📄 শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ধোকা
সমাজে যে সব লোক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী কিংবা নেতৃত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তির মালিক ছিল, জাহেলী যুগের লোকেরা তাদেরকে ভাবতো যে, এরা কখনোই ভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারে না।
আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের এই ভুল ধারণা নিরসনে আদ জাতির ধ্বংস হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন-
'যখন তারা আগত মেঘমালাকে তাদের জমি-জায়গার অতি নিকট দেখতে পেলো, তখন তারা বললো (ভয়ের কিছু নেই) এ মেঘ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষনের জন্য আসছে। আসলে এটিই ছিল তাদের জন্য মর্মান্তিক আযাব, যা আল্লাহর হুকুমে তাদের সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সকাল বেলা তাদের বিরান ঘর- বাড়ীগুলি ব্যতীত সেখানে আর কিছুই দেখা গেল না। আমরা এমনিবাবেই পাপিষ্ঠ জাতিকে তাদের উপযুক্ত বদলা দিয়ে থাকি। অবশ্যই আমি তাদেরকে দুনিয়ায় প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা দান করেছিলাম, যা তোমাদেরকে দেইনি এবং তাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দিয়েছিলাম, কিন্তু এইসব তাদের কোনো কাজে আসেনি। তারা আল্লাহর স্পষ্ট আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে বসলো। ফলে আযাব আসার ব্যাপারে তারা যে টিটকারী করতো, অবশেষে তাই-ই তাদেরকে ঘিরে ধরলো'। (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২৪-২৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব আসার দেরী দেখে ঐসব প্রবৃত্তি পূজারীগণ অবিশ্বাস করে তৎকালীন নবীকে ঠাট্টাচ্ছলে বলতো-
'তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে নিয়ে এসো দেখি সেই গযব, যার ভয় তুমি আমাদেরকে দেখিয়ে থাকো' (সূরা আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২২)
উক্ত আয়াত দ্বারা ঐসকল লোকদের যুক্তি বাতিল করা হলো, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট আসনের অধিকারী ব্যক্তিগণকে নিজেদের যুক্তির পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে এবং ধারণা করে থাকে যে, ঐসকল ব্যক্তির অতুল্য ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক মর্যাদা, জ্ঞান বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য তাদেরকে যাবতীয় প্রকারের পদস্খলন ও বিভ্রান্তি হতে বিরত রাখে। তুমি কি দেখ না 'আদ জাতির অবস্থা? পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা অর্থে- সম্পদে, শক্তি-সামর্থ্যে, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে সর্বদিক দিয়ে ইসলাম গ্রহণকারী আরব জাতির চাইতে উন্নত ছিল। অথচ তারা সোজা পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল।
অতএব বুঝা গেল যে, আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাওফিক এবং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন ও সত্যের পথে অনুগমণ কেবলমাত্র আল্লাহর ফযল ও করম বা অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। উহার জন্য অধিক মাল-সম্পদ বা স্বচ্ছল অবস্থা হওয়া শর্ত নহে। অতএব যে ব্যক্তি সত্যকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং উন্নত অবস্থা সম্পন্নদেরকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করলো সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের পথ অবলম্বন করলো এবং সঠিক পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। উপরোক্ত আদ জাতির মত ইয়াহুদী জাতিও নিজেদের হঠকারিতার জন্য হক রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যার বর্ণনা পবিত্র কালাম পাকের সূরায়ে বাক্বারাহ্ ৮৯ আয়াতে বিবৃত হয়েছে এই মর্মে যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমণের পূর্বে ইয়াহূদীরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে শেষ নবীর আগমনের মাধ্যমে বিজয়ের আশা পোষণ করতো এবং প্রার্থনা করতো এই বলে যে, হে আমাদের প্রভু, তুমি তোমার ওয়াদাকৃত শেষ নবীকে সত্বর পাঠাও, যাতে আমরা তাঁর মাধ্যমে আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারি।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপারে এই যে, যখন শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন, তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে বসলো এই হিংসার ফলে যে, শেষ নবী আরবদের মধ্যে থেকে আগমন করেছেন। তারা তাদের ধারণায় নিজেদেরকে আরবদের চাইতে অনেক উন্নত অবস্থার অধিকারী বলে মনে করতো। অথচ তারা একথা জানেনা যে, নবুওত এবং উহার উপর বিশ্বাস স্থাপন কেবলমাত্র আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করে থাকেন। (একই ধরণের বর্ণনা রয়েছে' সূরা বাক্বারাহ, ১৪৬- ১৪৭ আয়াতে এবং সূরা আন'আমের, ১৯-২০ আয়াতে)
📄 ঐশ্বর্যের ধোকা
জাহেলী আরবের ধনশালী ব্যক্তিরা অফুরন্ত ধন-ঐশ্বর্যের মালিক হওয়ার কারণে নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলে মনে করতো।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"যখনই আমি কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছো আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। তারা আরো বলতোঃ আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদের কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না। বলঃ আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা রিযক বর্ধিত করেন অথবা এটা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।" (সূরা আস-সাবা ৩৪, আয়াত: ৩৫-৩৭)
যেমন কারুনকে বলেন-
'যখন তার কওম বলল যে, বেশী ফুর্তি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফুর্তিবাজদেরকে ভালবাসেন না। তোমাকে আল্লাহ যে অগাধ ধন-সম্পদ দান করেছেন এ দিয়ে তুমি আখেরাতের পাথের সঞ্চয় করো। অবশ্য এ জন্য দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য হিস্যা ভুলে যেও না এবং তুমি ইহসান করো যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি ইহসান করেছেন। আর দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না। কিন্তু কারুন জওয়াবে বলেছিল- এ সমস্ত ধন-সম্পদ তো আমি আমার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অর্জন করেছি। অথচ এই হতভাগা জানেনা যে, তার চাইতে অনেক শক্তি ও সম্পদের অধিকারী বহু ব্যক্তিতে তার পূর্বের যামানায় আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিয়েছেন।' (সূরা ক্বাছাছ, ২৮ : আয়াত ৭৬-৭৮)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ধনের প্রাচুর্য, দুনিয়াবী আরাম-আয়েশ ও স্বচ্ছলতা পরকালীন জীবনে নাজাতের কোনো দলীল নয়। বরং আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের একমাত্র পথ হলো তাঁর আনুগত্য করা ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করা এবং দ্বীনে হক পরিপূর্ণভাবে কবুল করা।
যেমন কবি আবুল হোসায়েন আহমেদ ইবনে রাবেন্দী আল মুলহিদ বলেন-
কত জ্ঞানী-গুনি আছেন যারা ক্ষুধার্ত আর কত মুর্খ আছে যারা প্রাচুর্যে জীবন কাটাচ্ছে।
অপর এক মুরববী বলেন :
আমরা পরাক্রমশালী মহান সত্বার বন্টনে সন্তুষ্ট। আমাদের জন্য ইলম-জ্ঞান ও আমাদের শত্রুদের জন্য ধন-সম্পদ। সম্পদ, সে তো অতি সত্বর ধংস হয়ে যাবে, হয়ে যাবে নিঃশেষ। আর ইলম-জ্ঞান থেকে যাবে, নিঃশেষ হবে না কখনো।
অতএব জাহেলী আরবদের মধ্যে যে ধারণা প্রচলিত ছিল যে, দুনিয়ায় সম্পদশালী হওয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দা হওয়ার একটি প্রমাণ, এ যুক্তি একেবারেই বাতিল। যাদের সামান্য বোধশক্তি আছে, একথা বুঝতে তাদের মোটেই কষ্ট হবার কথা নয়।
📄 সত্যপন্থীরা দুর্বল হওয়ার কারণে মূল সত্যকেই অবজ্ঞা করা
উক্ত বিষয়ের প্রমাণ যেমন আল্লাহ নিজে নূহ আলাইহিস সালামের কওম সম্পর্কে বলেন :
‘নূহের কওম নবীদেরকে মিথ্যা ধারণা করেছিল। যখন তাদের ভাই নূহ তাদের বললেন, তোমরা কি সংযত হবে না? আমি তোমাদের বিশ্বস্ত পয়গম্বর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমাকে অনুসরণ করো। আমি এজন্য তোমাদের কাছে কোনরূপ প্রতিদান চাই না। এর সবকিছু বদলা আমি বিশ্ব প্রভু আল্লাহর কাছে কামনা করি। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। তখন কওমের লোকেরা জওয়াবে বলল- আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো, অথচ তোমাকে অনুসরণ করে নীচু স্তরের লোকেরা। নূহ বললেন, তারা কি করছে না করছে তা আমার জানা নেই। তাদের সমস্ত কাজের হিসাব আমার প্রভুর নিকট গচ্ছিত আছে, যদি তোমরা তা বুঝে থাক। আমি মুমিনদেরকে পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি স্পষ্ট ভয় প্রদর্শনকারী ব্যতীত কিছুই নই' (সূরা শু'আরা, ২৬ আয়াত ১০৫-১১৫)
হে পাঠক! একবার চিন্তা করো নূহের কওমের কথা। তারা কত হঠকারীভাবে তাদের নবীকে অস্বীকার করলো শুধু এই কারণে যে, তাকে যারা অনুসরণ করছে তারা অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক পদ- পর্যাদায় তাদের চাইতে অনেক নীচু। আর এটা এ কারণেই যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল দুনিয়া। নতুবা যদি আখিরাত বা পরকাল তাদের চিন্তার বিষয় হতো, তাহলে তারা যেখান থেকেই পাওয়া যাক না কেন সত্যের অনুসারী হতো। কিন্তু তাদের জাহেলিয়াতের কারণে তারা নিজ নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণে সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
পক্ষান্তরে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দিকে একবার খেয়াল করে দেখ। স্বীয় গভীর জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির কারণে গরীব ও দুর্বল শ্রেণীর অনুসরণকেই সত্যের পক্ষে দলীল হিসাবে গ্রহণ করলেন। যেমন আবু সুফিয়ানের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের মধ্যে একবার তিনি প্রশ্ন করেন যে, গোত্রের শুধু নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে অনুসরণ করেন, না দূর্বল শ্রেণীর লোকেরা? উত্তর শুনে তিনি বলেছিলেন- সাধারণতঃ দুর্বল শ্রেণীর লোকেরাই নবীদের অনুসারী হয়ে থাকে।
আল্লাহ্ রাববুল আলামীন পাক কালামে নূহের আলাইহিস সালামের কওমের বর্ণনা প্রসঙ্গে অন্যত্র বলেনঃ
'নূহকে আমরা তার কওমের নিকট প্রেরণ করলাম। তিনি বলেন, আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য ভয় প্রদর্শনকারী। তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের উপর সেই মর্মান্তিক দিবসের আযাবের আশংকা করছি। তখন তার কওমের অবিশ্বাসীরা বলল, তোমাকে আমরা আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু মনে করি না। আর আমরা দেখছি যে, তোমকে যারা অনুসরণ করে, তারা আমাদের মধ্যে বাহ্যতঃ অত্যন্ত নিম্ন শ্রেণীর লোক, (সে কারণে) আমরা তোমাকে আমাদের উপর কোনরূপ মর্যাদা আছে বলে দেখি না। বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি'। (সূরা হুদ, ১১: আয়াত ২৫-২৭)
📄 সত্যপন্থীদের উপর মিথ্যা দোষারোপ করা
জাহেলী যুগের লোকদের স্বভাব ছিল যে, তারা সত্যপন্থীদেরকে কপট ও দুনিয়াদার বলে দোষারোপ করতো। আল্লাহ তাদের এই স্বভাবের প্রতিবাদ করেছেন যা ইতোপূর্বে নূহ আলাইহিস সালামের মুখ দিয়ে পবিত্র কালামে আমরা শুনেছি।
কওমের লোকদের ঐসব কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল, এই যে, দরিদ্র নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা নূহের উপর ঈমান এনেছে যাতে তাদের কিছু দুনিয়াবী ফায়দা লুটার মওকা মিলে। কিছু পার্থিব সুবিধা অর্জন করা যায়। এজন্য নয় যে, তারা নূহের দাওয়াতের সত্যতা উপলব্ধি করে ঈমান এনেছে। এই অন্যায় দোষারোপের প্রতিবাদেই আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত বর্ণনা করেছেন।