📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তাচেতনার পর্যালোচনা

📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তাচেতনার পর্যালোচনা


আমাদেরকে অবশ্য জানতে হবে সেসব জামায়াত বা দল সম্পর্কে যারা নিজেদেরকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে। তারা মূলতঃ এক বিশেষ দর্শনের কারণে এটি করছে, তারা ইসলামের বিধি-বিধানকে ও এর প্রমাণাদিকে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেছে।

যারা আমাদের বর্তমান আরববিশ্বের চরমপন্থী দলগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয় (যেমন আল-কায়েদা, আল-জামাআ আল-ইসলামিয়া, আসসালাফিয়া আল-জিহাদিয়া, জামাআতে আনসারুল ইসলাম) তাহলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন দেখতে পাবে এবং তাদের ইসলামী বিশ্লেষণ লক্ষ্য করলে দেখবে যে তারা কুরআন-হাদীস এবং বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি দিয়ে তাদের পক্ষে কিভাবে দলিল পেশ করে থাকে। আমরা এদের এই বুঝের বিষয়টি অবশ্যই পর্যালোচনা করবো এবং এর জবাব দেব।১

একথা ঠিক যে এরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মুতাশাবিহাত (সংশয়যুক্ত) দলিলাদির উপর নির্ভর করে এবং মুহকামাত (সুস্পষ্ট দলিলাদি) পরিত্যাগ করে, তারা ছোটখাট বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বড় বড় বিষয়াবলিকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তারা বাহ্যিক দিকটাকে আঁকড়ে ধরে, এর উদ্দেশ্য-লক্ষ্য (مقاصد) সম্পর্কে গাফেল থাকে, তেমনিভাবে গাফেল থাকে এসব দলিলাদির বাহ্যিক দিকটিকে কোন কোন দলিল-প্রমাণ বিপক্ষে রয়েছে। এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলিল-প্রমাণকে তার সঠিকস্থানে ব্যবহার বা প্রয়োগ করেনি। একে তার সঠিকস্থান থেকে অন্যঅর্থে ব্যবহার করেছে। কিন্তু -অবস্থা যাই হোক না কেন- তাদের এমন বুঝ হয়েছে যা দ্বারা তারা চরমপন্থাকে গ্রহণ করেছে। তারা আমাদের ঐতিহ্যের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ততা দেখিয়ে কিছু কিছু যুবককে এবং যাদের ইসলাম সম্পর্কে ভাসাভাসা জ্ঞান রয়েছে তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তারা কোন কিছুর গভীরে যেতে পারেনি। তাদের বুঝের বা জ্ঞানের মূলে হল পূর্বের খাওয়ারিজদের চিন্তা-চেতনা। যারা কুরআন পাঠ করত কিন্তু তাদের কুরআন গণ্ডদেশের নিচে নামেনি। অর্থাৎ তারা কুরআনের শিক্ষা ও দর্শন বুঝেনি।

নিজ দেশের অভ্যন্তরে চরমপন্থার প্রয়োগ

এসব দল বা গ্রুপগুলো প্রথমে নিজেদের দেশের মধ্যে চরমপন্থা প্রয়োগ করে। তারা দেশের সরকারের আইনের বিরুদ্ধে, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে লেগে পড়ে।

তারা কিসের ভিত্তিতে এটা করল এবং এর পেছনে শরীয়তের কোন কোন দলিলাদিকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করল?

বর্তমান সরকার ব্যবস্থাকে কুফরী সরকার ব্যবস্থা মনে করা

এসব চরমপন্থী দলগুলো মনে করে যে বর্তমান সরকারগুলো ইসলামী সরকার নয় বরং তাদের স্পষ্ট বক্তব্য হল- এরা কাফের সরকার। কেননা এরা আল্লাহর দেয়া বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করে না, দেশ পরিচালনা করে না। তারা দেশ চালাচ্ছে মানব রচিত আইন দ্বারা, আর এজন্য তারা কাফের ও মুরতাদ হয়ে দীন-ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে যেন তারা ক্ষমতা ত্যাগ করে। কারণ তারা সুস্পষ্ট কুফরী করেছে, এ ব্যাপারে আল্লাহর দেয়া দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান।

তাদের এই দর্শনকে আরো শক্তিশালী করছে এই কারণে যে এসব সরকার আল্লাহর দুশমন কাফেরদের সাথে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে যারা সদাসর্বদা مسلمانوں বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা আল্লাহর নেক বান্দা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত, যে সব লোকেরা আল্লাহর আইন চালু করার দাবী জানাচ্ছে তাদের উপর জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। মহান আল্লাহ্‍ ইরশাদ করেনঃ

وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ - (المائدة : (٥١) “আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের (কাফেরদের) সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন।” (সূরা মায়েদা: ৫১)

এসব দলগুলোর আরো দলিল হল- এসব সরকারগুলো মসজিদুল আকসার প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে যে মসজিদ হল ইসরা ও মিরাজের ভূমি। এসব সরকারের অনেকেই যায়নবাদী ইসরাইলী সরকারের হাতে হাত মিলিয়েছে আর কেউ কেউ তাকে স্বীকৃতিও দিয়েছে, আর কেউ কেউ ইসরাইলের দোসর ও পৃষ্ঠপোষক আমেরিকাকে ঘাড়ে চড়িয়েছে এবং তার হাতে লাগাম ছেড়ে দিয়েছে সে যা ইচ্ছা করে তাই করছে, সে তাদের চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টাই করছে না; বরং তার ইসলামী পরিচয় পরিবর্তন করে দিতে চায় এবং তাদের ঐতিহাসিক পরিচিতিতে মুছে ফেলতে চাইছে।

বর্তমান সরকারগুলো নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে এসব অভিযোগ খণ্ডন করার জন্য বিভিন্ন কথা বলছেঃ তারা ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে ঘোষণা করেছে। তারা মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছে, আলেম-উলামাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খতীব, মুয়াজ্জিন নিয়োগ দান করছে, দীনি শিক্ষা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু করেছে, মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করছে, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা পালন করছে, রেডিও-টেলিভিশনে কুরআন সম্প্রচার করছে ইত্যাদি ইত্যাদি ধর্মীয় কাজ-কর্ম সম্পাদন করছে যা কোন না কোন ভাবে প্রমাণ করে যে তারা মুসলিম সরকার যার সারকথা হল-তারা ইসলামকে আকীদা হিসেবে স্বীকার করে শরীয়ত হিসেবে নয়, ইবাদত হিসেবে মুয়ামালাত হিসেবে নয় অথবা তারা কুরআনের কিছু মানছে আর কিছু অংশকে মানছে না।

আবার কোন কোন দেশের সংবিধানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ইসলামী শরীয়তই একমাত্র সকল কিছুর উৎস বা মূল ভিত্তি। আবার কেউ অজুহাত পেশ করে যে, পশ্চিমা পরাশক্তির চাপের কারণে ইসলামী বিধি-বিধান চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। আর কেউ কেউ বলে, ইসলামী শরীয়ত একসাথে চালু করা সম্ভব নয়, এর জন্য ধাপে ধাপে বা ক্রমান্বয়ে এগুতে হবে!

তাদের কেউ কেউ বলে- আমরা আমেরিকাকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করিনি কিন্তু তাদের সাথে সম্পর্ক রেখে চলি। কেননা আমরা দুর্বল তাদের মোকাবিলা করতে অক্ষম। আমরা মহান আল্লাহর এই বাণীর উপর আমল করছিঃ

إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقةً - (آل عمران : ۲۸) "তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোন ভয়ের আশংকা থাকে।" (সূরা আলে-ইমরান : ২৮) (অর্থাৎ আশংকার কারণেই বন্ধুত্ব রক্ষা করা হচ্ছে)। আবার কেউ বলে..... কেউ...... বিভিন্ন অজুহাত পেশ করছে নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে যার কোনটিই অকাট্য নয়, তবে এর দ্বারা তাদের সুস্পষ্ট কুফরীর অভিযোগ তিরোহিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. এ বিষয়টি নিয়ে আমরা লেখা "আসসাহওয়া আল-ইসলামিয়া মিনাল মুরাহাকা ইলাররুশদ" গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি এবং আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো 'ফিকহুল জিহাদ' নামক গ্রন্থে যা এখন গ্রন্থাবদ্ধ করা হচ্ছে।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ফতওয়া

📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ফতওয়া


চরমপন্থী দলগুলো তাদের যুক্তির পক্ষে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ফতওয়াকে পেশ করে যেভাবে তিনি কিতাল (সশস্ত্র লড়াই করতে) অভিমত দিয়েছেন প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যারা ইসলামের সুস্পষ্ট বিধি-বিধান পালনে অস্বীকার করবে যে সব বিধি-বিধান অকাট্যভাবে প্রমাণিত। যেমন নামায, যাকাত কিংবা আল্লাহর বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা না করা, রক্তপাত, ধনসম্পদ, ইজ্জত-আব্রু কিংবা সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দান ইত্যাদিতে। জিহাদী দলগুলো এক্ষেত্রে বিশেষভাবে নির্ভর করেছে আল-ফারিদ্বা আল-গায়েবা [الفريضة الغائبة] (অনুপস্থিত বা হারানো ফরজ) নামক গ্রন্থের উপর। তারা তাদের দলগঠনে এই ফতওয়াকে মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং এর আলোকেই তারা তাদের সব কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করছে।

তারা এখানে হযরত আবু বকর (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এটা যদি যাকাত অস্বীকারকারীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তাহলে যারা শরীয়তের বিধান কায়েম করে না তাদের ব্যাপারে কি করতে হবে? ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা সমস্ত জনগণের প্রাণের দাবী অথচ তারা এদের প্রতিই সবচেয়ে খড়গহস্ত, এদের প্রতিই সবচেয়ে বেশী জুলুম চালাচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী শত্রুতা পোষণ করছে। এরা ভুলেই গেছে যে, এসব অস্বীকারকারী যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়েছে তারা ছিল ওলীউল আমর বা নেতৃস্থানীয় লোক, যেমনটি লড়েছেন হযরত আবু বকর (রা.), তারা সাধারণ মানুষ নয়, নচেৎ এক ভয়াবহ বিশৃংখল অবস্থা সৃষ্টি হত।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 জাতির উপর জোর করে চেপে বসা সরকার সমূহ

📄 জাতির উপর জোর করে চেপে বসা সরকার সমূহ


চরমপন্থী দলগুলো আরেকটি বিষয়কে জোর দিয়ে বলে তা হল- এসব সরকারগুলোর বৈধতা নেই। কেননা এদেরকে শরীয়ত পন্থায় জনসাধারণ চয়ন বা নির্বাচন করেনি কিংবা আহলুল হল্লে ওয়ালআকদ বা ইসলামী জ্ঞানী-গুণী গবেষকগণ তাদের চয়ন করেনি এবং সাধারণ মানুষ তাদের বাইয়াত করেনি। এরা জনগণের সমর্থন বা সন্তুষ্টি লাভ করেনি যা শরিয়তের মূল বিবেচ্য। বরং তারা ক্ষমতায় গেছে বন্দুক, তরবারি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। যা বন্দুকের বা তরবারির সাহায্যে এসেছে তাকে বন্দুক-তরবারি দিয়েই প্রতিরোধ করতে হবে। তাকে কলম যুদ্ধে পরাজিত করা যাবে না!

এরা ভুলে গেছে আমাদের ফকিহগণ অনেক পূর্বেই যা বলে গেছেনঃ জোরজবরদস্তি ক্ষমতায় পৌঁছার পন্থাসমূহের মধ্যে একটি পন্থায় যদি অবস্থা স্থিতিশীল হয়ে যায় এবং জনগণ তাকে মেনে নেয়। এটিই করেছেন আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান ইবনে জুবাইর (রা.)-এর উপর বিজয় লাভের পর, জনগণ এটিকে মেনে নিয়েছে, এদের মধ্যে ছিলেন কতিপয় সাহাবী যেমন ইবনে উমর ও আনাস (রা.), রক্তপাত এড়ানো এবং ফিতনা দূর করার জন্য। প্রবাদ বাক্যে বলা হয়েছে- জালেম শাসক অব্যাহত ফিতনা থেকে উত্তম। এই হল ইসলামী বিধানের (ফিকহর) বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি এবং গুরুত্ব দেয়া, রক্তপাত এড়ানোর এবং ফিতনার পথ বন্ধ করা, যে ফিতনার পথ একবার খুলে দিলে সহসা তা বন্ধ হয় না। এর দ্বারা দুটি অকল্যাণের মধ্যে অল্প অকল্যাণ গ্রহণ করা এবং কম ক্ষতিকারককে গ্রহণ করা অধিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্যে, ফিকহুল মুয়াজানা বা তুলনামূলক বিধি-বিধানের প্রতি আমল করা।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তার বিভ্রান্তি

📄 চরমপন্থী দলগুলোর চিন্তার বিভ্রান্তি


জিহাদ ও অমুসলিমদের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা ও বুঝ-সমঝে বিরাট ত্রুটি রয়েছে, তাদের ধারণা সকল কাফেরের সাথে লড়াই করা ওয়াজিব যদিও তারা শান্তিকামী হয়ে থাকে। আমরা এ বিষয়টি আমাদের লিখা ফিকহুল জিহাদ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ১

নিরাপত্তা প্রাপ্ত (আহলুজজিম্মা) খৃষ্টান, কিবতী ও অন্যান্যদের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি, তাদের অধিকার ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে।

অন্যায়ের প্রতিকার ও প্রতিরোধ শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, সে সম্পর্কে শর্তাবলী বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে।

সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার ব্যাপারটি বুঝার ক্ষেত্রে এবং এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসের যে সব নির্দেশাবলী ও দিকনির্দেশনা রয়েছে তা বুঝার ক্ষেত্রে তাদের বিরাট ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে। যে কেউ চাইবে আর অস্ত্র হাতে তুলে নিবে এরকম কোন পথ ইসলামে খুলে রাখা হয়নি।

আমরা শরীয়তের আলোকে এসব আলোচনা করব।

চিন্তার বিভ্রান্তিই চরমপন্থীদের প্রধান সমস্যা

এটি সুস্পষ্ট যে, এদের অধিকাংশের মুসিবত হল- তাদের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সংকট, তাদের অন্তঃকরণে নয়। এদের অধিকাংশই একনিষ্ঠ-মুখলেস, তাদের নিয়ত ভাল, তারা তাদের রবের ইবাদতকারী। এদের অবস্থা তাদের পূর্বসূরী খাওয়ারিজদের মত যারা সমস্ত মুসলমানকে কাফের বলে গণ্য করে, তারা আমিরুল মুমিনীন আলী (রা.)-কে কাফের সাব্যস্ত করে তার রক্তকে বৈধ করে নেয় এবং এর সাথে সাথে مسلمانوں রক্তকেও বৈধ বলে ঘোষণা করে। সহীহ হাদীসে দশ দিক দিয়ে তাদের নিন্দার কথা বর্ণিত হয়েছে যেমনটি ইমাম আহমাদ বলেছেন। বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বলা হয়েছেঃ

يَحْقِرُ أَحَدُكُمْ صَلَاتَهُ إِلَى صَلَاتِهِمْ وَقِيَامَهُ إِلَى قِيَامِهِمْ وَقِرَاءَتَهُ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ يَمْرُقُوْنَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ -

"তোমাদের কেউ তাদের নামায দেখে, রাতের তাহাজ্জুদ দেখে, কুরআন তেলাওয়াত দেখে, নিজেদের নামায, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তেলাওয়াতকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে কিন্তু তাদের পাঠ গলদেশের নিচে নামবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর তার ধনুক থেকে বের হয়ে যায়।" ১

তারা (নফল) রোযাদার, তাহাজ্জুদগুজার, কুরআন পাঠকারী, বেশী বেশী ইবাদতকারী, কিন্তু তাদের কুরআন পাঠ কণ্ঠনালীর নিচে নামে না। অর্থাৎ তাদের অন্তরে প্রবেশ করে না, তাদের আকলে (জ্ঞান-বুদ্ধিতে) ধরে না, এর মর্মার্থ বুঝে না, এর উদ্দেশ্য-লক্ষ্য হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয় না। তারা শুধু এর শাব্দিক ও প্রকাশ্য অর্থই বুঝে থাকে।

তাদের এই বক্র বুঝ ও সমঝ অন্যান্য مسلمانوں ধনসম্পদ লুন্ঠন করা এবং রক্ত প্রবাহিত করাকে বৈধ করে দিয়েছে, এমনকি তারা ইসলামের বীরমুজাহিদ হযরত আলী (রা.)-এর রক্তকেও বৈধ করে নেয়। তাদের এক কবি আলীর হত্যাকারীর প্রশংসা করে বলেঃ

বাহ কি চমৎকার! মুত্তাকী হতে সেই আঘাত, যার উদ্দেশ্য হল মহান আরশের মালিকের সন্তুষ্টি অর্জন। আমি তাকে একদিন স্মরণ করলাম, বুঝলাম হাশরের মিজানে তার জন্য রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব।

ভাল নিয়ত মন্দ কাজকে উত্তম বানায়না

নবী করীম (সা.) সতর্ক করে দিয়েছেন সবধরনের নিয়ন্ত্রণহীন, উদ্দেশ্যহীন কাজকর্ম করা থেকে এবং আবেগপ্রবণ হয়ে অঘটন ঘটানোর ব্যাপারে যা কখনো কখনো ভাল মানুষও সৎ নিয়তে ও মহৎ উদ্দেশ্যে করে থাকে, এর পরিণাম-পরিণতি কি হবে সেদিকে খেয়াল না করেই। এটি তাদের সংকীর্ণ দৃীষ্টভঙ্গির কারণেই হয়ে থাকে। যদি সমাজ এ ব্যাপারে সচেতন না হয়, তাদেরকে এসব থেকে নিবৃত্ত না করে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডে বাধা না দেয় তাহলে তারা পুরো সমাজকেই এর দ্বারা কলুষিত করে ফেলবে, তাদের নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ড তাদের সৎ-নিয়ত থাকা সত্ত্বেও পুরো সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে।

এজন্যই রাসূল (সা.) সমাজের বুদ্ধিমান-বিবেকবান ও আলেম- উলামাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন যেন তাদের বাধা দেয় যেন তারা এসব চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে না পারে। এটা করতে হবে গোটা সমাজকে বাঁচানোর স্বার্থে, তাদের জীবন-মালের হেফাজতের স্বার্থেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এ জন্য এক সুন্দর প্রাণবন্ত উদাহরণ পেশ করেছেন তাহল- দুই বা ততোধিক তল বিশিষ্ট জাহাজের আরোহীদের সাথে যার কিছু রয়েছে নিচ তলায় আর কিছু রয়েছে উপরের তলায়। যদি নিচতলার যাত্রীরা তাদের অংশে ফুটা করে সরাসরি সমুদ্র বা নদী থেকে পানি পাওয়ার জন্য এই দাবী করে যে, তারা তাদের অংশে যা কিছু করার ব্যাপারে স্বাধীন, তারা উপরে যারা আছে তাদেরকে বার বার গিয়ে বিরক্ত করতে চায় না।

আসুন আমরা নবীর হাদীসটি সরাসরি পাঠ করি-

عن النعمان بن بشير رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال مثل القائم على حدود الله والواقع فيها كمثل قوم استهموا على سفينة فأصاب بعضهم أعلاها وبعضهم أسفلها فكان الذين في أسفلها إذا استقوا من الماء مروا على من فوقهم فقالوا لو أنا خرقنا في نصيبنا خرقا ولم نؤذ من فوقنا فإن تركوهم وما أرادوا هلكوا جميعا وإن أخذوا على أيديهم نجوا ونجوا جميعا.

"নুমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) বলেনঃ "আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী ও তা লঙ্ঘনকারীর উপমা হল- কয়েকজন লোক লটারীর মাধ্যমে একটি নৌযান ভাগ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পায় উপর তলায় এবং কেউ নীচের তলায়। তাদের মধ্যে যারা নীচের তলায় ছিল, তারা যখন পানি পিপাসা অনুভব করত, তখন যারা তাদের উপর ছিল, তাদের নিকট যেত, (এতে উপরের লোকদের কষ্ট হত)। এমতাবস্থায় নীচের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, যদি আমরা নিজেদের অংশে ছিদ্র করে পানি নিতাম আর উপরের লোকদেরও কোন কষ্ট না দিতাম, তবে ভাল হত। নবী করীম (সা.) বলেন, এখন যদি উপরের লোকেরা নীচের লোকদের মর্জির উপরে ছেড়ে দেয়, তবে সকলেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তাদেরকে বাধা দেয়, তবে তারা নিজেরাও বাঁচবে অন্য সকলেও বেঁচে যাবে।" ১

এই হাদীসে মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত সংহতি ও দায়-দায়িত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তারা যেন তাদের কোন সন্তানকে তাদের অজ্ঞতার মধ্যে না ছেড়ে দেয় এবং তাদের মন্দ আচরণ করার সুযোগ না দেয় যদিও তারা নিষ্ঠাবান (মুখলেস) হয়ে থাকে। কারণ, শুধুমাত্র নিষ্ঠা বা এখলাসই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই এখলাসের সাথে সাথে কাজটিও সঠিক হতে হবে।

চরমপন্থী দলগুলোকে ইসলাহ করার পন্থা আলেম-উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদেরকে অবশ্যই চরমপন্থী দল বা গ্রুপগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। তাদের ইসলাহ করতে হবে উত্তম পন্থায় যেমনটি মহান আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হবে, না হলে কমপক্ষে তাদের নেতাদের সাথে যুক্তি-তর্ক ও দলিল-প্রমাণ দিয়ে আলাপ-আলোচনা, পর্যালোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রাখেতে হবেঃ

এক. তারা যে বর্তমানে চরমপন্থা প্রয়োগ করছে এবং জনগণ যা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে, এটির কোন শরয়ী ভিত্তিই নেই- না এর দলিল-প্রমাণের দিক থেকে আর না এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের (مقاصده الكلية) দিক থেকে।

দুই. এই চরমপন্থার কার্যকারিতা কতটুকু, যদি আমরা এটিকে বৈধ মনে করি- এটি কি খারাপ অবস্থাকে পরিবর্তন করে দিবে? বা ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে? অথবা মুসলিম উম্মাহর কোন বিরাট উদ্দেশ্য সাধন করে দিবে?

জিহাদী দলগুলো যেমন জামাআতুত-তাকফীর, জামাআ ইসলামিয়া, সালাফিয়াতুল জিহাদ এবং সর্বশেষে আল-কায়েদা ঘোষণা করেছে যে বর্তমান সরকারগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। তারা এজন্য সশস্ত্র সংঘর্ষের পথ গ্রহণ করেছে। তারা বক্তৃতা-বিবৃতি অথবা শান্তিপূর্ণ পন্থায় পরিবর্তন না করে যেমন বিভিন্ন সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, মসজিদ-মাদরাসায় আলোচনা, সভা-সমাবেশ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ ইত্যাদি না করে ইসলাম বিরোধী সরকারকে প্রতিরোধ করার এবং জনগণের স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করার আহ্বান জানায়।

আর যেহেতু এসব দল বা গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত সরকারের মত সামরিক শক্তির অধিকারী নয় যা দ্বারা শক্তির মুকাবিলা করে এজন্য তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়।

এরমধ্যে হলঃ গুপ্তহত্যা এবং সরকারী স্থাপনায় নাশকতামূলক আক্রমণ।

এই দুটি পন্থায় সাধারণতঃ নিরপরাধ বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হয় যাদের এব্যাপারে কোন ভূমিকাই নেই। এরমধ্যে রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয় সেই বেঁচে যায় অথচ যাদের হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না এমন অনেক বেসামরিক লোকজন নিহত হয়।

ইসলামে একথা সুবিদিত যে, মুসলমান ও কাফেরদের মাঝে যুদ্ধের সময় যুদ্ধের সাথে যারা জড়িত থাকবে না তাদেরকে হত্যা করা জায়েয নয়। তাহলে কিভাবে مسلمانوںকে হত্যা করা যাবে? হাদীস শরীফে এসেছেঃ

لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ قَتْلِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ بِغَيْرِ حَقٍّ .

"আল্লাহর নিকট এই দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া অনেক সহজ একজন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়ে।” ১

একথাও সুবিদিত যে, ইসলাম রক্তপাতের ব্যাপারে প্রচণ্ড কড়াকড়ি আরোপ করেছে এমনকি কুরআন অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের সাথে একথা সাব্যস্ত করেছে যে,

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا - (المائدة : (٣٢)

“যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল।” (সূরা মায়েদা: ৩২)

ইসলামের নবী বলেনঃ "একজন মুমিন তার দীনের সহজতার মধ্যে ততক্ষণ থাকল, যতক্ষণ না সে অবৈধভাবে কোন রক্তপাত ঘটাবে।” (বুখারী ইবনে উমর (রা.) থেকে)

আর সরকারী স্থাপনা ধ্বংস করা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সম্পদই ধ্বংস করা।

তাদের আরেকটি পন্থা হলঃ পর্যটকদের হত্যা করা। যারা হল ফিকহের ভাষায় 'নিরাপত্তাপ্রাপ্ত' রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে তাদেরকে ভিসা প্রদানের মাধ্যমে। সুতরাং সবার প্রতি ওয়াজিব হল এই যে- তাদের নিরাপত্তার মর্যাদা দেয়া, তাদের প্রতি অন্যায় করা যাবে না, তাদের জিম্মাদারীর ব্যবস্থা করতে হবে যদিও তাকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে কোন মুসলমান দাস। হাদীস শরীফে এসেছে- "মুসলমানদের জিম্মাদারী প্রদান হতে পারে তাদের অধস্তন লোক থেকেও।” ১

নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেনঃ "মুসলমানদের জিম্মাদারী একই। সুতরাং যদি কেউ কোন মুসলমানদের অসম্মান-অমর্যাদা করে তাহলে তার উপর আল্লাহ, ফেরেস্তা এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত।”২

রাসূল (সা.) উম্মে হানীকে বলেন, যিনি তাঁর এক অমুসলিম নিকটাত্মীয়কে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন- হে উম্মে হানী! আপনি যাকে আশ্রয় দিয়েছেন আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।" ১

এ বিষয়টির উপর আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি 'ফিকহুল জিহাদ' নামক গ্রন্থে।

টিকাঃ
১. বইটি যন্ত্রস্থ অবস্থায় রয়েছে। মহান প্রভুর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন বইটি অতি দ্রুত পাঠকদের হাতে তুলে দেয়ার তাওফীক দেন।
১. বুখারী হাদীস নং ৩৬১০, মুসলিম হাদীস নং ১০৬৪, আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত।
১. বুখারী হাদীস নং ২৪৯৩
১. নাসাঈ, তাহরীমুদদিমা অধ্যায়, ৮৭/৮২, ৮৩ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত; তিরমিযী, দিয়াত অধ্যায়, হাদীস নং ১৩৯৫; ইবনে মাজা হাদীস নং ২৬১৯, বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত। ইমাম বুসায়রী তাঁর যাওআয়েদ গ্রন্থে বলেন এর সনদ সহীহ এবং বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর তালখীস গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন এবং ইমাম আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১. আবু দাউদ, ইবনে মাজা ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আলবানী জামেউস সাগীরে এটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন (৬৭১২)।
২. আলী (রা.) থেকে বুখারী হাদীস নং ১৭৭১; মুসলিম হাদীস নং ১৩৭১
১. বুখারী হাদীস নং ৩৫০, মুসলিম হাদীস নং ৩৩৬/৭০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00