📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 জাহেলী যুগে আরবদের মাঝে চরমপন্থা

📄 জাহেলী যুগে আরবদের মাঝে চরমপন্থা


জাহেলী যুগে আরবরা রুঢ়তা, বর্বরতা ও নির্দয় চরিত্রের প্রশংসা করত, দয়াপরবশ ও ন্যায়নীতি পরায়ণ চরিত্রকে নয়। আপনি কি চিন্তা করতে পারেন? তাদের কেউ কেউ নিজের সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করেছে। বিশেষ করে তারা মেয়ে সন্তানকে দারিদ্র ও আত্মমর্যাদার কারণে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম পন্থায় জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করত। মহান আল্লাহ তাদের এই জঘন্য অপকর্মকে এভাবে তুলে ধরেছেনঃ

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ - بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ - التكوير : ٨-٩)

"আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে।" (সূরা তাকভীর: ৮-৯)

কবি জুহাইর বিন আবী সালমা তার মুয়াল্লাকায় বলেনঃ যে ব্যক্তি তার অস্ত্র দ্বারা পানির হাউজ থেকে অন্যদেরকে না তাড়াবে অচিরেই তার হাউজ নষ্ট হয়ে যাবে।

আর যে ব্যক্তি মানুষের উপর জুলুম না করবে, সে অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হবে।

কবি এখানে মানুষকে উৎসাহিত করেছে জুলুম করার জন্য যেন তারা

নিজেরাই জুলুম শুরু করে তাহলে তারা জুলুমের শিকার হবে না। যেমনটি অপর এক ব্যক্তি বলেছিল, "তুমি তোমার শত্রু দ্বারা দুপুরের খানা খাও, সে তোমাকে দিয়ে রাতের খানা খাবার পূর্বেই।”

অপর এক জাহেলী কবি আমর ইবনে কুলসুম বলেন, দুনিয়াতো আমাদের জন্যই, আর যারা গতকাল ছিল আমরা তাদের উপর আক্রমণ চালাবো সর্বশক্তি দিয়ে।

আমরা হবো দুর্দান্ত জালেম, আমরা জুলুমের শিকার হবো না আমরাই প্রথমে জুলুম শুরু করবো জালিম হিসেবে।

তিনি আরো বলেন, আমরা কোন পানির ঘাটে গেলে পরিচ্ছন্ন পানি পান করবো আর অন্যরা পান করবে ঘোলা ও কর্দমাক্ত পানি।

এ ধরনের চরিত্রের প্রসার লাভে তাদেরকে সহায়তা করত অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা ও গোত্রপ্রীতি। এ কারণে মানুষ তার স্বগোত্রীয় লোকজনকে সে সঠিক বা বাতিল যা-ই হোক না কেন, তাকে সাহায্য করত, একথার বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর- "তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর সে জালিম হোক বা মাজলুম।”

তারা তাদের ভাইকে জিজ্ঞেস করে না যখন তাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। কোন বিপদাপদে যে, তুমি কি কারণে আমাদের সাহায্য চাও- প্রমাণ দাও।

তাদের কোন এক দলনেতা বলে, সে যখন ক্রোধান্বিত হয়: তার সাথে.... একহাজার তরবারী ক্রোধান্বিত হয়, তাকে জিজ্ঞেস করে না- কেন ক্রোধান্বিত হয়েছো?

যখন তাদেরকে মহান আল্লাহ ইসলামের দ্বারা ধন্য করলেন, তাদেরকে এক নতুন চরিত্রে গড়ে তুললেন, তাদের আকিদা-বিশ্বাস এবং চিন্তাধারায় পরিবর্তন সাধন করলেন, তাদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটালেন। তাদেরকে সঠিক চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠিত করে চরিত্রকে সংশোধন করলেন যেন তারা মানবতার সামনে সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম হয় যদিও তা নিজেদের জীবনের উপর বা সন্তান-সন্ততি কিংবা নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে হয়ে থাকে। তাদেরকে গোত্রপ্রীতি বা ক্রোধ সত্য-ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তারা হকের সাথেই হকের জন্য ছুটেছে। তারা তরবারী হাতে নিয়েছে একমাত্র সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই বা বাতিলকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে কিংবা ইনসাফ কায়েমের জন্যে অথবা মাজলুমকে সাহায্য করার নিমিত্তে।

নবী করীম (সা.) তাদের সামনে "তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে জালেম হোক বা মাজলুম হোক।" বাক্যের নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরলেন- তাকে জুলুম থেকে বাধা দিবে, সেটিই তাকে সাহায্য করা হবে।

ইসলাম জাহেলিয়াতের যুদ্ধ-বিগ্রহকে নিষিদ্ধ করে এবং মুসলমানদেরকে আহ্বান করে তারা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামের মধ্যে দাখিল হয়। তারা সকলেই যেন সত্যের নিকট মস্তক অবনত করে, যুদ্ধের উপর শান্তিকে প্রাধান্য দেয় এবং রাগের উপর ক্ষমা ও মার্জনাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে। এরা শক্তির আশ্রয় একমাত্র তখন গ্রহণ করে যখন শত্রুতা ও আক্রমণ প্রতিহত করার আর কোন পথ থাকে না কিংবা দীনের ব্যাপারে কোন ফিতনা দূর করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে বা দুর্বল-অসহায়দেরকে মুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে কিংবা এধরনের কোন বিশেষ প্রয়োজনেই তারা শক্তি প্রয়োগে এগিয়ে আসে। তারা নিরুপায় হয়েই যুদ্ধে জড়ায়। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেনঃ

كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ - (البقرة : ٢١٦) "তোমাদের উপর লড়াইয়ের বিধান ফরজ করা হয়েছে অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়।” (সূরা বাকারা: ২১৬)

কিন্তু যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে লড়াই ব্যতিরেকেই যেমনটি ঘটেছিল খন্দকের যুদ্ধে। তখন সে সম্পর্কে কুরআন মজীদে এভাবে ব্যক্ত করা হলঃ

وَرَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا . وَكَفَى اللهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ ، وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عزيزا - (الأحزاب : ٢٥)

“আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের আক্রোশসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোন কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রবল শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (সূরা আহযাব: ২৫)

কত সুন্দর বক্তব্য ও ভাষা যা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় ইসলাম সন্ধির ব্যাপারে কতটা আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে অগ্রণী। "যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”। মুমিনরা যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না, তারা যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়, নিরুপায় হয়ে যুদ্ধে জড়ায়।

যখন হুদায়বিয়ার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে সন্ধির মাধ্যমে এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে যাবার উপক্রম হবার পর এবং নবী করীম (সা.) তাঁর সাহাবাদের নিকট থেকে জীবনপণ বাইয়াত গ্রহণ করেন, এই ঐতিহাসিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সূরাতুল ফাতহ নাযিল হয় এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে। সেখানে রাসূল (সা.)-কে সম্বোধন করে বলা হয়ঃ

إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا - (الفتح : ١) "নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি।” (সূরা ফাতহঃ ১)

একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেন- হে আল্লাহর রাসূল! এটি কি বিজয়? তিনি বললেনঃ "হাঁ, এটি বিজয়।” ১ তিনি চিন্তাই করতে পারেননি যে, যুদ্ধ-বিগ্রহ ব্যতিরেকেই বিজয় হতে পারে।

রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেনঃ "তোমরা শত্রুর (যুদ্ধের জন্য) সাক্ষাৎ কামনা করো না। মহান আল্লাহর নিকট নিরাপদ থাকার জন্য প্রার্থনা কর। কিন্তু যদি সাক্ষাৎ ঘটে যায় তাহলে ধৈর্য ধারণ করবে। জেনে রেখো, জান্নাত হল তরবারির ছায়ার নিচে।” ১

তিনি মনে করেন শান্তি ও নিরাপত্তাই হল নিরাপদ থাকার উপায় যা প্রত্যেক মুসলমান কামনা করে এবং মহান আল্লাহর নিকট সর্বদা দু'আ-প্রার্থনা করতে থাকে নিরাপদে থাকার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ -

“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।”২ রবং নবী করীম (সা.) যুদ্ধ (حرب) শব্দটিকেই অপছন্দ করতেন। তিনি সেটি শুনতেই পছন্দ করতেন না। এ জন্যই তিনি বলেছেনঃ

أَحَبُّ الأَسْمَاءِ إِلَى اللهِ عَبْدِ اللَّهِ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ وَأَقْبَحُ الْأَسْمَاءِ حَرْبٍ وَمُرَّة -

"আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নাম হল- আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) ও আব্দুর রহমান (দয়াময় প্রভুর বান্দা) এবং ঘৃণিত নাম হল- হারব (যুদ্ধ) ও মুরা (তিতা)।”৩

কিন্তু মুসলমানদেরকে যদি আহ্বান করা হয় দীন, জান-মাল, পরিবার-পরিজন ও দেশ রক্ষার জন্য: তাহলে তারা দ্রুত ছুটে আসবে, তারা পেছনে পড়বে না বা জমিনকে আঁকড়ে ধরবে না। যেমনটি মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেনঃ

يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَالَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ اثَاقَلْتُمْ إِلَى الأَرْضِ ، أَرَضِيْتُمْ بِالْحَيَوةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ الا قَلِيلٌ - إِلَّا تَنْفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا ، واللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قدير - (التوبة : ٣٨-٣٩)

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হল, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা যমিনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার ভোগ-সামগ্রী আখেরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। যদি তোমরা (যুদ্ধে) বের না হও, তিনি তোমাদের বেদনাদায়ক আযাব দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক কওমকে আনয়ন করবেন, আর তোমরা তাঁর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা তাওবা: ৩৮-৩৯)

টিকাঃ
১. আবু দাউদ, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ২৭৩৬, মাজমা বিন জারিয়া (রা.) থেকে।
১. বুখারী হাদীস নং ২৯৬৬, মুসলিম হাদীস নং ১৭৪২, আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা (রা.) থেকে।
২. আবু দাউদ হাদীস নং ৫০৭৪, ইবনে মাজা হাদীস নং ৩৮৭১, হাকেম হাদীস নং ১/৫১৭ ইবনে উমর (রা.) থেকে।
৩. আবু দাউদ, আদাব অধ্যায়, হাদীস নং ৪৯৫০, আবু ওহাব জুশামী (রা.) থেকে।

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থা কি মুসলমানদের নিকট স্বাভাবিক পন্থা?

📄 চরমপন্থা কি মুসলমানদের নিকট স্বাভাবিক পন্থা?


এ হল ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকৃতি ও স্বাভাবিক অবস্থান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল- আমরা লক্ষ্য করছি যে, পশ্চিমারা এমনভাবে মুসলমানদেরকে চিত্রিত করছে যেন তারা হিংস্র পশু। এটি তাদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। তাদের ছোটরা এর উপরই বেড়ে উঠছে, বড়রা এই বিশ্বাসকে লালন করেই বয়ঃবৃদ্ধ হচ্ছে, এমনটি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই ঘটছে।

তারা আরো অভিযোগ করে- মুসলমানদের বিশ্বাসের মূলভিত্তি হল- মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর প্রতি যিনি প্রতিশোধ গ্রহণকারী, পর্যুদস্তকারী। মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে তারা তাদের আল্লাহর রঙে নিজেদের রাঙাবে, তাঁর মহাপরাক্রমের গুণে গুণান্বিত হবে, তাঁর মত প্রতিশোধ পরায়ণ হবে আর এজন্যই মুসলমানরা তাদের দীনের শত্রুর ব্যাপারে সামান্য দয়ামায়া প্রদর্শন করে না। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন এই বলেঃ

يأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنفِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ ، وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ، وَبِئْسَ الْمَصِيرُ - (التوبة : (٧٣) "হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের উপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম; আর তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান!" (সূরা তাওবা: ৭৩)

মুসলমানদের এভাবে চিত্রিত ও চিহ্নিত করা নিঃসন্দেহে মারাত্মক ভুল ও চরম জুলুম।

ইসলামী ধর্মীয় বিশ্বাসে মহান আল্লাহ যেমন মহাপরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী ও পর্যুদস্তকারী; তেমনি তিনি অপরিসীম দয়ালু ও দাতা, করুণাকারী, অনুগ্রহকারী, দানশীল ও সহিষ্ণু গুণে গুণান্বিত। মহান আল্লাহ বলেনঃ

اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ وَأَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - “জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর আর নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা মায়েদা: ৯৮)

তিনি আরো বলেনঃ

إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ - (الأنعام : ١٦٥) "নিশ্চয় তোমার রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আনয়াম : ১৬৫)

তিনি অন্যত্র বলেনঃ

وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ ، وَإِنَّ رَبِّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ - (الرعد : (٦)

"আর নিশ্চয় তোমার রব মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল তাদের যুলুম সত্ত্বেও এবং নিশ্চয় তোমার রব কঠিন শাস্তিদাতা।" (সূরা রা'দঃ ৬)

মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেনঃ نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ - وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الألِيمُ - (الحجر : ٤٩-٥٠)

"আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও যে, আমি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার আযাবই যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” (সূরা রা'দঃ ৪৯-৫০)

এখানে লক্ষ্য করুন, তিনি ক্ষমা এবং দয়া করাকে নিজের নামের অন্তর্ভুক্ত করেছেন আর শান্তি দানকে তিনি নিজের কর্মের অন্তর্গত হিসেবে উল্লেখ করেছেন-

غَافِرِ الذَّنْبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ ذِي الطَّولِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ - (المؤمن : (٣)

"তিনি পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর আযাব দাতা, অনুগ্রহ বর্ষণকারী। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন।” (সূরা মুমিন ৪৩)

আমরা এভাবেই দেখতে পাই, শক্তির নাম ও রহমতের নামের মধ্যে ভারসাম্য এবং মহাপরাক্রমশালী ও সৌন্দর্য নামের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে, যেমনটি বিশেষজ্ঞ আলেমগণ উল্লেখ করে থাকেন।

যে কেউ গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়ন করবে, সেই দেখতে পাবে রহমত, দয়া ও করুণা নামগুলোই আল্লাহর কিতাবে অধিকাংশ স্থানে এবং একাধিক বার উল্লেখ করা হয়েছে।

বরং বাস্তবতা হল মহান আল্লাহর নাম জাব্বার ( الجبار ) মহাপ্রতাপশালী নামটি একটিবার মাত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে সূরা হাশরের শেষ দিকে তাঁর অনেকগুলো সুন্দর গুণবাচক নামের মধ্যে। তিনি বলেনঃ هُوَ اللهُ الَّذِي لَا إِلهَ إِلاَّ هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَنَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ - هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ - (الحشر : ٢٣-٢٤)

“তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত, তারা যা শরীক করে তা হতে পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ, স্রষ্টা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদানকারী; তাঁর রয়েছে সুন্দর নামসমূহ; আসমান ও জমীনে যা আছে সবই তার মহিমা ঘোষণা করে। তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা হাশর : ২৩-২৪)

জাব্বার ( الجبار ) নামের অর্থ যিনি মহাপ্রতাপশালী যার নির্দেশ মানতে অন্যরা বাধ্য। তিনি তাদেরকে যা ইচ্ছা তা করতে বাধ্য করেন।১ এ জন্যই এটিকে আযীয [মহাপরাক্রমশালী] ও মুতাকাব্বির [অতীব মহিমান্বিত] শব্দদ্বয়ের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো শক্তি-সামর্থ্যের অর্থ বহন করে। এর অর্থ হল- পৃথিবীর অত্যাচারী, অহংকারীদেরকে জানিয়ে দেয়া যে, তারা যেন নিজেদের গণ্ডীর পরিসীমা জানতে পারে মহান আল্লাহর শক্তির মোকাবিলায় যাঁকে জমিন ও আসমানে কেউ পর্যুদস্ত-পরাস্ত করতে সক্ষম নয়।

এতদসত্ত্বেও এর সাথে তিনি 'সালাম' (শান্তি-নিরাপত্তা) নামটি যুক্ত করেছেন নিজের নামের সাথে, যার জন্য আজ মানুষ আর্ত-চিৎকার করছে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, মুসলমানদের মাঝে 'আবদুস সালাম' (শান্তিদাতার বান্দা) নামটি ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধিলাভ করেছে, সাথে সাথে আব্দুল মুমিন (নিরাপত্তাদানকারীর বান্দা) নামটি যার অর্থ হল নিরাপত্তাদান ভয়-ভীতি ও সন্ত্রাস থেকে এবং ঈমান দান করেন নাফরমানী থেকে মুক্ত করে।

কুরআন মজীদে কাহ্হার (القهار) [একচ্ছত্র ক্ষমতাধর বা পর্যুদস্তকারী] শব্দটি মাত্র ছয় জায়গাতে আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেনঃ

قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - (الرعد : ١٦) "বল, আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি এক একচ্ছত্র ক্ষমতাধর।” (সূরা রা'দ ১৬)

ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনায়, তিনি তাঁর সঙ্গী বন্দী দু'জনকে বলেছিলেন যারা ছিল মূর্তিপূজকঃ

يصاحِبَى السِّجْنِ أَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - (يوسف : ٣٩) “হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়, বহু সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন রব ভাল নাকি একচ্ছত্র ক্ষমতাধর এক আল্লাহ।" (সূরা ইউসুফ: ৩৯)

যেন তারা তুলনা করতে পারে তাদের ভ্রান্ত প্রভু এবং এই মহান প্রভুর মাঝে।

সূরা সোয়াদে বলা হয়েছেঃ

قُلْ إِنَّمَا أَنَا مُنْذِرٌ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ - (ص : ٦٥) "বল, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আল্লাহ ছাড়া আর কোন (সত্য) ইলাহ নেই। যিনি এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর।” (সূরা সোয়াদ: ৬৫)

আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এখানে নির্দেশ করছেন যেন তিনি আল্লাহর গুণাবলী থেকে মুক্ত করেন, তিনি তো একজন সতর্ককারী ছাড়া অন্য কিছু নন, আর সত্যিকার ইলাহ হলেন সেই আল্লাহ যিনি এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে এসব নাম আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই উল্লেখ করা হয়েছে যেন উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

আল-মুনতাকিম (المنتقم) [প্রতিশোধ গ্রহণকারী] নামটি কুরআন মজীদের কোথাও একক নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং অন্যভাবে (গুণবাচক শব্দ যোগ করে) (ذو انتقام) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অত্যাচারী, একনায়ক ও কাফেরদেরকে ধমক দেয়ার উদ্দেশ্যে। যেমনটি তিনি বলেনঃ

وَإِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيتِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَام - (آل عمران : ٤) "নিশ্চয় যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (সূরা আলে-ইমরান: ৪)

সূরা ইবরাহীমে কাফের জালেমদেরকে, নবী-রাসূলদের ব্যাপারে তাদের অবস্থানকে নিন্দা করা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেনঃ

فَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ مُخْلِفَ وَعْدِهِ رُسُلَهُ ، إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ ذُو انتقام - (ابراهيم : ٤٧) "সুতরাং তুমি কখনো আল্লাহকে তাঁর রাসূলদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী মনে করো না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (সূরা ইবরাহীম: ৪৭)

সূরা যুমারে যারা রাসূলদেরকে প্রতিমার ভয় দেখাচ্ছিল তাদের সে বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেনঃ

أَلَيْسَ اللهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ ، وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِنْ دُونِهِ ، وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ - وَمَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُّضِلَّ ، أَلَيْسَ اللَّهُ بِعَزِيزِ ذِي انْتِقَامٍ - (الزمر : ٣٦-٣٧)

"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদের ভয় দেখায়। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোন হিদায়েতকারী নেই। আর আল্লাহ যাকে হিদায়েত করেন, তার জন্য কোন পথভ্রষ্টকারী নেই। আল্লাহ কি মহাপরাক্রমশালী প্রতিশোধ গ্রহণকারী নন?” (সূরা যুমার: ৩৬-৩৭)

মুনতাকিম (প্রতিশোধ গ্রহণকারী) শব্দটি বহুবচন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মহান আল্লাহর এ বাণীতেঃ

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِايَتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا طَ إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ - (السجدة : (٢٢)

"আর তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? যাকে স্বীয় রবের আয়াতসমূহের মাধ্যমে উপদেশ দেয়ার পর তা থেকে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। নিশ্চয় আমরা প্রতিশোধগ্রহণকারী অপরাধীদের থেকে।” (সূরা সিজদা :২২)

বহুবচনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে নিম্নোক্ত বাণীতেঃ

يَوْمَ نَبْطِشُ الْبَطْشَةَ الْكُبْرَى إِنَّا مُنْتَقِمُونَ - (الدخان : ١٦)

"যেদিন আমি বড় আঘাত করবো, সেদিন অবশ্যই আমি তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো।" (সূরা দুখান: ১৬)

এসব নাম আল্লাহ তা'আলার মহান গুণাবলীই প্রমাণ করে থাকে, তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও মহানুভবতার কথাই বুঝিয়ে থাকে। যেমনটি তিনি নিজেই নিজেকে বিশেষিত করেছেনঃ

ذُو الْجَلَالِ وَالإِكْرَام - (الرحمن : (۲۷)

"(তিনি) মহামহিম ও মহানুভব।” (সূরা রহমানঃ ২৭)

এসব গুণাবলীকে সৌন্দর্যমূলক হিসেবেও বলা হয়ে থাকে। আর এসব নাম বা গুণাবলীই কুরআনে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে আমরা দেখতে পাব- রহমত, দয়াশীলতা, ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, ইহসান ইত্যাদি নামগুলোই কুরআনে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বিসমিল্লাহির রহমান (পরম করুণাময়) ও রহীম [অতীব দয়ালু]। নামটি বিসমিল্লাহির (بسم الله الرحمن الرحيم) কুরআন মজীদের ১১৩টি সূরার প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা সূরা ফাতিহাতে যা একজন মুসলমান দৈনিক নামাযে কমপক্ষে সতের বার পাঠ করে থাকে- "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আর-রাহমানির রাহীম।"

আমরা আরো লক্ষ্য করলে দেখতে পাই কুরআন মজীদে ১১৩টি সূরার প্রথমে ছাড়াও পাঁচ জায়গাতে রহমান ও রহীম নামটি একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা দেখতে পাই মহান আল্লাহর এ বাণীতে:

قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْء - (الأعراف : ١٥٦)

"তিনি বললেন, আমি যাকে ইচ্ছা তাকে আমার শাস্তি দিয়ে থাকি। আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।” (সূরা আ'রাফ: ১৫৬)

এখানে তিনি শাস্তি প্রদানকে তাঁর ইচ্ছার সাথে শর্তযুক্ত করেছেন আর রহমতকে কোন রকমের শর্তাধীন না করে উন্মুক্ত রেখেছেন।

আমরা কুরআনে উল্লেখ পাই যে, ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য এভাবে দু'আ করেনঃ

رَبَّنَا وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ - (المؤمن : (۷)

“হে আমাদের রব! আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আযাব থেকে তাদেরকে রক্ষা করুন।" (সূরা মুমিন: ৭)

আমরা কুরআন মজীদে একটি পূর্ণ সূরা দেখতে পাই যার নাম রাখা হয়েছে আর-রহমান (পরম করুণাময়) নামে। যা শুরু করা হয়েছে এভাবেঃ

الرَّحْمنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ - خَلَقَ الإِنْسَانَ - عَلَّمَهُ الْبَيَان - (الرحمن : ١-٤)

"পরম করুণাময়, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনি তাকে শিখিয়েছেন ভাষা।" (সূরা রহমান : ১-৪)

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই যে, কুরআন মজীদে মহান আল্লাহ নিজের নাম হিসেবে 'রহমান'কে ব্যবহার করেছেন তাঁর 'আল্লাহ' নামের মতই। তিনি বলেনঃ قُلْ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ أَيَّامًا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى - (الإسراء : ۱۱۰)

"বল তোমরা (তোমাদের রবকে) আল্লাহ নামে ডাক অথবা রহমান নামে ডাক, যে নামেই তোমরা ডাক না কেন, তাঁর জন্যই তো রয়েছে সুন্দর নামসমূহ।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ১১০)

এই নামটি কুরআনে ৫৭ (সাতান্ন) বার উল্লেখ করা হয়েছে বিসমিল্লাহ ব্যতিরেকেই।

আমরা দেখতে পাই যে, রহীম (الرحيم) [অতীব দয়ালু] নামটি কুরআন মজীদে ৯৫ (পঁচানব্বই) বার উল্লেখ করা হয়েছে বিসমিল্লাহ ব্যতিরেকেই। কখনো রহমান নামের সাথে আবার কখনো অন্য নামের সাথে যেমন 'গফুর' [ক্ষমাশীল]। যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে এই বাণীতেঃ قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ ، إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ - (الزمر : ٥٣)

"বল, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা যুমার : ৫৩)

কখনো রাউফ (الرعوف) নামের সাথে যুক্ত করে। যেমন মহান আল্লাহর এ বাণীতেঃ

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيْمَانَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ - (البقرة : ١٤٣)

"আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা বাকারা : ১৪৩)

কখনো আল-বার (البر) [ইহসানকারী] নামের সাথে যুক্ত করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ - (الطور : ۲۸)

"নিশ্চয় পূর্বে আমরা তাঁকে ডাকতাম; নিশ্চয় তিনি ইহসানকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা তুর : ২৮)

আত-তাওয়াব (التواب) [তাওবা কবুলকারী] নামের সাথে যুক্ত করেঃ

إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ - (التوبة : ۱۱۸)

"নিশ্চয় তিনিই তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবা : ১১৮)

আযীয (العزیز) [মহাপরাক্রমশালী] নামের সাথে যুক্ত করেঃ

تَنْزِيلُ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ - (يس : ٥)

"মহাপরাক্রমশালী, পরম দয়াময় (আল্লাহ) কর্তৃক নাযিলকৃত।” (সূরা ইয়াসিন : ৫)

আমরা কুরআন মজীদে দেখতে পাই যে, আরহামুর রাহেমীন (ارحم الراحمين) [সবচেয়ে বেশী দয়ালু] নামে মহান আল্লাহকে ভূষিত করা হয়েছে ৫ (পাঁচ) জায়গাতে এবং খায়রুর রাহেমীন (خير الراحمين) [সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু] নামে ভূষিত করা হয়েছে ২ (দুই) জায়গায়।

তাহলে এরা কিভাবে ধারণা করতে পারে যে, মুসলমানদের প্রভুর পরাক্রমশালী, পর্যুদস্তকারী, কঠিন, প্রতিশোধ গ্রহণকারী গুণাবলী ছাড়া অন্য কোন গুণাবলী নেই? আর মুসলমানেরা সেসব গুণাবলীই নিজেদের মাঝে রপ্ত করেছে?

তাওরাতের 'সাফারুল খুরুজ'-এ তাদের প্রভুর যে গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে যার প্রতি ইহুদী-খৃষ্টান উভয় সম্প্রদায়ই বিশ্বাস রাখে- যেখানে তাদের প্রভুকে বিশেষিত করা হয়েছে প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে। এমনকি সন্তানকে তার পিতার অপরাধে শাস্তি দিয়েছেন, পৌত্রদেরকে এমনকি পরপর চার প্রজন্মকে তাদের বাপ-দাদাদের পাপের কারণে শাস্তি দিয়েছেন।

তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে- মহান আল্লাহ বলেনঃ "আমিই তোমার প্রভু। পরম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন প্রভু। পিতার পাপের কারণে সন্তানকে শাস্তি দেই। এমনকি তৃতীয় প্রজন্মকে এবং চতুর্থ প্রজন্মকে এজন্য শাস্তি দিয়ে থাকি। ১

অথচ কুরআন মজীদে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে শাস্তি দেয়া যাবে না। একজনের গুনাহের কারণে অন্যজন জিজ্ঞাসিত হবে না। যদিও সে তার নিকটাত্মীয় হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

"প্রতিটি প্রাণ নিজ অর্জনের জন্য দায়বদ্ধ।” (সূরা মুদ্দাসসির: ৩৮)

তিনি আরো বলেনঃ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَت رَهِينَةٌ - (المدثر : ۳۸)

وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى - (الأنعام : ١٦٤)

"আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায়, আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না।" (সূরা আনয়াম: ১৬৪) আর এ কথাই সাব্যস্ত করে যে, এ বিষয়টি সমস্ত আসমানী কিতাবে স্বীকৃত-

أَمْ لَمْ يُنَبَّأ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى - وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَى - أَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخرى - (النجم : ٣٦-٣٨)

"নাকি মুসার কিতাবে যা আছে, সে সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়নি? আর ইবরাহীমের কিতাবে, যে (নির্দেশ) সে পূর্ণ করেছিল। তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা নজম : ৩৬-৩৮)

কুরআন ঘোষণা করেছেঃ মুহাম্মদের রিসালাত হল বিশ্বজাহানের জন্য রহমত স্বরূপ। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেনঃ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ - (الانبياء : ۱۰۷)

"আর আমি আপনাকে বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)

মুহাম্মদ (সা.) নিজের সম্পর্কে বলেনঃ "নিশ্চয় আমি রহমত স্বরূপ এবং পথপ্রদর্শক।" ১

মহান আল্লাহ তাঁর নবীর প্রশংসা করে সম্বোধন করেন তাঁর এ বাণীতেঃ فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ - (آل عمران : ١٥٩)

"আর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।" (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৯) দয়াশীলতার চরিত্রই প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর রিসালাতে, তাঁর জীবন- চরিতে। ২

তিনি বলেনঃ

الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ، إِرْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمُكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ -

"দয়াশীলদের প্রতি দয়াবান আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা যমিনে যারা রয়েছে তাদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আসমানে যারা রয়েছেন তারা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।"১

তিনি আরো বলেনঃ

مَنْ لَا يَرْحَمُ النَّاسِ لَا يَرْحَمُهُ اللَّهُ -

"যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।"২

কুরআন মজীদে নেককার বান্দাদের প্রশংসা করা হয়েছেঃ

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا - إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شكُورًا - (الدهر : ۸-۹)

"তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীদেরকে খাদ্য দান করে। তারা বলে- আমরাতো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে খাদ্য দান করি। আমরা তোমাদের থেকে কোন প্রতিদান চাই না এবং কোন শোকরও না।” (সূরা দাহার: ৮-৯)

আর বনী ইসরাঈলকে তাদের অন্তরের কাঠিন্যতার জন্য তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা হয়েছেঃ

ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِّنْ بَعْدِ ذلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةٌ - (البقرة : ٧٤)

"অতঃপর তোমাদের অন্তরসমূহ এর পরে কঠিন হয়ে গেল যেন তা পাথরের মত কিংবা তার চেয়েও শক্ত।” (সূরা বাকারা: ৭৪)

অন্তরের কাঠিন্যতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বনী ইসরাঈলদের ব্যাপারে বলেনঃ

فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِّيْثَاقَهُمْ لَعَنْهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قاسية - (المائدة : (١٣)

"সুতরাং তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদেরকে লানত দিয়েছি এবং তাদের অন্তরসমূহকে করেছি কঠোর।” (সূরা মায়েদা : ১৩)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

اريت الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ - فَذلِكَ الَّذِي يَدُعُ الْيَتِيمَ - وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ - (الماعون : ١-٣)

"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে হিসাব-প্রতিদানকে অস্বীকার করে? সে-ই ইয়াতীমকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না।” (সূরা মাউন: ১-৩)

এখানে ইয়াতীমের সাথে কঠোর আচরণ করাকে, মিসকীনকে খাদ্যদানে গুরুত্ব না দেয়াকে কুফরীর প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে যা মানুষকে পরকালের হিসাব-নিকাশ পর্যন্ত অস্বীকার করার পর্যায়ে নিয়ে যায়।

টিকাঃ
১. কেউ কেউ বলেন, জাব্বার (মহাপ্রতাপশালী) হলেন তিনি যিনি দুর্বলদের দুর্বলতা দূর করে তাদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটান, যদিও এই অর্থটি ধারাবাহিক অর্থের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। দেখুন, তাফসীরে কুরতুবী- সূরা হাশরের শেষাংশের ব্যাখ্যা।
১. সাফারুল খুরুজ: (২০/৫)
১. ইমাম হাকেম হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন (১/৩৫) এবং হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী এই অভিমতকে সমর্থন করেছেন।
২. দেখুনঃ অধ্যায়- চরমপন্থা ও প্রতিশোধ থেকে নম্রতা ও দয়াশীলতার দিকে, লেখক কর্তৃক লিখিত গ্রন্থ- আস্স্সাহওয়া আল-ইসলামিয়া মিনাল মুরাহাকা ইলার রুশদ, প্রকাশক- দারুশ শরুক, কায়রো।
১. আবু দাউদ ৪৯৪১, তিরমিযী ১৯২৫, তিনি বলেন, হাদীসটি সহীহ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত।
২. বুখারী ও মুসলিম জারীর (রা.) থেকে। আহমদ ও তিরমিযী আবু সাঈদ (রা.) থেকে, সহীহুল জামে ৬৫৯৭

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 পশ্চিমা সভ্যতা কি খৃষ্টীয় সভ্যতা?

📄 পশ্চিমা সভ্যতা কি খৃষ্টীয় সভ্যতা?


আমরা লক্ষ্য করছি যে, পশ্চিমারা নিজেদেরকে খৃষ্টান বলে ধারণা করে থাকে। আর তাদের সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে 'খৃষ্টান সভ্যতা'র ১ উপর। তারা গর্ব করে এই বলে যে, খৃষ্টধর্ম হল- শান্তি ও ভালবাসার ধর্ম। মসীহ (আ.) কারো প্রতি তরবারী উঁচু করেননি। বরং তিনি তার অনুসারীদের বলেছেনঃ যদি কেউ তোমার ডান গালে আঘাত করে তাহলে তুমি তার দিকে তোমার বাম গাল এগিয়ে দিবে। আর কেউ যদি তোমাকে তার সাথে এক মাইল পথ যেতে বাধ্য করে তাহলে তুমি তার সাথে দুই মাইল যাও। আর কেউ যদি তোমার জামাটি নিয়ে নিতে চায় তাহলে তুমি তাকে তোমার লুঙ্গিটিও দিয়ে দাও। ২

এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মন্দকে মন্দ দ্বারা প্রতিহত করা যাবে না। শক্তিকে শক্তি দ্বারা প্রতিহত করতে হবে না। বরং মসীহ তাঁর অনুসারীদের আহ্বান করেছেন যেন তারা তাদের শত্রুদের ভালবাসে এবং তাদের কর্মকাণ্ডে তাদেরকে সহায়তা করে। ৩

তাহলে এ কথার সত্যতা কোথায়? পশ্চিমারা কি সত্যিকার অর্থে খৃষ্টান? ইঞ্জিলের উপদেশাবলীর কোন প্রভাব কি খৃষ্টানদের জীবনে দেখা যায়? খৃষ্টানরা কি মসীহ-এর শিক্ষা নিজেদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করেছে এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের আচরণে লক্ষ্য করা গেছে?

এমনকি তারা নিজেরা পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে তা পালন করেছে?

ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছেঃ খৃষ্টানরা মসীহ-এর অনুসারীরা -সাধারণভাবে- এই উপদেশাবলী থেকে অনেক দূরে। তারা কেউ তাদের ডান গালে মারলে বাম গাল এগিয়ে দেয় না। বরং তারাই বিশ্ববাসীর দুই গালে প্রথমেই মারতে শুরু করেছে কোন রকমের কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে শত্রুতামূলক আচরণ করে।

খৃষ্টানরা ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে তাদের বিরোধিতাকারী জাতিগুলোকে হত্যা করে আসছে। এখনও অনেক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা এ কথার সাক্ষী হিসেবে বেঁচে রয়েছে। তারা মিলিয়ন মিলিয়ন লোককে হত্যা করেছে। অতি নিকট ইতিহাসও এ কথার সাক্ষী দিচ্ছে যা কখনো ভুলবার নয়। ক্যাথলিকরা তাদের উৎপত্তির পর পরই লক্ষ লক্ষ প্রোটেস্ট্যান্টকে হত্যা করে। আর প্রোটেস্ট্যান্টরা বিজয়লাভের পর লক্ষ লক্ষ ক্যাথলিককে হত্যা করে। ১

তারা নিজেরা নিজেদেরকে বিংশ শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছে। তারা সকলেই ছিল খৃষ্টান। তারা ছিল ইঞ্জিলে বিশ্বাসী এবং মসীহ-এর শান্তির ধর্মে বিশ্বাসী। এমনকি কতিপয় পশ্চিমা খৃষ্টান গবেষক বলেছেনঃ তারা মসীহ-এর নবুয়তে বিশ্বাসী নয়, যেমনটি তারা তাঁর কথাকে এই বলে বিশ্বাস করেছে যে, আমি এই দুনিয়াতে শান্তি নিয়ে আসিনি আমি এসেছি তরবারী নিয়ে। ২

এর দ্বারা ইতিহাস প্রমাণ করে এবং বাস্তবতাও প্রমাণ করে যে, শান্তির ও ভালবাসার অনুসারীরাই দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশী রক্ত ঝরিয়েছে এবং অতি দ্রুত অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণিত করেছে। আর তারা বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিয়েছে অন্যদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে।

আমরা নিজ চোখেই দেখলাম বাস্তব অবস্থা এবং নিজের হাতে স্পর্শ করলাম, দেখলাম আজকের পরাশক্তি বিশ্বের প্রভু "আমেরিকার শক্তি” যা এই পৃথিবীর বুকে রাজত্ব চালাচ্ছে প্রভুর আসনে বসে। তাকে 'জিজ্ঞেস করা যাবে না সে কি করল, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।' এর সামরিক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব দেখতে পেলাম আফগানিস্তান ও ইরাকে। সেখানে তার ধর্মীয়, চারিত্রিক ও নৈতিক অবস্থান দেখা গেছে ইরাকের কারাগারগুলোতে সে কি করেছে, বিশেষ করে আবু গরীব কারাগারে এবং এর পূর্বে গুযান্তানামো কারাগারে বন্দীদের সাথে। সেখানে বন্দীদের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে যা কোন ধর্ম, নীতিনৈতিকতা, প্রচলিত প্রথা ও আইন-কানুন সমর্থন করে না।

তেমনিভাবে তার অবস্থান দেখতে পায় যায়নবাদী ইহুদীদেরকে ও তাদের রাষ্ট্র ইসরাইলকে সদাসর্বদা অকুন্ঠ সমর্থন দানের ক্ষেত্রে, যাকে সে অস্ত্র ও অর্থবল দিয়ে ফিলিস্তিনীদের হত্যা করতে, তাদের ঘরবাড়ি, দালান-কোঠা ধ্বংস করতে, তাদের ভূমি দখল করতে, তাদের ফসল-পানি, শস্যক্ষেত্র বিনষ্ট করতে, তাদের গাছ-পালা জোরপূর্বক উপড়িয়ে ফেলতে, তাদের ছিন্নভিন্ন করতে, তাদেরকে বেষ্টনী দেয়াল দিয়ে ঘিরে গোটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে, তাদের সমাজের সবকিছুকে ধ্বংস ও নির্মূল করতে অন্ধভাবে সমর্থন দানের ক্ষেত্রে।

আমেরিকার ক্ষমতার মসনদ রয়েছে বর্তমানে কট্টর ডানপন্থী খৃষ্টানদের হাতে এবং তাদের পুরোধা হল জর্জ জুনিয়র বুশ। সে আল্লাহর বা মসীহ এর নৈকট্য লাভ করতে চায় مسلمانوںকে হত্যা করে, তাদের শাস্তি দিয়ে, তাদেরকে ক্ষুধায় কষ্ট দিয়ে। সে-ই এই জমিনের বুকে চরমপন্থা-কট্টরতা প্রয়োগ করছে আকাশের প্রভুর নামে। সে নিজেকে মনে করছে এবং তার সহযোগীরাও মনে করছে- প্রভুর প্রেরিত পুরুষ বলে। তাদের কেউ কেউ বলেছে- নির্বাচনের মাধ্যমে বুশ হোয়াইট হাউজে আসেনি, আল্লাহই বুশকে সেখানে এনেছেন। যেমনটি বহুপূর্বে মনে করেছিল চেঙ্গিস খান, যে গোটা দুনিয়া জুড়ে চালিয়েছিল হত্যা, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং সমসাময়িক রাজা-বাদশাহদেরকে এবং রাজ্যগুলোকে, মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করেছিল।

টিকাঃ
১. পশ্চিমা সভ্যতা প্রকৃতপক্ষে খৃষ্টান সভ্যতা নয়। এ সভ্যতা ভোগ-বিলাসে আকণ্ঠ নিমগ্ন। আর খৃষ্টবাদ নিমগ্ন আধ্যাত্মিকতায়। পশ্চিমা সভ্যতা বৈধতা দিয়েছে অবাধ যৌনাচারের ও সবধরণের নৈতিকতার বন্ধন থেকে মুক্ত হবার। আর মসীহ (আ.) বলেন, যে ব্যক্তি চোখ দিয়ে (খারাপ কিছু) দেখলো, সে ব্যভিচার করল। আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, এটি মসীহ ইবনে মরিয়ম (আ.)-এর সভ্যতা নয়; বরং এটি মসীহুদ্দাজ্জালের সভ্যতা। এটি একচোখ কানা সভ্যতা। এটি কানা সভ্যতা। এটি জীবন, মানুষ ও বিশ্বের দিকে একচোখে দৃষ্টি দেয়। আর তা হল- ভোগ-বিলাসের দৃষ্টিতে। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- লেখকের 'ইসলাম আগামীর সভ্যতা' গ্রন্থের 'বর্তমান সভ্যতার প্রাণ' নামক অধ্যায়, পৃ. ১১-২৫, প্রকাশনায়ঃ মাকতাবুল ওহবা, কায়রো এবং মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।
২. দেখুনঃ ইঞ্জিল মেথি, অধ্যায় ৫, অনুচ্ছেদ ৩৯-৪২; ইঞ্জিল লুকা: ৬:২৯.,৩০
৩. ইঞ্জিল মেথি: ৫:৪৩,৪৪; ইঞ্জিল লুকাঃ ৬:২৭,২৮
১. দেখুনঃ শায়খ রহমতুল্লাহ হিন্দীর লিখা 'এজহারুল হক' নামক গ্রন্থে। এতে তিনি ঘটনাবলী ও সংখ্যাসহ খৃষ্টানদের বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতি সহ তাদের জুলুম অত্যাচার, হত্যা-লুটতরাজ, যুদ্ধ-বিগ্রহের এক বীভৎস চিত্র তুলে ধরেছেন। পৃ. ৫০৯-৫২৮, আরবী সংস্করণ- এহইয়াউত তুরাস আল-ইসলামী, কাতার।
২. ইঞ্জিল মেথিঃ ১০:৪৩; ইঞ্জিল লুকাঃ ১২:১৫

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 তাওরাত ও চরমপন্থা

📄 তাওরাত ও চরমপন্থা


ইসলাম তার বিরোধীদের উপর শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কি কি সংস্কার, নতুনত্ব ও মর্যাদাকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা যদি কেউ জানতে চায় পূর্বের শরিয়ত ও ধর্মীয় বিধানের স্থানে, তাহলে তাকে খুব দ্রুত হলেও দৃষ্টি দিতে হবে তাওরাতে কি রয়েছে (বর্তমান সংস্করণগুলোতেও) যার উপর সমস্ত ইহুদী ও খৃষ্টান ঈমান রাখে। আর সেটিই হল প্রভুর কিতাব যা তিনি মুসার উপর নাযিল করেছেন। আর মসীহ (আ.) ঘোষণা করেন যে, তিনি এসেছেন মুসা (আ.) যা এনেছেন তার বিরোধীতা নয় বরং তার পরিপূর্ণতা বিধান করতে এসেছেন। ১

আমরা জানি না, পশ্চিমারা কি এসব পড়েছে, যারা ইসলামকে অভিযুক্ত করে যে সেটি 'তরবারির ধর্ম'। আর যারা ধারণা করে যে, তারা 'পবিত্র কিতাব' (তাওরাত)-এর উপর ঈমান রাখে, তারা কি এই বাণীগুলো পড়েনি? নাকি তা অনুধাবন করেনি? নাকি পড়েও তা তাদের বোধগম্য হয়নি?

সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আপনিই ন্যায়নিষ্ঠ দৃষ্টিতে দেখুন, তাওরাত যুদ্ধ এবং হত্যার বাপারে, বিরোধীদের সাথে চারমপন্থা-বাড়াবাড়ি ও শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কি বলে।

তাওরাতে সাফারু তাসনিয়াতুল এশতেরা', অধ্যায় কুড়ি-এর অধীনে 'দূরবর্তী শহর অবরোধ ও তা বিজয়ের বিধি-বিধান' শিরোনামে বলা হয়েছেঃ

"যখন তোমরা কোন শহরে যুদ্ধ করতে যাবে তখন সেখানকার অধিবাসীদেরকে প্রথমেই সন্ধির জন্য আহ্বান করবে। যদি তারা সন্ধি প্রস্তাবে সাড়া দেয় এবং তোমাদের নিকট আত্মসমর্পন করে তাহলে সেখানে বসবাসকারী সমস্ত লোকজন তোমাদের দাসে পরিণত হবে। আর যদি তারা সন্ধি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তাদেরকে অবরুদ্ধ কর। যখন তোমাদের প্রভু তাদেরকে পরাভূত করবেন তোমাদের হাতে তখন তোমরা তাদের সকল পুরুষকে তরবারি দ্বারা হত্যা করবে। আর শহরের নারী, শিশু ও জীব-জন্তু সব তোমাদের জন্য গনিমত, তোমরা তা ভোগ করবে। তোমরা তোমাদের দেয়া প্রভুর গনিমত নিয়ে উপভোগ করবে। তোমরা এভাবেই সব দূরবর্তী শহরগুলোকে পদানত করবে এবং সেখানে তোমরা এভাবেই তোমাদের কর্মকাণ্ড চালাবে।

এই হল তাওরাতের সুস্পষ্ট কঠোর নির্দেশনা বনী ইসরাইলদের জন্য বা ইহুদীদের জন্য যারা মুসার শরীয়তে বিশ্বাসী দূরবর্তী শহর অবরুদ্ধ ও বিজয় করার ব্যাপারেঃ যদি সন্ধির ব্যাপারে সাড়া দেয় তাহলে সকল অধিবাসীরা হবে তাদের দাস কোন রকমের ব্যতিক্রম ছাড়াই! আর যদি তারা সন্ধি প্রস্তাবে সাড়া না দেয় তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। যদি তাদের হাতে পতন ঘটে তাহলে তাদের উপর ওয়াজিব হল সমস্ত পুরুষদেরকে তরবারির আঘাতে হত্যা করতে হবে, এটি তাদের প্রভুর নির্দেশ। তাওরাতের শরীয়তে হত্যার কোন বিকল্প দেয়া হয়নিঃ তারা ইহুদী ধর্মে দিক্ষীত হবে বা তারা নিরাপত্তা কর (জিযিয়া) প্রদান করবে বা অন্য কিছু। তাদের প্রভুর নির্দেশে কোন ব্যতিক্রম রাখা হয়নি পুরুষদের মধ্যে সে বৃদ্ধ হোক, বড় হোক বা ছোট শিশু হোক।

এখানে কুরআন বলছেঃ

فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا اثْخَنْتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أوزارها - (محمد : ٤)

"অতএব তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ বন্ধ হয়।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৪)

এখানে কুরআন শত্রুর সাথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাদেরকে দুর্বল করতে নির্দেশ দিয়েছে, তাদেরকে যেন হত্যার পরিবর্তে বন্দী করা হয়।

কুরআন আরো বলছেঃ قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُوْنَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صغرُونَ - (التوبة : ٢٩)

"তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযিয়া (নিরাপত্তা কর) দেয়।" (সূরা তাওবা: ২৯)

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধকারী শত্রুদের জন্য হত্যা থেকে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে এবং জোরপূর্বক ইসলামে দিক্ষিত হওয়া থেকে জিযিয়া দিয়ে। অর্থাৎ সামর্থ্য থাকলে সামান্য অর্থের বিনিময়ে বেঁচে যাবার সুযোগ করে দিয়েছে ইসলাম, তাদের জানমালের নিরাপত্তারও দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

টিকাঃ
১. ইঞ্জিল মেথি- অধ্যায়-৫ঃ তোমরা মনে করোনা যে, আমি' নবীদের শরিয়ত বাতিল করতে এসেছি। বরং আমি এসেছি তার পরিপূর্ণতা বিধান করতে, অনুচ্ছেদ ১৭: দেখুনঃ ইঞ্জিল মারকাসঃ ৯:৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00