📄 সংখ্যা গরিষ্ঠতার দোহাই
হক ও বাতিলের পরিচয় নির্ধারণের জন্য তারা সংখ্যার উপর নির্ভর করতো। কোনো একটি বিষয়ের অনুসারীদের সংখ্যা বেশী হলে তারা তাকেই হক বা ন্যায় বলে ধরে নিত এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের যুক্তি যতই মজবুত হোক, তারা তাকে বাতিল বলে গণ্য করতো।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন জাহেলী যুগের এই কদর্য্য রীতির কঠোর প্রতিবাদ করে ইরশাদ করেন-
(হে নবী!) যদি আপনি অধিকাংশ লোকের কথা শুনে কাজ করেন তবে ওরা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণার অনুসরণ করে এবং আন্দাজে কথা বলে। নিশ্চয়ই আপনার রব সবচাইতে বেশী জানেন কারা আল্লাহর রাস্তা হতে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং কারা সত্যিকারের হিদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে' (সূরা আল-আনআম, ৬ : আয়াত ১১৬-১১৭)
অতএব, বাতিলের অনুসারী লোকদের সংখ্যা যত বেশীই হোক না কেন, কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ উহার অনুসরণ করতে পারে না। কেননা সত্যই একমাত্র অনুসরণযোগ্য, উহার অনুসারীদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। সূরায়ে সাদ এর ২৪ আয়াতেও এ বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
“শরীকদের অনেকে একে অন্যের উপর অবিচার করে থাকে, তবে যারা মুমিন ও সৎকর্ম করে তারা নয় এবং তারা সংখ্যায় সল্প।”
কবির ভাষায়-
'সংখ্যায় কম হওয়ায় কারণে লোকেরা আমাদেরকে কটাক্ষ করে। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি, নিশ্চয়ই সত্যসেবী সম্মানিত লোকদের সংখ্যা চিরদিন কমই হয়ে থাকে।'
মোটকথা জ্ঞানী মাত্রই স্পষ্ট দলীলের সন্ধান করবে এবং দলীল দ্বারা যা প্রমাণিত হবে, কেবলমাত্র তাই গ্রহণ করবে- যদিও উহার অনুসারী সংখ্যা কম হয়। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি দলীলের সন্ধান না নিয়ে কেবল অধিক লোকের ভীর দেখে সেটাই গ্রহণ করে, সে ব্যক্তি মহা ভ্রান্তিতে লিপ্ত এবং জাহেলিয়াতের অনুসারী বলে গণ্য হবে।
📄 সংখ্যা লঘিষ্ঠতার দোহাই
কোন বস্তুকে বাতিল ঘোষণা করার জন্যে উহার অনুসারীদের সংখ্যা লঘিষ্ঠতাকে জাহেলী যুগের লোকেরা যুক্তি হিসাবে দাঁড় করাতো। উহার প্রতিবাদে আল্লাহ বলেন-
'তোমাদের পূর্বেকার জ্ঞানী লোকেরা বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি রোধের চেষ্টা কেন করেনি? তবে হ্যাঁ, তাদের মধ্যে মাত্র কিছুসংখ্যক লোক (চেষ্টা করেছিল) যাদেরকে আমি নাজাত দিয়েছিলাম'। (সূরা হুদ, ১১: আয়াত ১১৬)
টিকাঃ
২. এখানে আল্লাহ্ বেশীসংখ্যক লোকদের চেয়ে অল্পসংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে হক পন্থী হওয়ার কারণে নাজাত দানের কথা ঘোষণা করেছেন। (অনুবাদক)।
📄 শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ধোকা
সমাজে যে সব লোক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী কিংবা নেতৃত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তির মালিক ছিল, জাহেলী যুগের লোকেরা তাদেরকে ভাবতো যে, এরা কখনোই ভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারে না।
আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের এই ভুল ধারণা নিরসনে আদ জাতির ধ্বংস হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন-
'যখন তারা আগত মেঘমালাকে তাদের জমি-জায়গার অতি নিকট দেখতে পেলো, তখন তারা বললো (ভয়ের কিছু নেই) এ মেঘ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষনের জন্য আসছে। আসলে এটিই ছিল তাদের জন্য মর্মান্তিক আযাব, যা আল্লাহর হুকুমে তাদের সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সকাল বেলা তাদের বিরান ঘর- বাড়ীগুলি ব্যতীত সেখানে আর কিছুই দেখা গেল না। আমরা এমনিবাবেই পাপিষ্ঠ জাতিকে তাদের উপযুক্ত বদলা দিয়ে থাকি। অবশ্যই আমি তাদেরকে দুনিয়ায় প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা দান করেছিলাম, যা তোমাদেরকে দেইনি এবং তাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দিয়েছিলাম, কিন্তু এইসব তাদের কোনো কাজে আসেনি। তারা আল্লাহর স্পষ্ট আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে বসলো। ফলে আযাব আসার ব্যাপারে তারা যে টিটকারী করতো, অবশেষে তাই-ই তাদেরকে ঘিরে ধরলো'। (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২৪-২৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব আসার দেরী দেখে ঐসব প্রবৃত্তি পূজারীগণ অবিশ্বাস করে তৎকালীন নবীকে ঠাট্টাচ্ছলে বলতো-
'তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে নিয়ে এসো দেখি সেই গযব, যার ভয় তুমি আমাদেরকে দেখিয়ে থাকো' (সূরা আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২২)
উক্ত আয়াত দ্বারা ঐসকল লোকদের যুক্তি বাতিল করা হলো, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট আসনের অধিকারী ব্যক্তিগণকে নিজেদের যুক্তির পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে এবং ধারণা করে থাকে যে, ঐসকল ব্যক্তির অতুল্য ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক মর্যাদা, জ্ঞান বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য তাদেরকে যাবতীয় প্রকারের পদস্খলন ও বিভ্রান্তি হতে বিরত রাখে। তুমি কি দেখ না 'আদ জাতির অবস্থা? পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা অর্থে- সম্পদে, শক্তি-সামর্থ্যে, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে সর্বদিক দিয়ে ইসলাম গ্রহণকারী আরব জাতির চাইতে উন্নত ছিল। অথচ তারা সোজা পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল।
অতএব বুঝা গেল যে, আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাওফিক এবং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন ও সত্যের পথে অনুগমণ কেবলমাত্র আল্লাহর ফযল ও করম বা অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। উহার জন্য অধিক মাল-সম্পদ বা স্বচ্ছল অবস্থা হওয়া শর্ত নহে। অতএব যে ব্যক্তি সত্যকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং উন্নত অবস্থা সম্পন্নদেরকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করলো সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের পথ অবলম্বন করলো এবং সঠিক পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। উপরোক্ত আদ জাতির মত ইয়াহুদী জাতিও নিজেদের হঠকারিতার জন্য হক রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যার বর্ণনা পবিত্র কালাম পাকের সূরায়ে বাক্বারাহ্ ৮৯ আয়াতে বিবৃত হয়েছে এই মর্মে যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমণের পূর্বে ইয়াহূদীরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে শেষ নবীর আগমনের মাধ্যমে বিজয়ের আশা পোষণ করতো এবং প্রার্থনা করতো এই বলে যে, হে আমাদের প্রভু, তুমি তোমার ওয়াদাকৃত শেষ নবীকে সত্বর পাঠাও, যাতে আমরা তাঁর মাধ্যমে আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারি।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপারে এই যে, যখন শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন, তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে বসলো এই হিংসার ফলে যে, শেষ নবী আরবদের মধ্যে থেকে আগমন করেছেন। তারা তাদের ধারণায় নিজেদেরকে আরবদের চাইতে অনেক উন্নত অবস্থার অধিকারী বলে মনে করতো। অথচ তারা একথা জানেনা যে, নবুওত এবং উহার উপর বিশ্বাস স্থাপন কেবলমাত্র আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করে থাকেন। (একই ধরণের বর্ণনা রয়েছে' সূরা বাক্বারাহ, ১৪৬- ১৪৭ আয়াতে এবং সূরা আন'আমের, ১৯-২০ আয়াতে)
📄 ঐশ্বর্যের ধোকা
জাহেলী আরবের ধনশালী ব্যক্তিরা অফুরন্ত ধন-ঐশ্বর্যের মালিক হওয়ার কারণে নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলে মনে করতো।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"যখনই আমি কোনো জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছো আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। তারা আরো বলতোঃ আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদের কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না। বলঃ আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা রিযক বর্ধিত করেন অথবা এটা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।" (সূরা আস-সাবা ৩৪, আয়াত: ৩৫-৩৭)
যেমন কারুনকে বলেন-
'যখন তার কওম বলল যে, বেশী ফুর্তি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফুর্তিবাজদেরকে ভালবাসেন না। তোমাকে আল্লাহ যে অগাধ ধন-সম্পদ দান করেছেন এ দিয়ে তুমি আখেরাতের পাথের সঞ্চয় করো। অবশ্য এ জন্য দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য হিস্যা ভুলে যেও না এবং তুমি ইহসান করো যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি ইহসান করেছেন। আর দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না। কিন্তু কারুন জওয়াবে বলেছিল- এ সমস্ত ধন-সম্পদ তো আমি আমার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অর্জন করেছি। অথচ এই হতভাগা জানেনা যে, তার চাইতে অনেক শক্তি ও সম্পদের অধিকারী বহু ব্যক্তিতে তার পূর্বের যামানায় আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিয়েছেন।' (সূরা ক্বাছাছ, ২৮ : আয়াত ৭৬-৭৮)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ধনের প্রাচুর্য, দুনিয়াবী আরাম-আয়েশ ও স্বচ্ছলতা পরকালীন জীবনে নাজাতের কোনো দলীল নয়। বরং আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর সন্তুষ্টি হাসিলের একমাত্র পথ হলো তাঁর আনুগত্য করা ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করা এবং দ্বীনে হক পরিপূর্ণভাবে কবুল করা।
যেমন কবি আবুল হোসায়েন আহমেদ ইবনে রাবেন্দী আল মুলহিদ বলেন-
কত জ্ঞানী-গুনি আছেন যারা ক্ষুধার্ত আর কত মুর্খ আছে যারা প্রাচুর্যে জীবন কাটাচ্ছে।
অপর এক মুরববী বলেন :
আমরা পরাক্রমশালী মহান সত্বার বন্টনে সন্তুষ্ট। আমাদের জন্য ইলম-জ্ঞান ও আমাদের শত্রুদের জন্য ধন-সম্পদ। সম্পদ, সে তো অতি সত্বর ধংস হয়ে যাবে, হয়ে যাবে নিঃশেষ। আর ইলম-জ্ঞান থেকে যাবে, নিঃশেষ হবে না কখনো।
অতএব জাহেলী আরবদের মধ্যে যে ধারণা প্রচলিত ছিল যে, দুনিয়ায় সম্পদশালী হওয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দা হওয়ার একটি প্রমাণ, এ যুক্তি একেবারেই বাতিল। যাদের সামান্য বোধশক্তি আছে, একথা বুঝতে তাদের মোটেই কষ্ট হবার কথা নয়।