📄 নেককারদের দুআ
জাহেলী যুগে আরবের লোকেরা আল্লাহর নিকট দু'আ এবং ইবাদত করার সময় নেককার লোকদের শরীক করতো। তারা একে নেককার লোকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন মনে করতো এবং এর দ্বারা তারা আল্লাহর নিকট তাদের শাফাআত বা সুপারিশ কামনা করতো।
আল্লাহ সূরা যুমারের প্রথম দিকে ইরশাদ করেন- 'যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অলী-বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, তারা বলে আমরা ওদের ইবাদত করি কেবলমাত্র এই জন্য যে, ওরা আমাদেরকে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে।' (সূরা যুমার, ৩৯ : আয়াত-৩)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন- 'ওরা আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুর ইবাদত করে, যারা তাদের না কোনো ক্ষতি করতে পারে, না কোনো উপকার করতে পারে এবং ওরা বলে এরাই আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট শাফাআতকারী।' (সূরা ইউনুস, ১০ : আয়াত ১৮)
ঐটি ছিল সব চেয়ে বড় বিষয় যে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিরদের বিরোধিতা করেছিলেন। অতঃপর তিনি ইখলাছ নিয়ে এলেন এবং লোকদের বলে দিলেন যে, এটা আল্লাহর দ্বীন এখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করা হবে না। যেসব লোকেরা নিজেদের ইচ্ছামত কাজ করতে চায়, তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন এবং তাদের ঠিকানা জাহান্নাম।
এই উপরোক্তটিই হলো প্রকৃত দ্বীন। এরই কারণে মানব জাতি 'মুসলিম' ও 'কাফির' দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এই বিষয়টিকেই শত্রুতার মানদণ্ড ধরা হয়েছে এবং এরই কারণে জিহাদ আইন সংগত করা হয়েছে।
আল্লাহর ইরশাদ করেন-
'তোমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করো যতক্ষণ পর্যন্ত না ফিৎনা বাকী থাকে এবং দ্বীন কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য খালেছ হয়ে যায়।' (সূরা বাক্বারাহ ২ : আয়াত ১৯৩)
📄 অনৈক্য
জাহেলী যুগে আরবের লোকেরা ছিল একেবারেই বিশৃঙ্খল। নেতারা আনুগত্য করাকে তারা মানহানিকর ও গ্লানিকর বলে মনে করতো। আল্লাহ তাদেরকে জামাআতবদ্ধ হওয়ার আদেশ দিলেন এবং বিভক্ত হতে নিষেধ করলেন।
যেমন ইরশাদ হচ্ছে-
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধরো। খবরদার বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা স্মরণ করো সেই অতীতকে যখন তোমরা আপোষে পরস্পরের শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে পারস্পরিক মহব্বত পয়দা করে দিলেন। ফলে তোমরা সকলেই আল্লাহর রহমতে পরস্পরের ভাই হয়ে গেলে। (আরও স্মরণ করো) যখন তোমরা (পারস্পরিক শত্রুতার কারণে ধ্বংসের) অগ্নিকুণ্ডের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিলে; অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেন। এই ভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা সত্য-সঠিক পথ পেতে পারো।' (সূরা আল ইমরান, ৩ : আয়াত ১০৩)
উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যকার যুদ্ধের দিকে ইশারা দিয়েছেন, যা দীর্ঘ একশত বিশ বৎসর যাবৎ চলেছিল। যতক্ষণ না ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করেন এবং হিংসা দূরীভূত হয়ে যায়। ইবনে ইসহাক একথা বলেছেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ যে যুদ্ধ হয়েছিল সেটি ছিল 'বুআছের' যুদ্ধ। এ বিষয়ে 'কামেল' নামক কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
কেউ কেউ বলেন, উক্ত আয়াতে আরবের মুশরিকদের মধ্যে যে দীর্ঘায়িত বিবাদ- বিসম্বাদ যেমন বসুসের যুদ্ধ (যা চল্লিশ বৎসর যাবত চলেছিল) প্রভৃতি জারি ছিল- সেই দিকে ইশারা করা হয়েছে। হাসান রা. থেকে একথা বর্ণনা করা হয়েছে।
এমনিভাবে নেতার অনুগত হয়ে জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়ে অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
‘তোমরা তোমাদের সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় করো এবং নির্দেশ গ্রহণ করো ও অনুগত হয়ে চলো’। (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪: আয়াত : ১৬)
এমনি ধরণের আরও বহু আয়াত রয়েছে, যেখানে একনায়কত্ব, হঠকারিতা, বিশৃঙ্খলা, আনুগত্যহীনতা প্রভৃতি জাহেলী যুগের স্বভাবসমূহের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
📄 প্রশাসন কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা
জাহেলী যুগের আরবরা শাসন কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে ফযীলতের কাজ এমনকি কেউ কেউ একে ধর্ম বলে মনে করতো। আল্লাহর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এই বদ-স্বভাবের বিরোধিতা করলেন এবং তাদেরকে শাসনকর্তাদের ত্রুটিবিচ্যুতি সহ্য করার নির্দেশ দিলেন। তিনি লোকদেরকে প্রশাসন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ গ্রহণ, তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং উহাদের উপদেশ প্রদানের পরামর্শ দিলেন ও সকলকে এ বিষয়ে বারবার তাকিদ করলেন।
যেমন উপরোক্ত তিনটি ব্যাপারে ছহীহ্ হাদীসে নির্দেশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তোমাদের উপর তিনটি ব্যাপারে খুশী হন: (১) তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই আনুগত্য করো এবং তাঁর সংগে কাউকে শরীক করো না। (২) তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং (৩) আল্লাহ যাদেরকে তোমাদের উপর শাসন ক্ষমতা দান করেন, তাদেরকে সৎ পরামর্শ দান করো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
'তোমাদের মধ্যে যদি কেউ তার আমীরের পক্ষ থেকে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তবে সে যেন ধৈর্য্য ধারণ করে। কেননা, যে ব্যক্তি তার শাসনকর্তার আনুগত্য হতে এক বিঘত পরিমাণ বের হয়ে গেল, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করলো।' (বুখারী)
অন্য হাদীসে উবাদা ইবন ছামেত রা. বলেন যে : একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাঁর নিকট বায়'আত করলাম। তার মধ্যে বিশেষ কয়েকটি বিষয় ছিল। যেমন- নেতার নির্দেশ শ্রবণ করা, সম্পদে-বিপদে, কষ্টে- স্বাচ্ছন্দে সকল অবস্থায় তাঁর আনুগত্য করা এবং শাসন কর্তৃপক্ষের সহিত ঝগড়ায় লিপ্ত না হওয়া। তবে হ্যাঁ, যদি নেতা প্রকাশ্যে কুফরী করেন, তাহলে তাঁর আনুগত্য করা চলবে না।
এই বিষয়ে বহু ছহীহ্ হাদীস রয়েছে। বলাবাহুল্য রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত নির্দেশের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের কারণেই আজ মানুষের দ্বীন- দুনিয়া সকল ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকারের অশান্তি- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
📄 তাকলীদ
জাহেলী আরবদের দ্বীন যে কয়টি মুল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তন্মধ্যে সেরা ছিল তাকলীদ। ইহা মানব সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে এ যাবৎ সকল কাফির, মুশরিকদের লালিত শ্রেষ্ঠ মূলনীতি।
আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন-
'এমনিভাবে তোমার পূর্বে আমি যেখানেই কোনো ভয় প্রদর্শনকারী নবী পাঠিয়েছি সেখানকার বড়লোক বা মাতববর শ্রেণীর লোকেরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ- দাদাদেরকে একই দলভূক্ত পেয়েছি। অতএব আমরা তাদেরই পথ-পন্থা অনুসরণ করবো। এর জওয়াবে নবীগণ যখন বলতেন, আমরা কি তোমাদের নিকট তোমাদের বাপ- দাদাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ হিদায়েত নিয়ে আসিনি? তখন তারা সরাসরি বলে দিতো- যাও, তোমরা যা কিছু হিদায়েত নিয়ে প্রেরিত হয়েছ সবকিছুকে আমরা অস্বীকার করি'। (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: আয়াত ২৩ ও ২৪)
কাফিরদের উপরোক্ত কথার জওয়াবে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন-
‘তোমাদের রবের কাছ থেকে যা কিছু পাঠানো হয়েছে, তোমরা কেবল তারই অনুসরণ করো। তাকে ছেড়ে অন্য কোনো আউলিয়া বা বন্ধুদের অনুসরণ করো না। বস্তুতঃপক্ষে এটাই সত্য যে, তোমরা খুব কম লোকেই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।’ (সূরা আল-আ'আরাফ ৭: আয়াত ৩)
এমনিভাবে সূরা বাক্বারাহ্ ১৭০ আয়াত ছাড়াও বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে একথা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, জাহেলী যুগের লোকেরা তাকলীদ তথা অন্ধ অনুকরণের গন্ডিতে বাঁধা ছিল। তারা দ্বীনের ব্যাপারে যাবতীয় চিন্তা-গবেষণা থেকে দূরে থাকতো। আর এ জন্যেই তো তারা জাহেলিয়াতের অন্ধ গলিতে যুগ যুগ ধরে ভ্রান্ত পথিকের মত ঘুরে বেরিয়েছে। একই অবস্থা প্রত্যেক যুগের ঐসব লোকদের জন্য, যারা জাহেলী যুগের লালিত উপরোক্ত তাকলীদী বন্ধনে নিজেদেরকে আবদ্ধ রেখেছেন এবং বাপ-দাদার প্রচলিত রেওয়াজের অন্ধ অনুসারী মুকাল্লিদ হয়ে যাবতীয় স্বাধীন চিন্তার দুয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের জন্য বন্ধ রেখেছেন।