📄 রাজস্ব আয় (দু’প্রকার)
রাজস্ব আয় দু’প্রকার:
📄 বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য গৃহীত ঋণ (২ প্রকার)
বাজেট ঘাটতি ও তা পূরণ: ব্যয় থেকে আয় বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তাই ঘাটতি। যেমন পাকিস্তানের ১৯৯২-৯৩ এর বাজেটে ঘাটতির পরিসংখ্যান নিম্নরূপ-
মোট ব্যয় ৩৩০ কোটি টাকা।
মোট আয় ২৬৫ কোটি টাকা।
ঘাটতি ৬৫ কোটি টাকা।
এ ঘাটতি পূরণের জন্য পুঁজি সরবরাহ করাকে 'ঘাটতি পূরণ' (Deficit Financing) বলে। ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ঋণ গ্রহণ করে। এ ঋণ দু’প্রকার-
📄 (ঋণের মেয়াদ তিন ধরনের)
ঋণের তিন ধরনের মেয়াদ হয়ে থাকে- যা বাজেটে লিখা থাকে।
📄 ঘাটতি পূরণের বিকল্প পদ্ধতি
যখন সুদমুক্ত অর্থনীতির কথা আলোচনা করা হয় তখন বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে তা সর্বাধিক কঠিন সমস্যা মনে করা হয়। অনেকেই ভাবতে থাকে, যদি সুদি ঋণ নেয়ার পথ একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য যে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নেয়া হয়, তা নেয়ার পদ্ধতি কী হবে? কেননা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তো শিরকত ও মুদারাবা পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব। কিন্তু যে সকল খাতে সরকার ঋণ গ্রহণ করে তার সবগুলো এমন লাভজনক নয় যে শিরকত-মুদারাবা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে। যেমন সড়ক, সেতু, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ, সেনা বাহিনীর জন্য নতুন অস্ত্র সংগ্রহ করা। অনুরূপভাবে এমন অনেক পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হয় যার ফায়দা পুরো জাতি ভোগ করে, কিন্তু তা থেকে সরাসরি কোনো আয় আসে না, বিধায় সেক্ষেত্রে শিরকত ও মুদারাবা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় না।
এ প্রশ্নের উত্তরে সর্বপ্রথম কথা হচ্ছে, বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য সর্বপ্রথম অপচয়মূলক ব্যয় পরিহার করা প্রয়োজন- রাত দিন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে যার প্রদর্শনী হয়। একটি দরিদ্র দেশে যার কোনো বৈধতাও নেই। তেমনিভাবে আমাদের দেশে ঘুষ দুর্নীতির কারণেও অনেক বিরাট অংকের টাকা নষ্ট হয়। এর রাস্তা বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু তারপরও এ বাস্তবতা স্বস্থানে থেকে যাবে। অপচয়মূলক ব্যয় পরিহার এবং দুর্নীতি বন্ধ করা সত্ত্বেও দেশের প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য পুঁজি সরবরাহের অন্য মাধ্যমের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে। বর্তমান অবস্থায় এ উদ্দেশ্যের জন্য সুদের ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হয়। সুদমুক্ত করার পর সরকারের বিভিন্ন প্রয়োজনের জন্য বিভিন্ন অর্থসংস্থান পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। যার কয়েকটি হলো:-
১. সরকারের যে প্রতিষ্ঠান লাভজনক যেমন টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ বিভাগ- এর অর্থসংস্থানের জন্য মুদারাবা সার্টিফিকেট জারি করা যেতে পারে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এ মুদারাবা সার্টিফিকেট গ্রহণ করবে, সে ঐ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশে তার অংশ অনুযায়ী শরীক হবে। তেমনিভাবে যদি কোনো মহাসড়ক বা সেতু নির্মাণ করতে হয় তাহলে তার ব্যবহারের উপর ফিস আরোপ করা যেতে পারে। এর দ্বারা এ প্রকল্পও লাভজনক হয়ে যাবে। এর মাধ্যমেও জনসাধারণের মধ্যে মুদারাবা সার্টিফিকেট জারি করা যেতে পারে।
২. যে প্রকল্প কোনোভাবেই লাভজনক না হবে তার অর্থসংস্থানের জন্য এমন সুদমুক্ত বন্ড জারি করা যেতে পারে- যার উপর কোনো বিনিময় প্রদান করা হবে না। তবে তার গ্রাহকদের ট্যাক্সে ছাড় দেয়া যেতে পারে। ট্যাক্স ছাড় পদ্ধতি অধিক হারে আকর্ষণীয় বানানো যেতে পারে। ট্যাক্স যেহেতু জনসাধারণের উপর সরকারের ঋণ নয়, এ কারণে তা মওকুফ বা তাতে ছাড় দেয়া সুদের মধ্যে গণ্য হবে না। সরকার ট্যাক্স বসাতে এবং বিভিন্ন বিভাগকে ছাড় দেয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন কারণ সামনে রাখে। যদি এ কারণও সামনে রাখা হয় তাহলে তাতে কোনো ক্ষতি নেই।
৩. আরেকটি প্রস্তাবও বিবেচনাযোগ্য। ঋণপত্রের মাধ্যমে জনগণ থেকে ঋণ নিয়ে শর্তযুক্ত অতিরিক্ত কিছু প্রদান করা না গেলেও কখনো সুযোগমতো কিছু পুরস্কার দেয়াতে কোনো বাঁধা নেই। আইনগতভাবে সে পুরস্কার দাবি করার কোনো অধিকার থাকবে না। মালয়েশিয়ায় এ প্রস্তাবের উপর কার্যক্রম চলছে। যেহেতু এ পদ্ধতিতে পুরস্কার শর্তযুক্তও নয়, আর তার হারও ধার্যকৃত নয় এবং তা পাওয়াও নিশ্চিত নয়, ঋণদাতার পক্ষ থেকে তার দাবিও নেই- এ কারণে দর্শনগত দিক থেকে তার উপর সুদের সংজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু সন্দেহ হয়- ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলে এটা المعروف کالمশروط এ মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আরো একটি প্রস্তাব হচ্ছে, এ অতিরিক্ত আদায়কে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ঋণের মেয়াদে মোট জাতীয় উৎপাদনে যত বৃদ্ধি পাবে, ততটুকু বেশিই জনসাধারণেরকে দেয়া হবে। যদি কোনো বৃদ্ধি না থাকে, তাহলে অতিরিক্ত কিছু দেয়া হবে না। এ প্রস্তাবের ব্যাপারে এখনো আমার নেতিবাচক বা ইতিবাচক কোনো দিকে দৃঢ়তা নেই। কিন্তু ওলামায়ে কেরামের এ ব্যাপারে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।
৪. সরকারের নিজের কাজের জন্য, অনুরূপভাবে সেনাবাহিনীর জন্য অনেক মেশিনারি সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। এর অর্থসংস্থানের জন্য ইজারা পদ্ধতিও সহজে গ্রহণ করা যায়। কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এসব সামগ্রী ইজারার ভিত্তিতে লাভ করা যায়।
৫. এ ছাড়া একটি বহুমুখী কর্মপ্রক্রিয়া হতে পারে। সরকার তার ব্যয়ের অর্থসংস্থানের জন্য একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করবে। এ প্রতিষ্ঠান সরকারি বিভাগেও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে এবং তাকে আধা সরকারিও বানানো যেতে পারে। এ প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য মুদারাবা সার্টিফিকেট চালু করবে। আর এ সার্টিফিকেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনগণের টাকা থেকে সরকারকে বিভিন্ন কাজের মধ্যে শিরকত, মুদারাবা, ইজারা এবং মুরাবাহার ভিত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করবে। যার বিস্তারিত প্রক্রিয়া ব্যাংকিং অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এ বিনিয়োগের ফলে যে আয় হবে সেটা মুদারাবা সার্টিফিকেটধারীদের মধ্যে অংশ অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। এ মুদারাবা সার্টিফিকেট সেকেন্ডারি মার্কেটে ক্রয়-বিক্রয়যোগ্যও হতে পারে। এভাবে জনসাধারণ আশ্বস্ত হতে পারে যে, তার খাটানো টাকা যখন ইচ্ছা সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করে ফেরত নিতে পারবে। আর সার্টিফিকেট নিজের কাছে রাখতে চাইলে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের আয়ে অংশীদার হতে পারবে।
মোটকথা, বিভিন্ন প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন এবং তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা যেতে পারে।
এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের এক বিরাট অংক থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ। তার উপর সুদের লেনদেন নিছক একটি কাগজী জমা খরচ। এটা বাদ দিতে কোনো জটিলতা নেই। তেমনিভাবে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ঋণের লেনদেনেও সুদের কার্যক্রম সহজেই দূর করা যেতে পারে। এতেও কোনো জটিলতা নেই।
বৈদেশিক ঋণের ব্যাপারেও যদি সরকার আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করে তাহলে অন্য দেশকে ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতির ভিত্তিতে টাকা সরবরাহ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বৈদেশিক ঋণদাতাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন করা, মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। এর একটি সরল দৃষ্টান্ত হচ্ছে, অনেক দেশ ঋণ দেয়ার সময় শর্তারোপ করে যে, দ্রব্য-সামগ্রী তাদের দেশ থেকেই ক্রয় করতে হবে। যখন দ্রব্য সামগ্রী তাদের দেশ থেকেই ক্রয় করতে হবে তখন ঋণের পরিবর্তে দ্রব্য-সামগ্রীকেই মুরাবাহা মুয়াজ্জালা-এর ভিত্তিতে গ্রহণ করতে কী অসুবিধা? এখন সারা দুনিয়ায় ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতি ক্রমে ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠছে। I.M.F. এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে এ ব্যাপারে যথারীতি গবেষণা হচ্ছে। তার থেকে কোনো কোনোটার সমর্থনে পাশ্চাত্য লেখকদের প্রবন্ধও প্রকাশিত হচ্ছে। I.F.C. (ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন- যা বিশ্ব ব্যাংক ধাঁচের একটি প্রতিষ্ঠান এবং খাঁটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদান করে) এখন ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিজেরাই ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতির ভিত্তিতে কারবার করছে। এ অবস্থায় ইসলামী দেশগুলো যদি আন্তরিকতা এবং গুরুত্বের সাথে অন্য দেশের সাথে এ ভিত্তিতে লেনদেনের চেষ্টা করে তাহলে সাফল্য অর্জন কঠিন কিছু নয়।