📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 জায়েয প্রবক্তাদের বক্তব্য ও তার জবাব

📄 জায়েয প্রবক্তাদের বক্তব্য ও তার জবাব


শায়খ মুস্তফা আয্যারকা এবং শায়খ আলী আল-খফীফের দলিল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার সুযোগ এখানে নেই। তবে তাঁদের দলিলের সারাংশ জবাবসহ পেশ করা হলো-

১. বাণিজ্যিক বীমা জুয়া নয়। কেননা, জুয়া এবং বীমার মধ্যে পার্থক্য আছে। জুয়া মূলত কোনো চুক্তি (عقد) নয়- এক ধরনের খেল-তামাশা মাত্র। আর বীমা ঐচ্ছিকভাবে সম্পাদিত এক বিশেষ চুক্তি।
উত্তর: বীমা নামক চুক্তিটি জুয়া, সুদ ও ধোঁকাবাজি হওয়ার বিষয়টি আমরা পূর্বের আলোচনায় স্পষ্ট করে দিয়েছি। জুয়া হওয়ার জন্য খেল-তামাশা বা ঠাট্টা হওয়া জরুরি নয়। ঐচ্ছিক চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও তা জুয়ায় পরিণত হতে পারে।

২. দুর্ঘটনা কবলিত অবস্থায় কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রাপ্ত টাকা মূলত চুক্তিকৃত বস্তু নয়; বরং বীমা করার ফলে লাভ হওয়া নিরাপত্তাই মূলত চুক্তিকৃত বস্তু। আর নিরাপত্তার বিনিময় ধার্য করা যায়- যেমন প্রহরীর বেতন নিরাপত্তার বিনিময়ে ধার্য করা হয়।
উত্তর: চুক্তিকৃত বস্তু নিরাপত্তা নয়- বরং টাকাই। আর নিরাপত্তা হলো তার একটি ফলাফল বা পরিণাম। আর প্রহরীর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার বিনিময়ে বেতন ধার্য করা হয় না- বরং প্রহরা সেবার বিনিময়ে ধার্য করা হয়। আর নিরাপত্তা হলো সেই প্রহরা সেবার একটি ফলাফল মাত্র। অতএব যেহেতু কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রাপ্ত টাকাই চুক্তিকৃত বস্তু হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে তখন প্রদেয় ও প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে সমতা আবশ্যক- যা বীমার মধ্যে নেই।

৩. সহযোগিতা বীমা (Mutual Insurance)-কে সকল উলামায়ে কেরামই জায়েয বলেন। এরই একটি সম্প্রসারিত রূপ হলো বাণিজ্যিক বীমা (Commercial Insurance)।
উত্তর: সহযোগিতা বীমা একটি অনুদান (تبرع) ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক বীমা হলো একটি বিনিময় (معاوضة) ব্যবস্থা। আর শরীয়তে অনুদানের ক্ষেত্রে ধোঁকা (গুরার) সহনীয় হলেও বিনিময় চুক্তিতে তা সহনীয় নয়।

৪. তাদের আরেকটি দলিল হলো, বীমা একটি নতুন চুক্তি। আর যে কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো- ততক্ষণ পর্যন্ত তাতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি না পাওয়া যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা বৈধ বলে বিবেচিত হবে।
উত্তর: শরীয়তের দৃষ্টিতে বীমা জুয়া, সুদ এবং ধোঁকা হওয়ার বিষয়টি আমরা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে মূলগত বৈধতার নীতি চলবে না。

টিকাঃ
১. যেমন কোনো ব্যক্তি বললো, যদি আগামী শুক্রবার বৃষ্টি হয় তাহলে আমি তোমার নিকট আমার ঘরটি বিক্রি করলাম। এটি হচ্ছে বিনিময় চুক্তি, অতএব গুরারের কারণে না-জায়েয হবে। তবে সে যদি বলে, আগামী শুক্রবার বৃষ্টি হলে আমি তোমাকে এই ঘরটি দান করবো। তাহলে এটি হবে অনুদান চুক্তি।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 বীমার বিকল্প

📄 বীমার বিকল্প


বীমার একটি বিকল্প তো সহযোগিতা বীমা (Mutual Insurance)। এতে শরীকরা স্বেচ্ছায় ফান্ডে টাকা জমা করে। সারা বছর ধরে যে সকল গ্রাহকের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় তাদের ঐ ফান্ড থেকে সাহায্য করা হয়। আর বছর শেষে টাকা থেকে থাকলে শরীকদের অংশ অনুযায়ী ফেরত দেয়া হয়। অথবা আগামী বছরের ফান্ডের চাঁদা হিসেবে তাদের অনুমতি সাপেক্ষে রেখে দেয়া হয়।

এছাড়া বর্তমানে ইসলামী দুনিয়ার কয়েকটি দেশে شركات التكافل নামে বাণিজ্যিক বীমার বিকল্প হিসেবে কিছু কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মৌলিক রূপরেখা হলো, প্রত্যেক বীমা গ্রহীতা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার। কোম্পানি তার মূলধন লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করে এবং কোম্পানিরই একটি রিজার্ভ ফান্ড থেকে বীমা গ্রহীতাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। আমার এখনো ঐসব কোম্পানির কর্মপন্থা ও খুঁটিনাটি বিস্তারিতভাবে ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি। তাই এখনো আমি এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তমূলক কথা বলতে পারছি না।

টিকাঃ
১. পরবর্তীতে শাইখুল ইসলাম দা.বা. ১৪২৬ হিজরি মোতাবেক ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াকফের ভিত্তিতে বীমার রূপরেখা অঙ্কন করে "তাকফুল" নামে এক অনবদ্য রচনা লিখেন- যার সারসংক্ষেপ নিম্নে দেয়া হলো- (১) প্রথমে একটি ওয়াকফ কল্যাণ ফান্ড গঠন করা হবে- যে ফান্ডের মূলধনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দানে এবং চিরস্থায়ী জনকল্যাণমূলক খাতে ওয়াকফ করা হবে। (২) ওয়াকফ ফান্ডটি আইনগত ব্যক্তিসত্তা সম্পন্ন হওয়ার দরুণ নিজেই নিজের সম্পত্তির মালিক বলে বিবেচিত হবে। (৩) বীমা গ্রাহকরা নির্দিষ্ট অনুদান দিয়ে ফান্ডের সদস্যপদ লাভ করবে। (৪) বীমা কোম্পানিতে করা গ্রাহকদের অনুদান তাদের মালিকানা থেকে বের হয়ে ওয়াকফ ফান্ডের মালিকানাধীন সাব্যস্ত হবে। (৫) ওয়াকফ ফান্ড ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দানের নীতিমালা প্রণয়ন করবে। (৬) ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণ ওয়াকফ ফান্ডের পক্ষ থেকে গ্রাহকের প্রতি নিঃশর্ত অনুদান হিসেবে বিবেচিত হবে। (৭) বীমা ফান্ডের জন্য বাৎসরিক সারপ্লাস প্রদান ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিতি (Reserve) করা বৈধ হবে। (৮) কোম্পানির কাজ দুটি: ফান্ড পরিচালনা ও বিনিয়োগ। (৯) কোম্পানির লাভের উৎস হবে নিজস্ব মূলধন বিনিয়োগ, ফান্ডের সার্ভিস চার্জ এবং মুদারিব হিসেবে প্রাপ্ত লভ্যাংশ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px