📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তার বিভ্রান্তি

📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তার বিভ্রান্তি


জিহাদ ও অমুসলিমদের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা ও বুঝ-সমঝে বিরাট ত্রুটি রয়েছে, তাদের ধারণা সকল কাফেরের সাথে লড়াই করা ওয়াজিব যদিও তারা শান্তিকামী হয়ে থাকে। আমরা এ বিষয়টি আমাদের লিখা ফিকহুল জিহাদ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ১

নিরাপত্তা প্রাপ্ত (আহলুজজিম্মা) খৃষ্টান, কিবতী ও অন্যান্যদের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি, তাদের অধিকার ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে।

অন্যায়ের প্রতিকার ও প্রতিরোধ শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, সে সম্পর্কে শর্তাবলী বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে।

সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার ব্যাপারটি বুঝার ক্ষেত্রে এবং এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসের যে সব নির্দেশাবলী ও দিকনির্দেশনা রয়েছে তা বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে। যে কেউ চাইবে আর অস্ত্র হাতে তুলে নিবে এরকম কোন পথ ইসলামে খুলে রাখা হয়নি।

আমরা শরীয়তের আলোকে এসব আলোচনা করব।

চিন্তার বিভ্রান্তিই চরমপন্থীদের প্রধান সমস্যা

এটি সুস্পষ্ট যে, এদের অধিকাংশের মুসিবত হল- তাদের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সংকট, তাদের অন্তঃকরণে নয়। এদের অধিকাংশই একনিষ্ঠ-মুখলেস, তাদের নিয়ত ভাল, তারা তাদের রবের ইবাদতকারী। এদের অবস্থা তাদের পূর্বসূরী খাওয়ারিজদের মত যারা সমস্ত মুসলমানকে কাফের বলে গণ্য করে, তারা আমিরুল মুমিনীন আলী (রা.)-কে কাফের সাব্যস্ত করে তার রক্তকে বৈধ করে নেয় এবং এর সাথে সাথে مسلمانوں রক্তকেও বৈধ বলে ঘোষণা করে। সহীহ হাদীসে দশ দিক দিয়ে তাদের নিন্দার কথা বর্ণিত হয়েছে যেমনটি ইমাম আহমাদ বলেছেন। বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বলা হয়েছেঃ

يَحْقِرُ أَحَدُكُمْ صَلَاتَهُ إِلَى صَلَاتِهِمْ وَقِيَامَهُ إِلَى قِيَامِهِمْ وَقِرَاءَتَهُ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ يَمْرُقُوْنَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ -

"তোমাদের কেউ তাদের নামায দেখে, রাতের তাহাজ্জুদ দেখে, কুরআন তেলাওয়াত দেখে, নিজেদের নামায, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তেলাওয়াতকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তাদের পাঠ গলদেশের নিচে নামবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর তার ধনুক থেকে বের হয়ে যায়।" ১

তারা (নফল) রোযাদার, তাহাজ্জুদগুজার, কুরআন পাঠকারী, বেশী বেশী ইবাদতকারী, কিন্তু তাদের কুরআন পাঠ কণ্ঠনালীর নিচে নামে না। অর্থাৎ তাদের অন্তরে প্রবেশ করে না, তাদের আকলে (জ্ঞান-বুদ্ধিতে) ধরে না, এর মর্মার্থ বুঝে না, এর উদ্দেশ্য-লক্ষ্য হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয় না। তারা শুধু এর শাব্দিক ও প্রকাশ্য অর্থই বুঝে থাকে।

তাদের এই বক্র বুঝ ও সমঝ অন্যান্য مسلمانوں ধনসম্পদ লুন্ঠন করা এবং রক্ত প্রবাহিত করাকে বৈধ করে দিয়েছে, এমনকি তারা ইসলামের বীরমুজাহিদ হযরত আলী (রা.)-এর রক্তকেও বৈধ করে নেয়। তাদের এক কবি আলীর হত্যাকারীর প্রশংসা করে বলেঃ

বাহ কি চমৎকার! মুত্তাকী হতে সেই আঘাত, যার উদ্দেশ্য হল মহান আরশের মালিকের সন্তুষ্টি অর্জন। আমি তাকে একদিন স্মরণ করলাম, বুঝলাম হাশরের মিজানে তার জন্য রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব।

ভাল নিয়ত মন্দ কাজকে উত্তম বানায়না

নবী করীম (সা.) সতর্ক করে দিয়েছেন সবধরনের নিয়ন্ত্রণহীন, উদ্দেশ্যহীন কাজকর্ম করা থেকে এবং আবেগপ্রবণ হয়ে অঘটন ঘটানোর ব্যাপারে যা কখনো কখনো ভাল মানুষও সৎ নিয়তে ও মহৎ উদ্দেশ্যে করে থাকে, এর পরিণাম-পরিণতি কি হবে সেদিকে খেয়াল না করেই। এটি তাদের সংকীর্ণ দৃীষ্টভঙ্গির কারণেই হয়ে থাকে। যদি সমাজ এ ব্যাপারে সচেতন না হয়, তাদেরকে এসব থেকে নিবৃত্ত না করে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডে বাধা না দেয় তাহলে তারা পুরো সমাজকেই এর দ্বারা কলুষিত করে ফেলবে, তাদের নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ড তাদের সৎ-নিয়ত থাকা সত্ত্বেও পুরো সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে।

এজন্যই রাসূল (সা.) সমাজের বুদ্ধিমান-বিবেকবান ও আলেম- উলামাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন যেন তাদের বাধা দেয় যেন তারা এসব চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে না পারে। এটা করতে হবে গোটা সমাজকে বাঁচানোর স্বার্থে, তাদের জীবন-মালের হেফাজতের স্বার্থেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এ জন্য এক সুন্দর প্রাণবন্ত উদাহরণ পেশ করেছেন তাহল- দুই বা ততোধিক তল বিশিষ্ট জাহাজের আরোহীদের সাথে যার কিছু রয়েছে নিচ তলায় আর কিছু রয়েছে উপরের তলায়। যদি নিচতলার যাত্রীরা তাদের অংশে ফুটা করে সরাসরি সমুদ্র বা নদী থেকে পানি পাওয়ার জন্য এই দাবী করে যে, তারা তাদের অংশে যা কিছু করার ব্যাপারে স্বাধীন, তারা উপরে যারা আছে তাদেরকে বার বার গিয়ে বিরক্ত করতে চায় না।

আসুন আমরা নবীর হাদীসটি সরাসরি পাঠ করি-

عن النعمان بن بشير رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال مثل القائم على حدود الله والواقع فيها كمثل قوم استهموا على سفينة فأصاب بعضهم أعلاها وبعضهم أسفلها فكان الذين في أسفلها إذا استقوا من الماء مروا على من فوقهم فقالوا لو أنا خرقنا في نصيبنا خرقا ولم نؤذ من فوقنا فإن تركوهم وما أرادوا هلكوا جميعا وإن أخذوا على أيديهم نجوا ونجوا جميعا.

"নুমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী ও তা লঙ্ঘনকারীর উপমা হল- কয়েকজন লোক লটারীর মাধ্যমে একটি নৌযান ভাগ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পায় উপর তলায় এবং কেউ নীচের তলায়। তাদের মধ্যে যারা নীচের তলায় ছিল, তারা যখন পানি পিপাসা অনুভব করত, তখন যারা তাদের উপর ছিল, তাদের নিকট যেত, (এতে উপরের লোকদের কষ্ট হত)। এমতাবস্থায় নীচের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, যদি আমরা নিজেদের অংশে ছিদ্র করে পানি নিতাম আর উপরের লোকদেরও কোন কষ্ট না দিতাম, তবে ভাল হত। নবী করীম (সা.) বলেন, এখন যদি উপরের লোকেরা নীচের লোকদের মর্জির উপরে ছেড়ে দেয়, তবে সকলেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তাদেরকে বাধা দেয়, তবে তারা নিজেরাও বাঁচবে অন্য সকলেও বেঁচে যাবে।" ১

এই হাদীসে মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত সংহতি ও দায়-দায়িত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তারা যেন তাদের কোন সন্তানকে তাদের অজ্ঞতার মধ্যে না ছেড়ে দেয় এবং তাদের মন্দ আচরণ করার সুযোগ না দেয় যদিও তারা নিষ্ঠাবান (মুখলেস) হয়ে থাকে। কারণ, শুধুমাত্র নিষ্ঠা বা এখলাসই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই এখলাসের সাথে সাথে কাজটিও সঠিক হতে হবে।

চরমপন্থী দলগুলোকে ইসলাহ করার পন্থা আলেম-উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদেরকে অবশ্যই চরমপন্থী দল বা গ্রুপগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। তাদের ইসলাহ করতে হবে উত্তম পন্থায় যেমনটি মহান আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হবে, না হলে কমপক্ষে তাদের নেতাদের সাথে যুক্তি-তর্ক ও দলিল-প্রমাণ দিয়ে আলাপ-আলোচনা, পর্যালোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখেতে হবেঃ

এক. তারা যে বর্তমানে চরমপন্থা প্রয়োগ করছে এবং জনগণ যা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে, এটির কোন শরয়ী ভিত্তিই নেই- না এর দলিল-প্রমাণের দিক থেকে আর না এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের (مقاصده الكلية) দিক থেকে।

দুই. এই চরমপন্থার কার্যকারিতা কতটুকু, যদি আমরা এটিকে বৈধ মনে করি- এটি কি খারাপ অবস্থাকে পরিবর্তন করে দিবে? বা ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে? অথবা মুসলিম উম্মাহর কোন বিরাট উদ্দেশ্য সাধন করে দিবে?

জিহাদী দলগুলো যেমন জামাআতুত-তাকফীর, জামাআ ইসলামিয়া, সালাফিয়াতুল জিহাদ এবং সর্বশেষে আল-কায়েদা ঘোষণা করেছে যে বর্তমান সরকারগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। তারা এজন্য সশস্ত্র সংঘর্ষের পথ গ্রহণ করেছে। তারা বক্তৃতা-বিবৃতি অথবা শান্তিপূর্ণ পন্থায় পরিবর্তন না করে যেমন বিভিন্ন সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, মসজিদ-মাদরাসায় আলোচনা, সভা-সমাবেশ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ ইত্যাদি না করে ইসলাম বিরোধী সরকারকে প্রতিরোধ করার এবং জনগণের স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করার আহ্বান জানায়।

আর যেহেতু এসব দল বা গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত সরকারের মত সামরিক শক্তির অধিকারী নয় যা দ্বারা শক্তির মুকাবিলা করে এজন্য তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়।

এরমধ্যে হলঃ গুপ্তহত্যা এবং সরকারী স্থাপনায় নাশকতামূলক আক্রমণ।

এই দুটি পন্থায় সাধারণতঃ নিরপরাধ বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হয় যাদের এব্যাপারে কোন ভূমিকাই নেই। এরমধ্যে রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয় সেই বেঁচে যায় অথচ যাদের হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না এমন অনেক বেসামরিক লোকজন নিহত হয়।

ইসলামে একথা সুবিদিত যে, মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে যুদ্ধের সময় যুদ্ধের সাথে যারা জড়িত থাকবে না তাদেরকে হত্যা করা জায়েয নয়। তাহলে কিভাবে مسلمانوںকে হত্যা করা যাবে? হাদীস শরীফে এসেছেঃ

لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ قَتْلِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ بِغَيْرِ حَقٍّ .

"আল্লাহর নিকট এই দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া অনেক সহজ একজন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়ে।” ১

একথাও সুবিদিত যে, ইসলাম রক্তপাতের ব্যাপারে প্রচণ্ড কড়াকড়ি আরোপ করেছে এমনকি কুরআন অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের সাথে একথা সাব্যস্ত করেছে যে,

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا - (المائدة : (٣٢)

“যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল।” (সূরা মায়েদা: ৩২)

ইসলামের নবী বলেনঃ "একজন মুমিন তার দীনের সহজতার মধ্যে ততক্ষণ থাকল, যতক্ষণ না সে অবৈধভাবে কোন রক্তপাত ঘটাবে।” (বুখারী ইবনে উমর (রা.) থেকে)

আর সরকারী স্থাপনা ধ্বংস করা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সম্পদই ধ্বংস করা।

তাদের আরেকটি পন্থা হলঃ পর্যটকদের হত্যা করা। যারা হল ফিকহের ভাষায় 'নিরাপত্তাপ্রাপ্ত' রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে তাদেরকে ভিসা প্রদানের মাধ্যমে। সুতরাং সবার প্রতি ওয়াজিব হল এই যে- তাদের নিরাপত্তার মর্যাদা দেয়া, তাদের প্রতি অন্যায় করা যাবে না, তাদের জিম্মাদারীর ব্যবস্থা করতে হবে যদিও তাকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে কোন মুসলমান দাস। হাদীস শরীফে এসেছে- "মুসলমানদের জিম্মাদারী প্রদান হতে পারে তাদের অধস্তন লোক থেকেও।” ১

নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেনঃ "মুসলমানদের জিম্মাদারী একই। সুতরাং যদি কেউ কোন মুসলমানদের অসম্মান-অমর্যাদা করে তাহলে তার উপর আল্লাহ, ফেরেস্তা এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত।”২

রাসূল (সা.) উম্মে হানীকে বলেন, যিনি তাঁর এক অমুসলিম নিকটাত্মীয়কে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন- হে উম্মে হানী! আপনি যাকে আশ্রয় দিয়েছেন আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।" ১

এ বিষয়টির উপর আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি 'ফিকহুল জিহাদ' নামক গ্রন্থে।

টিকাঃ
১. বইটি যন্ত্রস্থ অবস্থায় রয়েছে। মহান প্রভুর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন বইটি অতি দ্রুত পাঠকদের হাতে তুলে দেয়ার তাওফীক দেন।
১. বুখারী হাদীস নং ৩৬১০, মুসলিম হাদীস নং ১০৬৪, আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত।
১. বুখারী হাদীস নং ২৪৯৩
১. নাসাঈ, তাহরীমুদদিমা অধ্যায়, ৮৭/৮২, ৮৩ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত; তিরমিযী, দিয়াত অধ্যায়, হাদীস নং ১৩৯৫; ইবনে মাজা হাদীস নং ২৬১৯, বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত। ইমাম বুসায়রী তাঁর যাওআয়েদ গ্রন্থে বলেন এর সনদ সহীহ এবং বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর তালখীস গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন এবং ইমাম আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১. আবু দাউদ, ইবনে মাজা ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আলবানী জামেউস সাগীরে এটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন (৬৭১২)।
২. আলী (রা.) থেকে বুখারী হাদীস নং ১৭৭১; মুসলিম হাদীস নং ১৩৭১
১. বুখারী হাদীস নং ৩৫০, মুসলিম হাদীস নং ৩৩৬/৭০

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থা দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল হয় কি?

📄 চরমপন্থা দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল হয় কি?


চরমপন্থার ব্যাপারে যারা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করেন তাদের নিকট এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, চরমপন্থামূলক কর্মকাণ্ড এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ দ্বারা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের পতন ঘটানো যায় না, এমনকি তাকে দুর্বলও করা সম্ভব হয় না। কখনো কখনো চরমপন্থীরা সফল হয়ঃ রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী অথবা কোন মন্ত্রী বা কোন পদস্থ কর্মকর্তা বা এধরনের কাউকে হত্যা করতে সমর্থ হয়। কিন্তু এর দ্বারা সমস্যার সমাধান করা যায় না। বরং দেখা যায় যে নতুন এলো সে পূর্বের চেয়ে আরো বেশী কঠোর ও রুঢ় ইসলামপন্থীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে। এজন্য এক কবি আক্ষেপ করে বলেনঃ

আমি কোন একদিনের জন্য কেঁদেছি কিন্তু পরবর্তীতে তারচেয়েও কষ্ট পেয়ে পূর্বের সেই দিনের জন্যই কাঁদতে হয়েছে।

অপর এক কবি বলেনঃ আমি আমরের জন্য বদদু'আ করলে সে মারা যায়, এরপর আমি অন্যদের দ্বারা নিগৃহীত হই, ফলে আমরের জন্যই পরে কান্নাকাটি করি।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থী দলগুলো অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে

📄 চরমপন্থী দলগুলো অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে


সরকারগুলোই সর্বদা চরমপন্থী দল বা গ্রুপগুলোর উপর জয়লাভ করে থাকে, যদিও প্রাথমিকভাবে এরা কিছু কিছু সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তারা বিভিন্ন দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ঃ

১. ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব যুবকরা নিহত হচ্ছে আর যে মারা যায় না তাকে জেলে নিক্ষেপ করা হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। ছাত্র হলে তাদের অনেকেরই লেখাপড়া জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, চাকুরীজীবী হলে চাকুরী হারায়, ব্যবসায়ী হলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। আর এগুলো বাস্তবিকই বিরাট বড়ধরনের ক্ষতি, যা আমরা স্বচক্ষে দেখলাম। তাদের নিয়ত কি ছিল সেটা আল্লাহই ভাল জানেন, তাদের ব্যাপারে তিনি কি করবেন। কিন্তু দুনিয়ার হিসেবে তাদের কর্ম নিস্ফল, ক্ষতি অপূরণীয়।

২. দেশে-বিদেশে ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে ক্ষতি। চরমপন্থাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করে ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী জাগরণকে কলুষিত করা হচ্ছে, ইসলামকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে এবং ইসলাম বিশ্বের শান্তি-নিরাপত্তার জন্য হুমকী স্বরূপ বলে ইসলামের শত্রুরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। مسلمانوںকে সন্ত্রাসী ও হিংস্র বলে আখ্যায়িত করার প্রয়াসে লিপ্ত। তাদের মনে কোন দয়া-মায়া নেই বলে প্রচার করছে বিশেষ করে মিসর ও আলজিরিয়ায় কতিপয় রক্তাক্ত ঘটনাবলী ঘটে যাওয়ার পর যা দেখে যে কোন মানুষই ব্যথিত না হয়ে পারে না।

৩. ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে ইসলামী আন্দোলনকে দমন করার সুযোগ করে দেওয়া। এসব ঘটনাকে পুঁজি করে ইসলামের দুশমনরা সঠিক ইসলামী আন্দোলন ও জাগরণকে নিগৃহীত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, তারা ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। ইসলামের সুমহান বাণী প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

৪. জাতীয় পর্যায়ে ক্ষতি- একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে পড়ছে, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির কোন খবর নেই, জনগণের সমস্যার কথা বাদ দিয়ে কে কাকে মারবে এই চিন্তায় বিভোর। দেশের সমস্যার সমাধানে যেখানে একে অপরের হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া দরকার সেখানে একে অপরকে মারতে হত্যা করতে তৎপর রয়েছে।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 মিসরের জামাআ ইসলামিয়ার আলোকিত প্রত্যাবর্তন

📄 মিসরের জামাআ ইসলামিয়ার আলোকিত প্রত্যাবর্তন


আমরা এখানে অত্যন্ত গৌরবের সাথে উল্লেখ করতে চাই যা মিসরের জামাআ ইসলামিয়া ঘোষণা করেছে এবং সেটিকে তাদের আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ উমর আব্দুর রহমান সমর্থন করেছেন, যিনি এখন আমেরিকার কারাগারে বন্দী রয়েছেন- আল্লাহ তাঁকে মুক্তি দিন- তারা ঘোষণা করেছে চরমপন্থা বন্ধ করার এবং শান্তির পথ গ্রহণ করার আর সবধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ পরিত্যাগ করার। তারা তাদের জিহাদের নামে যেসব ভুল-ত্রুটি সংঘঠিত হয়েছে তা তারা স্বীকার করেছে। তারা এটি করেছে ১৯৯৭ সালের ৫ই জুলাই কোর্টের নিকট। সামরিক আদালতে ২৩৫ নং মামলায় উপস্থিত সকলেই হতবাক হয়ে গেলেন যখন জামাআ ইসলামিয়ার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের স্বাক্ষর করা বিবৃতি পাঠ করে শুনানো হল প্রিন্টিং মিডিয়া ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের লোকজনের উপস্থিতিতে যে, তারা সবধরনের রক্তপাত ও সশস্ত্র আক্রমণ পরিত্যাগ করছে।

জামাআ ইসলামিয়ার কতিপয় নেতা এটির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। পরে তারা নিশ্চিত হতে পারেন যে ঘটনা সত্য, তারা সমঝোতা ও শান্তির পথ গ্রহণ করেছেন। এরপর তারা ১৯৯৯ সালের ২৮ মার্চ ঘোষণা করে সম্পূর্ণভাবে চরমপন্থা পরিত্যাগ করার এবং সবধরনের আক্রমণ ত্যাগ করার আর তারা এ ব্যাপারে বিবৃতিও প্রকাশ করে।

এরপর জামাআ ইসলামিয়ার নেতৃবৃন্দ বেশ কিছু বিবৃতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার নিরিখে প্রকাশ করেন যাতে তারা তাদের এই পদক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপারটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। তারা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ও ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম-উলামাদের দলিল-প্রমাণসহ বেশকিছু বিবৃতি প্রকাশ করেন যা তারা "তাসহীহুল মাফাহীম" [বুঝ-সমঝ পরি শুদ্ধকরণ] নামে প্রকাশ করেন। এসব বিবৃতির প্রকাশক বলেন, এগুলো হল শান্তি আলোচনার বিশেষ ফলশ্রুতি। এর দ্বারা নেতৃবৃন্দ চেয়েছেন তাদের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে লোকজনকে অবহিত করতে এবং ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে বিশেষ করে ইসলামী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে।

তিনি আরো বলেন, এসব বিবৃতির আরেকটি বিশেষ দিক হল, শীর্ষস্থানীয় সকল নেতৃবৃন্দ এটি দেখেছেন এবং পড়েছেন যেমনঃ কারাম জুহদী, নাজেহ ইবরাহীম, উসামা হাফেজ, ফুয়াদ দুআলিমী, হামদী আব্দুর রহমান, আলী শারীফ, আসেম আব্দুল মাজেদ এবং এসام দারবালা।

এসব বিবৃতি ও প্রচারণা আমার দৃষ্টি কেড়েছে এ জন্য যে, তাদের নিকট আমার বই-পুস্তক ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু আমি দেখলাম বিভিন্ন জায়গাতে তারা আমার বই-পুস্তকের উদ্ধৃতি দিয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায় তারা মুখলেস বা একনিষ্ঠ ছিল এবং তারা তাদের পূর্বের গোঁড়ামী থেকে বের হয়ে এসেছে। তারা অন্ধ অনুসরণ ও বাড়াবাড়ি পরিত্যাগ করেছে আর এটি তাদের সঠিক পথে ফিরে আসারই প্রমাণ বহন করে এবং সঠিক জ্ঞান ও হিকমতের অন্বেষণ করার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ বুঝায়।

সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে দশটি শরয়ী বাধা

এসব ভাইয়েরা বুঝতে পেরেছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা বা সশস্ত্র জিহাদ করা যাকে তারা শরীয়তে ওয়াজিব বলে বিশ্বাস করত, এটি আজ তাদের উপর ওয়াজিব নয়। এর কারণ এ ব্যাপারে অনেকগুলো বাধা রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো দশটি। তাদের প্রথম বুকলেট "চরমপন্থা পরিহার করার পদক্ষেপঃ বাস্তবতা ও শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী"-এ তারা এ ব্যাপারে দলিল-প্রমাণ সহ উল্লেখ করে যা এখানে উল্লেখ করা হল।

১. প্রথম বাধাঃ এধারণাই প্রবল হচ্ছে যে, জিহাদ বা সশস্ত্র লড়াই বা সংঘাত দ্বারা কাঙ্খিত ফললাভ সম্ভবপর হবে না, যে উদ্দেশ্যে এই জিহাদ শুরু করা হয়েছিল।

২. দ্বিতীয় বাধাঃ সশস্ত্র লড়াই করা [মহান আল্লাহর সৃষ্টির উদ্দেশ্য-লক্ষের পরিপন্থী। (এবং তা ঘৃণিতও বটে।)

৩. তৃতীয় বাধাঃ অপারগতা বা সামর্থ্যহীনতা। আর অপারগতার কারণে ওয়াজিবাত বা কর্তব্য তিরোহিত হয়ে যায়। "তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যতটুকু সম্ভব।” (সূরা তাগাবুন: ১৬)

৪. চতুর্থ বাধাঃ ধ্বংস (জীবনাবশান) যেমনটি মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা তোমাদের হস্তদ্বয়কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” (সূরা বাকারা: ১০৫)

৫. পঞ্চম বাধাঃ মুশরিকদের সাথে মুসলমানের উপস্থিতি। একজন মুসলমানের রক্তের জিম্মাদারীর কারণে সে যদি অন্যান্য মুশরিকের মাঝে রয়ে যায় যাতে তাকে পার্থক্য করা সম্ভব না হয় তাহলে সকলের রক্তই নিরাপদ হয়ে যাবে। তাদেরকে আক্রমণ করা যাবে না, মুসলিমের উপস্থিতির কারণে। এ ব্যাপারে কুরআন বলেঃ

وَلَوْلَا رِجَالٌ مُؤْمِنُونَ وَنِسَاءً مُؤْمِنَاتٌ لَّمْ تَعْلَمُوهُمْ أَنْ تَطَئُوهُمْ فَتُصِيبَكُمْ مِّنْهُمْ مَّعَرَّةٌ بِغَيْرِ عِلْمٍ ، لِيُدْخِلَ اللهُ فِي رَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ : لَوْ تَزَيَّلُوا لَعَذَّبْنَا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا - (الفتح : (٢٥)

"যদি মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা না থাকত, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না যে, অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করবে, ফলে তাদের কারণে তোমরা দোষী হতে কিন্তু আমি তাদের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছি যাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে প্রবেশ করাবেন। যদি তারা পৃথক থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে আমি অবশ্যই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম।" (সূরা ফাতহঃ ২৫)

৬. ষষ্ঠ বাধাঃ কাফেররাও কালেমা শাহাদাত পাঠ করছে, মুরতাদ ব্যক্তিও তাওবা করতে পারে এবং সঠিক ইসলামের পথে ফিরে আসছে এবং গুনাহগার-পাপী আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসছে।

৭. সপ্তম বাধাঃ যদি লড়াই-সংগাম করতে গিয়ে যে ফিতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে আশংকা করা হয়, সম্ভাব্য ফল লাভের চেয়ে অথবা এর দ্বারা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশী হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

৮. অষ্টম বাধাঃ বিশেষ করে আহলে কিতাবদের (ইহুদী-খৃষ্টানদের) ব্যাপারে- যদি তারা নির্ধারিত ট্যাক্স (জিযিয়া) বা অন্য কর সরকারের নিকট প্রদান করে থাকে আর তাদের জন্য সরকার নিরাপত্তা প্রদান করে থাকে, তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা যায় না। তারা যেহেতু مسلمانوں দেশে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় প্রবেশ করছে, তাহলে তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে হবে, তাদেরকে হত্যা করা যাবে না বা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।

৯. নবম বাধাঃ সকলের নিকট দাওয়াত না পৌঁছা। কারণ, কারো নিকট ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছার পূর্বে তার সাথে লড়াই করা জায়েয নয়।

১০. দশম বাধাঃ সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করা। আর একথা সুবিদিত যে, সন্ধিই উত্তম। শায়খ হাসকাফী তাঁর দুররুল মুখতার [তানভীরুল আবসার গ্রন্থের ব্যাখ্যা] গ্রন্থে বলেন, তাদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করা জায়েয তাদের পক্ষ থেকে ধন-সম্পদ দিয়ে অথবা আমাদের পক্ষ থেকে ধন-সম্পদ প্রদান করে, যদি এতে কল্যাণ থাকে মহান আল্লাহর এ বাণীর কারণেঃ

وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا - (الأنفال : ٦١) "আর যদি তারা সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তুমিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়।” (সূরা আনফাল: ৬১) ইমাম ইবনে আবেদীন এর টীকায় লিখেন, "আয়াতের হুকুমকে শর্তযুক্ত করা হয়েছে কল্যাণলাভ থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে, এটি সম্মিলিত অভিমত [ইজমা]।” ১

এই চুক্তি যখনই সম্পাদিত হবে তখনই লড়াই করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, সে চুক্তি সাময়িক হোক বা স্থায়ী।

এ দশটি বাধার কথা যা এখানে উল্লেখ করলাম, সেগুলো তাদের প্রথম বুকলেট "চরমপন্থা পরিহার করার পদক্ষেপঃ বাস্তবতা ও শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী" থেকে সংক্ষেপে উল্লেখ করলাম। তারা সেখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। তাদের সে বুকলেটের শেষভাগে এই বলিষ্ঠ বক্তব্য তুলে ধরেছে যা আমি এখানে উল্লেখ করছিঃ

তারা বলেঃ "আমরা ইসলামী আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমাদের উপর ওয়াজিব হল- আমাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য স্পষ্ট হতে হবে যেজন্য আমরা কাজ করছি এবং অবশ্যই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে মূল্যায়ন করতে হবে যে, এই পদক্ষেপ আমাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে কি না। আমাদের মহান উদ্দেশ্যই হল যা নবী-রাসূলগণ নিয়ে এসেছেনঃ "তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই।” (সূরা মুমিনুন : ৩২)

আমাদের উদ্দেশ্যই হল মানুষকে তাদের রব এর ইবাদতের বন্ধনে একীভূত করা অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টিকুলের নিকট হেদায়েতের বাণী উপস্থাপন করা। এজন্য আমাদেরকে পর্যাপ্ত সাহসের সাথে অগ্রসর হতে হবে যেকোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যাকে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক মনে করব।

আমাদেরকে আরো সাহসের সাথে অগ্রসর হতে হবে যেন আমরা আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ যা আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়ক নয় যদিও বাস্তবে সেটি কেউ কেউ আমাদের ইতোমধ্যে বাস্তবে করে ফেলেছে তা পরিহার করতে হবে- যা আমাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য মানুষকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করা- এতে প্রতিবন্ধক কর্মকাণ্ড অবশ্যই সাহসের সাথে পরিহার করব। এটি কোন বাহাদুরী নয় যে, আমরা আমাদের দেশের' সন্তানদেরকে হত্যা করব। আমরা এটা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি যে, আমরা কারো হাড়-হাড্ডি ভাঙতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে দীনের দাওয়াতকেই ধ্বংস করে দিলাম।

বরং সাহস ও বাহাদুরীর কাজ হল যা রাসূলুল্লাহ (সা.) করেছেন যখন তিনি দেখলেন কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ পরিত্যাগ করা উত্তম, তখন তিনি তাদের সাথে সন্ধি করেন [সন্ধি চুক্তিতে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু কঠোর ও অসম্মানজনক শর্তারোপ করা হয়েছিল]। এমনকি উমর (রা.) বলেন, আমরা কেন দীনের ব্যাপারে এত কঠিন শর্ত মেনে নিচ্ছি।"১

রাসূল (সা.) আরো সাহস ও বাহাদুরীর উদাহরণ হল- তিনি যখন জানলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ কৌশলে মুসলিম সৈন্যদের নিয়ে মুতা'র যুদ্ধ থেকে পিছু হটে এসেছেন। তিনি সেটিকে মেনে নিয়েছেন। অথচ অনেক মুসলমানই এটিকে মেনে নিতে না পেরে তাঁকে পলাতক বলে অভিযুক্ত করেন।

রাসূল (সা.) এর শিক্ষা ও অনুমোদন ভালভাবে অধ্যয়ন-পর্যবেক্ষণ করে আমরা মিসরে সশস্ত্র লড়াই পরিত্যাগ করার ঘোষণা প্রদান করছি।”২

আমার দৃঢ়বিশ্বাস মিসরের জামাআ ইসলামিয়ার বর্তমান অবস্থান এবং তাদের পূর্বচিন্তাধারা থেকে প্রত্যাবর্তন করা নিঃসন্দেহে এক বলিষ্ঠ সাহসী পদক্ষেপ। আর তাদের বক্তব্যগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করায় তাদের নিয়তের একনিষ্ঠতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় থাকে না। এর দ্বারা তাদের চিন্তাধারাও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে যারা শুধুমাত্র নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণকেই একমাত্র পথ বলে মনে করত। নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ ও কর্মসূচী দ্বারা তাদেরকে সাময়িকভাবে দমন করা সম্ভব হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও চিন্তার জগতে তাদের যে ভ্রান্তি রয়েছে তা দূর করা সম্ভব হবে না। সুযোগ পেলেই বিভ্রান্তরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। হয়তবা নতুন কোন নামে বা আঙ্গিকে তারা সংগঠিত হবে। এজন্য তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন এনে তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হওয়ায় সমস্যার সমাধান হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

সমাপ্ত

টিকাঃ
১. বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে জানতে হলে "ফিকহুল জিহাদ” গ্রন্থটি পাঠ করুন, যা অচিরেই প্রকাশিত হবে।
১. বুখারী হাদীস নং ৩০১০, মুসলিম ১৭৮৫/৯৪ সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) থেকে বর্ণিত।
২. দেখুন, জামাআ ইসলামিয়ার প্রকাশিত বুকলেট "চরমপন্থা পরিহার করার পদক্ষেপঃ বাস্তবতা ও শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী", এবং তাদের অপর প্রকাশিত পুস্তিকা- "জিহাদের কি ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে তার উপর দৃষ্টিপাত"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00