📄 প্রতিশ্রুত ভূমি, শহর অবরোধ ও বিজয়ের বিধান
যেসব স্থানকে 'প্রতিশ্রুত ভূমি' বলে তারা (ইহুদীরা) উল্লেখ করে থাকে সেসব স্থানে অধিবাসীদের সম্পর্কে তাওরাত বলেঃ "যেসব শহর-জনপদ তোমাদের প্রভু তোমদের দান করেন সেসব স্থানের অধিবাসীরা তোমাদের মিরাস। সেখানে কোন মানুষকে জীবন্ত রাখবে না। বরং ধ্বংস কর তাদের গোষ্ঠীসুদ্ধ। যেমনটি ধ্বংস করেছো, হিসসীন, আমুরীয়, কেনানী, ফারযীন, হুওয়য়ীন এবং ইয়াবুসীদেরকে?। যেমনটি তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেন তারা যে ইবাদতের ক্ষেত্রে অপবিত্রতার সৃষ্টি করেছিল তার কোন চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে। তোমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন কর এবং তোমাদের মহান প্রভুর দিকে এগিয়ে চল। ১
এই ছয় জাতিকে একেবারে সমূলে ধ্বংস করতে হবে। কোন রকমের দাওয়াত বা আহ্বান ছাড়াই বা তাদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ না করেই কিংবা কোন রকমের সন্ধি না করেই- তাদের ভাগ্যে তরবারি ব্যতিরেকে অন্য কিছুই নেই। তাদের জন্য রয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস- এই হল এই হতভাগা জাতির ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! তাদের একমাত্র অপরাধ তারা তাদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে বসবাস করছিল।
তাওরাতের ব্যাখ্যাকারকগণ এই অনুচ্ছেদের উপর লিখেনঃ “দয়ালু প্রভুর পক্ষে কিভাবে সম্ভব যে তিনি নির্দেশ দিলেন সমস্ত জনপদের কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংস করার তার অধিবাসীসহ? এটি করেছেন বনী ইসরাইলকে মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা করার জন্যই, যা ওরা করত, আর এটিই করা দরকার তাদের উপর মন্দ আচরণ করাই ওয়াজিব (২০:১৮)। আর প্রকৃত কথা হল- যদি বনী ইসরাঈল এসব জাতিকে নির্মূল না করত যেমনটি তাদের রব তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাহলে তারাই নির্যাতনের শিকার হত এবং অনেক রক্তপাত ঘটতো, ধ্বংসযজ্ঞ সংঘঠিত হতো।
দেখুন, এভাবেই তাওরাতের ব্যাখ্যাকারীরা এসব জাতিকে নির্মূল করার বৈধতা প্রদান করল প্রভুর নির্দেশের নামে। বরং তারা আফসোস করে যে সব জাতিকে ইসরাঈলের তরবারি স্পর্শ করতে পারে নি, তাদের ব্যাপারে!
তাহলে তাওরাতে যা বর্ণিত হয়েছে আর কুরআনে যা এসেছে তার মধ্যে কোথায় সম্পর্ক? পার্থক্যটা কত বিরাট ও বিপরীতধর্মী!
নিকটবর্তী দেশ বা যাকে তারা প্রতিশ্রুত ভূমি বলে অভিহিত করে থাকে সেখানে কোন একজন মানুষকেও জীবন্ত রাখা যাবে না। অর্থাৎ সমূলে ধ্বংস করা হবে। এদেশের সকলকে নির্মূল করা হবে। এজন্যই আশ্চর্যের কোন কারণ নেই যে, ইউরোপীয় খৃষ্টানারা উত্তর আমেরিকায় গিয়ে কি করেছিল রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করার ক্ষেত্রে, সেদেশের আসল অধিবাসীদেরকে। বৃটিশরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে কি করেছিল তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আর সেখানকার অধিবাসীদের নির্মূল করেছিল এমন সব পন্থায় যার সাথে নীতি-নৈতিকতার ও মানবতার সামান্যতম সম্পর্কও ছিল না। যদি সেটিকে পশুত্বের সাথে তুলনা করা হয় তাহলেও বিরাট জুলুম করা হবে। কারণ, হিংস্র পশু অন্য প্রাণীকে ততটুকুই হত্যা করে যতটুকু তায় খাবারের প্রয়োজন হয়। যখন তার পেট ভরে যায় তখন আর হত্যা করে না। আর এরা হত্যা করে পরিতৃপ্ত হয়না। রক্ত ঝরিয়ে ক্ষান্ত হয় না যদিও তা নদীর স্রোতের মত প্রবাহিত হয়।
জাতি-গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস ও নির্মূল করা "তাওরাতী চিন্তাধারা” যা তাওরাতের পাঠক ইহুদী ও খৃষ্টানরা যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় পেয়ে আসছে। ইসলামে এই চিন্তাধারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত। এটি মানবতার ব্যাপারেই শুধু নয়। বরং তা অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও, যদি প্রাণীটি কোন এক বিশেষ জাতের হয় (বিরল বা বিপন্ন প্রজাতি) তাহলে সেটিকে হত্যা করা নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে ইসলামের নবী (সা.) বলেনঃ
لَوْلَا أَنَّ الْكِلَابِ أُمَّةٌ مِنَ الْأُمَمِ لَأَمَرْتُ بِقَتْلِهَا
"কুকুর যদি প্রাণীকূলের একটি জাত না হত তাহলে আমি তাকে হত্যা করতে নির্দেশ দিতাম।" ১
অর্থাৎ তাকে নির্মূল করতে আদেশ দিতেন মানুষকে তার ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য।
কিন্তু রাসূল (সা.) বিষয়টিকে গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, তিনি দেখেছেন এই 'কুকুর' কুরআনের দৃষ্টিতে একটি জাতি (উম্মত), তার রয়েছে বিশেষত্ব-বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী যা দ্বারা তাকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে আলাদা করেছে। আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর বিশেষ হিকমতে, এটা যে জানলো সে জানলো, আর যে জানল না সে এ ব্যাপারে অজ্ঞতায় রয়ে গেল। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَئِرِ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ - (الأنعام : ۳۸)
"আর জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী এবং দু'ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মত এক একটি উম্মত (জাতি-প্রজাতি)।” (সূরা আনআম: ৩৮)
এই মহান দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা ইসলাম প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বেই সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে- যা আজকের মানবতা ডাক দিচ্ছে এসব প্রাণী-প্রজাতিকে রক্ষা করার জন্য তাদের বিলীন বা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া থেকে। যাকে বলা হয়ে থাকে নূহ (আ.)-এর নীতিগত কাজ।১
যখন তিনি তাঁর জাহাজে প্রতিটি প্রাণীর জোড়াকে উঠিয়ে নিয়েছিলেন যেন প্রাণীদের জাতি-প্রজাতি সংরক্ষণ করা যায়, তুফান থেকে যা সবকিছুকে ধ্বংস করবে বলে আশংকা করা হয়েছিল।
দেখুন মানবতার প্রতি ইসলামের কি সুউচ্চ দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন প্রজাতির জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষী সংরক্ষণের জন্য এবং সেগুলোকে আমাদের মতই উম্মত বা জাতি-প্রজাতি হিসেবে গণ্য করেছে। আপনি তুলনা করুন ইসলামের সুমহান আদর্শের এবং পশ্চিমাদের নিচুতার মাঝে যারা তাওরাতের দীক্ষায় দিক্ষীত হয়ে শিশুসহ তাদের সকল বিরুদ্ধবাদীকে নির্মূল করতে চায়। তাদের বর্বরতার কথা ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে।
আমরা দেখেছি ইহুদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনের অধিবাসীদের সাথে কি করেছে? তারা বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ বেসামরিক লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে যা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমনটি তারা 'দীরে ইয়াসীন' ও অন্যান্য স্থানে ঘটিয়েছে। তারা গর্ভবতী নারীদের পেট ফেড়ে শিশুকে বের করে আনে এবং এই পৈশাচিক কর্মকান্ড করে উল্লাস প্রকাশ করে। পিতার চোখের সামনে সন্তানকে হত্যা করে, মায়ের সামনে তার কলিজার টুকরাকে হত্যা করেছে, ছেলেমেয়েদের সামনে বাবা মাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। তারা এরূপ পশুত্বমূলক আচরণ করে ফিলিস্তিনীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে তারা ঘরবাড়ি এই রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী হায়েনাদের জন্য ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
এই পাপিষ্ঠ রক্তপিপাসুরা তাওরাতের বিধিবিধান বাস্তবায়ন করে চলেছে যা তারা তাতে পেয়েছে যে, তোমরা সেখানে কোন প্রাণীকে জীবন্ত রাখবে না।
এই হল তাওরাতের বিধান এইসব জাতিগুলোর ব্যাপারেঃ তাদেরকে সমূলে নির্মূল কর, কোন মানুষ যেন বেঁচে না থাকে এভাবেই মুসার প্রভু তার অনুসারীদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে এসব জাতিসত্ত্বাকে নির্মূল করতে। তারা যেন তাদের উপর আক্রমণ শুরু করে, তাদেরকে কোন রকমের ট্যাক্স বা ধর্মান্তরিত হবার কোনই সুযোগ না দেয়। তাদের ভাগ্যে রয়েছে একমাত্র তরবারি।
এই বিধান বাস্তবায়ন করেছেন মুসা, ১ অতঃপর ইউশা এবং দাউদ এই শিক্ষাকে অক্ষরে অক্ষরে। সুতরাং তাঁরা নির্মূল করেছেন জাতিগুলোকে তাদের বংশশুদ্ধ। তারা তাদের বিরোধী লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেন।
তাদের অবস্থা এমনটিই ছিল যেমনটি মহান আল্লাহ কুরআন মজীদে উল্লেখ করেছেনঃ
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِّنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً - (البقرة : ٧٤)
“অতঃপর তোমাদের অন্তঃকরণসমূহ কঠিন হয়ে যায় পাথরের মত বা তার চেয়েও কঠিন।” (সূরা বাকারা: ৭৪)
তাহলে এটি কোথায় যা কুরআন নিয়ে এসেছে তার তুলনায় মহান আল্লাহর এ বাণীতেঃ
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ، إِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ - وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَاخْرُجُوهُمْ مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ : وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيْهِ - (البقرة : ۱۹۰-۱۹۱)
“আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে।” (সূরা বাকারা: ১৯০-১৯১)
কুরআন শত্রুর উপর বাড়াবাড়ি করার অনুমতি দেয়নি যদিও তাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্রোধ রয়েছে, যদিও তারা মুসলমানদের কাবাঘরে ইবাদত করতে বাধা প্রদান করেছে তবুও। যেমনটি মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেনঃ
وَلَا يَجْرِمَنَّ شَنَانُ قَوْمٍ أَنْ صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَنْ تَعْتَدُوا - (المائدة : ٢)
"কোন কওমের শত্রুতা যে, তারা তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে বাধা প্রদান করেছে, তোমাদেরকে যেন কখনো প্ররোচিত না করে যে, তোমরা সীমালঙ্ঘন করবে।" (সূরা মায়েদা: ২) এটি কোথায় যা কুরআন নিয়ে এসেছে, মহান আল্লাহর এ বাণীর সাথে কোন তুলনা চলে?
وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ - (التوبة : ٦)
"আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে, অতঃপর তাকে পৌঁছিয়ে দাও তার নিরাপদ স্থানে।” (সূরা তাওবা: ৬) এটি কোথায় মহান আল্লাহর বাণীর কাছেঃ
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ - وَإِنْ يُرِيدُوا أَنْ يَخْدَعُوكَ فَإِنَّ حَسْبَكَ اللهُ هُوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ - (الأنفال : ٦١-٦٢)
"আর যদি তারা সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তুমিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়, আর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল কর। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আর যদি তারা তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা।” (সূরা আনফালঃ ৬১-৬২)
ইসলাম যে যুদ্ধের চরিত্র নিয়ে এসেছে তার তুলনা কোথায়? একমাত্র তাকেই হত্যা করা যাবে যে যুদ্ধ করবে, কোন নারী ও শিশুকে হত্যা করা যাবে না বা বয়োঃবৃদ্ধ কোন লোককে হত্যা করা যাবে না। আর কোন অন্ধ, রোগাক্রান্ত বা ধর্মগুরুকে হত্যা করা যাবে না কিংবা কৃষককে হত্যা করা যাবে না এবং অন্য কোন বেসামরিক লোককে হত্যা করা যাবে না যুদ্ধের সাথে যাদের কোন সম্পর্ক নেই।
শত্রুর সাথে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম নির্দেশ দিয়েছেঃ যেন শত্রুদের ঘাড়ের উপর আঘাত করে যার ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের শক্তি খর্ব হয়ে গেলে তারা যুদ্ধ ছেড়ে বন্দী হয়ে পড়বে। বন্দী হওয়ার পর মুসলমানরা তাদেরকে হয় কোনরকমের বিনিময় গ্রহণ ব্যতিরেকে ক্ষমা করে দিবে অথবা বিনিময় গ্রহণ করবে কিংবা তাদেরকে বন্দী করে রাখবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَشْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً -
"অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়।” (সূরা মুহাম্মাদঃ ৪)
এটি কোথায় যা আমরা তাওরাতে পাঠ করলাম, যেখানে বলা হয়েছেঃ "তাদেরকে সমূলে নির্মূল কর।"
ইসলাম শক্তি খর্ব হবার পরই বন্দী ব্যবস্থা রেখেছে, তেমনিভাবে বন্দীর সাথে বন্দী হবার পর উত্তম আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। যেমনটি আমরা দেখতে পাই রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদেরকে বদর যুদ্ধের বন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের প্রশংসায় বলেনঃ
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا -
"তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে।” (সূরা দাহার: ৮)
মুসলমানদেরকে নিহতদের লাশের উপর প্রতিশোধ নিতে এবং লাশ বিকৃত করতে নিষেধ করা রয়েছে। রাসূল (সা.) তাঁর সেনাপতিদেরকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন এবং তাঁর পরে খুলাফায়ে রাশেদাগণ সতর্ক করেছেন।
ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) যখন তাঁর এক সেনাপতিকে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করেন তখন তাকে সতর্ক করে বলেন, “সাবধান, রাসূলের শহরে (মদীনায়) কোন মৃতদেহ নিয়ে আসবে না।”১ তাঁকে যখন বলা হলঃ তারা তো আমাদের নেতার (কমান্ডার বা সেনাপতি) লাশের সাথে এরূপ করে। তিনি বললেন, কি? রোমান ও পারস্যদের নীতির অনুসরণ। আল্লাহর শপথ! আজ থেকে আমার নিকট কোন লাশের মাথা প্রেরণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে চিঠি-পত্র ও সংবাদই যথেষ্ট। ২
টিকাঃ
১. দেখুনঃ পবিত্র কিতাব- তাওরাত, সাফারুস তাসনিয়া, অধ্যায়- কুড়িতমঃ ১০-১৮ পৃ. ৩৯২-৩৯৩
১. আবু দাউদ, কিতাবুস সায়দ, হাদীস নং ২৮৪৫ আব্দুল্লাহ বিন মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত; তিরমিযী হাদীস নং ১৪৮৯; নাসাঈ হাদীস নং ৪২৮৫; ইবনে মাজা হাদীস নং ৩২০৪। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি সহীহ। ইমাম আলবানী হাদীসটিকে 'সহীহুল জামেউস সাগীর'-এ সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (৫৩২১)
১. দেখুনঃ লেখকের রচিত গ্রন্থ [আরবী] 'রেয়ায়াতুল বি'য়া ফিশারিয়াতিল ইসলামিযা' অধ্যায়- পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা, পৃ. ১৫২
১. আমরা মুসা (আ.)-এর উপর আরোপিত এই অপরাধ সম্পর্কে তাঁকে পবিত্র বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আল্লাহর কুরআন ও রাসূল (সা.)-এর হাদীসে এমন কিছুর উল্লেখ নেই যা এসম্পর্কে কোন কিছু প্রমাণ করে। কিন্তু আমরা এখানে উল্লেখ করছি সেই জাতির আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে যা তাদের পবিত্র কিতাবে উল্লেখ রয়েছে এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তাদের স্বভাব-চরিত্র এবং অন্যান্যদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে ফুটে উঠছে, প্রতিফলিত হচ্ছে।
১. দেখুনঃ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক (৫/৩০৬) বর্ণনা দুটিঃ ৯৭০১, ৯৭০২]
২. সাঈদ ইবনে মানসুর তাঁর সুনান গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন (২৬৩৬); বায়হাকী তাঁর সুনানুল কুবরা গ্রন্থে (৯/১৩২)]
📄 চরমপন্থা ও সন্ত্রাস
চরমপন্থা ও সন্ত্রাস কি একই? না এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে? অনেকেই এ ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে এদুটির মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি।
আমার দৃষ্টিতে এ দুটির মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে সাধারণ (আম) ও বিশেষ (খাস) এর মত যেমনটি তর্কশাস্ত্রে বলা হয়ে থাকে। সুতরাং সকল সন্ত্রাসই চরমপন্থা কিন্তু সকল চরমপন্থাই সন্ত্রাস নয়।
সুতরাং আমরা দেখতে পাই- চরমপন্থা হল: একদল লোক কর্তৃক অপাত্রে (অনুপযুক্ত স্থানে) শক্তি প্রয়োগ কোন রকমের নীতি-নৈতিকতা, শরিয়ত ও আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই।
অপাত্রে (অনুপযুক্ত স্থানে) এর অর্থ হল- যেখানে কথার দলিল দিয়ে বা আলোচনা করে বা যুক্তি-প্রমাণের দ্বারা সমস্যার সমাধান করা যেত বল প্রয়োগ ব্যতিরেকেই। আর এরা যখন শক্তি প্রয়োগ করে তখন মোটেই দেখে না যে কে মারা গেল? জিজ্ঞেস করে না- তাদের হত্যা করা কি বৈধ? তাকে কোন দিন জিজ্ঞেস করলে সে নিজেকে দেখাবে মুফতী (আইনজ্ঞ), কাজী (বিচারক) এবং পুলিশ হিসেবে। এটিই হল চরমপন্থা যাকে আমরা অপরাধ হিসেবে গণ্য করছি।
কিন্তু সন্ত্রাস হলঃ চরমপন্থা ব্যবহার করা যার সাথে তার কোন বিষয়ই নেই। এটি হল অন্যদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার মাধ্যম এবং তাদেরকে যে কোন উপায়ে দুঃখ-কষ্ট দেয়া এবং তাদেরকে তাদের দাবী-দাওয়া মানতে বাধ্য করা, যদিও তা আপনার দৃষ্টিতে সঠিক বলে মনে হয়।
সন্ত্রাসের মধ্যে গণ্য করা যায়ঃ বিমান ছিনতাই, সাধারণতঃ দেখা যায় ছিনতাইকারী ও যাত্রীদের মাঝে কোন বিষয়ই নেই, তাদের মাঝে আর এদের মধ্যে কোন বিরোধই নেই। এদের কোন একপক্ষকে চাপ দেয়ার জন্য মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে যেমনঃ সরকারের কোন বিমান ছিনতাই করা বা কোন বেসামরিক বিমান ছিনতাই করে সরকারকে তাদের দাবী-দাওয়া মানতে চাপ দেয়া যেমন হয়তো তাদের কোন বন্দীকে মুক্তির দাবী করল বা মুক্তিপণ দাবী করল কিংবা এ ধরনের কিছু দাবী করল না হলে বিমানের কোন যাত্রীকে হত্যা করল বা বিমানটিই বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দিল।
তেমনিভাবে এর মধ্যে শামিল: পণবন্দী হিসেবে আটক করা, এদেরকে তারাও চিনেনা এবং ওরাও তাদেরকে চিনেনা। কিন্তু তাদের ধরা হয় চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে যেন তাদের দাবী আদায় করা যায় কিংবা তাদের যাকে ইচ্ছা হত্যা করে যেমনটি ফিলিপাইনে আবু সাইয়াফের গ্রুপ ও অনুরূপ দল ও গ্রুপগুলো করেছে।
তেমনি সন্ত্রাসের মধ্যে গণ্য করা যায়: মিসরে পর্যটকদের হত্যা করা, যেমনটি ঘটিয়েছে 'আল-আকসার' নামক স্থানে পর্যটকদের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মিসরের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য এবং মিসর সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে।
এর মধ্যে রয়েছে: ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ খৃষ্টাব্দে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে বেসামরিক বিমান যাত্রীসহ ছিনতাই করে এমন সব যাত্রী যাদের মধ্যে ও ছিনতাইকারীদের মধ্যে কোন সমস্যা বা বিরোধ ছিলনা, সেটিকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যাত্রীসহ সকলকে বিস্ফোরিত করে দিয়ে আমেরিকার রাজনীতিতে চাপ প্রয়োগ করার লক্ষ্যে।
তেমনিভাবে নিরপরাধ বেসামরিক লোকদেরসহ ওয়াশিংটনের বিশ্ব-বাণিজ্যকেন্দ্র টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে এমন লোকদেরকে যাদের সাথে টাওয়ার ধ্বংসকারীদের কোন সমস্যা বা বিরোধ ছিল না এবং তাদের সাথে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই, এরা সবাই সাধারণ কর্মচারী যারা নিজেদের জীবনধারণের জন্য দৈনন্দিন কর্ম সম্পাদন করছিল, এদের মধ্যে মুসলমানও ছিল।
আমরা সাধারণভাবে চরমপন্থাকে ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান করছি তেমনি বিশেষভাবে আমরা সন্ত্রাসকে ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান করছি। কেননা এতে রয়েছে অন্যের প্রতি জুলুম ও বাড়াবাড়ি করা যাদের এমন সামান্যতম কোন অপরাধ নেই যার জন্য তাদেরকে পাকড়াও করা যেতে পারে।
কুরআন মজীদ ও অন্যান্য আসমানী কিতাবগুলোতে১ যে মূলনীতি এসেছে তা হলঃ
"আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা নাজম: ৩৮)
কেননা এর দ্বারা নিরাপদ নিরপরাধ লোকজনকে আতঙ্কিত করা হয় আর ইসলামের দৃষ্টিতে কাউকে ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত করা বিরাট জুলুম।
আমি বেশ কয়েক বছর পূর্বে ফতওয়া প্রদান করেছিঃ বিমান ছিনতাই করা হারাম বলে। সেটি ছিল কুয়েতী বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার পর। এ ঘটনায় যাত্রীদেরকে ষোল দিন পর্যন্ত পণবন্দী করে রাখে এদের একজন বা দু'জনকে হত্যাও করে।
তেমনিভাবে আমি ফতওয়া প্রদান করেছি পণবন্দী হিসেবে কাউকে আটক করা এবং তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হারাম। এটি আমি দিয়েছিলাম ফিলিপাইনে আবু সাইয়াফ গ্রুপের লোকদের কর্মকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করে। এসব পণবন্দীদের কোন অপরাধ নেই। কিন্তু ভাগ্যের লিখনে তারা এদের হাতে বন্দী হয়েছে।
আমি তেমনিভাবে বিবৃতি দিয়েছি এগারই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর। এতে আমি এই কর্মকাণ্ডকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছি, তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন, তাদের জাতীয়তা যা-ই হোকনা কেন এবং তারা যে দেশেরই অধিবাসী হোক না কেন।
এটি আমার একার ব্যক্তিগত অভিমত নয়। আমি ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও নীতি থেকেই, কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধানের আলোকেই এই অভিমত ব্যক্ত করেছি। আমি এ ক্ষেত্রে সকল মাযহাব ও দলমতনির্বিশেষে সকলের অভিপ্রায়, অভিমতকে সামনে রেখেই ফতওয়া-বিবৃতি প্রদান করেছি।
টিকাঃ
১. মহান আল্লাহ বলেনঃ "নাকি মুসার কিতাবে যা আছে, সে সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়নি? আর ইবরাহীমের কিতাবে, যে (নির্দেশ) পূর্ণ করেছিল। তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা নজম: ৩৬-৩৮)
📄 জিহাদ ও চরমপন্থার মাঝে
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত জরুরী যে, সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য বিধান করবো ইসলামে যে জিহাদ ফরজ করেছে দীনের প্রতিরোধ কল্পে বা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে কিংবা ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করতে এবং চরমপন্থার মাঝে যাকে আমরা নিন্দা, ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যান করি।
জিহাদ ও চরমপন্থা প্রতিটিতেই উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু জিহাদ তার উদ্দেশ্য-লক্ষ্য এবং মাধ্যমের ব্যাপারে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জিহাদ সর্বদা শরীয়তের বিধি-বিধান এবং ইসলামে বর্ণিত নৈতিক-চরিত্রে অনুসরণ করে থাকেঃ যুদ্ধের পূর্বে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং যুদ্ধের পরে।
কিন্তু চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ি যেমনটি করছে কতিপয় ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত গ্রুপ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়, তা তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য বা মাধ্যমের ক্ষেত্রে কিংবা শরীয়তের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে, সাধারণত এটি করে থাকে আবেগপ্রবণ যুবকরা, যাদের শরীয়তের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং বাস্তব জ্ঞানের ও বাস্তবতা উপলব্ধি করার মত দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে আর তাদের মাঝে আবেগপ্রবণতাই অধিক। তারা জীবনকে ও মানুষকে কাল চোখে দেখে থাকে, এজন্য তাদের মধ্যে খারাপ ধারণা বদ্ধমূল থাকে যারফলে অন্যকে ফাসেক এমনকি সুস্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত বলতে দ্বিধা করে না। আর সুস্পষ্ট কুফরী মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
জিহাদ শক্তি প্রয়োগ করে থাকে তার স্বস্থানে, সময়মত এবং প্রয়োজন মাফিক, সেই শত্রুদের সাথে যারা শত্রুরা করেছে ইসলামের সাথে, ইসলামের অনুসারীদের সাথে। তাদেরকে তাদের দীনের ব্যাপারে ফিতনায় ফেলেছে বা তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে কিংবা দুর্বলদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন করেছে এবং তাদের অধিকার বিনষ্ট করেছে কিংবা তাদের ভূমি জবরদখল করেছে, তাদের ইজ্জত-আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের পবিত্র স্থানসমূহকে পদানত করেছে সুতরাং এক্ষেত্রে জিহাদ করার বৈধতা রয়েছে মহান আল্লাহর এই বাণীর প্রতি আমল করেঃ
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا طَ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ - (البقرة : ١٩٠) "আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা : ১৯০)
📄 ফিলিস্তীনে জিহাদের বৈধতা
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমানে সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হল ফিলিস্তীনকে মুক্ত করার জিহাদ, ইসরা ও মিরাজের পবিত্র ভূমি, আল-আকসা মসজিদের ভূমি যা মুসলমানদের প্রথম কিবলা এবং তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ। যেই মসজিদকে মসজিদে হারামের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যেখান থেকেই ইসরার শুরু এবং যেখানে এসেই ইসরার পরিসমাপ্তি।
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ - (الاسراء : ١) "পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল-মাসজিদুল হারাম (কাবাঘর) থেকে আল-মাসজিদুল আকসা (বায়তুলমুকাদ্দাস মসজিদ) পর্যন্ত। যার আশে-পাশে আমি বরকত দিয়েছি।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ১)
এই পবিত্র ভূমি আজ জঘন্য ধরনের আগ্রাসনে 'নিপতিত, মারাত্মক সাম্রাজ্যবাদের হাতে বন্দী, সে সাম্রাজ্যবাদ হল ইহুদী যায়নবাদী, আগ্রাসী, বর্ণবাদী, সন্ত্রাসী, গ্রাসকারী, বসতিস্থাপনকারী, পশু উপনিবেশবাদী। ১ এই উপনিবেশবাদে কোন মানুষের সামান্যতম মূল্য নেই, সে কোন মুমিনের প্রতি কোন মান-সম্মান দেখায় না, তার আচরণে কোন দয়ামায়ার বিন্দুমাত্র লেশ নেই।
এই উপনিবেশবাদ এক রক্তাক্ত, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ি পশুত্ব কর্মকান্ড করে এমন এক অঞ্চলকে কুক্ষিগত করেছে যার উপর তার শতবছর পূর্বেও কোন উপস্থিতি ছিল না। শক্তি, ষড়যন্ত্র ও পশ্চিমাদের সাহায্যে- প্রথমে বৃটেন এবং পরবর্তীতে আমেরিকা- এর অধিবাসীদের উপর চড়াও হয়েছে এবং তাদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাড়িয়ে দিয়েছে, তাদেরকে জোর করে উচ্ছেদ করছে।
ইসলামী বিধানে (ফিকহ) এটি সুবিদিত যে, ফিলিস্তীনের জন্য মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধভাবে এবং একাকী বের হতে হবে কাফের শত্রুকে বিতাড়নের জন্য, যারা বাড়িঘর জবরদখল করেছে। একারণেই তাদের সবার উপর ফরজে আইন (প্রত্যেকের উপর অপরিহার্য) হয়ে পড়েছে যার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে জিহাদ করবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির যে হক রয়েছে সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে- স্ত্রী স্বামীর বিনা অনুমতিতে, সন্তান পিতার অনুমতি ব্যতিরেকেই, দাস মুনিবের অনুমতি ছাড়াই জিহাদে অংশ গ্রহণ করতে পারবে। কেননা সমষ্টির (জামায়াতের) বাঁচার অধিকারকে ব্যক্তি অধিকার স্বামী, পিতা মুনিবের উপর প্রাধান্য দিতে হবে।
যদি ফিলিস্তীনের অধিবাসীরা ভূমি উদ্ধারে অক্ষম-অপারগ হয়, তারা হয়তো অলসতা করলে বা কাপুরুষতা প্রদর্শন করলে এর আশে-পাশের লোকজনের উপর ফরজ হয়ে যাবে লড়াই করার, তারাই তখন ওদের হয়ে জিহাদ করে ফিলিস্তীনকে মুক্ত করবে, শত্রুদেরকে বিতাড়িত করবে। যদি এর প্রতিবেশীরাও বসে পড়ে শত্রুর মোকাবিলা না করে-যেমন বর্তমান অবস্থা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর- তাহলে এর পরবর্তীদের উপর অতঃপর তাদের পরে যারা রয়েছে এরপর সমস্ত মুসলমানদের উপর ফরয হবে ফিলিস্তীনকে কাফের-ইহুদীদের দখল মুক্ত করা।
এটিই শরীয়তের বিধানে অপরিহার্য (ফরয) করা হয়েছে, ইসলামী মাজহাবের সকল দলই এই ফতওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য।
ফিলিস্তীনের ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবতা। ফিলিস্তিনীরা তাদের সবকিছু খরচ করেছে, চমকপ্রদ বীরত্ব দেখিয়েছে, আত্মঘাতী শহীদী হামলা চালিয়েছে, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে, শিবিরে, তাঁবুতে চরম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, প্রশংসনীয় আক্রমণ পরিচালনা করেছে যদিও তাদের অস্ত্র, রসদ অপ্রতুল।
যদিও তাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে শত্রুরা ট্যাংক, সাজোয়া যান, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, আবাদী জমিনকে বিরান করে, শস্যক্ষেতকে জ্বালিয়ে দিয়েছে, গাছ-পালা উপড়িয়ে ফেলেছে, তাদেরকে ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, তাদের উপর অবরোধ চাপিয়ে তাদেরকে ক্ষুধা-দারিদ্রতার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে যেন তারা ইহুদী যায়নবাদীদের কাছে মাথা নত করে। এতদসত্ত্বেও এই জাতি দমে যায়নি, তারা শত্রুর সামনে মাথানত করেনি, তারা পিছুটান দেয়নি। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে, ফিলিস্তিনীদের শক্তিসামর্থ্য দ্বারা মহাপরাক্রমশালী ইসরাইলকে রুখা যায়নি, যে ইসরাইল আজ বিশ্বের ভয়ংকর অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের তালিকায় রয়েছে, তার অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে পারমানবিক অস্ত্র। আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যেন তারা পারমানবিক অস্ত্রের অধিকারী না হতে পারে।
এখানে এসেই জিহাদের ফরজিয়াত প্রতিবেশী দেশগুলোর উপর এসে বর্তাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ফিলিস্তীনের আশেপাশের লোকজন সম্পূর্ণভাবে এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এমনকি তারা জিহাদকে পরিত্যাগ করে দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরেছে। তারা ফিলিস্তিনীদের একা ছেড়ে দিয়েছে। যে ফিলিস্তিনীরা তাদের সীমিত সামর্থ্য-শক্তি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র যাকে স্বয়ং বিশ্বের পরাশক্তি আমেরিকা সাহায্য করছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছে। আরবরা যখন ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তীন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তখন সদ্যপ্রসূত-তিন বছর বয়সী-আরব লীগ ফিলিস্তিনীদের হাতে এ ব্যাপারে কোন দায়িত্বই দেয় নি।
এখানে এসে জিহাদের দায়িত্ব এসে পড়েছে বিশ্বের সকল মুসলমানের উপর। তাদের উপর অবশ্য কর্তব্য হল তারা একাকী ও একতাবদ্ধভাবে তাদের জানমাল নিয়ে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাদের যার যা সামর্থ্য রয়েছে তা নিয়েই।
বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলমানদের উপর ওয়াজিব হয়ে পড়ে যদি ইসলামের কোন পবিত্র ভূমি কাফের দখলদার বাহিনীর কবলে পড়ে তাহলে তাকে উদ্ধার করা। আর সেটা যদি তাদের প্রথম কিবলা, ইসরা ও মেরাজের ভূমি মসজিদুল আকসা হয়?
এখন মুসলিম উম্মার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে মসজিদুল আকসাকে উদ্ধার করা। মুসলিম উম্মার সকল জনশক্তি তাদের সরকারের উপর যথাসম্ভব চাপ প্রয়োগ করবে- সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দানের অংশ হিসেবে- আলেম-উলামা, লেখক-বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক-সাহিত্যিক যার যা সামর্থ্য রয়েছে তা দিয়েই হকের কথা বলবে যেন শেষাবধি সরকারগুলো তাদের ডাকে সাড়া দেয়, কেননা তারা তাদের জাতির দাবী-দাওয়াকে উপেক্ষা করতে পারে না, তাদের থেকে বিচ্ছিন্নও হতে পারবে না। নিদেনপক্ষে সেসব লোকদের জন্য সুযোগ করে দেবে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করে শহীদ হতে আগ্রহী। এই উম্মতের একদল মর্দে-মুজাহিদ হকের উপর অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর ফয়সালা অবশ্যই আসবে। শেষ পর্যন্ত উম্মতের সর্বশেষ এ দলটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
মুসলিম উম্মাহ গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেইসব স্বাধীনচেতা লোকদের যারা উম্মতে মুহাম্মদীকে জিহাদে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসবে, তাদের প্রবল কামনা-বাসনার জিহাদে সকলকে সংগঠিত করবে। যেমনটি ইতোপূর্বে করেছিলেন- ইমাদুদ্দিন জঙ্গী এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী পুত্র শহীদ নুরুদ্দীন মাহমুদ এবং তাঁর অন্যতম শিষ্য সালাহউদ্দীন আইউবী, যার হাতেই আল্লাহ প্রথম বিজয় এনে দেন।
এই জিহাদ নিঃসন্দেহে বৈধ, বরং ফরজ বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণের উপর এবং সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের উপর। তারা গুনাহগার হবে যদি তারা তাদের এই দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে বা গাফলতি করে।
টিকাঃ
১. এই উপনিবেশবাদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য লেখকের 'জেরুজালেম বিশ্বমুসলিম সমস্যা', আল-ফুরকান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত বইটি পাঠ করুন।