📄 ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ফাইন্যান্সিং (Working Capital Financing)-এর ক্ষেত্রে সমন্বয়
ব্যবসায়িক চলমান ব্যয়, যেমন পণ্য অথবা কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য ঋণপ্রার্থীকে ব্যাংক মুশারাকা ও মুদারাবা পদ্ধতিতে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। যেমন ব্যাংক যে মূলধন সরবরাহ করছে তা দিয়ে তুলা ক্রয় করা হবে। অতঃপর এর দ্বারা কাপড় ইত্যাদি তৈরি করে যে লাভ হবে তাতে ব্যাংক শরীক হবে। আর কাঁচামালের প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে মুরাবাহাও হতে পারে।
📄 ওভার হেড এক্সপেন্সেস (Over Head Expenses)-এর ক্ষেত্রে সমন্বয়
বাংলায় একে 'উপরি ব্যয়' বলে। যে ব্যয় সরাসরি উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত নয়- যেমন বেতন, ভাড়া ইত্যাদি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংকের জন্য শরয়ী পন্থায় পুঁজি বিনিয়োগ করা খুবই কঠিন। ইজারা ও মুরাবাহার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই এক্ষেত্রে বিনিয়োগের শুধু দু'টি পথই আছে-
১. মুশারাকা অর্থাৎ, গ্রাহকের যত টাকার প্রয়োজন ব্যাংক তত টাকা দিয়ে কারবারের কোনো অংশে শরীক হয়ে যাবে। যখন শিরকত হিসেবে প্রতিষ্ঠান টাকা পেয়ে গেল, তখন কারবারের যে কোনো প্রয়োজনে তা ব্যয় করতে পারবে।
২. সুদবিহীন ঋণ প্রদান এক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো সুদ নিতে না পারলেও হিসাব-নিকাশ করতে যে পরিমাণ বাস্তব খরচ হতে পারে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে রাখতে পারবে। কিন্তু আলাদাভাবে প্রত্যেকটি ঋণের বাস্তব খরচ সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই ব্যাংক তার ব্যবস্থাপনা কাজের বিনিময়ে 'ন্যায্য পারিশ্রমিক' গ্রহণ করতে পারবে বলে মনে হয়। তবে কিছুতেই যেন তা 'ন্যায্য পারিশ্রমিক' থেকে অতিরিক্ত না হয়। এর দৃষ্টান্ত হলো, মৌখিকভাবে ফাতওয়া প্রদান করে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা না গেলেও, ফাতওয়া 'লিখে' দেওয়ার কারণে ন্যায্য পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয আছে। এ ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, লেখার পারিশ্রমিক যেন ন্যায্য পরিমাণের চেয়ে অধিক না হয়।
টিকাঃ
১. এ পর্যন্ত গ্রাহকের সাথে ব্যাংকের উভয় প্রকার সম্পর্কের বিশ্লেষণ পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হলো, যার সারাংশ এই- ব্যাংকের ১ম সম্পর্ক সঞ্চয়কারীদের সাথে ব্যাংকের ২য় সম্পর্ক ঋণ গ্রহীতাদের সাথে।
📄 আমদানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প
আগেই বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রেও ব্যাংকের বিরাট অবদান রয়েছে। আমদানি (Import)-এর বেলায় ব্যাংক L.C. খোলে। ব্যাংক এক্ষেত্রে ওকালত ও জামানতের পারিশ্রমিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঋণের সুদও গ্রহণ করে। শরয়ী বিধানের আলোকে জামিন হওয়ার পারিশ্রমিক এবং ঋণের সুদ নেওয়া জায়েয নেই। তাই বিনিময় গ্রহণ করতে হলে L.C.-এর বিকল্প দু'টি পদ্ধতি হতে পারে:
বিকল্প এক: মুরাবাহা
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে L.C.-এর লেনদেন সাধারণত মুরাবাহার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে, যার প্রক্রিয়া হচ্ছে- বিদেশ থেকে যে পণ্যটি আমদানি করতে হবে ব্যাংক তাতে উকিল না হয়ে নিজে তা ক্রয় করে আমদানি করবে এবং আমদানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির কাছে তা অধিক মূল্যে বিক্রি করে দেবে। L.C.-এর ফিস ইত্যাদি মুরাবাহার হারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। মুরাবাহার শর্তাদি রক্ষা করা হলে মৌলিকভাবে এর মধ্যে কোনো অসুবিধা নেই। তারপরও কার্যক্ষেত্রে এ পদ্ধতি পছন্দনীয় বলে মনে হয় না। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে- ১. প্রথমত এ পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে মুরাবাহার শর্তাদি পূরণ করা কঠিন হয়। ২. দ্বিতীয়ত ব্যাংক কর্তৃক ঐ বস্তু ক্রয় করে মুরাবাহা করা কেবল একটি কৃত্রিম কার্যক্রম। ৩. তৃতীয়ত মুরাবাহা জায়েয হওয়ার জন্য জরুরি হচ্ছে, যে পণ্য আমদানি করা হচ্ছে তা প্রথমে ব্যাংকের জামানতে আসতে হবে- অথচ তা করা হয় না।
বিকল্প দুই: শিরকত বা মুদারাবা
L.C.-এর সঠিক বিকল্প হলো, প্রচলিত মুরাবাহার পদ্ধতি পরিহার করে শিরকত বা মুদারাবার ভিত্তিতে লেনদেন করা। (১) L.C. জিরো মার্জিনে হলে মুদারাবার লেনদেন হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক হবে রব্বুলমাল ও আমদানিকারক হবে মুদারিব। (২) আর L.C. আংশিক মার্জিনে খোলা হলে শিরকতের লেনদেন হবে। মুশারাকা বা মুদারাবার প্রক্রিয়া হবে এমন- ব্যাংক আমদানিকারককে বলবে, মালের মূল্য ব্যাংক তাৎক্ষণিক পরিশোধ করে দেবে এবং পরবর্তীতে মাল বিক্রি করে যে লাভ হবে তা নির্ধারিত হারে বণ্টন করে নেওয়া হবে।
টিকাঃ
১. আমরা জানি L.C-এর তিনটি পদ্ধতি হতে পারে। এখানে দুইটি উল্লেখ হয়েছে। তৃতীয়টি হলো, ফুল মার্জিনে L.C. খোলা। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী হবে 'রব্বুলমাল' আর ব্যাংক হবে 'মুদারিব'।
১. 'মুশারাকা' হবে শুধু ২য় সুরতে। প্রথম ও তৃতীয় সুরতে হবে 'মুদারাবা'। আর মুশারাকার ন্যায় মুদারাবাও নির্দিষ্ট মেয়াদী হতে পারে।
📄 রপ্তানিকারক ব্যাংকের L.C. কার্যক্রম ও এর শরয়ী বিকল্প
এল.সি. কার্যক্রম রপ্তানিকারক ব্যাংককে Negotiating Bank বলে। এ ব্যাংক রপ্তানিতে দু'ধরনের ভূমিকা পালন করে-
১. উকালতি: প্রথমত Negotiating Bank রপ্তানিকারকের উকিল হিসেবে মাল প্রেরণের কাগজপত্র (Bill of Lading) প্রেরণ করে এবং আমদানিকারক থেকে টাকা উসুল করে রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়। উকিল হিসেবে এ সেবা প্রদান করে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে। এ পারিশ্রমিক গ্রহণের ব্যাপারে শরয়ী কোনো আপত্তি নেই। কারণ, এসব সেবার 'সার্ভিস চার্জ' গ্রহণ করা জায়েয।
২. রপ্তানি বিনিয়োগ: দ্বিতীয়ত পণ্য ক্রয় করতে বা প্রস্তুত করতে রপ্তানিকারকের মূলধন প্রয়োজন হলে তা Negotiating Bank সরবরাহ করে। এ ধরনের বিনিয়োগকে 'রপ্তানি বিনিয়োগ' (Export Financing) বলে। এই 'রপ্তানি বিনিয়োগ' দুই প্রকার- ১. শিপমেন্ট পূর্ব বিনিয়োগ ২. শিপমেন্ট পরবর্তী বিনিয়োগ।