📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 আমদানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প

📄 আমদানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প


আগেই বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রেও ব্যাংকের বিরাট অবদান রয়েছে। আমদানি (Import)-এর বেলায় ব্যাংক L.C. খোলে। ব্যাংক এক্ষেত্রে ওকালত ও জামানতের পারিশ্রমিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঋণের সুদও গ্রহণ করে। শরয়ী বিধানের আলোকে জামিন হওয়ার পারিশ্রমিক এবং ঋণের সুদ নেওয়া জায়েয নেই। তাই বিনিময় গ্রহণ করতে হলে L.C.-এর বিকল্প দু'টি পদ্ধতি হতে পারে:
বিকল্প এক: মুরাবাহা
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে L.C.-এর লেনদেন সাধারণত মুরাবাহার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে, যার প্রক্রিয়া হচ্ছে- বিদেশ থেকে যে পণ্যটি আমদানি করতে হবে ব্যাংক তাতে উকিল না হয়ে নিজে তা ক্রয় করে আমদানি করবে এবং আমদানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির কাছে তা অধিক মূল্যে বিক্রি করে দেবে। L.C.-এর ফিস ইত্যাদি মুরাবাহার হারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। মুরাবাহার শর্তাদি রক্ষা করা হলে মৌলিকভাবে এর মধ্যে কোনো অসুবিধা নেই। তারপরও কার্যক্ষেত্রে এ পদ্ধতি পছন্দনীয় বলে মনে হয় না। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে- ১. প্রথমত এ পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে মুরাবাহার শর্তাদি পূরণ করা কঠিন হয়। ২. দ্বিতীয়ত ব্যাংক কর্তৃক ঐ বস্তু ক্রয় করে মুরাবাহা করা কেবল একটি কৃত্রিম কার্যক্রম। ৩. তৃতীয়ত মুরাবাহা জায়েয হওয়ার জন্য জরুরি হচ্ছে, যে পণ্য আমদানি করা হচ্ছে তা প্রথমে ব্যাংকের জামানতে আসতে হবে- অথচ তা করা হয় না।
বিকল্প দুই: শিরকত বা মুদারাবা
L.C.-এর সঠিক বিকল্প হলো, প্রচলিত মুরাবাহার পদ্ধতি পরিহার করে শিরকত বা মুদারাবার ভিত্তিতে লেনদেন করা। (১) L.C. জিরো মার্জিনে হলে মুদারাবার লেনদেন হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক হবে রব্বুলমাল ও আমদানিকারক হবে মুদারিব। (২) আর L.C. আংশিক মার্জিনে খোলা হলে শিরকতের লেনদেন হবে। মুশারাকা বা মুদারাবার প্রক্রিয়া হবে এমন- ব্যাংক আমদানিকারককে বলবে, মালের মূল্য ব্যাংক তাৎক্ষণিক পরিশোধ করে দেবে এবং পরবর্তীতে মাল বিক্রি করে যে লাভ হবে তা নির্ধারিত হারে বণ্টন করে নেওয়া হবে।

টিকাঃ
১. আমরা জানি L.C-এর তিনটি পদ্ধতি হতে পারে। এখানে দুইটি উল্লেখ হয়েছে। তৃতীয়টি হলো, ফুল মার্জিনে L.C. খোলা। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী হবে 'রব্বুলমাল' আর ব্যাংক হবে 'মুদারিব'।
১. 'মুশারাকা' হবে শুধু ২য় সুরতে। প্রথম ও তৃতীয় সুরতে হবে 'মুদারাবা'। আর মুশারাকার ন্যায় মুদারাবাও নির্দিষ্ট মেয়াদী হতে পারে।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 রপ্তানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প

📄 রপ্তানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প


এল.সি. কার্যক্রম রপ্তানিকারক ব্যাংককে Negotiating Bank বলে। এ ব্যাংক রপ্তানিতে দু'ধরনের ভূমিকা পালন করে-
১. উকালতি: প্রথমত Negotiating Bank রপ্তানিকারকের উকিল হিসেবে মাল প্রেরণের কাগজপত্র (Bill of Lading) প্রেরণ করে এবং আমদানিকারক থেকে টাকা উসুল করে রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়। উকিল হিসেবে এ সেবা প্রদান করে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে। এ পারিশ্রমিক গ্রহণের ব্যাপারে শরয়ী কোনো আপত্তি নেই। কারণ, এসব সেবার 'সার্ভিস চার্জ' গ্রহণ করা জায়েয।
২. রপ্তানি বিনিয়োগ: দ্বিতীয়ত পণ্য ক্রয় করতে বা প্রস্তুত করতে রপ্তানিকারকের মূলধন প্রয়োজন হলে তা Negotiating Bank সরবরাহ করে। এ ধরনের বিনিয়োগকে 'রপ্তানি বিনিয়োগ' (Export Financing) বলে। এই 'রপ্তানি বিনিয়োগ' দুই প্রকার- ১. শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগ ২. শিপমেন্ট পরবর্তী বিনিয়োগ।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগের বিকল্প

📄 শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগের বিকল্প


‘শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগ’-এর দু’টি শরয়ী বিকল্প হতে পারে-
বিকল্প এক: মুরাবাহা
অনেক ইসলামী ব্যাংকেই শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুরাবাহার পদ্ধতি চালু হয়েছে। এর প্রক্রিয়া হলো, স্বয়ং রপ্তানি ব্যাংকই উক্ত পণ্যটি রপ্তানিকারক (Exporter) থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে ক্রয় করে আমদানিকারকের নিকট নির্ধারিত মূল্যে পাঠিয়ে দেয়। উভয় মূল্যের ব্যবধানটুকু ব্যাংকের লাভ থেকে যায়। কিন্তু এ পদ্ধতিতে কয়েকটি ত্রুটি রয়েছে। তা হলো, এ পদ্ধতিতে বিক্রয়ের শরয়ী দাবি সাধারণত পূরণ হয় না। ব্যাংককে বিক্রেতা মনে করা হয় না, বরং এটি একটি কৃত্রিম কার্যক্রম বলে মনে হয়।
বিকল্প দুই: শিরকত বা মুদারাবা
শিপমেন্ট-পূর্ব বিনিয়োগের উত্তম পন্থা হলো, ব্যাংক এবং গ্রাহকের মধ্যে শিরকত বা মুদারাবার চুক্তি হবে। যদি গ্রাহকও কিছু টাকা অগ্রিম প্রদান করে তাহলে হবে শিরকত, আর যদি সে কোনো টাকা না খাটায় তাহলে মুদারাবার চুক্তি হবে। গ্রাহক ব্যাংক থেকে মূলধন সংগ্রহ করে পণ্য ক্রয় বা প্রস্তুত করে বিদেশে প্রেরণ করবে। যে লাভ হবে তা যথারীতি বণ্টিত হবে। ব্যাংক প্রার্থীত কোয়ালিটির মাল প্রেরণ করার শর্তারোপ করতে পারে।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 শিপমেন্ট পরবর্তী বিনিয়োগ পদ্ধতি

📄 শিপমেন্ট পরবর্তী বিনিয়োগ পদ্ধতি


শিপমেন্ট পরবর্তী বিনিয়োগের পদ্ধতি 'বিল অব এক্সচেইঞ্জ' কম্বিয়াল এর ডিসকাউন্টিংয়ের মতোই। রপ্তানিকারক জাহাজে পণ্য লোড করে বিল সংগ্রহ করে অতঃপর তা ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করে। আর ব্যাংক সে বিলের মেয়াদপূর্তিকে (Maturity) সামনে রেখে ডিসকাউন্ট করে বাকি টাকা রপ্তানিকারককে তাৎক্ষণিক দিয়ে দেয়। আর মেয়াদপূর্তির (Maturity) তারিখ আসলে ব্যাংক এ টাকা আমদানিকারক থেকে উসুল করে নেয়। ডিসকাউন্টিংয়ের ফিকহি বিশ্লেষণ হলো, 'ঋণদাতা' তথা যার কাছে বিল রয়েছে সে উক্ত বিলটিকে তৃতীয় পক্ষ তথা ব্যাংক এর কাছে হাওয়ালা (حَوَالَة) করে দেয়। আর এ হাওয়ালা হয় ঋণ থেকে কম পরিমাণ করজ গ্রহণের বিপরীতে- যা না-জায়েয। কারণ এটা সুদ।

টিকাঃ
১. এক্ষেত্রে রপ্তানিকারক যেন ঋণদাতা, আর আমদানিকারক যেন ঋণগ্রহীতা। আর রপ্তানিকারক জাহাজে পণ্য লোড করতঃ যে Bill of Lading সংগ্রহ করেছে সেটাই যেন 'বিল অব এক্সচেইঞ্জ'।
২. অর্থাৎ আমদানিকারকের কাছে রপ্তানিকারকের পাওনা আছে হয়তো ১ কোটি টাকা। কিন্তু রপ্তানিকারক ব্যাংক থেকে নগদে ৯০ লক্ষ টাকা করজ গ্রহণ করে এবং ঐ ১ কোটি টাকার বিলটি ব্যাংকের কাছে হাওয়ালা করে দেয়। এটি সুস্পষ্টই সুদ।
৩. এখানে মেয়াদি ঋণের বিপরীতে বেশি গ্রহণ করার কারণে এটি রিবান নাসিয়া হিসেবে গণ্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px