📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী-রাসূলগণের উপর যাদেরকে বিশ্বমানবতার হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ হলেন মুহাম্মদ (সা.), তাঁর পরিবার ও সাহাবাদের উপর এবং যারা তাঁর অনুসরণ করবে তাদের উপর। অতঃপর-

আমি এখানে চরমপন্থা সম্পর্কে কিছু লেখা উপস্থাপন করছি এবং এ সম্পর্কে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থান তুলে ধরছি। বিষয়টি আজ সবার নিকট বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, বিষয়টি নিয়ে গোটা দুনিয়াতে হৈ-চৈ পড়ে গেছে। এর দ্বারা শুধু মুসলমানদেরকেই অভিযুক্ত করা হয়নি বরং ইসলামকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে- ইসলাম এমন এক ধর্ম যার চিন্তাধারা ও কর্মে চরমপন্থা লালন করা হয়ে থাকে- আল্লাহর ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে, তাঁর উপর দৃঢ়বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যে তিনি (আল্লাহ) হলেন অদ্বিতীয়, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, মহাক্ষমতাধর; ইসলাম তার অনুসারীদের উপর জিহাদ ফরয করেছে যেন তারা আল্লাহর পথে যথার্থভাবে জিহাদ করে।

আমি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে চেয়েছি তাদের জন্য যারা এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল নয় এবং যারা অবগত তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আর যত অপবাদ দেয়া হয়েছে তার জবাব দিতে চেয়েছি এবং এই মহান দীন সম্পর্কে যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা হচ্ছে তা অপনোদন করতে চেয়েছি, যাকে এর কিছু নির্বোধ অনুসারী কলুষিত করেছে তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে। প্রাচীন কালের প্রবাদ বাক্যে বলা হয়েছে- 'জ্ঞানী শত্রু বোকা বন্ধুর চেয়ে উত্তম!'

আশা করি এর দ্বারা মনের ব্যথা-বেদনা কিছুটা হলেও দূর হবে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত "ফিকহুল জিহাদ” নামক বইয়ে আলোচনা করবো বলে আশা করছি। মহান আল্লাহর নিকট দু'আ করছি, তিনি যেন বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করার তওফীক দান করেন।

رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا - (الكهف : ١٠)

"হে আমাদের রব! আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড সঠিক করে দিন।" (সূরা কাহাফ : ১০)

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قدير (التحريم : ۸)

"হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।” (সূরা তাহরীম : ৮)

আর আমাদের সর্বশেষ ঘোষণা হল- সমস্ত প্রশংসা একমাত্র বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের জন্য।

দোহা, কাতার সেপ্টেম্বর, ২০০৪ ইং

মহান আল্লাহর করুণাপ্রার্থী ইউসুফ আল-কারযাভী

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থা (العنف) শব্দের আভিধানিক অর্থ

📄 চরমপন্থা (العنف) শব্দের আভিধানিক অর্থ


আল-কামুস নামক অভিধানে বলা হয়েছে- নম্রতা-দয়াশীলতার বিপরীত হল চরমপন্থা।

চরমপন্থা শব্দটি দ্বারা কাঠিন্যতা ও রুঢ়তাও বুঝানো হয়ে থাকে।

কতিপয় হাদীসে নম্রতা-দয়াশীলতার বিপরীতে চরমপন্থা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেনঃ إِنَّ اللهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطَى عَلَى الْعُنْفِ -

"নিশ্চয় মহান আল্লাহ নম্র, তিনি নম্রতা-দয়াশীলতাকে পছন্দ করেন। আর তিনি নম্রতা-দয়াশীলতার দ্বারা যা দিয়ে থাকেন চরমপন্থার মাধ্যমে তা দেন না।”¹

নবী করীম (সা.) নম্রতা-ভদ্রতাকে পছন্দ করতেন এবং বাড়াবাড়ি, চরমপন্থা ও কাঠিন্যতাকে ঘৃণা করতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে প্রতিটি বিষয়ে নম্রতা গ্রহণ করতে বলতেন।

আয়েশা (রা.) নবী করীম (সা.) থেকে বর্ণনা করেনঃ إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ الأَشَانَهُ .

"কোন বিষয়ের মাঝে নম্রতা-দয়াশীলতা থাকলে তাকে অবশ্যই সৌন্দর্যমন্ডিত করবে। আর কোন বিষয় থেকে তা (নম্রতা-দয়াশীলতা) ছিনিয়ে নিলে তাকে অবশ্যই কদর্য ও কলুষিত করে দেবে।”²

টিকাঃ
১. মুসলিম, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। হাদীস নং ২৫৯৩
২. মুসলিম, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। হাদীস নং ২৫৯৪

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 চরমপন্থা শব্দটির বর্তমান পরিভাষায় অর্থ

📄 চরমপন্থা শব্দটির বর্তমান পরিভাষায় অর্থ


বর্তমানে চরমপন্থা (العنف) শব্দটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটি একটি ধিকৃত ও অপরাধমূলক পরিভাষা বলে চিহ্নিত হয়েছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃতি লাভ করেছে। পারিবারিক ক্ষেত্রে- স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, পিতামাতা ও সন্তানদের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, পরিবারের কর্তা-কর্ত্রী ও চাকর-বাকরদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে- মালিক ও শ্রমিকদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, সাধারণভাবে শক্তিমান ও দুর্বলদের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, শিক্ষা ক্ষেত্রে- শিক্ষক ও ছাত্রদের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে- অপরাধীদেরকে শাস্তিদানের ক্ষেত্রে যেমনটি কতিপয় পশ্চিমা ইসলামী বিচার ব্যবস্থা ও শাস্তি বিধানকে চরমপন্থা ও বর্বরতা বলে অভিহিত করে থাকে।

এটি আমাদের বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। আর চরমপন্থা বলতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রকেই সাধারণত বুঝানো হয়ে থাকে। এর প্রতি ঘৃণার বাণী উচ্চকিত হচ্ছে এবং অতিসম্প্রতি এটিকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হচ্ছে, যদিও নির্দিষ্ট করা হয়নি কে এটি শুরু করেছে আর কারা এই অপরাধের সাথে জড়িত।

চরমপন্থার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী অভিযুক্ত করা হচ্ছে মুসলমানদেরকে। আর পশ্চিমারাই তাদেরকে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত করছে- কিন্তু বাস্তবতা বলছে: পশ্চিমারাই হল সবচেয়ে বেশী চরমপন্থী, আর গোটা দুনিয়ায় মুসলমানরাই চরমপন্থার শিকার। সর্বত্রই তাদের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠিত হচ্ছে।

আমরা এখানে রাজনৈতিক চরমপন্থা এবং এ ব্যাপারে মুসলমানদের অবস্থান কি? সে সম্পর্কে আলোচনা করবো।

চরমপন্থা বলতে রাজনৈতিক অঙ্গনে কি বুঝায় যা আজকে খুবই ঘৃণিত ও অপরাধমূলক কাজ?

মুসলমানদেরকে চরমপন্থী বলে অভিযুক্ত করাটা কি সঠিক? যদি সঠিক হয়, তাহলে কি ইসলাম তাদেরকে চরমপন্থা গ্রহণ করতে বলেছে?

তাহলে আসুন আমরা এখন চরমপন্থা সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করি।

চরমপন্থা সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা হল- বিরুদ্ধবাদীকে দমন করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করা বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বিরুদ্ধবাদীকে নির্মূল করা কোন রকমের আইন-কানুন বা নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে। এর ফলে নিরপরাধ ও বেসামরিক লোকদের ভাগ্যে কি ঘটবে সেদিকে মোটেই দৃষ্টিপাত না করা। এই চরমপন্থা ব্যক্তির পক্ষ থেকে হতে পারে বা কোন গোষ্ঠী কিংবা দলের পক্ষ থেকেও হতে পারে অথবা কোন সরকারের পক্ষ থেকেও ঘটতে পারে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু কিছু দলকে চরমপন্থী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অথচ তারা এ ব্যাপারে নির্দোষ, চরমপন্থা থেকে তারা মুক্ত।

আমার দৃষ্টিতে চরমপন্থা না হয়ে শক্তির ব্যবহার বা অহেতুক কঠোরতা অবলম্বন করা কিংবা সময়ের পূর্বের শক্তির ব্যবহার করা বা কোন রকমের নিয়মনীতি না মেনে শক্তির অপপ্রয়োগ করাকে বললেই ভাল হয়।

আমি বলছি, কাঠিন্যতা, আমি বলছি না- শক্তির ব্যবহার, যেমনটি আজকে অনেকেই মনে করেন।

কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে 'চরমপন্থা' শুধুমাত্র শক্তির প্রয়োগ বা সামরিক শক্তির ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চরমপন্থা ঝগড়া-বিবাদ ও বাক-বিতণ্ডাকেও শামিল করে।

কারণ ব্যতিরেকে চরমপন্থাকে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটি কথা বা কাজ যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন।

এ জন্যই ইসলামী দাওয়াতের নীতিমালা নম্রতার উপরে প্রতিষ্ঠিত, চরমপন্থা বা কাঠিন্যতার উপরে নয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ

اُدْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ - (النحل : ١٢٥) "তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর।” (সূরা নাহল: ১২৫)

তিনি অন্যত্র বলেনঃ

وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُ الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزِعُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلإِنْسَانِ عَدُوا مُبِينًا - (الإسراء : ٥٣) "আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে যা অতি সুন্দর। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করে; নিশ্চয় শয়তান মানুষের স্পষ্ট শত্রু।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ৫৩)

মহান আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন অন্যদেরকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে নিজেদের বক্তব্যে সতর্কতা অবলম্বন করে, তারা যেন উত্তম বাক্য ব্যবহার করে শুধুমাত্র ভাল কথাই নয়। যদি দুটি বাক্য থাকে একটি ভাল এবং অপরটি উত্তম; তাহলে তাঁর বান্দাদের উপর নির্দেশ হল- উত্তম বাক্যটি ব্যবহার করার।

এভাবেই একজন মুসলমান সতর্ক থাকবে তার বক্তব্যে, ঝগড়া-বিবাদে উত্তম বাক্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এবং অন্যকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ - (حم السجدة : ٣٤)

“আর ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত কর তা দ্বারা যা উৎকৃষ্টতর।” (সূরা হা-মিম সিজদা : ৩৪)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন উক্ত আদর্শের প্রকৃষ্ট নমুনা যা কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তাঁর চরিত্রটিই ছিল কুরআনী চরিত্র। বুখারী শরীফে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ইহুদীদের কতিপয় লোক রাসূল (সা.)-এর নিকট সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তিনি তাদের আসার অনুমতি দেন। তারা তাঁকে এই বলে অভিবাদন করে- আস্সামু আলাইকা (السَّامُ عَلَيْكَ) (অর্থাৎ আপনার মৃত্যু ও ধ্বংস হোক)। আমি তখন বলি- বালিস্ সামু আলাইকুম ওয়াল্লানা' (بَلِ السَّامُ عَلَيْكُمْ وَاللَّعُنْةُ) (বরং তোমাদের মৃত্যু ও ধ্বংস হোক এবং তোমাদের উপর অভিসম্পাত)। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে নম্রতা পছন্দ করেন। আমি বললাম, তারা কি বলেছে তা কি আপনি শুনেন নি? তিনি বললেন, আমি এর জবাবে বলেছি- ওয়া আলাইকুম অর্থাৎ সেটি তোমাদের উপরও। ১

এই কদর্য ইহুদীরা নবীর সাথে সম্বোধনের শিষ্টাচার রক্ষা করেনি। রবং তারা নিজেদের জিহ্বাকে বক্র করেছে, বাক্যাবলীকে বিকৃত করেছে, হে মুহাম্মাদ! আস্সালামু আলাইকা না বলে, আস্সামু আলাইকা বলেছে। কিন্তু রাসূল (সা.) এ নিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ বাঁধিয়ে না দিয়ে তিনি জবাব দিয়েছেন- ওয়া আলাইকুম (আর তা তোমাদের উপরও) বলে। অর্থাৎ তোমাদের ও আমাদের সবার উপর মৃত্যু ও ধ্বংস। তিনি তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ নম্পন্ন যুবতী স্ত্রীকে প্রতিটি বিষয়ে নম্রতা গ্রহণের শিক্ষা দিলেন।

ইসলাম যখন আলাপচারিতা ও কথাবার্তায় চরমপন্থা ও বাড়াবাড়িকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাহলে কর্মকান্ডের ক্ষেত্রেও চরমপন্থা ও কঠোরতাকে প্রত্যাখ্যান করবে এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ অহেতুক শক্তির ব্যবহার ও সামরিক শক্তির প্রয়োগকে প্রত্যাখান করেছে- তা সত্য-ন্যায়ের পথেই হোক বা বাতিলের ক্ষেত্রে এবং জুলুম ও ইনসাফ যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন।

টিকাঃ
১. বুখারী, আদাব অধ্যায়, হাদীস নং ৬০২৪; মুসলিম, সালাম অধ্যায়, হাদীস নং ২১৬৫

📘 ইসলাম ও চরমপন্থা > 📄 জাহেলী যুগে আরবদের মাঝে চরমপন্থা

📄 জাহেলী যুগে আরবদের মাঝে চরমপন্থা


জাহেলী যুগে আরবরা রুঢ়তা, বর্বরতা ও নির্দয় চরিত্রের প্রশংসা করত, দয়াপরবশ ও ন্যায়নীতি পরায়ণ চরিত্রকে নয়। আপনি কি চিন্তা করতে পারেন? তাদের কেউ কেউ নিজের সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করেছে। বিশেষ করে তারা মেয়ে সন্তানকে দারিদ্র ও আত্মমর্যাদার কারণে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম পন্থায় জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করত। মহান আল্লাহ তাদের এই জঘন্য অপকর্মকে এভাবে তুলে ধরেছেনঃ

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ - بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ - التكوير : ٨-٩)

"আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে।" (সূরা তাকভীর: ৮-৯)

কবি জুহাইর বিন আবী সালমা তার মুয়াল্লাকায় বলেনঃ যে ব্যক্তি তার অস্ত্র দ্বারা পানির হাউজ থেকে অন্যদেরকে না তাড়াবে অচিরেই তার হাউজ নষ্ট হয়ে যাবে।

আর যে ব্যক্তি মানুষের উপর জুলুম না করবে, সে অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হবে।

কবি এখানে মানুষকে উৎসাহিত করেছে জুলুম করার জন্য যেন তারা

নিজেরাই জুলুম শুরু করে তাহলে তারা জুলুমের শিকার হবে না। যেমনটি অপর এক ব্যক্তি বলেছিল, "তুমি তোমার শত্রু দ্বারা দুপুরের খানা খাও, সে তোমাকে দিয়ে রাতের খানা খাবার পূর্বেই।”

অপর এক জাহেলী কবি আমর ইবনে কুলসুম বলেন, দুনিয়াতো আমাদের জন্যই, আর যারা গতকাল ছিল আমরা তাদের উপর আক্রমণ চালাবো সর্বশক্তি দিয়ে।

আমরা হবো দুর্দান্ত জালেম, আমরা জুলুমের শিকার হবো না আমরাই প্রথমে জুলুম শুরু করবো জালিম হিসেবে।

তিনি আরো বলেন, আমরা কোন পানির ঘাটে গেলে পরিচ্ছন্ন পানি পান করবো আর অন্যরা পান করবে ঘোলা ও কর্দমাক্ত পানি।

এ ধরনের চরিত্রের প্রসার লাভে তাদেরকে সহায়তা করত অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা ও গোত্রপ্রীতি। এ কারণে মানুষ তার স্বগোত্রীয় লোকজনকে সে সঠিক বা বাতিল যা-ই হোক না কেন, তাকে সাহায্য করত, একথার বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর- "তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর সে জালিম হোক বা মাজলুম।”

তারা তাদের ভাইকে জিজ্ঞেস করে না যখন তাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। কোন বিপদাপদে যে, তুমি কি কারণে আমাদের সাহায্য চাও- প্রমাণ দাও।

তাদের কোন এক দলনেতা বলে, সে যখন ক্রোধান্বিত হয়: তার সাথে.... একহাজার তরবারী ক্রোধান্বিত হয়, তাকে জিজ্ঞেস করে না- কেন ক্রোধান্বিত হয়েছো?

যখন তাদেরকে মহান আল্লাহ ইসলামের দ্বারা ধন্য করলেন, তাদেরকে এক নতুন চরিত্রে গড়ে তুললেন, তাদের আকিদা-বিশ্বাস এবং চিন্তাধারায় পরিবর্তন সাধন করলেন, তাদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটালেন। তাদেরকে সঠিক চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠিত করে চরিত্রকে সংশোধন করলেন যেন তারা মানবতার সামনে সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম হয় যদিও তা নিজেদের জীবনের উপর বা সন্তান-সন্ততি কিংবা নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে হয়ে থাকে। তাদেরকে গোত্রপ্রীতি বা ক্রোধ সত্য-ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তারা হকের সাথেই হকের জন্য ছুটেছে। তারা তরবারী হাতে নিয়েছে একমাত্র সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই বা বাতিলকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে কিংবা ইনসাফ কায়েমের জন্যে অথবা মাজলুমকে সাহায্য করার নিমিত্তে।

নবী করীম (সা.) তাদের সামনে "তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে জালেম হোক বা মাজলুম হোক।" বাক্যের নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরলেন- তাকে জুলুম থেকে বাধা দিবে, সেটিই তাকে সাহায্য করা হবে।

ইসলাম জাহেলিয়াতের যুদ্ধ-বিগ্রহকে নিষিদ্ধ করে এবং মুসলমানদেরকে আহ্বান করে তারা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামের মধ্যে দাখিল হয়। তারা সকলেই যেন সত্যের নিকট মস্তক অবনত করে, যুদ্ধের উপর শান্তিকে প্রাধান্য দেয় এবং রাগের উপর ক্ষমা ও মার্জনাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে। এরা শক্তির আশ্রয় একমাত্র তখন গ্রহণ করে যখন শত্রুতা ও আক্রমণ প্রতিহত করার আর কোন পথ থাকে না কিংবা দীনের ব্যাপারে কোন ফিতনা দূর করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে বা দুর্বল-অসহায়দেরকে মুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে কিংবা এধরনের কোন বিশেষ প্রয়োজনেই তারা শক্তি প্রয়োগে এগিয়ে আসে। তারা নিরুপায় হয়েই যুদ্ধে জড়ায়। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেনঃ

كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ - (البقرة : ٢١٦) "তোমাদের উপর লড়াইয়ের বিধান ফরজ করা হয়েছে অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়।” (সূরা বাকারা: ২১৬)

কিন্তু যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে লড়াই ব্যতিরেকেই যেমনটি ঘটেছিল খন্দকের যুদ্ধে। তখন সে সম্পর্কে কুরআন মজীদে এভাবে ব্যক্ত করা হলঃ

وَرَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا . وَكَفَى اللهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ ، وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عزيزا - (الأحزاب : ٢٥)

“আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের আক্রোশসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোন কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রবল শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (সূরা আহযাব: ২৫)

কত সুন্দর বক্তব্য ও ভাষা যা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় ইসলাম সন্ধির ব্যাপারে কতটা আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে অগ্রণী। "যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”। মুমিনরা যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না, তারা যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়, নিরুপায় হয়ে যুদ্ধে জড়ায়।

যখন হুদায়বিয়ার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে সন্ধির মাধ্যমে এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে যাবার উপক্রম হবার পর এবং নবী করীম (সা.) তাঁর সাহাবাদের নিকট থেকে জীবনপণ বাইয়াত গ্রহণ করেন, এই ঐতিহাসিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সূরাতুল ফাতহ নাযিল হয় এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে। সেখানে রাসূল (সা.)-কে সম্বোধন করে বলা হয়ঃ

إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا - (الفتح : ١) "নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি।” (সূরা ফাতহঃ ১)

একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেন- হে আল্লাহর রাসূল! এটি কি বিজয়? তিনি বললেনঃ "হাঁ, এটি বিজয়।” ১ তিনি চিন্তাই করতে পারেননি যে, যুদ্ধ-বিগ্রহ ব্যতিরেকেই বিজয় হতে পারে।

রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেনঃ "তোমরা শত্রুর (যুদ্ধের জন্য) সাক্ষাৎ কামনা করো না। মহান আল্লাহর নিকট নিরাপদ থাকার জন্য প্রার্থনা কর। কিন্তু যদি সাক্ষাৎ ঘটে যায় তাহলে ধৈর্য ধারণ করবে। জেনে রেখো, জান্নাত হল তরবারির ছায়ার নিচে।” ১

তিনি মনে করেন শান্তি ও নিরাপত্তাই হল নিরাপদ থাকার উপায় যা প্রত্যেক মুসলমান কামনা করে এবং মহান আল্লাহর নিকট সর্বদা দু'আ-প্রার্থনা করতে থাকে নিরাপদে থাকার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ -

“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।”২ রবং নবী করীম (সা.) যুদ্ধ (حرب) শব্দটিকেই অপছন্দ করতেন। তিনি সেটি শুনতেই পছন্দ করতেন না। এ জন্যই তিনি বলেছেনঃ

أَحَبُّ الأَسْمَاءِ إِلَى اللهِ عَبْدِ اللَّهِ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ وَأَقْبَحُ الْأَسْمَاءِ حَرْبٍ وَمُرَّة -

"আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নাম হল- আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) ও আব্দুর রহমান (দয়াময় প্রভুর বান্দা) এবং ঘৃণিত নাম হল- হারব (যুদ্ধ) ও মুরা (তিতা)।”৩

কিন্তু মুসলমানদেরকে যদি আহ্বান করা হয় দীন, জান-মাল, পরিবার-পরিজন ও দেশ রক্ষার জন্য: তাহলে তারা দ্রুত ছুটে আসবে, তারা পেছনে পড়বে না বা জমিনকে আঁকড়ে ধরবে না। যেমনটি মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেনঃ

يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَالَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ اثَاقَلْتُمْ إِلَى الأَرْضِ ، أَرَضِيْتُمْ بِالْحَيَوةِ الدُّنْيَا مِنَ الآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا فِي الآخِرَةِ الا قَلِيلٌ - إِلَّا تَنْفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا ، واللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قدير - (التوبة : ٣٨-٣٩)

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হল, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা যমিনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার ভোগ-সামগ্রী আখেরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। যদি তোমরা (যুদ্ধে) বের না হও, তিনি তোমাদের বেদনাদায়ক আযাব দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক কওমকে আনয়ন করবেন, আর তোমরা তাঁর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা তাওবা: ৩৮-৩৯)

টিকাঃ
১. আবু দাউদ, জিহাদ অধ্যায়, হাদীস নং ২৭৩৬, মাজমা বিন জারিয়া (রা.) থেকে।
১. বুখারী হাদীস নং ২৯৬৬, মুসলিম হাদীস নং ১৭৪২, আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা (রা.) থেকে।
২. আবু দাউদ হাদীস নং ৫০৭৪, ইবনে মাজা হাদীস নং ৩৮৭১, হাকেম হাদীস নং ১/৫১৭ ইবনে উমর (রা.) থেকে।
৩. আবু দাউদ, আদাব অধ্যায়, হাদীস নং ৪৯৫০, আবু ওহাব জুশামী (রা.) থেকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00