণ্য করেছে, কেবল তারাই ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, অথচ আল্লাহ তাকেই দুনিয়ার মধ্যে হতে নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি আখিরাতে অবশ্যই নেককার বান্দাদের মধ্যে গণ্য হবেন'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ১২৫-১৩০)
শেষোক্ত আয়াতটি নাযিলের কারণ হিসাবে বলা হয়ে থাকে যে, প্রখ্যাত ইয়াহূদী পন্ডিত (পরে মুসলিম) আব্দুল্লাহ ইবন সালাম সালমা ও মুহাজির নামীর স্বীয় দুই ভাতিজাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, তোমরা নিশ্চয়ই একথা জানো যে, আল্লাহ পাক তাওরাতে বলেছেন, আমি ইসমাঈলের বংশে আহমদ নামে একজন নবীকে পাঠাবো। যারা তার উপর ঈমান আনবে তারা হিদায়েত প্রাপ্ত হবে এবং যারা ঈমান আনবে না তারা হবে অভিশপ্ত। একথা শুনে ভাতিজা দু'জনেই মুসলিম হয়ে গেল। এ ঘটনার পরেই উক্ত আয়াত নাযিল হয়।