📄 কাগজী নোট (Paper Currency)-এর স্বরূপ (حَيْثُ)
বর্তমানে নোটের পেছনে কোনো স্বর্ণ বা রৌপ্য মজুদ নেই। তাই বর্তমান অবস্থায় কাগজী নোটের স্বরূপ (حقیقت) কী? এ প্রশ্নের দু'টি উত্তর হতে পারে-
১. অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের বক্তব্য হলো, নোট একটি বিশেষ ক্রয় ক্ষমতার নাম- যা দ্বারা নির্দিষ্ট মূল্যের পণ্য ক্রয় করা যায়। এখন নোটের পিছনে স্বর্ণের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট বিভিন্ন পণ্যের সমষ্টি রয়েছে- যাকে ইংরেজিতে Basket of Goods বলে।
২. ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ মত হলো, নোট পারিভাষিক বা প্রচলিত মুদ্রা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। যদিও এ কাগজের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই, কিন্তু প্রচলিতভাবে এটাকে এক বিশেষ মূল্যমানের বিনিময় মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
📄 কাগজী নোটের ফিকহি বিধান (৪টি অভিমত)
কাগজী নোট তথা প্রচলিত মুদ্রার ফিকহি বিধান নিয়ে উলামায়ে কেরামের চারটি অভিমত রয়েছে-
১. প্রথম অভিমত: নোট স্বয়ং কোনো সম্পদ নয়, বরং তা ঋণের নিশ্চয়তামূলক রসিদ। কাউকে নোট প্রদান করা মানে ঋণের হাওয়ালা (حوالة) করা।
২. দ্বিতীয় অভিমত: এক টাকার নোটগুলো স্বয়ং সম্পদ, আর অন্য নোটগুলো সেগুলোর রসিদ। কিন্তু এ দর্শনের সাথে বাস্তবতার সমর্থন নেই।
৩. তৃতীয় অভিমত: অধিকাংশ আরব উলামায়ে কেরামের মত হলো, নোট স্বর্ণ-রৌপ্যের স্থলাভিষিক্ত। এর হুকুম হুবহু স্বর্ণ-রৌপ্যের ন্যায়।
৪. চতুর্থ অভিমত: নোট সম্পদের 'রসিদ' নয় বরং নোট নিজেই মূল্যবান সম্পদ। তবে এ সম্পদের মূল্য 'প্রচলিত মূল্য'। অতএব এর বিধান হবে 'ফুলুস' (ধাতব মুদ্রা)-এর ন্যায়। নোট যেহেতু নিজেই সম্পদ তাই তা দ্বারা যাকাত আদায় করলে তাৎক্ষণিকই আদায় হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১. কাগজী নোট নিয়ে মতানৈক্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, কাগজী নোট স্বয়ং সম্পদ নাকি রশিদ। বর্তমানে মুদ্রা স্বয়ংই সম্পদ- অন্য সম্পদের নিশ্চয়তাপত্র বা রশিদ নয়।
১. ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশের মুদ্রা হিসেবে টাকা চালু হয়। কাগজের নোট বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রবর্তিত হয়। ১, ২, ৫ টাকার নোট এবং ধাতব মুদ্রাগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রচলিত হয়।
১. এ পর্যন্ত কাগজী নোট সম্পর্কে চারটি অভিমত উল্লেখ হলো। তন্মধ্যে চতুর্থ অভিমত অনুযায়ী নোট একটি পারিভাষিক মূল্য এবং এটি স্বয়ং সম্পদ।
📄 একই দেশের দু’টি নোটের বিনিময়
একই দেশের নোট পরস্পর বিনিময়ের ক্ষেত্রে কম-বেশি করা জায়েয নেই, সমতা রক্ষা করা জরুরি। এবং এ সমতা নোটের সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং নোটের উপর লিখিত মূল্য (Face Value)-এর ভিত্তিতে হবে। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, এই লেনদেনে উভয় পক্ষ নগদ হস্তগত হওয়া জরুরি, যাতে 'দ্রব্য ও মুদ্রা উভয়টি বাকিতে লেনদেন' (بيع الدين بالدين) না হয়ে যায়।
টিকাঃ
১. এ লেনদেন "بيع الصرف" নয় বটে, কিন্তু সুদের দু'ইল্লতের একটি- অর্থাৎ اتحاد الجنس (সমজাতীয় বস্তু হওয়া) এখানে পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য বাকিতে লেনদেন বৈধ হবে না। [মুহাম্মাদ তাকী উসমানী (১২/১০/১৪২৬হি)]
১. মা-ওয়ারা-উন্নাহর (ট্রান্সঅক্সনিয়া) মধ্য এশিয়ার অংশবিশেষের প্রাচীন নাম। বর্তমান উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কিরগিজস্তান ও দক্ষিণ-পশ্চিম কাজাখস্তান জুড়ে এই অঞ্চল বিস্তৃত।
📄 দু’দেশের দু’টি নোটের বিনিময়
দু'দেশের মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে কম-বেশি করা জায়েয আছে- তবে শর্ত হলো, কোনো একটি বিনিময় নগদ হস্তগত হতে হবে। এক্ষেত্রে কম-বেশি জায়েয হওয়ার কারণ- প্রত্যেক দেশের মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক দেশের মুদ্রা ভিন্ন জাতীয় বস্তু। সরকার অন্য দেশের মুদ্রার সাথে নিজ দেশের মুদ্রার যে রেট নির্ধারণ করে দেয়, সেই আইন লঙ্ঘন করা গুনাহের কাজ।
টিকাঃ
১. কোনো দেশের মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস-বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো সে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।
২. মালিবাগ মাদরাসার প্রয়াত মুহাদ্দীস আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. তার 'ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ন' পুস্তকে সকল দেশের মুদ্রাকে এক জাতীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তবে শাইখুল ইসলাম দা.বা. এর মতে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানির উপর ভিত্তি করে ক্রয়ক্ষমতা প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হয় বলে দু'দেশের মুদ্রা ভিন্ন জাতীয়।