📄 জিহাদ ও চরমপন্থার মাঝে
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত জরুরী যে, সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য বিধান করবো ইসলামে যে জিহাদ ফরজ করেছে দীনের প্রতিরোধ কল্পে বা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে কিংবা ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করতে এবং চরমপন্থার মাঝে যাকে আমরা নিন্দা, ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যান করি।
জিহাদ ও চরমপন্থা প্রতিটিতেই উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু জিহাদ তার উদ্দেশ্য-লক্ষ্য এবং মাধ্যমের ব্যাপারে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জিহাদ সর্বদা শরীয়তের বিধি-বিধান এবং ইসলামে বর্ণিত নৈতিক-চরিত্রে অনুসরণ করে থাকেঃ যুদ্ধের পূর্বে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং যুদ্ধের পরে।
কিন্তু চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ি যেমনটি করছে কতিপয় ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত গ্রুপ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়, তা তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য বা মাধ্যমের ক্ষেত্রে কিংবা শরীয়তের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে, সাধারণত এটি করে থাকে আবেগপ্রবণ যুবকরা, যাদের শরীয়তের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং বাস্তব জ্ঞানের ও বাস্তবতা উপলব্ধি করার মত দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে আর তাদের মাঝে আবেগপ্রবণতাই অধিক। তারা জীবনকে ও মানুষকে কাল চোখে দেখে থাকে, এজন্য তাদের মধ্যে খারাপ ধারণা বদ্ধমূল থাকে যারফলে অন্যকে ফাসেক এমনকি সুস্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত বলতে দ্বিধা করে না। আর সুস্পষ্ট কুফরী মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
জিহাদ শক্তি প্রয়োগ করে থাকে তার স্বস্থানে, সময়মত এবং প্রয়োজন মাফিক, সেই শত্রুদের সাথে যারা শত্রুরা করেছে ইসলামের সাথে, ইসলামের অনুসারীদের সাথে। তাদেরকে তাদের দীনের ব্যাপারে ফিতনায় ফেলেছে বা তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে কিংবা দুর্বলদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন করেছে এবং তাদের অধিকার বিনষ্ট করেছে কিংবা তাদের ভূমি জবরদখল করেছে, তাদের ইজ্জত-আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের পবিত্র স্থানসমূহকে পদানত করেছে সুতরাং এক্ষেত্রে জিহাদ করার বৈধতা রয়েছে মহান আল্লাহর এই বাণীর প্রতি আমল করেঃ
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا طَ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ - (البقرة : ١٩٠) "আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা : ১৯০)
📄 ফিলিস্তীনে জিহাদের বৈধতা
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হল ফিলিস্তীনকে মুক্ত করার জিহাদ, ইসরা ও মিরাজের পবিত্র ভূমি, আল-আকসা মসজিদের ভূমি যা মুসলমানদের প্রথম কিবলা এবং তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ। যেই মসজিদকে মসজিদে হারামের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যেখান থেকেই ইসরার শুরু এবং যেখানে এসেই ইসরার পরিসমাপ্তি।
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ - (الاسراء : ١) "পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল-মাসজিদুল হারাম (কাবাঘর) থেকে আল-মাসজিদুল আকসা (বায়তুলমুকাদ্দাস মসজিদ) পর্যন্ত। যার আশে-পাশে আমি বরকত দিয়েছি।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ১)
এই পবিত্র ভূমি আজ জঘন্য ধরনের আগ্রাসনে 'নিপতিত, মারাত্মক সাম্রাজ্যবাদের হাতে বন্দী, সে সাম্রাজ্যবাদ হল ইহুদী যায়নবাদী, আগ্রাসী, বর্ণবাদী, সন্ত্রাসী, গ্রাসকারী, বসতিস্থাপনকারী, পশু উপনিবেশবাদী। ১ এই উপনিবেশবাদে কোন মানুষের সামান্যতম মূল্য নেই, সে কোন মুমিনের প্রতি কোন মান-সম্মান দেখায় না, তার আচরণে কোন দয়ামায়ার বিন্দুমাত্র লেশ নেই।
এই উপনিবেশবাদ এক রক্তাক্ত, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ি পশুত্ব কর্মকান্ড করে এমন এক অঞ্চলকে কুক্ষিগত করেছে যার উপর তার শতবছর পূর্বেও কোন উপস্থিতি ছিল না। শক্তি, ষড়যন্ত্র ও পশ্চিমাদের সাহায্যে- প্রথমে বৃটেন এবং পরবর্তীতে আমেরিকা- এর অধিবাসীদের উপর চড়াও হয়েছে এবং তাদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাড়িয়ে দিয়েছে, তাদেরকে জোর করে উচ্ছেদ করছে।
ইসলামী বিধানে (ফিকহ) এটি সুবিদিত যে, ফিলিস্তীনের জন্য মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধভাবে এবং একাকী বের হতে হবে কাফের শত্রুকে বিতাড়নের জন্য, যারা বাড়িঘর জবরদখল করেছে। একারণেই তাদের সবার উপর ফরজে আইন (প্রত্যেকের উপর অপরিহার্য) হয়ে পড়েছে যার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে জিহাদ করবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির যে হক রয়েছে সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে- স্ত্রী স্বামীর বিনা অনুমতিতে, সন্তান পিতার অনুমতি ব্যতিরেকেই, দাস মুনিবের অনুমতি ছাড়াই জিহাদে অংশ গ্রহণ করতে পারবে। কেননা সমষ্টির (জামায়াতের) বাঁচার অধিকারকে ব্যক্তি অধিকার স্বামী, পিতা মুনিবের উপর প্রাধান্য দিতে হবে।
যদি ফিলিস্তীনের অধিবাসীরা ভূমি উদ্ধারে অক্ষম-অপারগ হয়, তারা হয়তো অলসতা করলে বা কাপুরুষতা প্রদর্শন করলে এর আশে-পাশের লোকজনের উপর ফরজ হয়ে যাবে লড়াই করার, তারাই তখন ওদের হয়ে জিহাদ করে ফিলিস্তীনকে মুক্ত করবে, শত্রুদেরকে বিতাড়িত করবে। যদি এর প্রতিবেশীরাও বসে পড়ে শত্রুর মোকাবিলা না করে-যেমন বর্তমান অবস্থা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর- তাহলে এর পরবর্তীদের উপর অতঃপর তাদের পরে যারা রয়েছে এরপর সমস্ত মুসলমানদের উপর ফরয হবে ফিলিস্তীনকে কাফের-ইহুদীদের দখল মুক্ত করা।
এটিই শরীয়তের বিধানে অপরিহার্য (ফরয) করা হয়েছে, ইসলামী মাজহাবের সকল দলই এই ফতওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য।
ফিলিস্তীনের ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবতা। ফিলিস্তিনীরা তাদের সবকিছু খরচ করেছে, চমকপ্রদ বীরত্ব দেখিয়েছে, আত্মঘাতী শহীদী হামলা চালিয়েছে, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে, শিবিরে, তাঁবুতে চরম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, প্রশংসনীয় আক্রমণ পরিচালনা করেছে যদিও তাদের অস্ত্র, রসদ অপ্রতুল।
যদিও তাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে শত্রুরা ট্যাংক, সাজোয়া যান, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, আবাদী জমিনকে বিরান করে, শস্যক্ষেতকে জ্বালিয়ে দিয়েছে, গাছ-পালা উপড়িয়ে ফেলেছে, তাদেরকে ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, তাদের উপর অবরোধ চাপিয়ে তাদেরকে ক্ষুধা-দারিদ্রতার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে যেন তারা ইহুদী যায়নবাদীদের কাছে মাথা নত করে। এতদসত্ত্বেও এই জাতি দমে যায়নি, তারা শত্রুর সামনে মাথানত করেনি, তারা পিছুটান দেয়নি। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে, ফিলিস্তিনীদের শক্তিসামর্থ্য দ্বারা মহাপরাক্রমশালী ইসরাইলকে রুখা যায়নি, যে ইসরাইল আজ বিশ্বের ভয়ংকর অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের তালিকায় রয়েছে, তার অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে পারমানবিক অস্ত্র। আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যেন তারা পারমানবিক অস্ত্রের অধিকারী না হতে পারে।
এখানে এসেই জিহাদের ফরজিয়াত প্রতিবেশী দেশগুলোর উপর এসে বর্তাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ফিলিস্তীনের আশেপাশের লোকজন সম্পূর্ণভাবে এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এমনকি তারা জিহাদকে পরিত্যাগ করে দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছে। তারা ফিলিস্তিনীদের একা ছেড়ে দিয়েছে। যে ফিলিস্তিনীরা তাদের সীমিত সামর্থ্য-শক্তি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র যাকে স্বয়ং বিশ্বের পরাশক্তি আমেরিকা সাহায্য করছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছে। আরবরা যখন ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তীন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তখন সদ্যপ্রসূত-তিন বছর বয়সী-আরব লীগ ফিলিস্তিনীদের হাতে এ ব্যাপারে কোন দায়িত্বই দেয় নি।
এখানে এসে জিহাদের দায়িত্ব এসে পড়েছে বিশ্বের সকল মুসলমানের উপর। তাদের উপর অবশ্য কর্তব্য হল তারা একাকী ও একতাবদ্ধভাবে তাদের জানমাল নিয়ে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাদের যার যা সামর্থ্য রয়েছে তা নিয়েই।
বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলমানদের উপর ওয়াজিব হয়ে পড়ে যদি ইসলামের কোন পবিত্র ভূমি কাফের দখলদার বাহিনীর কবলে পড়ে তাহলে তাকে উদ্ধার করা। আর সেটা যদি তাদের প্রথম কিবলা, ইসরা ও মেরাজের ভূমি মসজিদুল আকসা হয়?
এখন মুসলিম উম্মার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে মসজিদুল আকসাকে উদ্ধার করা। মুসলিম উম্মার সকল জনশক্তি তাদের সরকারের উপর যথাসম্ভব চাপ প্রয়োগ করবে- সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দানের অংশ হিসেবে- আলেম-উলামা, লেখক-বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক-সাহিত্যিক যার যা সামর্থ্য রয়েছে তা দিয়েই হকের কথা বলবে যেন শেষাবধি সরকারগুলো তাদের ডাকে সাড়া দেয়, কেননা তারা তাদের জাতির দাবী-দাওয়াকে উপেক্ষা করতে পারে না, তাদের থেকে বিচ্ছিন্নও হতে পারবে না। নিদেনপক্ষে সেসব লোকদের জন্য সুযোগ করে দেবে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করে শহীদ হতে আগ্রহী। এই উম্মতের একদল মর্দে-মুজাহিদ হকের উপর অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর ফয়সালা অবশ্যই আসবে। শেষ পর্যন্ত উম্মতের সর্বশেষ এ দলটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
মুসলিম উম্মাহ গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেইসব স্বাধীনচেতা লোকদের যারা উম্মতে মুহাম্মদীকে জিহাদে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসবে, তাদের প্রবল কামনা-বাসনার জিহাদে সকলকে সংগঠিত করবে। যেমনটি ইতোপূর্বে করেছিলেন- ইমাদুদ্দিন জঙ্গী এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী পুত্র শহীদ নুরুদ্দীন মাহমুদ এবং তাঁর অন্যতম শিষ্য সালাহউদ্দীন আইউবী, যার হাতেই আল্লাহ প্রথম বিজয় এনে দেন।
এই জিহাদ নিঃসন্দেহে বৈধ, বরং ফরজ বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণের উপর এবং সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের উপর। তারা গুনাহগার হবে যদি তারা তাদের এই দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে বা গাফলতি করে।
টিকাঃ
১. এই উপনিবেশবাদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য লেখকের 'জেরুজালেম বিশ্বমুসলিম সমস্যা', আল-ফুরকান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত বইটি পাঠ করুন।
📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা আজকের দিনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জিহাদ
আজকে ফিলিস্তীনের বিভিন্ন গেরিলা গ্রুপ যে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা পরিচালনা করছে দখলদার ইহুদী যায়নবাদীদের বিরুদ্ধে তা কোন অবস্থাতেই নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী আক্রমণের মধ্যে পড়ে না, যদিও এর দ্বারা কিছু কিছু বেসামরিক মানুষের জীবনহানী ঘটে থাকে। এর কারণ হলঃ
প্রথমতঃ ইসরাইলী সমাজ যা গঠিত হয়েছে দখলদার সাম্রাজ্যবাদী, বর্ণবাদী, সামরিক ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে যারা মূলত সামরিক জনগোষ্ঠী বেসামরিক ছদ্দাবরণে। অর্থাৎ ইসরাঈলের প্রতিটি জনগণই শিশু বয়স পার হলেই ইসরাইলী সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক সদস্য হয়ে যায়, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এজন্যই ইসরাইলের প্রতিটি নাগরিকই হয়ত বাস্তবেই সরাসরি সৈনিক বা সৈনিক শক্তি হিসেবে, আমরা একে অতিরিক্ত সৈনিক হিসেবে গণ্য করতে পারি। যাকে যেকোন মুহূর্তে ডাকা যাবে যুদ্ধের জন্য। আর এটিই বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যার জন্য কোন প্রমাণ-পঞ্জির প্রয়োজন পড়ে না। এদের যাদেরকে বলা হয়ে থাকে বেসামরিক তারা বাস্তবেই সামরিক বিভাগেরই লোক সে পুরুষ হোক বা নারী বিশেষ করে নতুন জনবসতির লোকজন যা মূলত সামরিক ঘাটির নামান্তর।
দ্বিতীয়তঃ ইসরাঈলী সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দ্বারা তাকে অন্যান্য মানব সমাজ থেকে পৃথক করে তারা হল আক্রমণকারী - ফিলিস্তিনীদের ক্ষেত্রে- গোষ্ঠী বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ করে আমেরিকা, ইউরোপ ও রাশিয়া ও প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। তারা এসে সেখানকার অধিবাসীদেরকে উৎখাত করে বসতি গড়ে তুলছে, তাদেরকে জিম্মী করে ঘরবাড়ী ধ্বংস করে দখল করে নিচ্ছে। অধিবাসীদের এই অধিকার রয়েছে তারা যেভাবেই পারবে এই দখলদার বাহিনীকে বিতাড়ন করে নিজেদের ভূমি উদ্ধার করবে। তারা ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জিহাদে লিপ্ত হবে, জিহাদে নামতে বাধ্য যে জিহাদকে ফিকহ-এর ভাষায় বলা হয় জিহাদে ইদতেরার, প্রতিরোধ জিহাদ, আক্রমণ জিহাদ নয়। এতে নারী, পুরুষ, শিশু কে মারা গেল তা ধর্তব্যের বিষয় নয়। কারণ, এরা মারা পড়ছে অনিচ্ছাকৃতভাবে, যুদ্ধেরই প্রয়োজনে।
সময়ের পরিবর্তনেও যায়নবাদী ইহুদীদের সাম্রাজ্যদাবী দখলদারী গুণের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সময় বয়ে গেলেও বাস্তবতা অভিন্ন রয়েছে, তারা নির্বিচারে হত্যা, অপহরণ, গুম, দখলদারী, ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠন বন্ধ করেনি। এদের বেসামরিক পোষাক এদের জঘন্য চিত্রকে লুকাতে পারেনি। যাদেরকে মহান আল্লাহ অত্যাচারী, সীমালংঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। "সাবধান! জালেম-অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।" (হুদ: ১৮)
তৃতীয়তঃ যে ইসলামী শরিয়তের আমরা অনুসারী- যা আমাদের সর্বক্ষেত্রে পালনীয়, সেই শরীয়তে অমুসলিমদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে দুই ভাগেঃ শান্তিকামী এবং যুদ্ধবাজ। যারা শান্তিকামী তাদের ব্যাপারে আমাদের কর্তব্য আমরা তাদের সাথে সহাবস্থান করব, তাদের সাথে উত্তম আচরণ করব। আর যারা যুদ্ধবাজ বা যুদ্ধরত তাদের ব্যাপারে কর্তব্য তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তাদের শত্রুতার জবাব শত্রুতা দিয়েই দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ - وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ : وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيْهِ ، فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ ، كَذلِكَ جَزَاءُ الْكَفِرِينَ - فَانِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - وَقتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ ويَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ، فَإِنِ انْتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ - (البقرة : ١٩٠-١٩٣)
"আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে তাদেরকে হত্যা কর। এটাই কাফেরদের প্রতিদান। তবে যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে জালিমরা ছাড়া (কারো উপর) কোন কঠোরতা নেই।" (সূরা বাকারা: ১৯০-১৯৩)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
لا يَنْهكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ، إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا يَنْهِكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ وَظَهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ، وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ - (الممتحنة : ٨-٩)
"দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ও তোমাদেরকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো জালিম।” (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)
সুতরাং প্রথম প্রকার হল শান্তিকামী, তাদের সাথে মুসলমানদেরকে অবশ্যই ভাল এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রকারের হল প্রথম প্রকারের উল্টোটি যে যুদ্ধবাজ বা যুদ্ধে লিপ্ত যাদেরকে ফকিহরা বলেন, হারবী বা যুদ্ধরত বা যাদের সাথে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। এদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তে বিশেষ বিধি-বিধান রয়েছে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন হারবী বা যুদ্ধবাজের সম্পদ নিরাপদ নয়। তার শত্রুতার কারণে মুসলমানদের উপর থেকে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা তিরোহিত হয়ে গেছে।
চতুর্থতঃ এ বিষয়টিকে আরো বলিষ্ঠ করেছে এ জন্য যে, সমস্ত ফকিহগণ একমত হয়েছেন বা অধিকাংশ ফকিহ একমত যে যদি তারা মুসলমানদেরকে মানব ঢাল হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে হত্যা করা জায়েয হবে। শত্রু যদি মুসলমানদেরকে মানবঢাল হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে সামনে রাখে তাহলে ফকিহরা জায়েয বলে ফতওয়া দিয়েছেন যে, এক্ষেত্রে নিরপরাধ মুসলমানদেরকে হত্যা করা যাবে যদি তাদেরকে হত্যা করা ছাড়া কোন গত্যন্তর না থাকে বা কোন বিকল্প না থাকে। যদি তাদের সমেত হত্যা না করে এগিয়ে না যায় তাহলে আক্রমণকারী শত্রু এসে তাদেরকেই হত্যা করবে, তাদের ঘর-বাড়ি, ফসল-পানি জ্বালিয়ে দিবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কতিপয় লোককে কোরবানী দিতেই হবে, সকলকে হেফাজত ও নিরাপদ রাখার স্বার্থেই। আর এটি হল ভাল এবং মন্দের মাঝে অল্প মন্দের দ্বারা অধিক ভাল অর্জন করা।
যখন নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করা জায়েয বৃহত্তর স্বার্থে তখন অমুসলিমদেরকে হত্যা করা জায়েয হবে মুসলমানদের দখলকৃত ভূমি উদ্ধারের জন্য যা জবরদখল করেছে শত্রুরা।
পঞ্চমতঃ বর্তমান কালের যুদ্ধে সমাজের প্রত্যেকেই এর যোদ্ধা, সকলেই এই যুদ্ধের সৈনিক যেন সকলেই এই যুদ্ধে জড়িত এবং এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করছে এবং সকলেই এতে রসদ সরবরাহ করছে অর্থ দিয়ে মানব সম্পদ দিয়ে, যেন যুদ্ধরত রাষ্ট্রটি বিজয় লাভ করতে পারে। এতে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে যে যেখানে রয়েছে সেখান থেকেই যুদ্ধের রসদ জোগাবে ভিতর থেকে বাইরে থেকে- যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে রয়েছে তারা আর যারা অস্ত্র বহন করছে না তারাও এর যোদ্ধা। এ জন্য বিশেষজ্ঞরা বলেনঃ যায়নবাদী ইহুদীরা (ইসরাইলীরা) বাস্তবে সবাই সৈনিক।
ষষ্ঠতঃ বিধি-বিধান দুই প্রকারের- ভাল এবং প্রশস্ততার সময়ে বিধি-বিধান এবং সংকট ও বিপদকালীন বিধি-বিধান। একজন মুসলমানের জন্য বিপদকালীন সময়ে যা জায়েয তা অন্য সময় জায়েয নয়। এ জন্য মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে চার জায়গাতে হারাম করেছেন- মৃত, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়ে থাকে। অতঃপর বলেনঃ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلاَ إِثْمَ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - (البقرة : ۱۷۳)
"সুতরাং যে বাধ্য হবে, অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা বাকারা: ১৭৩)
এখান থেকেই ইসলামী আইনজ্ঞরা (ফকিহগণ) বিশেষ সূত্র (কায়েদা) গ্রহণ করেছেন: (الضرورات تبيح المحظورات) "অতীব প্রয়োজন [জরুরাত] হারামকে বৈধ করে দেয়।" আমাদের ফিলিস্তিনী ভাইয়েরা নিঃসন্দেহে জরুরী অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বরং এটিই খুবই সংকটাপন্ন জরুরাত এই শাহাদাত উজ্জীবিতী আক্রমণ চালানোর জন্য যেন শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা যায় যে শত্রু অন্যায়ভাবে দেশকে দখল করে রয়েছে, জনগণের মাঝে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাদেরকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না, তাদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। যদি এই শহীদী হামলা না চালানো হত তাহলে এতদিনে তাদেরকে ইসরাইল যা চায় তাই দিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না।
যদি তাদেরকে ইসরাইলের হাতে যে ট্যাঙ্ক, সাজোয়া বহর, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, নৌ যুদ্ধ জাহাজ এবং অন্যান্য অস্ত্র-শস্ত্র রয়েছে এর একশভাগের একভাগও ফিলিস্তিনীদেরকে দেয়া হত তখন অবশ্যই তারা এই শহীদী আত্মঘাতী হামলা পরিত্যাগ করত। তাদের কাছে এমন কোন অস্ত্র নেই যা দ্বারা তারা এই চরম ঔদ্ধত্য মহাপরাক্রমশালী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তাদের এই অতি নগণ্য অস্ত্র হল 'মানব বোমা' যা কোন যুবক বা যুবতী বহন করছে নিজের জীবনের বিনিময়ে যা শত্রুর মাঝে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর একমাত্র এই অস্ত্রই শত্রুর হাতে নেই- যার অস্ত্র ভান্ডারকে আমেরিকা সবধরনের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছে। এটি এক বিশেষ অস্ত্র যার মালিক হল আল্লাহর প্রতি পাক্কা ঈমানদার ব্যক্তিগণ। আর এটি মহান আল্লাহর এক কুদরতী প্রতিরোধ ও ইনসাফপূর্ণ প্রতিরোধ যা প্রকৃত জ্ঞানীজনই উপলব্ধি করতে পারেন। এটি হল অতীব দুর্বল অসহায়ের অস্ত্র চরম পরাক্রমশালী ঔদ্ধত্যপূর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে। "আর তোমার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।" (সূরা মুদ্দাসসির: ৩১)
📄 ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা কোনক্রমেই আত্মহনন নয়
বিপক্ষ অভিমতপোষণকারীদের সংশয়ের জবাব যারা শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা তিনটি কারণে সংশয়-সন্দেহ পেশ করেনঃ
১. এটি আত্মহত্যার মধ্যে পড়ে এবং নিজেকে ধ্বংস করার মধ্যে শামিল হবে। আর ইসলামে আত্মহনন করা কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ।
২. এর দ্বারা অনেক ক্ষেত্রেই এমন সব বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হন যারা কখনও যুদ্ধে অংশগ্রহণই করে না যেমন নারী, শিশু ইত্যাদি। এদেরকে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ এমনকি শত্রুর সাথে সম্মুখ সমরের সময়ও, এমনকি সেসব বেসামরিক লোককেও হত্যা করা বৈধ নয় যারা অস্ত্র বহন করে না।
৩. এর দ্বারা ফিলিস্তিনীরাই বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শত্রুর পক্ষ থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করার কারণে। আত্মঘাতী হামলার পর ইসরাইল চরম বর্বরোচিত পাল্টা আক্রমণ চালায় ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে, ইজ্জত-আব্রু বিনষ্ট করে। যদিও শরীয়তে এ বিষয়টি বৈধ করা হয়েছে কিন্তু এর ফলাফল পর্যালোচনা করে এটি নিষিদ্ধ হওয়াই উচিত।
ফিলিস্তীনে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলা কোনক্রমেই আত্মহনন নয়
যারা শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার বিরোধিতা করেন এই বলে যে, এটি এক প্রকারের আত্মহনন বা নিজের জীবন হত্যা করা তারা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। কেননা আত্মহনন ও শাহাদাতের উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। অপর দিকে- যে ব্যক্তি শহীদী আত্মঘাতী এবং আত্মহননের বিষয়টি বিশ্লেষণ করবে সে অবশ্যই এ দুটির মাঝে বিস্তর ফারাক পাবে।
একজন আত্মহননকারী নিজের আত্মাকে নিজের জন্যই খুন করছে। কোন বঞ্চনার কারণে বা কোন আবেগ তাড়িত হয়ে কিংবা পরিস্থিতিকে সামাল দিতে না পেরে বা অন্য কোন কারণে, এর ফলে সে জীবনকে বিলীন করে দিচ্ছে মুত্যুর মাধ্যমে।
আর শহীদী-হামলাকারী নিজের প্রতি দেখে না। সে দেখে এক বিরাট বিষয়ের দিকে যার জন্য সে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগে এগিয়ে আসে, সে নিজের আত্মাকে আল্লাহর নিকট বিক্রি করে দেয় জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ -(التوبة : ١١١)
"নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সূরা তাওবা : ১১১)
আত্মহননকারী মারা যাচ্ছে (জীবন থেকে কাপুরুষের মত) পলায়নপর হয়ে, পক্ষান্তরে শহীদী হামলাকারী মারা যাচ্ছে (বীরের মত) আক্রমণকারী হিসেবে।
আত্মহননকারীর জীবন থেকে পালানো ছাড়া কোন উদ্দেশ্যই নেই পক্ষান্তরে শহীদী হামলাকারীর উদ্দেশ্য অতি স্পষ্ট তা হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ ، وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ - (البقرة : ۲۰۷)
"আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। আর আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল।” (সূরা বাকারা : ২০৭)
বেসামরিক লোকজন আক্রান্ত হওয়া
বেসামরিক নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কর্মচারী, শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে যারা অস্ত্র বহন করে না বলে যে সংশয়-সন্দেহ পেশ করা হয়ে থাকে সে ব্যাপারে ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে ইসরাইলী সমাজ পুরোটাই সামরিক সমাজ এরা আক্রমণকারী... এদের মধ্যে কেউ বেসামরিক লোকই নেই, সে লেখাগুলো দয়া করে আবার পাঠ করুন।
আর শিশু- আত্মঘাতী কর্তৃক শিশুদের হত্যা করার কোন পরিকল্পনাই নেই কিন্তু তা আনুষঙ্গিকভাবে ঘটে যায় এবং সেটি জরুরাতের মধ্যে গণ্য। আর একথা সবার জানা রয়েছে যে, জরুরাতের কারণে নিষিদ্ধ কাজও বৈধতা লাভ করে থাকে এবং ওয়াজিবাতও রহিত হয়ে যায়।
ফিলিস্তিনীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
আর ফিলিস্তিনীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারে সংশয় রয়েছে যে শাহাদাত উজ্জীবিত হামলার পর তাদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, জ্বালাও পোড়াও নেমে আসে, সে ব্যাপারে কথা হল ইসরাইলের হাত অনেক বড়, তার শক্তি-সামর্থ্য অনেক বেশী। সে একের পরিবর্তে দ্বিগুণ বরং দশগুণ প্রতিশোধ নিয়ে থাকে।
আমরা এখানে কতিপয় জবাব উল্লেখ করবঃ
প্রথমতঃ ইসরাইলই এখন পর্যন্ত সবসময় প্রথমেই আক্রমণ করে এসেছে। প্রতিরোধের কারণে সে এখন নিজের প্রতিরক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। একথা সবার নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট যে, পৃথিবীর বুকে সেই একমাত্র রাষ্ট্র যে অন্যের ভূমি জবরদখল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে। ফিলিস্তিনীরা নিজেদের দখল হয়ে যাওয়া দেশকে মুক্ত করার জন্য আক্রমণকারী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
দ্বিতীয়তঃ শত্রুতা করাই ইসরাইলের প্রকৃতি প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত। বরং সে প্রতিষ্ঠাই পেয়েছে হত্যা, সন্ত্রাস, রক্ত প্রবাহিত করে, সম্পদ লুণ্ঠন করে, অন্যের ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠন করার মাধ্যমে। তার স্বভাব প্রকৃতি মোটেও পাল্টায় নি। যদি ফিলিস্তিনীরা তাদের এই অতি নগণ্য অস্ত্র ব্যবহার না করে চোখ বন্ধ করে থাকে তাহলে ইসরাইল তার হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা অব্যাহতভাবে চালিয়েই যাবে।
তৃতীয়তঃ আমরা যেন ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরাইলের পাল্টাআক্রমণকে খুব বড় করে না দেখি এবং শহীদী আত্মঘাতী হামলার ফলে ইসরাইলের উপর ফলাফল সম্পর্কে বেখবর না হই। এরফলে তাদের মধ্যে যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তাদের ভবিষ্যত স্থিতিশীলতার উপর যে বিরাট প্রভাব পড়েছে অনেকেই দেশত্যাগ করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে এবং অনেকেই বাস্তবে ইসরাইল ছেড়ে পালিয়েছে। এছাড়া এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পর্যটন শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে কি বিরাট প্রভাব পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ কারণে ইসরাইল ও আমেরিকা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যেন যেকোন মূল্যে এই আত্মঘাতী হামলা বন্ধ করা যায়। এরমধ্যে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করা যে কোন মূল্যে যেন এই প্রতিরোধকে উৎখাত করা যায় সন্ত্রাসের দোহাই দিয়ে।
আমরা যদিও ব্যথা ও মনোকষ্টে ভুগছি, সে কিন্তু আমাদের চেয়েও বেশী ভুগছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ إِنْ تَكُونُوا تَأْلَمُونَ فَإِنَّهُمْ يَأْلَمُونَ كَمَا تَأْلَمُونَ وَتَرْجُونَ مِنَ اللهِ مَا لَا يَرْجُونَ - (النساء : ١٠٤)
"যদি তোমরা ব্যথা পেয়ে থাক তাহলে তারাও তো ব্যথা পাচ্ছে, যেভাবে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাচ্ছ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট থেকে আশা করছ যা তারা আশা করছে না।" (সূরা নিসা: ১০৪)