📄 বাপ-দাদার দোহাই
সঠিক কোনো যুক্তি ছাড়াই বিগত যুগের লোকদের দোহাই দিয়ে কাজ করা জাহেলী যুগের লোকদের অন্যতম স্বভাব ছিল। আল্লাহ তা'আলা এই স্বভাবের তীব্র ভৎর্সনা করেছেন। যেমন-
'মুসা আলাইহিস সালাম স্পষ্ট দলীল ও আয়াতসমূহ নিয়ে যখন তাঁর (বিরোধী পক্ষের) লোকদের কাছে গেলেন, তখন তারা বলল- ঐটা তো যাদু ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া এসব কথা তো আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের কাছে শুনিনি। মূসা আলাইহিস সালাম তখন তাদের জওয়াবে বলেছিলেন: আমার রব ভালভাবেই জানেন, কে তাঁর কাছ থেকে সত্যিকারের হিদায়েত নিয়ে এসেছে এবং কার জন্য শুভ পরিণাম অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই যালিমরা কখনোই কামিয়াব হতে পারে না'। (সূরা আল-কাসাস ২৮: আয়াত ৩৬ ও ৩৭)
অন্যত্র আল্লাহ নবী নূহের আলাইহিস সালাম এর কওমের বর্ণনা দিয়ে বলেন-
‘আমরা নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট, সে বলেছিলঃ হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? উত্তরে তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি তোমাদেরই মত একজন মানুষ মাত্র। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চাচ্ছে। আল্লাহ চাইলে একজন ফেরেশতাকে এ কাজে পাঠাতে পারতেন। এ ব্যক্তির এসব কথা তো আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের নিকট শুনি নাই।’ (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: আয়াত ২৩-২৪)
এমনিভাবে অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরামকেও শুনানো হয়েছে, যা কুর'আনের বিভিন্ন আয়াতে প্রমাণিত হয়েছে। নবীদের দাওয়াতকে অস্বীকার করার মূলে সকল যুগের সকল কাফিরগণের একই যুক্তি ছিল যে, তাদের বাপ-দাদাগণ এই নিয়মের অনুসারী ছিল না এবং তারা এসব কথা আগ থেকে কখনো জানতো না। তাদের এই বদ স্বভাব ও অনঢ় মনোভাব লক্ষ্য করার মত। যদি তাদের চোখ, কান ও হৃদয় খোলা থাকতো তাহলে তারা অবশ্যই সত্যকে দলীল সহকারে উপলব্ধি করতো এবং সত্যের সম্মুখে বিনা বাক্য ব্যয়ে মাথা নত করতো।
এই অবস্থা তাদের উত্তরসূরী (বর্তমান যুগের) লোকদের- যারা অন্তরের দিক দিয়ে পূর্বের লোকদের সদৃশ।
📄 সংখ্যা গরিষ্ঠতার দোহাই
হক ও বাতিলের পরিচয় নির্ধারণের জন্য তারা সংখ্যার উপর নির্ভর করতো। কোনো একটি বিষয়ের অনুসারীদের সংখ্যা বেশী হলে তারা তাকেই হক বা ন্যায় বলে ধরে নিত এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের যুক্তি যতই মজবুত হোক, তারা তাকে বাতিল বলে গণ্য করতো।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন জাহেলী যুগের এই কদর্য্য রীতির কঠোর প্রতিবাদ করে ইরশাদ করেন-
(হে নবী!) যদি আপনি অধিকাংশ লোকের কথা শুনে কাজ করেন তবে ওরা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণার অনুসরণ করে এবং আন্দাজে কথা বলে। নিশ্চয়ই আপনার রব সবচাইতে বেশী জানেন কারা আল্লাহর রাস্তা হতে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং কারা সত্যিকারের হিদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে' (সূরা আল-আনআম, ৬ : আয়াত ১১৬-১১৭)
অতএব, বাতিলের অনুসারী লোকদের সংখ্যা যত বেশীই হোক না কেন, কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ উহার অনুসরণ করতে পারে না। কেননা সত্যই একমাত্র অনুসরণযোগ্য, উহার অনুসারীদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। সূরায়ে সাদ এর ২৪ আয়াতেও এ বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
“শরীকদের অনেকে একে অন্যের উপর অবিচার করে থাকে, তবে যারা মুমিন ও সৎকর্ম করে তারা নয় এবং তারা সংখ্যায় সল্প।”
কবির ভাষায়-
'সংখ্যায় কম হওয়ায় কারণে লোকেরা আমাদেরকে কটাক্ষ করে। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি, নিশ্চয়ই সত্যসেবী সম্মানিত লোকদের সংখ্যা চিরদিন কমই হয়ে থাকে।'
মোটকথা জ্ঞানী মাত্রই স্পষ্ট দলীলের সন্ধান করবে এবং দলীল দ্বারা যা প্রমাণিত হবে, কেবলমাত্র তাই গ্রহণ করবে- যদিও উহার অনুসারী সংখ্যা কম হয়। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি দলীলের সন্ধান না নিয়ে কেবল অধিক লোকের ভীর দেখে সেটাই গ্রহণ করে, সে ব্যক্তি মহা ভ্রান্তিতে লিপ্ত এবং জাহেলিয়াতের অনুসারী বলে গণ্য হবে।
📄 সংখ্যা লঘিষ্ঠতার দোহাই
কোন বস্তুকে বাতিল ঘোষণা করার জন্যে উহার অনুসারীদের সংখ্যা লঘিষ্ঠতাকে জাহেলী যুগের লোকেরা যুক্তি হিসাবে দাঁড় করাতো। উহার প্রতিবাদে আল্লাহ বলেন-
'তোমাদের পূর্বেকার জ্ঞানী লোকেরা বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি রোধের চেষ্টা কেন করেনি? তবে হ্যাঁ, তাদের মধ্যে মাত্র কিছুসংখ্যক লোক (চেষ্টা করেছিল) যাদেরকে আমি নাজাত দিয়েছিলাম'। (সূরা হুদ, ১১: আয়াত ১১৬)
টিকাঃ
২. এখানে আল্লাহ্ বেশীসংখ্যক লোকদের চেয়ে অল্পসংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে হক পন্থী হওয়ার কারণে নাজাত দানের কথা ঘোষণা করেছেন। (অনুবাদক)।
📄 শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ধোকা
সমাজে যে সব লোক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী কিংবা নেতৃত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তির মালিক ছিল, জাহেলী যুগের লোকেরা তাদেরকে ভাবতো যে, এরা কখনোই ভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারে না।
আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের এই ভুল ধারণা নিরসনে আদ জাতির ধ্বংস হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন-
'যখন তারা আগত মেঘমালাকে তাদের জমি-জায়গার অতি নিকট দেখতে পেলো, তখন তারা বললো (ভয়ের কিছু নেই) এ মেঘ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষনের জন্য আসছে। আসলে এটিই ছিল তাদের জন্য মর্মান্তিক আযাব, যা আল্লাহর হুকুমে তাদের সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সকাল বেলা তাদের বিরান ঘর- বাড়ীগুলি ব্যতীত সেখানে আর কিছুই দেখা গেল না। আমরা এমনিবাবেই পাপিষ্ঠ জাতিকে তাদের উপযুক্ত বদলা দিয়ে থাকি। অবশ্যই আমি তাদেরকে দুনিয়ায় প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা দান করেছিলাম, যা তোমাদেরকে দেইনি এবং তাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দিয়েছিলাম, কিন্তু এইসব তাদের কোনো কাজে আসেনি। তারা আল্লাহর স্পষ্ট আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে বসলো। ফলে আযাব আসার ব্যাপারে তারা যে টিটকারী করতো, অবশেষে তাই-ই তাদেরকে ঘিরে ধরলো'। (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২৪-২৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব আসার দেরী দেখে ঐসব প্রবৃত্তি পূজারীগণ অবিশ্বাস করে তৎকালীন নবীকে ঠাট্টাচ্ছলে বলতো-
'তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে নিয়ে এসো দেখি সেই গযব, যার ভয় তুমি আমাদেরকে দেখিয়ে থাকো' (সূরা আহকাফ, ৪৬ : আয়াত ২২)
উক্ত আয়াত দ্বারা ঐসকল লোকদের যুক্তি বাতিল করা হলো, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট আসনের অধিকারী ব্যক্তিগণকে নিজেদের যুক্তির পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে এবং ধারণা করে থাকে যে, ঐসকল ব্যক্তির অতুল্য ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সামাজিক মর্যাদা, জ্ঞান বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্য তাদেরকে যাবতীয় প্রকারের পদস্খলন ও বিভ্রান্তি হতে বিরত রাখে। তুমি কি দেখ না 'আদ জাতির অবস্থা? পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা অর্থে- সম্পদে, শক্তি-সামর্থ্যে, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে সর্বদিক দিয়ে ইসলাম গ্রহণকারী আরব জাতির চাইতে উন্নত ছিল। অথচ তারা সোজা পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল।
অতএব বুঝা গেল যে, আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার তাওফিক এবং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন ও সত্যের পথে অনুগমণ কেবলমাত্র আল্লাহর ফযল ও করম বা অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। উহার জন্য অধিক মাল-সম্পদ বা স্বচ্ছল অবস্থা হওয়া শর্ত নহে। অতএব যে ব্যক্তি সত্যকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং উন্নত অবস্থা সম্পন্নদেরকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করলো সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের পথ অবলম্বন করলো এবং সঠিক পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। উপরোক্ত আদ জাতির মত ইয়াহুদী জাতিও নিজেদের হঠকারিতার জন্য হক রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যার বর্ণনা পবিত্র কালাম পাকের সূরায়ে বাক্বারাহ্ ৮৯ আয়াতে বিবৃত হয়েছে এই মর্মে যে, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমণের পূর্বে ইয়াহূদীরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে শেষ নবীর আগমনের মাধ্যমে বিজয়ের আশা পোষণ করতো এবং প্রার্থনা করতো এই বলে যে, হে আমাদের প্রভু, তুমি তোমার ওয়াদাকৃত শেষ নবীকে সত্বর পাঠাও, যাতে আমরা তাঁর মাধ্যমে আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারি।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপারে এই যে, যখন শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন, তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে বসলো এই হিংসার ফলে যে, শেষ নবী আরবদের মধ্যে থেকে আগমন করেছেন। তারা তাদের ধারণায় নিজেদেরকে আরবদের চাইতে অনেক উন্নত অবস্থার অধিকারী বলে মনে করতো। অথচ তারা একথা জানেনা যে, নবুওত এবং উহার উপর বিশ্বাস স্থাপন কেবলমাত্র আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহেই সম্ভব হয়ে থাকে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করে থাকেন। (একই ধরণের বর্ণনা রয়েছে' সূরা বাক্বারাহ, ১৪৬- ১৪৭ আয়াতে এবং সূরা আন'আমের, ১৯-২০ আয়াতে)