📄 চারটি কথা স্মর্তব্য
সুদি ব্যাংকিংয়ের বিকল্প অনুসন্ধানের পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ মৌলিক চারটি কথা স্মর্তব্য:-
১. সুদি ব্যাংকিংয়ের বিকল্প অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য এমন হওয়া উচিত নয় যে, প্রচলিত ব্যাংক যত কাজ যে প্রক্রিয়ায় করে চলছে সেগুলো সে প্রক্রিয়ায়ই সম্পাদন করতে হবে এবং উদ্দেশ্যে কোনো পার্থক্য হতে পারবে না। বিকল্প ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হচ্ছে- বর্তমান বাণিজ্যিক পরিবেশে ব্যাংকের জন্য যে কাজ জরুরি বা উপকারী তা সম্পাদন করার জন্য এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করা যা শরীয়তের মূলনীতির গণ্ডির মধ্যে থাকে এবং যা দ্বারা শরীয়তের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়।
২. যেহেতু সুদ বন্ধ করে দিলে এর প্রভাব পুরো বণ্টন ব্যবস্থার উপর পড়বে, তাই এ আশা করা ভুল যে, সুদের শরয়ী বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর করলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের লাভের হার অপরিবর্তিত থাকবে। বরং ইসলামী বিধান কার্যকর করা হলে সম্পদ বণ্টনে বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আসাই স্বাভাবিক এবং কাম্য।
৩. বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংক হলো শুধু এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা টাকার লেনদেন করে। কিন্তু ইসলামী বিধানের আলোকে ব্যাংক শুধু এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবশিষ্ট থাকতে পারে না। বরং ব্যাংককে এমন এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বানাতে হবে- যা বিভিন্ন মানুষের সঞ্চয় একত্র করে তা সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। আর যেসব লোকের সঞ্চয় সে জমা করবে তারা সবাই সরাসরি সে ব্যবসার অংশীদার হবে।
৪. চতুর্থ কথা হলো, শত শত বছর ধরে জেঁকে বসা কোনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করতে গেলে সর্বদা সমস্যা হয়েই থাকে। কিন্তু ব্যবস্থাটির পরিবর্তন বাস্তবিকই যদি জরুরি হয়ে থাকে তাহলে শুধু সমস্যার অজুহাতে তা অগ্রাহ্য বলে স্থির করা কখনোই ঠিক নয়। এ অবস্থায় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাই কর্তব্য।
📄 ব্যাংকিংয়ের শরীয়তসম্মত পন্থা
ঐ প্রস্তাবগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে, যেগুলো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শরীয়তসম্মত মূলনীতির আলোকে পরিচালনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমে বুঝতে হবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে মৌলিকভাবে দু'টি পক্ষ জড়িত। একদিকে ব্যাংকের সম্পর্ক ঐ সমস্ত লোকদের সাথে যারা তাদের ছোট-বড় 'সঞ্চিতি' (আমানত)-গুলোকে ব্যাংকে জমা রাখে। অন্যদিকে ব্যাংকের সম্পর্ক ঐ সকল লোকদের সাথে যাদের কাছে ব্যাংক অর্থ বিনিয়োগ করে, অর্থাৎ তাদের প্রার্থীত মূলধন সরবরাহ করে।
📄 ব্যাংক ও ডিপজিটরদের সম্পর্কের বিশ্লেষণ
বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যাংকে যে টাকা রাখা হয় ব্যাংকিংয়ের পরিভাষায় একে 'আমানত' বলে- কিন্তু ফিকহের দৃষ্টিতে তা প্রকৃতপক্ষে 'ঋণ'। ব্যাংককে ইসলামী পদ্ধতিতে চালানো হলে আমানতদাতাদের সাথে ব্যাংক শিরকত বা মুদারাবা পদ্ধতিতে লেনদেন করবে। এ পদ্ধতিতে এ টাকা 'ঋণ' হবে না, বরং তখন ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয়কারী হবে- 'রব্বুলমাল', আর ব্যাংক হবে- 'মুদারিব'। ব্যাংক সঞ্চিত অর্থের উপর কোনো নির্দিষ্ট হারে লাভ দিবে না- বরং মুদারাবার ভিত্তিতে যা লাভ হবে তা পূর্বে ধার্যকৃত অনুপাতে ব্যাংক ও সঞ্চয়কারীর মাঝে বণ্টিত হবে।
কারেন্ট একাউন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো মুনাফা দিবে না। কারেন্ট একাউন্টে জমাকৃত টাকা ডিপজিটরদের পক্ষ থেকে ব্যাংককে প্রদত্ত সুদমুক্ত ঋণ বলে গণ্য করা হবে।
ব্যাংকের শিরকত ও মুদারাবার লভ্যাংশ বণ্টনের একটি পদ্ধতি হলো Daily Product Basis (الحِسَابُ اليَومِي) বা 'দৈনন্দিন হিসাব'। এর সারকথা হলো, অংশীদারদের স্বাধীনতা দেয়া হবে তারা যখন ইচ্ছা যথারীতি ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন বা জমা করতে পারবে। মেয়াদের শেষে দেখা হবে, এ মেয়াদে কত টাকা কত দিন ব্যাংকে থেকেছে আর প্রতিদিন প্রতি টাকায় কত লাভ হয়েছে। অতঃপর সে হিসেবে লভ্যাংশ বণ্টন করে দেয়া হবে।
টিকাঃ
১. কতক উলামায়ে কেরামের মতে সুদি ব্যাংকের কারেন্ট একাউন্ট 'আমানত' (ودیعة) হিসেবে গণ্য এবং সেভিং ও ফিক্সড একাউন্ট 'ঋণ' (قرض) হিসেবে গণ্য। বিশুদ্ধ মত হলো, সুদি ব্যাংকের তিন প্রকার একাউন্টই 'ঋণ' (قرض) হিসেবে গণ্য। আর ইসলামী ব্যাংকের কারেন্ট একাউন্ট শুধু 'ঋণ' (قرض) হিসেবে গণ্য। অপর দুই একাউন্ট মুদারাবার রাসুল মাল (رَأْسُ مَالِ الْمُضَارُبَةِ) হিসেবে গণ্য।
📄 ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের সম্পর্কের বিশ্লেষণ
এ পর্যন্ত ইসলামী ব্যবস্থায় ব্যাংক ও ডিপজিটরদের মধ্যকার সম্পর্কের বিশ্লেষণ হয়েছে। এখন ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যকার সম্পর্ক, অর্থাৎ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ- অর্থায়ন তথা বিনিয়োগের মাধ্যমে মূলধন সরবরাহ করার ব্যাপারে ইসলামী পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর কয়েকটি প্রক্রিয়া হতে পারে।