📄 তাকলীদ
জাহেলী আরবদের দ্বীন যে কয়টি মুল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তন্মধ্যে সেরা ছিল তাকলীদ। ইহা মানব সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে এ যাবৎ সকল কাফির, মুশরিকদের লালিত শ্রেষ্ঠ মূলনীতি।
আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন-
'এমনিভাবে তোমার পূর্বে আমি যেখানেই কোনো ভয় প্রদর্শনকারী নবী পাঠিয়েছি সেখানকার বড়লোক বা মাতববর শ্রেণীর লোকেরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ- দাদাদেরকে একই দলভূক্ত পেয়েছি। অতএব আমরা তাদেরই পথ-পন্থা অনুসরণ করবো। এর জওয়াবে নবীগণ যখন বলতেন, আমরা কি তোমাদের নিকট তোমাদের বাপ- দাদাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ হিদায়েত নিয়ে আসিনি? তখন তারা সরাসরি বলে দিতো- যাও, তোমরা যা কিছু হিদায়েত নিয়ে প্রেরিত হয়েছ সবকিছুকে আমরা অস্বীকার করি'। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ২৩ ও ২৪)
কাফিরদের উপরোক্ত কথার জওয়াবে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন-
‘তোমাদের রবের কাছ থেকে যা কিছু পাঠানো হয়েছে, তোমরা কেবল তারই অনুসরণ করো। তাকে ছেড়ে অন্য কোনো আউলিয়া বা বন্ধুদের অনুসরণ করো না। বস্তুতঃপক্ষে এটাই সত্য যে, তোমরা খুব কম লোকেই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’ (সূরা আল-আ'আরাফ ৭: আয়াত ৩)
এমনিভাবে সূরা বাক্বারাহ্ ১৭০ আয়াত ছাড়াও বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে একথা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, জাহেলী যুগের লোকেরা তাকলীদ তথা অন্ধ অনুকরণের গন্ডিতে বাঁধা ছিল। তারা দ্বীনের ব্যাপারে যাবতীয় চিন্তা-গবেষণা থেকে দূরে থাকতো। আর এ জন্যেই তো তারা জাহেলিয়াতের অন্ধ গলিতে যুগ যুগ ধরে ভ্রান্ত পথিকের মত ঘুরে বেরিয়েছে। একই অবস্থা প্রত্যেক যুগের ঐসব লোকদের জন্য, যারা জাহেলী যুগের লালিত উপরোক্ত তাকলীদী বন্ধনে নিজেদেরকে আবদ্ধ রেখেছেন এবং বাপ-দাদার প্রচলিত রেওয়াজের অন্ধ অনুসারী মুকাল্লিদ হয়ে যাবতীয় স্বাধীন চিন্তার দুয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের জন্য বন্ধ রেখেছেন।
📄 ফাসেক আলেম ও মূর্খ আবেদগণের অনুসরণ
তাদের আর একটি বদ অভ্যাস ছিল বে-আমল ফাসেক আলেম এবং মুর্খ আবেদগণের বাহ্যিক বেশভূষা ও চালচলন দেখে তাদেরকে বিরাট কিছু মনে করা ও তাদের অনুসরণ করা।
আল্লহা তা'আলা এ বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! (সাবধান) ইয়াহুদী-খ্রীষ্টানদের পাদ্রী-পুরোহিতরা অসাধু পন্থায় মানুষের সম্পদ খেতো এবং আল্লাহর পথ থেকে তাদের বিরত রাখতো।' (সূরা আত-তাওবা, ৯ : আয়াত ৩৪)
সূরা মায়েদার ৭৭ আয়াত ছাড়াও এমনি ধরণের বহু আয়াত রয়েছে যেখানে ঐসব ভন্ড তপস্বীদের অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে যা প্রকাশ্যভাবে জাহেলী যুগের তরীকা।
* বর্তমান যুগের ধর্ম ব্যবসায়ী পীর ফকির ও তাদের অন্ধ অনুসারী ভক্ত মুরীদগণ আয়াতটি অনুধাবন করুন।
📄 বাপ-দাদার দোহাই
সঠিক কোনো যুক্তি ছাড়াই বিগত যুগের লোকদের দোহাই দিয়ে কাজ করা জাহেলী যুগের লোকদের অন্যতম স্বভাব ছিল। আল্লাহ তা'আলা এই স্বভাবের তীব্র ভৎর্সনা করেছেন। যেমন-
'মুসা আলাইহিস সালাম স্পষ্ট দলীল ও আয়াতসমূহ নিয়ে যখন তাঁর (বিরোধী পক্ষের) লোকদের কাছে গেলেন, তখন তারা বলল- ঐটা তো যাদু ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া এসব কথা তো আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের কাছে শুনিনি। মূসা আলাইহিস সালাম তখন তাদের জওয়াবে বলেছিলেন: আমার রব ভালভাবেই জানেন, কে তাঁর কাছ থেকে সত্যিকারের হিদায়েত নিয়ে এসেছে এবং কার জন্য শুভ পরিণাম অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই যালিমরা কখনোই কামিয়াব হতে পারে না'। (সূরা আল-কাসাস ২৮: আয়াত ৩৬ ও ৩৭)
অন্যত্র আল্লাহ নবী নূহের আলাইহিস সালাম এর কওমের বর্ণনা দিয়ে বলেন-
‘আমরা নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট, সে বলেছিলঃ হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না? উত্তরে তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি তোমাদেরই মত একজন মানুষ মাত্র। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চাচ্ছে। আল্লাহ চাইলে একজন ফেরেশতাকে এ কাজে পাঠাতে পারতেন। এ ব্যক্তির এসব কথা তো আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের নিকট শুনি নাই।’ (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩: আয়াত ২৩-২৪)
এমনিভাবে অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরামকেও শুনানো হয়েছে, যা কুর'আনের বিভিন্ন আয়াতে প্রমাণিত হয়েছে। নবীদের দাওয়াতকে অস্বীকার করার মূলে সকল যুগের সকল কাফিরগণের একই যুক্তি ছিল যে, তাদের বাপ-দাদাগণ এই নিয়মের অনুসারী ছিল না এবং তারা এসব কথা আগ থেকে কখনো জানতো না। তাদের এই বদ স্বভাব ও অনঢ় মনোভাব লক্ষ্য করার মত। যদি তাদের চোখ, কান ও হৃদয় খোলা থাকতো তাহলে তারা অবশ্যই সত্যকে দলীল সহকারে উপলব্ধি করতো এবং সত্যের সম্মুখে বিনা বাক্য ব্যয়ে মাথা নত করতো।
এই অবস্থা তাদের উত্তরসূরী (বর্তমান যুগের) লোকদের- যারা অন্তরের দিক দিয়ে পূর্বের লোকদের সদৃশ।
📄 সংখ্যা গরিষ্ঠতার দোহাই
হক ও বাতিলের পরিচয় নির্ধারণের জন্য তারা সংখ্যার উপর নির্ভর করতো। কোনো একটি বিষয়ের অনুসারীদের সংখ্যা বেশী হলে তারা তাকেই হক বা ন্যায় বলে ধরে নিত এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের যুক্তি যতই মজবুত হোক, তারা তাকে বাতিল বলে গণ্য করতো।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন জাহেলী যুগের এই কদর্য্য রীতির কঠোর প্রতিবাদ করে ইরশাদ করেন-
(হে নবী!) যদি আপনি অধিকাংশ লোকের কথা শুনে কাজ করেন তবে ওরা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে। কেননা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণার অনুসরণ করে এবং আন্দাজে কথা বলে। নিশ্চয়ই আপনার রব সবচাইতে বেশী জানেন কারা আল্লাহর রাস্তা হতে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং কারা সত্যিকারের হিদায়েত প্রাপ্ত হয়েছে' (সূরা আল-আনআম, ৬ : আয়াত ১১৬-১১৭)
অতএব, বাতিলের অনুসারী লোকদের সংখ্যা যত বেশীই হোক না কেন, কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ উহার অনুসরণ করতে পারে না। কেননা সত্যই একমাত্র অনুসরণযোগ্য, উহার অনুসারীদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। সূরায়ে সাদ এর ২৪ আয়াতেও এ বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
“শরীকদের অনেকে একে অন্যের উপর অবিচার করে থাকে, তবে যারা মুমিন ও সৎকর্ম করে তারা নয় এবং তারা সংখ্যায় সল্প।”
কবির ভাষায়-
'সংখ্যায় কম হওয়ায় কারণে লোকেরা আমাদেরকে কটাক্ষ করে। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি, নিশ্চয়ই সত্যসেবী সম্মানিত লোকদের সংখ্যা চিরদিন কমই হয়ে থাকে।'
মোটকথা জ্ঞানী মাত্রই স্পষ্ট দলীলের সন্ধান করবে এবং দলীল দ্বারা যা প্রমাণিত হবে, কেবলমাত্র তাই গ্রহণ করবে- যদিও উহার অনুসারী সংখ্যা কম হয়। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি দলীলের সন্ধান না নিয়ে কেবল অধিক লোকের ভীর দেখে সেটাই গ্রহণ করে, সে ব্যক্তি মহা ভ্রান্তিতে লিপ্ত এবং জাহেলিয়াতের অনুসারী বলে গণ্য হবে।