📄 সঠিক ও ত্রুটিপূর্ণ কিয়াস সম্পর্কে অজ্ঞতা
জাহেলী যুগের লোকেরা নিজেদের অন্যায় দাবীর সমর্থন অযৌক্তিক কিয়াসের আশ্রয় নিত এবং সঠিক কিয়াসকে প্রত্যাখ্যান করতো। পবিত্র কুর'আনুল কারীমে তাদের এই বদ অভ্যাসের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আমরা নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করি। তিনি তাদেরকে বলেনঃ হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। তোমরা কি (আল্লাহর আযাবের) ভয় করো না'? (সূরা আল মুমিনুন, ২৩: আয়াত ২৩)
তখন তার কওমের নেতৃস্থানীয় অবিশ্বাসীরা বললো, এই ব্যক্তি তোমাদেরই মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই নয়। সে তোমাদের উপর প্রধান্য বিস্তার করতে চায়। যদি আল্লাহ (সত্যি সত্যিই কোনো নবী প্রেরণ করতে) চাইতেন তাহলে কোনো ফেরেশতাকে (ঐ কাজে) পাঠাতেন। (এ ব্যক্তি যে সমস্ত কথা বলছে) আমরাতো কখনই এ সব কথা আমাদের বাপ-দাদাদের কাছে শুনিনি। নিশ্চয়ই এই ব্যক্তির সংগে কোনো জিন-ভূত কিংবা পাগলামী আছে। অতএব, তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো (যতদিন না এর পাগলামী ছেড়ে যায়)'।
এখানে তারা নবীকে তাদের কুটবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের সংগে কিয়াস করছে। যদিও দৈহিক দিক দিয়ে নবীরা তাদেরই মত মানুষ, তবুও অন্য সকল দিক দিয়ে তাদের সংগে নবীদের যে হাজারো পার্থক্য রয়েছে সে কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। যেমন আল্লাহ সমগ্র মানুষের মধ্যে নবীদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন তাঁর পয়গাম বহনের জন্য, তাঁর কালামের জন্য, অহীর জন্য প্রভৃতি। অতএব, এই দিক দিয়ে তারা দুনিয়ার অন্য সকল মানুষ হতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। অথচ জাহেলীরা তাদেরকে নিজেদের উপর কিয়াস করেছেন এবং অন্যায়ভাবে দোষারোপ করেছে। যেমন একালের জাহিলরাও করে থাকে।
টিকাঃ
৩. লেখক উপরোক্ত আয়াতের শাব্দিক ও ভাবগত বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কিয়াস সম্পর্কে জানার জন্য ইমাম ইবনে তাহমিয়াহ প্রণীত 'আল-কিয়াসু ফিশ শারয়িল ইসলামি' বইটি পাঠককে পাঠ করতে বলেছেন। সর্বদিক বিবেচনা করেই এখানে কেবল মূল বক্তব্যটুকু তুলে ধরা হলো। (অনুবাদক)।
📄 সৎ লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
জাহেলী যুগের লোকেরা ওলামা ও আউলিয়াদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতো। আল্লাহ বলেন-
'ইয়াহূদীরা বলেছে ওযায়ের আল্লাহর পুত্র, ওদিকে নাছারারা বলে ঈসা মসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের (অবাস্তব) কথা মাত্র। তারাতো তাদের ন্যায়ই কথা বলছে যারা তাদের পূর্বে কাফের হয়ে গেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! তারা কোনো দিকে যাচ্ছে? তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের ধর্ম-যাজক ও পুরোহিতদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদের প্রতি এই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মাবুদের ইবাদত করবে যিনি ব্যতীত মাবুদ হওয়ার যোগ্য কেইউ নেই, তিনি তাদের শরীক স্থির হতে পবিত্র।' (সূরা আত-তাওবাঃ ৯: আয়াত ৩০-৩১)
এখানে 'আহবার' ও 'রুহবান' বা পীর- পুরোহিতদেরকে 'রব' হিসাবে গ্রহণ করার অর্থ এই যে, ঐ সময় তাদের কথার উপরেই হালাল-হারাম নির্ধারিত হতো। বাঁচার জন্য কিংবা কোনো কিছুর মঙ্গলের আশায় এদেরকেই ডাকতো। তাদেরই উত্তরসূরীরা আজও বেঁচে আছে পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন প্রান্তে। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস বর্ণে বর্ণে সত্য হয়েছে। তিনি বলেছেন - 'অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি অনুসরণ করবে'। (হাদীস)।
যার ফলে আজ আমরা অধিকাংশ লোককে দেখি আল্লাহ ও তাঁর সত্য দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রকমারী বেদআতে তারা হাবুডুবু খাচ্ছে। বিভ্রান্তি ও গুমরাহীর ধু-ধু ময়দানে তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরছে। কিতাব ও সুন্নাহ এবং তার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে দ্বীন আজ তাদের কাছে যেয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে। ইসলাম আজ প্রকাশ্য বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে।
📄 না বুঝার অজুহাত
জাহেলী যুগের লোকেরা আল্লাহর অহীর তাৎপর্য বুঝতে না পারার অজুহাত দিয়ে ইসলাম থেকে দূরে থাকতে চাইতো। যেমন আল্লাহ রাববুল 'আলামীন বলেনঃ
'যখন তোমাদের কাছে তোমাদের ইচ্ছার বিরোধী কোনো দাওয়াত নিয়ে রাসূল আগমন করেন, তখন তোমরা অহংকার দেখাও। অতঃপর তোমাদের একদল তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে, অন্য দল তাকে হত্যা করে। তারা বলে যে, আমাদের অন্তরগুলো আচ্ছাদিত, বরং তাদের এই অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহর তাদেরকে লা'নত করেন'। (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ৮৭-৮৮)
অন্যত্র পবিত্র কুর'আনের প্রতি মানুষের আচরণ প্রসঙ্গে বলেনঃ
'অতঃপর তাদের অধিকাংশ তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিল, তারা উহার বাণীর প্রতি কর্ণপাত করলো না। তারা বলত যে, তোমরা আমাদেরকে যেদিকে আহবান করছো ঐ সব বিষয়ের জন্য আমাদের অন্তরগুলি আচ্ছাদিত হয়ে আছে, আমাদের কানগুলি বধির হয়ে গেছে এবং তোমাদের ও আমাদের মাঝে একটি পর্দা পড়ে গেছে। অতএব তোমরা তোমাদের কাজ করো, আমরা আমাদের কাজ করি। হে নবী! আপনি বলুন যে, আমি তোমাদের মত একজন মানুষ। (পার্থক্য এতটুকুই যে) আমার নিকট 'অহী' আসে। নিশ্চয়ই তোমাদের রব মাত্র একজন। অতএব, তাঁর প্রতি সোজা হয়ে চলো এবং ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই মুশরিকদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য'। (সূরা হা-মীম সাজদাহ্ / ফুছছিলাত, ৪১: আয়াত ৪-৬)
বিভিন্ন খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে তারা রাসূলকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাশ করতে চাইতো, যাতে তিনি তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো হতে বিরত থাকেন এবং তাদের সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রা. কাতাদাহ্ রা. ও সুদ্দী রা. বলেন- তাদের অন্তরসমূহ আবৃত অর্থাৎ ইলম ও জ্ঞানে ভরপুর। অবিশ্বাসীরা মনে করতো যে, তাদের কাছে যে জ্ঞান আছে তাই-ই যথেষ্ট। (অতএব নবীর কি দরকার)। কেউ কেউ উক্ত আয়াতের তাফসীর করেছেন যে, কাফিররা মনে করতো যে, তাদের অন্তরগুলি জ্ঞানের ভান্ডার। অতএব, তাদের পক্ষে কোনো মূর্খ নবীর অনুসরণ করা মোটেই ঠিক নয়।
এমনিভাবে মাদায়েনবাসীরা শু'আইব আলাইহিস সালামকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল-
‘হে শুআইব! তুমি যে সব কথা বলো ওসবের কিছু আমরা বুঝি না। আমরা তোমাকে আমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্বল দেখি। যদি তোমার কওম না থাকতো তাহলে আমরা তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করতাম। আর তুমি আমাদের উপর মোটেই ক্ষমতাবান নও’। (সূরা হুদ, ১১: আয়াত ৯১)
উপরোক্ত সমস্ত আয়াতগুলি প্রায় একই অর্থ বহন করছে যে, অবিশ্বাসীরা নিজেদের হঠকারিতাকে ঢেকে রাখবার জন্য অহী বুঝতে না পারার খোঁড়া অজুহাত পেশ করতো। আল্লাহ তাদের এই মিথ্যা অজুহাতকে বার বার মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন বিভিন্ন আয়াতসমূহে এবং বর্ণনা করেছেন যে, এই না বোঝার অর্থ আসলে ‘বুঝতে না চাওয়া’, ‘বুঝতে না পারা’ নয়।
কবি মা'আরী বলেছেন:
তারকারাজির সৌন্দর্য অনুধাবন করতে চক্ষু অক্ষম। এই অক্ষমতার জন্য চক্ষু দায়ী, তারকা নয়।
📄 দলীয় নীতির বিরোধী হওয়ায় সত্যকে অস্বীকার করা
জাহেলী যুগের লোকদের অন্যতম স্বভাব ছিল এই যে, তারা কেবল সেই সকল সত্যকে স্বীকার করতো, যেগুলি তাদের গোত্র বা সম্প্রদায় মেনে নিত। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের স্বভাব বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন :
'যখন তাদেরকে কুরআনের প্রতি ঈমান আনতে বলা হলো তখন তারা বললো- আমাদের নিকট যে কিতাব নাযিল হয়েছে কেবল তার উপরেই আমরা ঈমান আনবো। (এই ভাবে) তারা এর বাইরে সব কিছুকে অস্বীকার করে। অথচ কুরআন হল সত্য এবং তাদের নিকট ইতোপূর্বে আগত কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। (হে নবী!) আপনি বলে দিন যে, তোমরা যদি (তাওরাতের প্রতি) সত্যিকারের বিশ্বাসী হয়ে থাকো তাহলে কেন ইতোপূর্বে আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছিলে?' (সূরা আল-বাক্বারা, ২ : আয়াত ৯১)
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথার উত্তরে স্পষ্ট ভাষায় তারা বলে দিয়েছে যে, তারা চিরকাল তাওরাতের ও তার আদেশ-নিষেধের উপরই ঈমান রাখবে। এ কথাও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, কুরআনের উপরে তারা ঈমান আনতে চায় না এই হিংসা ও হঠকারিতার কারণে যে তা তাদের বর্ণের মধ্যে কারোর উপরে নাযিল হয়নি।