📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা আজকের দিনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জিহাদ

📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা আজকের দিনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জিহাদ


আজকে ফিলিস্তীনের বিভিন্ন গেরিলা গ্রুপ যে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা পরিচালনা করছে দখলদার ইহুদী যায়নবাদীদের বিরুদ্ধে তা কোন অবস্থাতেই নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী আক্রমণের মধ্যে পড়ে না, যদিও এর দ্বারা কিছু কিছু বেসামরিক মানুষের জীবনহানী ঘটে থাকে। এর কারণ হলঃ

প্রথমতঃ ইসরাইলী সমাজ যা গঠিত হয়েছে দখলদার সাম্রাজ্যবাদী, বর্ণবাদী, সামরিক ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে যারা মূলত সামরিক জনগোষ্ঠী বেসামরিক ছদ্দাবরণে। অর্থাৎ ইসরাঈলের প্রতিটি জনগণই শিশু বয়স পার হলেই ইসরাইলী সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক সদস্য হয়ে যায়, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এজন্যই ইসরাইলের প্রতিটি নাগরিকই হয়ত বাস্তবেই সরাসরি সৈনিক বা সৈনিক শক্তি হিসেবে, আমরা একে অতিরিক্ত সৈনিক হিসেবে গণ্য করতে পারি। যাকে যেকোন মুহূর্তে ডাকা যাবে যুদ্ধের জন্য। আর এটিই বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যার জন্য কোন প্রমাণ-পঞ্জির প্রয়োজন পড়ে না। এদের যাদেরকে বলা হয়ে থাকে বেসামরিক তারা বাস্তবেই সামরিক বিভাগেরই লোক সে পুরুষ হোক বা নারী বিশেষ করে নতুন জনবসতির লোকজন যা মূলত সামরিক ঘাটির নামান্তর।

দ্বিতীয়তঃ ইসরাঈলী সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দ্বারা তাকে অন্যান্য মানব সমাজ থেকে পৃথক করে তারা হল আক্রমণকারী - ফিলিস্তিনীদের ক্ষেত্রে- গোষ্ঠী বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ করে আমেরিকা, ইউরোপ ও রাশিয়া ও প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। তারা এসে সেখানকার অধিবাসীদেরকে উৎখাত করে বসতি গড়ে তুলছে, তাদেরকে জিম্মী করে ঘরবাড়ী ধ্বংস করে দখল করে নিচ্ছে। অধিবাসীদের এই অধিকার রয়েছে তারা যেভাবেই পারবে এই দখলদার বাহিনীকে বিতাড়ন করে নিজেদের ভূমি উদ্ধার করবে। তারা ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জিহাদে লিপ্ত হবে, জিহাদে নামতে বাধ্য যে জিহাদকে ফিকহ-এর ভাষায় বলা হয় জিহাদে ইদতেরার, প্রতিরোধ জিহাদ, আক্রমণ জিহাদ নয়। এতে নারী, পুরুষ, শিশু কে মারা গেল তা ধর্তব্যের বিষয় নয়। কারণ, এরা মারা পড়ছে অনিচ্ছাকৃতভাবে, যুদ্ধেরই প্রয়োজনে।

সময়ের পরিবর্তনেও যায়নবাদী ইহুদীদের সাম্রাজ্যদাবী দখলদারী গুণের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সময় বয়ে গেলেও বাস্তবতা অভিন্ন রয়েছে, তারা নির্বিচারে হত্যা, অপহরণ, গুম, দখলদারী, ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠন বন্ধ করেনি। এদের বেসামরিক পোষাক এদের জঘন্য চিত্রকে লুকাতে পারেনি। যাদেরকে মহান আল্লাহ অত্যাচারী, সীমালংঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। "সাবধান! জালেম-অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।" (হুদ: ১৮)

তৃতীয়তঃ যে ইসলামী শরিয়তের আমরা অনুসারী- যা আমাদের সর্বক্ষেত্রে পালনীয়, সেই শরীয়তে অমুসলিমদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে দুই ভাগেঃ শান্তিকামী এবং যুদ্ধবাজ। যারা শান্তিকামী তাদের ব্যাপারে আমাদের কর্তব্য আমরা তাদের সাথে সহাবস্থান করব, তাদের সাথে উত্তম আচরণ করব। আর যারা যুদ্ধবাজ বা যুদ্ধরত তাদের ব্যাপারে কর্তব্য তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তাদের শত্রুতার জবাব শত্রুতা দিয়েই দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ - وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ : وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيْهِ ، فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ ، كَذلِكَ جَزَاءُ الْكَفِرِينَ - فَانِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - وَقتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ ويَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ، فَإِنِ انْتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ - (البقرة : ١٩٠-١٩٣)

"আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে তাদেরকে হত্যা কর। এটাই কাফেরদের প্রতিদান। তবে যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে জালিমরা ছাড়া (কারো উপর) কোন কঠোরতা নেই।" (সূরা বাকারা: ১৯০-১৯৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

لا يَنْهكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ، إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا يَنْهِكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ وَظَهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ، وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ - (الممتحنة : ٨-٩)

"দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ও তোমাদেরকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো জালিম।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)

সুতরাং প্রথম প্রকার হল শান্তিকামী, তাদের সাথে মুসলমানদেরকে অবশ্যই ভাল এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার করতে হবে।

দ্বিতীয় প্রকারের হল প্রথম প্রকারের উল্টোটি যে যুদ্ধবাজ বা যুদ্ধে লিপ্ত যাদেরকে ফকিহরা বলেন, হারবী বা যুদ্ধরত বা যাদের সাথে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। এদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তে বিশেষ বিধি-বিধান রয়েছে।

শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন হারবী বা যুদ্ধবাজের সম্পদ নিরাপদ নয়। তার শত্রুতার কারণে মুসলমানদের উপর থেকে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা তিরোহিত হয়ে গেছে।

চতুর্থতঃ এ বিষয়টিকে আরো বলিষ্ঠ করেছে এ জন্য যে, সমস্ত ফকিহগণ একমত হয়েছেন বা অধিকাংশ ফকিহ একমত যে যদি তারা মুসলমানদেরকে মানব ঢাল হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে হত্যা করা জায়েয হবে। শত্রু যদি মুসলমানদেরকে মানবঢাল হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে সামনে রাখে তাহলে ফকিহরা জায়েয বলে ফতওয়া দিয়েছেন যে, এক্ষেত্রে নিরপরাধ মুসলমানদেরকে হত্যা করা যাবে যদি তাদেরকে হত্যা করা ছাড়া কোন গত্যন্তর না থাকে বা কোন বিকল্প না থাকে। যদি তাদের সমেত হত্যা না করে এগিয়ে না যায় তাহলে আক্রমণকারী শত্রু এসে তাদেরকেই হত্যা করবে, তাদের ঘর-বাড়ি, ফসল-পানি জ্বালিয়ে দিবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কতিপয় লোককে কোরবানী দিতেই হবে, সকলকে হেফাজত ও নিরাপদ রাখার স্বার্থেই। আর এটি হল ভাল এবং মন্দের মাঝে অল্প মন্দের দ্বারা অধিক ভাল অর্জন করা।

যখন নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করা জায়েয বৃহত্তর স্বার্থে তখন অমুসলিমদেরকে হত্যা করা জায়েয হবে মুসলমানদের দখলকৃত ভূমি উদ্ধারের জন্য যা জবরদখল করেছে শত্রুরা।

পঞ্চমতঃ বর্তমান কালের যুদ্ধে সমাজের প্রত্যেকেই এর যোদ্ধা, সকলেই এই যুদ্ধের সৈনিক যেন সকলেই এই যুদ্ধে জড়িত এবং এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করছে এবং সকলেই এতে রসদ সরবরাহ করছে অর্থ দিয়ে মানব সম্পদ দিয়ে, যেন যুদ্ধরত রাষ্ট্রটি বিজয় লাভ করতে পারে। এতে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে যে যেখানে রয়েছে সেখান থেকেই যুদ্ধের রসদ জোগাবে ভিতর থেকে বাইরে থেকে- যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে রয়েছে তারা আর যারা অস্ত্র বহন করছে না তারাও এর যোদ্ধা। এ জন্য বিশেষজ্ঞরা বলেনঃ যায়নবাদী ইহুদীরা (ইসরাইলীরা) বাস্তবে সবাই সৈনিক।

ষষ্ঠতঃ বিধি-বিধান দুই প্রকারের- ভাল এবং প্রশস্ততার সময়ে বিধি-বিধান এবং সংকট ও বিপদকালীন বিধি-বিধান। একজন মুসলমানের জন্য বিপদকালীন সময়ে যা জায়েয তা অন্য সময় জায়েয নয়। এ জন্য মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে চার জায়গাতে হারাম করেছেন- মৃত, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়ে থাকে। অতঃপর বলেনঃ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلاَ إِثْمَ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - (البقرة : ۱۷۳)

"সুতরাং যে বাধ্য হবে, অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা বাকারা: ১৭৩)

এখান থেকেই ইসলামী আইনজ্ঞরা (ফকিহগণ) বিশেষ সূত্র (কায়েদা) গ্রহণ করেছেন: (الضرورات تبيح المحظورات) "অতীব প্রয়োজন [জরুরাত] হারামকে বৈধ করে দেয়।" আমাদের ফিলিস্তিনী ভাইয়েরা নিঃসন্দেহে জরুরী অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বরং এটিই খুবই সংকটাপন্ন জরুরাত এই শাহাদাত উজ্জীবিতী আক্রমণ চালানোর জন্য যেন শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা যায় যে শত্রু অন্যায়ভাবে দেশকে দখল করে রয়েছে, জনগণের মাঝে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাদেরকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না, তাদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। যদি এই শহীদী হামলা না চালানো হত তাহলে এতদিনে তাদেরকে ইসরাইল যা চায় তাই দিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না।

যদি তাদেরকে ইসরাইলের হাতে যে ট্যাঙ্ক, সাজোয়া বহর, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, নৌ যুদ্ধ জাহাজ এবং অন্যান্য অস্ত্র-শস্ত্র রয়েছে এর একশভাগের একভাগও ফিলিস্তিনীদেরকে দেয়া হত তখন অবশ্যই তারা এই শহীদী আত্মঘাতী হামলা পরিত্যাগ করত। তাদের কাছে এমন কোন অস্ত্র নেই যা দ্বারা তারা এই চরম ঔদ্ধত্য মহাপরাক্রমশালী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তাদের এই অতি নগণ্য অস্ত্র হল 'মানব বোমা' যা কোন যুবক বা যুবতী বহন করছে নিজের জীবনের বিনিময়ে যা শত্রুর মাঝে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর একমাত্র এই অস্ত্রই শত্রুর হাতে নেই- যার অস্ত্র ভান্ডারকে আমেরিকা সবধরনের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছে। এটি এক বিশেষ অস্ত্র যার মালিক হল আল্লাহর প্রতি পাক্কা ঈমানদার ব্যক্তিগণ। আর এটি মহান আল্লাহর এক কুদরতী প্রতিরোধ ও ইনসাফপূর্ণ প্রতিরোধ যা প্রকৃত জ্ঞানীজনই উপলব্ধি করতে পারেন। এটি হল অতীব দুর্বল অসহায়ের অস্ত্র চরম পরাক্রমশালী ঔদ্ধত্যপূর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে। "আর তোমার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।" (সূরা মুদ্দাসসির: ৩১)

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা কোনক্রমেই আত্মহনন নয়

📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা কোনক্রমেই আত্মহনন নয়


বিপক্ষ অভিমতপোষণকারীদের সংশয়ের জবাব যারা শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা তিনটি কারণে সংশয়-সন্দেহ পেশ করেনঃ

১. এটি আত্মহত্যার মধ্যে পড়ে এবং নিজেকে ধ্বংস করার মধ্যে শামিল হবে। আর ইসলামে আত্মহনন করা কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ।

২. এর দ্বারা অনেক ক্ষেত্রেই এমন সব বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হন যারা কখনও যুদ্ধে অংশগ্রহণই করে না যেমন নারী, শিশু ইত্যাদি। এদেরকে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ এমনকি শত্রুর সাথে সম্মুখ সমরের সময়ও, এমনকি সেসব বেসামরিক লোককেও হত্যা করা বৈধ নয় যারা অস্ত্র বহন করে না।

৩. এর দ্বারা ফিলিস্তিনীরাই বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শত্রুর পক্ষ থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করার কারণে। আত্মঘাতী হামলার পর ইসরাইল চরম বর্বরোচিত পাল্টা আক্রমণ চালায় ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে, ইজ্জত-আব্রু বিনষ্ট করে। যদিও শরীয়তে এ বিষয়টি বৈধ করা হয়েছে কিন্তু এর ফলাফল পর্যালোচনা করে এটি নিষিদ্ধ হওয়াই উচিত।

ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা কোনক্রমেই আত্মহনন নয়

যারা শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার বিরোধিতা করেন এই বলে যে, এটি এক প্রকারের আত্মহনন বা নিজের জীবন হত্যা করা তারা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। কেননা আত্মহনন ও শাহাদাতের উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। অপর দিকে- যে ব্যক্তি শহীদী আত্মঘাতী এবং আত্মহননের বিষয়টি বিশ্লেষণ করবে সে অবশ্যই এ দুটির মাঝে বিস্তর ফারাক পাবে।

একজন আত্মহননকারী নিজের আত্মাকে নিজের জন্যই খুন করছে। কোন বঞ্চনার কারণে বা কোন আবেগ তাড়িত হয়ে কিংবা পরিস্থিতিকে সামাল দিতে না পেরে বা অন্য কোন কারণে, এর ফলে সে জীবনকে বিলীন করে দিচ্ছে মুত্যুর মাধ্যমে।

আর শহীদী-হামলাকারী নিজের প্রতি দেখে না। সে দেখে এক বিরাট বিষয়ের দিকে যার জন্য সে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগে এগিয়ে আসে, সে নিজের আত্মাকে আল্লাহর নিকট বিক্রি করে দেয় জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ -(التوبة : ١١١)

"নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সূরা তাওবা : ১১১)

আত্মহননকারী মারা যাচ্ছে (জীবন থেকে কাপুরুষের মত) পলায়নপর হয়ে, পক্ষান্তরে শহীদী হামলাকারী মারা যাচ্ছে (বীরের মত) আক্রমণকারী হিসেবে।

আত্মহননকারীর জীবন থেকে পালানো ছাড়া কোন উদ্দেশ্যই নেই পক্ষান্তরে শহীদী হামলাকারীর উদ্দেশ্য অতি স্পষ্ট তা হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ ، وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ - (البقرة : ۲۰۷)

"আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। আর আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল।” (সূরা বাকারা : ২০৭)

বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হওয়া

বেসামরিক নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কর্মচারী, শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে যারা অস্ত্র বহন করে না বলে যে সংশয়-সন্দেহ পেশ করা হয়ে থাকে সে ব্যাপারে ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে ইসরাইলী সমাজ পুরোটাই সামরিক সমাজ এরা আক্রমণকারী... এদের মধ্যে কেউ বেসামরিক লোকই নেই, সে লেখাগুলো দয়া করে আবার পাঠ করুন।

আর শিশু- আত্মঘাতী কর্তৃক শিশুদের হত্যা করার কোন পরিকল্পনাই নেই কিন্তু তা আনুষঙ্গিকভাবে ঘটে যায় এবং সেটি জরুরাতের মধ্যে গণ্য। আর একথা সবার জানা রয়েছে যে, জরুরাতের কারণে নিষিদ্ধ কাজও বৈধতা লাভ করে থাকে এবং ওয়াজিবাতও রহিত হয়ে যায়।

ফিলিস্তিনীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

আর ফিলিস্তিনীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারে সংশয় রয়েছে যে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার পর তাদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, জ্বালাও পোড়াও নেমে আসে, সে ব্যাপারে কথা হল ইসরাইলের হাত অনেক বড়, তার শক্তি-সামর্থ্য অনেক বেশী। সে একের পরিবর্তে দ্বিগুণ বরং দশগুণ প্রতিশোধ নিয়ে থাকে।

আমরা এখানে কতিপয় জবাব উল্লেখ করবঃ

প্রথমতঃ ইসরাইলই এখন পর্যন্ত সবসময় প্রথমেই আক্রমণ করে এসেছে। প্রতিরোধের কারণে সে এখন নিজের প্রতিরক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। একথা সবার নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট যে, পৃথিবীর বুকে সেই একমাত্র রাষ্ট্র যে অন্যের ভূমি জবরদখল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে। ফিলিস্তিনীরা নিজেদের দখল হয়ে যাওয়া দেশকে মুক্ত করার জন্য আক্রমণকারী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

দ্বিতীয়তঃ শত্রুতা করাই ইসরাইলের প্রকৃতি প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত। বরং সে প্রতিষ্ঠাই পেয়েছে হত্যা, সন্ত্রাস, রক্ত প্রবাহিত করে, সম্পদ লুণ্ঠন করে, অন্যের ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠন করার মাধ্যমে। তার স্বভাব প্রকৃতি মোটেও পাল্টায় নি। যদি ফিলিস্তিনীরা তাদের এই অতি নগণ্য অস্ত্র ব্যবহার না করে চোখ বন্ধ করে থাকে তাহলে ইসরাইল তার হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা অব্যাহতভাবে চালিয়েই যাবে।

তৃতীয়তঃ আমরা যেন ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরাইলের পাল্টাআক্রমণকে খুব বড় করে না দেখি এবং শহীদী আত্মঘাতী হামলার ফলে ইসরাইলের উপর ফলাফল সম্পর্কে বেখবর না হই। এরফলে তাদের মধ্যে যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তাদের ভবিষ্যত স্থিতিশীলতার উপর যে বিরাট প্রভাব পড়েছে অনেকেই দেশত্যাগ করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে এবং অনেকেই বাস্তবে ইসরাইল ছেড়ে পালিয়েছে। এছাড়া এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পর্যটন শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে কি বিরাট প্রভাব পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ কারণে ইসরাইল ও আমেরিকা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যেন যেকোন মূল্যে এই আত্মঘাতী হামলা বন্ধ করা যায়। এরমধ্যে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করা যে কোন মূল্যে যেন এই প্রতিরোধকে উৎখাত করা যায় সন্ত্রাসের দোহাই দিয়ে।

আমরা যদিও ব্যথা ও মনোকষ্টে ভুগছি, সে কিন্তু আমাদের চেয়েও বেশী ভুগছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ إِنْ تَكُونُوا تَأْلَمُونَ فَإِنَّهُمْ يَأْلَمُونَ كَمَا تَأْلَمُونَ وَتَرْجُونَ مِنَ اللهِ مَا لَا يَرْجُونَ - (النساء : ١٠٤)

"যদি তোমরা ব্যথা পেয়ে থাক তাহলে তারাও তো ব্যথা পাচ্ছে, যেভাবে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাচ্ছ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট থেকে আশা করছ যা তারা আশা করছে না।" (সূরা নিসা: ১০৪)

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত কতিপয় চরমপন্থী দল ও গ্রুপ

📄 ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত কতিপয় চরমপন্থী দল ও গ্রুপ


সম্প্রতি বিগত কয়েক দশকে কতিপয় আরব ও মুসলিম দেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেঃ ইসলামী প্রতিরোধ দল গঠন করার ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের নাম দিয়েছে "জিহাদী দল"। তারা জিহাদ বলতে প্রথমতঃ বুঝাতে চায়- সেই সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে যারা মুসলিম উম্মাহকে শাসন করছে আল্লাহর দেয়া বিধানের পরিবর্তে মানব রচিত আইনের দ্বারা অথচ মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন সর্বক্ষেত্রে তাঁর দেয়া বিধান মোতাবেক বিচার-ফয়সালা করতে হবে- তা দীনী বিষয় হোক যেমন ইবাদত বা দুনিয়াবী বিষয়ই হোক যেমন মুয়ামালাত (পারস্পরিক লেন-দেন ইত্যাদি)। মহান আল্লাহ বলেনঃ يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ - (البقرة : ۱۸۳)

"হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা বাকারা: ১৮৩)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ القصاص - (البقرة : (۱۷۸)

"হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর কিসাস ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা বাকারা : ১৭৮)

অতএব রোযার মতই কিসাসের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ উভয়টিই ফরজ।

মহান আল্লাহ সূরা মায়েদায় ইরশাদ করেনঃ يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ - (المائدة : (٦)

"হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাযে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর।” (সূরা মায়েদা: ৬)

মহান আল্লাহ উক্ত সূরাতে আরো ইরশাদ করেনঃ السَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ - (المائدة : ۳۸)

"আর পুরুষ চোর এবং নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আজাব স্বরূপ এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা মায়েদা: ৩৮)

আমরা কেন পাক-পবিত্রতার আয়াতকে মানছি আর চুরির বিধানের আয়াতকে ফ্রিজ করে রাখছি? অথচ দুটি আয়াতই মহান আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে আমাদের নিকট এসেছে!

মিসর, আলজিরিয়া সহ অন্যান্য দেশে জিহাদী সংগঠনগুলো অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে, বরং তাদের দৃষ্টিতে কাফের শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে, এদের সাথে ওয়াজ, নসিহত ও আলাপ-আলোচনার পথ ব্যর্থ হবার পর। তারা এদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ ও চরমপন্থা ছাড়া আর অন্য কোন পথই খুঁজে পায়নি। তারা বলেঃ এসব শাসকদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে যদি কোন লাভ হত তাহলে অবশ্যই আমরা আলাপ-আলোচনা করতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল তরবারির মোকাবিলা কলম দ্বারা করা যায় না এবং অস্ত্রের ভাষার বিরুদ্ধে মুখের ভাষায় কোন কাজ হয় না।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থী গ্রুপসমূহের মোকাবেলা করার পন্থা

📄 চরমপন্থী গ্রুপসমূহের মোকাবেলা করার পন্থা


অনেকেই "চরমপন্থার উত্থানের" বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা পর্যালোচনা এবং গবেষণা করেছেন এবং এর প্রতিকারের বিষয়েও কথা বলেছেন।

এসব গবেষণা দ্বারা একথা পরিস্কার হয়ে গেছে যে, শুধুমাত্র মুসলিম দেশগুলোতেই চরমপন্থার উত্থান ঘটেনি বরং এটির উত্থান বিশ্বব্যাপী। খোদ আমেরিকাতেও বর্তমানে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান। ইউরোপে (বৃটেন, ইতালী, স্পেন) এবং এশিয়াতে (ভারত, জাপান এবং স্বয়ং ইসরাইলে) এর অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোতে।

আমাদের নিকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- আমরা আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে কিভাবে এর মোকাবিলা করব বিশেষ করে বিভিন্ন কারণে এর শিকড় অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে, তন্মধ্যে আমাদের দেশগুলোতে পরাশক্তির চরম জুলুম ও নির্যাতন। এরমধ্যে অন্যতম হল ফিলিস্তীন সমস্যার ব্যাপারে, এমন এক জাতির সমস্যা যাদের ভূমিকে জবরদখল করে নেয়া হয়েছে, যাদেরকে ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের উপর ভিতর-বাহির সবদিক থেকে চাপ প্রয়োগ করে দখলদারকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করা হয়েছে। গাজা এবং পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট এলাকাগুলোও দখল করে নেয়া হচ্ছে। তাদের উপর আকাশ, ভূমি, স্থল সর্বত্র নজরদারী করা হচ্ছে, বোমা মেরে সবকিছু ধ্বংস করা হচ্ছে, তাদের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যন্ত মনিটরিং করা হচ্ছে, তাদেরকে পেটে-ভাতে মারার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা সকাল-বিকাল টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাচ্ছি কিভাবে ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদেরকে কিভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হচ্ছে। বিশ্ববাসী এই দৃশ্য চোখ বুজে দেখে যাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের সামান্যতম টনক নড়ছে না। আরবরা কবরে শায়িতদের মত নিশ্চুপ হয়ে আছে- আর এতকিছুর পরও অত্রাঞ্চলের শাসকরা আমেরিকার সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে- অথচ সবকিছুর পেছনে আমেরিকার অন্ধ সমর্থন অব্যাহত রয়েছে, সামরিক-অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত দিকসহ সব ব্যাপারে ইসরাইলের প্রতি। এছাড়াও আরো জুলুম-অত্যাচার ও নিপীড়ন দেখুন আফগানিস্তান ও ইরাকে।

চরমপন্থার আরেকটি কারণ হল- আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে শাসকরা চরম জুলুম-অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ পরিহার করে তাঁর বিধানের প্রতি কোন রকমের তোয়াক্কা না করে, আদল-ইনসাফের প্রতি কোন রকমের ভ্রুক্ষেপ না করে, জনগণের আশা-আকাংখার প্রতি, তাদের সম্মানজনক রুটি-রুজি ও জীবনোপকরণের দিকে সামান্যতম নজর না দিয়ে স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

এসবই চরমপন্থার কারণ নিঃসন্দেহে কিন্তু এসবই আসল কারণ নয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণও নয় যেমনটি কতিপয় গবেষক মনে করেন।

যারাই এসব ইসলামী দল বা গ্রুপগুলোর উপর গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখবে তারাই দেখতে পাবেন যে, এর পেছনে রয়েছে চিন্তাগত কারণ- এটিই সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তারকারী। এটির প্রভাবেই এসব যুবকরা তাদের পূর্বসূরী খাওয়ারিজদের পথ ধরেছে, যাদের ব্যাপক পরিচিতি ছিল তাহাজ্জুদগুজার, (নফল) রোজাদার এবং কুরআনের কারী হিসেবে। এতদসত্ত্বেও তারা অন্যান্য مسلمانوںকে রক্তকে বৈধ করে নিয়েছিল- তাদের চিন্তা ও বুঝ-সমঝের জগতে ভুল ও বিকৃতির অনুপ্রবেশ করেছিল তাদের অন্তঃকরণ ও নিয়তে নয়।

তাদের চিন্তার জগতে দীন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে ও তাদের জীবন সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মলাভ করে, যা জেল, নির্যাতন বা কঠোর শাস্তি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয় বরং এতে তাদের বক্রচিন্তার ক্ষেত্রে বক্রতা-কট্টরতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

হাঁ, এখানে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয় বরং তাদেরকে চিন্তা-চেতনার দিক দিয়েও প্রতিরোধ করতে হবে। তাদের সাথে বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের আলাপ-আলোচনার পদক্ষেপ নিতে হবে, তাদের ভ্রান্ত চিন্তার পরিবর্তন সাধন করতে হবে। তাদেরকে দলিল-প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতে হবে। তাদের সঙ্গে হক্কানী আলেম-উলামাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে যারা সরকারী আলেম হিসেবে বা সরকারের দালাল হিসেবে চিহ্নিত নয়।

হযরত আলী (রা.) খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে আলোচনার জন্য মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানতাপস বিশিষ্ট কুরআন গবেষক-ভাষ্যকার (حبر الأمة وترجمان القرآن) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে প্রেরণ করেন। তিনি তাদের সাথে আলোচনা করেন, তাদেরকে দলিল-প্রমাণ দিয়ে, যুক্তি-তর্ক দিয়ে বুঝান যার ফলে কয়েক হাজার ফিরে আসে আর কিছু লোক তাদের বাতিল চিন্তাধারার উপর অটল থাকে।

আমাদেরকে এই সব দল ও গ্রুপের সাথে অবশ্যই এ কাজ করতে হবে যারা মিসরে, আলজিরিয়ায়, সৌদি আরবে, মরক্কো ইত্যাদি দেশে ইতোমধ্যে অঘটন ঘটিয়ে দিয়েছে। তাদের সাথে যুক্তি-তর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই সবর করতে হবে, তাদের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এরপর যারা সঠিক পথে ফিরে আসবে তারা আসলো আর যাবা আসবে না তারাও অন্তত সঠিক দলিল-প্রমাণ জেনে গেল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00