📄 সত্যপন্থীদের উপর মিথ্যা দোষারোপ করা
জাহেলী যুগের লোকদের স্বভাব ছিল যে, তারা সত্যপন্থীদেরকে কপট ও দুনিয়াদার বলে দোষারোপ করতো। আল্লাহ তাদের এই স্বভাবের প্রতিবাদ করেছেন যা ইতোপূর্বে নূহ আলাইহিস সালামের মুখ দিয়ে পবিত্র কালামে আমরা শুনেছি।
কওমের লোকদের ঐসব কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল, এই যে, দরিদ্র নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা নূহের উপর ঈমান এনেছে যাতে তাদের কিছু দুনিয়াবী ফায়দা লুটার মওকা মিলে। কিছু পার্থিব সুবিধা অর্জন করা যায়। এজন্য নয় যে, তারা নূহের দাওয়াতের সত্যতা উপলব্ধি করে ঈমান এনেছে। এই অন্যায় দোষারোপের প্রতিবাদেই আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত বর্ণনা করেছেন।
📄 হক পন্থীরা দুর্বল এই অহংকারে হকের সাহায্য থেকে দুরে থাকা
জাহেলী যুগের অন্যতম স্বভাব ছিল যে, তারা হক পথ হতে মুখ ফিরিয়ে নিত অবজ্ঞা ও অহংকার করে, যেহেতু সেখানে দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা ঢুকে পড়েছে।
আল্লাহ এর প্রতিবাদে বলেনঃ
'(হে নবী) আপনি ঐ সমস্ত লোকদের দূরে সরিয়ে দেবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভু-প্রতিপালককে ডাকে। তারা কেবলমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে আপনার যেমন কোনো দায়-দায়িত্ব নেই, আপনার হিসাব নিকাশের ব্যাপারেও তাদের কোনরূপ দায় দায়িত্ব নেই, আপনি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দেবেন না, তাহলে আপনি অনাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। এমনিভাবে আমি একজনকে অপরজনের দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি, যাতে তারা বলে যে, আমাদের মধ্য থেকে আল্লাহ অমুক অমুক লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আল্লাহ কি তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত নহেন?' (সূরা আনআম, ৬: আয়াত ৫২-৫৩)
মোদ্দাকথা, এখানে বক্তব্য বিষয় এই যে, ঐসমস্ত দুর্বল শ্রেণীর মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তারা সত্যিই যুক্তির ভিত্তিতে ঈমান এনেছে কোনো লোভ-লালসা বা নগদপ্রাপ্তির আশায় নহে যেমন ধারণা করেছে তাদের শত্রুরা। কেননা পরকালীন হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে রাসূল বা উম্মত কেউ কারো দায়-দায়িত্ব নেবে না। অতএব তাদের খালেছ ঈমানকে অহেতুক অবজ্ঞা করার কোনো অর্থ হয় না।
📄 নিজেদের অধিকতর যোগ্য ভেবে অন্যের গৃহিত সত্যকে বাতিল গণ্য করা
সূরা আহক্বাফে আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের আচরণ ব্যাখ্যা করেন নিম্নভাবে-
‘আপনি ওদেরকে বলে দিন- আচ্ছা যদি এই কুর'আন যথার্থই আল্লাহর তরফ থেকে হয় এবং তোমরা উহাকে অস্বীকার করতে থাকো এমনিভাবে যদি তোমাদেরই কওম বনী ইসরাইলের মধ্য হতে কেউ উহার সত্যতার সাক্ষ্য দেয় এবং ঈমান আনয়ন করে আর তোমরা কেবল অহংকার করতেই থাকো, সেমতাবস্থায় তোমাদের রায় কি হবে? নিশ্চয়ই আল্লাহ অবিচারী যালিমদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।’ (সূরা আল-আহকাফ : আয়াত ১০)
(এ কথার উত্তরে) অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলল- যদি কুর'আন যথার্থই কোনো উত্তম বস্তু হতো, তাহলে সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই এসব (নিম্ন শ্রেণীর) লোকেরা আমাদের অগ্রবর্তী হতে পারতো না (কেননা জ্ঞানীরাই প্রথমে উত্তম বস্তু গ্রহণ করে থাকে)। আল্লাহ বলেন, যখন কুর'আন দ্বারা ওদের হিদায়েত জোটেনি, তখন ওরা একথাই বলবে যে, উহাতো কেবল পুরাতন অলীক বিষয়’। (সূরা আল-আহক্বাফ, ৪৬: আয়াত ১০ ও ১১)
📄 সঠিক ও ত্রুটিপূর্ণ কিয়াস সম্পর্কে অজ্ঞতা
জাহেলী যুগের লোকেরা নিজেদের অন্যায় দাবীর সমর্থন অযৌক্তিক কিয়াসের আশ্রয় নিত এবং সঠিক কিয়াসকে প্রত্যাখ্যান করতো। পবিত্র কুর'আনুল কারীমে তাদের এই বদ অভ্যাসের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আমরা নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করি। তিনি তাদেরকে বলেনঃ হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। তোমরা কি (আল্লাহর আযাবের) ভয় করো না'? (সূরা আল মুমিনুন, ২৩: আয়াত ২৩)
তখন তার কওমের নেতৃস্থানীয় অবিশ্বাসীরা বললো, এই ব্যক্তি তোমাদেরই মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই নয়। সে তোমাদের উপর প্রধান্য বিস্তার করতে চায়। যদি আল্লাহ (সত্যি সত্যিই কোনো নবী প্রেরণ করতে) চাইতেন তাহলে কোনো ফেরেশতাকে (ঐ কাজে) পাঠাতেন। (এ ব্যক্তি যে সমস্ত কথা বলছে) আমরাতো কখনই এ সব কথা আমাদের বাপ-দাদাদের কাছে শুনিনি। নিশ্চয়ই এই ব্যক্তির সংগে কোনো জিন-ভূত কিংবা পাগলামী আছে। অতএব, তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো (যতদিন না এর পাগলামী ছেড়ে যায়)'।
এখানে তারা নবীকে তাদের কুটবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের সংগে কিয়াস করছে। যদিও দৈহিক দিক দিয়ে নবীরা তাদেরই মত মানুষ, তবুও অন্য সকল দিক দিয়ে তাদের সংগে নবীদের যে হাজারো পার্থক্য রয়েছে সে কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। যেমন আল্লাহ সমগ্র মানুষের মধ্যে নবীদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন তাঁর পয়গাম বহনের জন্য, তাঁর কালামের জন্য, অহীর জন্য প্রভৃতি। অতএব, এই দিক দিয়ে তারা দুনিয়ার অন্য সকল মানুষ হতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। অথচ জাহেলীরা তাদেরকে নিজেদের উপর কিয়াস করেছেন এবং অন্যায়ভাবে দোষারোপ করেছে। যেমন একালের জাহিলরাও করে থাকে।
টিকাঃ
৩. লেখক উপরোক্ত আয়াতের শাব্দিক ও ভাবগত বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কিয়াস সম্পর্কে জানার জন্য ইমাম ইবনে তাহমিয়াহ প্রণীত 'আল-কিয়াসু ফিশ শারয়িল ইসলামি' বইটি পাঠককে পাঠ করতে বলেছেন। সর্বদিক বিবেচনা করেই এখানে কেবল মূল বক্তব্যটুকু তুলে ধরা হলো। (অনুবাদক)।