📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 ঐশ্বর্যের ধোকা

📄 ঐশ্বর্যের ধোকা


জাহেলী আরবের ধনশালী ব্যক্তিরা অফুরন্ত ধন-ঐশ্বর্যের মালিক হওয়ার কারণে নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলে মনে করতো।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"যখনই আমি কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছো আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। তারা আরো বলতোঃ আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদের কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না। বলঃ আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা রিযক বর্ধিত করেন অথবা এটা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।" (সূরা আস-সাবা ৩৪, আয়াত: ৩৫-৩৭)

যেমন কারুনকে বলেন-
'যখন তার কওম বলল যে, বেশী ফুর্তি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফুর্তিবাজদেরকে ভালবাসেন না। তোমাকে আল্লাহ যে অগাধ ধন-সম্পদ দান করেছেন এ দিয়ে তুমি আখেরাতের পাথের সঞ্চয় করো। অবশ্য এ জন্য দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য হিস্যা ভুলে যেও না এবং তুমি ইহসান করো যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি ইহসান করেছেন। আর দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না। কিন্তু কারুন জওয়াবে বলেছিল- এ সমস্ত ধন-সম্পদ তো আমি আমার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অর্জন করেছি। অথচ এই হতভাগা জানেনা যে, তার চাইতে অনেক শক্তি ও সম্পদের অধিকারী বহু ব্যক্তিতে তার পূর্বের যামানায় আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিয়েছেন।' (সূরা ক্বাছাছ, ২৮ : আয়াত ৭৬-৭৮)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ধনের প্রাচুর্য, দুনিয়াবী আরাম-আয়েশ ও স্বচ্ছলতা পরকালীন জীবনে নাজাতের কোনো দলীল নয়। বরং আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের একমাত্র পথ হলো তাঁর আনুগত্য করা ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করা এবং দ্বীনে হক পরিপূর্ণভাবে কবুল করা।

যেমন কবি আবুল হোসায়েন আহমেদ ইবনে রাবেন্দী আল মুলহিদ বলেন-
কত জ্ঞানী-গুনি আছেন যারা ক্ষুধার্ত আর কত মুর্খ আছে যারা প্রাচুর্যে জীবন কাটাচ্ছে।

অপর এক মুরববী বলেন :
আমরা পরাক্রমশালী মহান সত্বার বন্টনে সন্তুষ্ট। আমাদের জন্য ইলম-জ্ঞান ও আমাদের শত্রুদের জন্য ধন-সম্পদ। সম্পদ, সে তো অতি সত্বর ধংস হয়ে যাবে, হয়ে যাবে নিঃশেষ। আর ইলম-জ্ঞান থেকে যাবে, নিঃশেষ হবে না কখনো।

অতএব জাহেলী আরবদের মধ্যে যে ধারণা প্রচলিত ছিল যে, দুনিয়ায় সম্পদশালী হওয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দা হওয়ার একটি প্রমাণ, এ যুক্তি একেবারেই বাতিল। যাদের সামান্য বোধশক্তি আছে, একথা বুঝতে তাদের মোটেই কষ্ট হবার কথা নয়।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সত্যপন্থীরা দুর্বল হওয়ার কারণে মূল সত্যকেই অবজ্ঞা করা

📄 সত্যপন্থীরা দুর্বল হওয়ার কারণে মূল সত্যকেই অবজ্ঞা করা


উক্ত বিষয়ের প্রমাণ যেমন আল্লাহ নিজে নূহ আলাইহিস সালামের কওম সম্পর্কে বলেন :
‘নূহের কওম নবীদেরকে মিথ্যা ধারণা করেছিল। যখন তাদের ভাই নূহ তাদের বললেন, তোমরা কি সংযত হবে না? আমি তোমাদের বিশ্বস্ত পয়গম্বর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমাকে অনুসরণ করো। আমি এজন্য তোমাদের কাছে কোনরূপ প্রতিদান চাই না। এর সবকিছু বদলা আমি বিশ্ব প্রভু আল্লাহর কাছে কামনা করি। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। তখন কওমের লোকেরা জওয়াবে বলল- আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো, অথচ তোমাকে অনুসরণ করে নীচু স্তরের লোকেরা। নূহ বললেন, তারা কি করছে না করছে তা আমার জানা নেই। তাদের সমস্ত কাজের হিসাব আমার প্রভুর নিকট গচ্ছিত আছে, যদি তোমরা তা বুঝে থাক। আমি মুমিনদেরকে পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি স্পষ্ট ভয় প্রদর্শনকারী ব্যতীত কিছুই নই' (সূরা শু'আরা, ২৬ আয়াত ১০৫-১১৫)

হে পাঠক! একবার চিন্তা করো নূহের কওমের কথা। তারা কত হঠকারীভাবে তাদের নবীকে অস্বীকার করলো শুধু এই কারণে যে, তাকে যারা অনুসরণ করছে তারা অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক পদ- পর্যাদায় তাদের চাইতে অনেক নীচু। আর এটা এ কারণেই যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল দুনিয়া। নতুবা যদি আখিরাত বা পরকাল তাদের চিন্তার বিষয় হতো, তাহলে তারা যেখান থেকেই পাওয়া যাক না কেন সত্যের অনুসারী হতো। কিন্তু তাদের জাহেলিয়াতের কারণে তারা নিজ নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণে সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

পক্ষান্তরে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দিকে একবার খেয়াল করে দেখ। স্বীয় গভীর জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির কারণে গরীব ও দুর্বল শ্রেণীর অনুসরণকেই সত্যের পক্ষে দলীল হিসাবে গ্রহণ করলেন। যেমন আবু সুফিয়ানের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একবার তিনি প্রশ্ন করেন যে, গোত্রের শুধু নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে অনুসরণ করেন, না দূর্বল শ্রেণীর লোকেরা? উত্তর শুনে তিনি বলেছিলেন- সাধারণতঃ দুর্বল শ্রেণীর লোকেরাই নবীদের অনুসারী হয়ে থাকে।

আল্লাহ্ রাববুল আলামীন পাক কালামে নূহের আলাইহিস সালামের কওমের বর্ণনা প্রসঙ্গে অন্যত্র বলেনঃ
'নূহকে আমরা তার কওমের নিকট প্রেরণ করলাম। তিনি বলেন, আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য ভয় প্রদর্শনকারী। তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের উপর সেই মর্মান্তিক দিবসের আযাবের আশংকা করছি। তখন তার কওমের অবিশ্বাসীরা বলল, তোমাকে আমরা আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু মনে করি না। আর আমরা দেখছি যে, তোমকে যারা অনুসরণ করে, তারা আমাদের মধ্যে বাহ্যতঃ অত্যন্ত নিম্ন শ্রেণীর লোক, (সে কারণে) আমরা তোমাকে আমাদের উপর কোনরূপ মর্যাদা আছে বলে দেখি না। বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি'। (সূরা হুদ, ১১: আয়াত ২৫-২৭)

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 সত্যপন্থীদের উপর মিথ্যা দোষারোপ করা

📄 সত্যপন্থীদের উপর মিথ্যা দোষারোপ করা


জাহেলী যুগের লোকদের স্বভাব ছিল যে, তারা সত্যপন্থীদেরকে কপট ও দুনিয়াদার বলে দোষারোপ করতো। আল্লাহ তাদের এই স্বভাবের প্রতিবাদ করেছেন যা ইতোপূর্বে নূহ আলাইহিস সালামের মুখ দিয়ে পবিত্র কালামে আমরা শুনেছি।

কওমের লোকদের ঐসব কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল, এই যে, দরিদ্র নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা নূহের উপর ঈমান এনেছে যাতে তাদের কিছু দুনিয়াবী ফায়দা লুটার মওকা মিলে। কিছু পার্থিব সুবিধা অর্জন করা যায়। এজন্য নয় যে, তারা নূহের দাওয়াতের সত্যতা উপলব্ধি করে ঈমান এনেছে। এই অন্যায় দোষারোপের প্রতিবাদেই আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত বর্ণনা করেছেন।

📘 ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব 📄 হক পন্থীরা দুর্বল এই অহংকারে হকের সাহায্য থেকে দুরে থাকা

📄 হক পন্থীরা দুর্বল এই অহংকারে হকের সাহায্য থেকে দুরে থাকা


জাহেলী যুগের অন্যতম স্বভাব ছিল যে, তারা হক পথ হতে মুখ ফিরিয়ে নিত অবজ্ঞা ও অহংকার করে, যেহেতু সেখানে দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা ঢুকে পড়েছে।

আল্লাহ এর প্রতিবাদে বলেনঃ
'(হে নবী) আপনি ঐ সমস্ত লোকদের দূরে সরিয়ে দেবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভু-প্রতিপালককে ডাকে। তারা কেবলমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে আপনার যেমন কোনো দায়-দায়িত্ব নেই, আপনার হিসাব নিকাশের ব্যাপারেও তাদের কোনরূপ দায় দায়িত্ব নেই, আপনি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দেবেন না, তাহলে আপনি অনাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। এমনিভাবে আমি একজনকে অপরজনের দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি, যাতে তারা বলে যে, আমাদের মধ্য থেকে আল্লাহ অমুক অমুক লোকদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আল্লাহ কি তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত নহেন?' (সূরা আনআম, ৬: আয়াত ৫২-৫৩)

মোদ্দাকথা, এখানে বক্তব্য বিষয় এই যে, ঐসমস্ত দুর্বল শ্রেণীর মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তারা সত্যিই যুক্তির ভিত্তিতে ঈমান এনেছে কোনো লোভ-লালসা বা নগদপ্রাপ্তির আশায় নহে যেমন ধারণা করেছে তাদের শত্রুরা। কেননা পরকালীন হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে রাসূল বা উম্মত কেউ কারো দায়-দায়িত্ব নেবে না। অতএব তাদের খালেছ ঈমানকে অহেতুক অবজ্ঞা করার কোনো অর্থ হয় না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية