📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 ‘অর্থ’ ও ‘মুদ্রা’ (Currency)-এর মধ্যে পার্থক্য

📄 ‘অর্থ’ ও ‘মুদ্রা’ (Currency)-এর মধ্যে পার্থক্য


পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, অর্থের বৈশিষ্ট্য তিনটি: (১) বিনিময় মাধ্যম, (২) মূল্য পরিমাপক, (৩) মূল্য সংরক্ষক। এ হিসেবে চেক, প্রাইজবন্ড ইত্যাদিও 'অর্থ'- যদিও কোনো ব্যক্তি চেক বা প্রাইজবন্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করার পর অন্যজন তার প্রাপ্য এগুলোর মাধ্যমে নিতে অস্বীকৃতি জানালে তা গ্রহণ করার জন্য তাকে আইনগতভাবে বাধ্য করা যায় না। অপরপক্ষে মুদ্রা (Currency) বলা হয় এমন অর্থকে যা আইনগতভাবেও কোনো দেশের বিনিময়-মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যেমন টাকা। ফলে কোনো ব্যক্তি টাকা পরিশোধ করলে আইনগতভাবে তা গ্রহণে বাধ্য করা যায়। এরূপ আইনগত মুদ্রাকে আরবীতে عُمْلَةٌ قَانُونِيَّةٌ বাংলায় 'বিহিত মুদ্রা' এবং ইংরেজিতে Legal Tender বলে।

এই 'বিহিত মুদ্রা' (Currency) আবার দু'প্রকার-
প্রথম প্রকার: যা দ্বারা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আইনগতভাবে পরিশোধ করা যায়- তারচে' অতিরিক্ত দিলে গ্রাহক নিতে বাধ্য থাকে না- যেমন পঁচিশ পয়সার মুদ্রা। একে আরবীতে عُمْلَةٌ قَانُونِيَّةٌ مَحْدُودَةٌ বাংলায় 'সসীম বিহিত মুদ্রা' এবং ইংরেজিতে Limited Legal Tender বলা হয়।

দ্বিতীয় প্রকার: যা দ্বারা ঋণ পরিশোধের আইনগত কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। একে আরবীতে عُمْلَةٌ قَانُونِيَّةٌ غَيْرُ مَحْدُودَةٌ বাংলায় 'অসীম বিহিত মুদ্রা' এবং ইংরেজিতে Unlimited Legal Tender বলে, যেমন ধাতব বা কাগজী মুদ্রা।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 মুদ্রার ক্রমবিকাশ ও বিভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা

📄 মুদ্রার ক্রমবিকাশ ও বিভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা


(১) প্রাচীনকালে মানুষের মধ্যে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির প্রথা চালু ছিলো, যাকে 'পণ্য বিনিময় প্রথা', مُقَائِضَةٌ বা 'Barter' বলা হয়।
(২) অতঃপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তু বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো- যেমন গম, যব, চামড়া ইত্যাদি।
(৩) এরপর স্বর্ণ ও রূপাকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
(৪) এরপর ছাঁচে ঢালাইকৃত মুদ্রার প্রচলন ঘটে। এ ব্যবস্থাকে 'স্বর্ণমান মুদ্রাব্যবস্থা', আরবীতে قاعدة الذهب এবং ইংরেজিতে Gold Standard বলা হয়।
(৫) এরপর স্বর্ণের সাথে সাথে রূপার মুদ্রাও ছাঁচে ঢালাই করে তৈরি শুরু হয়। একে 'দ্বি-ধাতব মুদ্রাব্যবস্থা' বা Bi-Metallic Standard বলা হয়।
(৬) তারপর এমন এক যুগ আসে যখন লোকেরা সোনা-রূপার মুদ্রা স্বর্ণকারদের নিকট আমানত রেখে দিতো এবং স্বর্ণকাররা রসিদ লিখে দিতো। আস্তে আস্তে রসিদ দিয়ে পণ্য ক্রয় করা শুরু হয়ে যায়।
(৭) স্বর্ণকাররা যখন দেখলো মানুষ সচরাচর স্বর্ণ ফেরত নিতে আসে না, তখন তারা মানুষের গচ্ছিত স্বর্ণ অন্যকে ঋণ দিতে আরম্ভ করলো। এভাবে নোট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয়।
(৮) শুরুতে প্রত্যেক ব্যক্তি নোট প্রকাশ করতে পারতো। পরবর্তীতে নোটকে 'বিহিত মুদ্রা' (Legal Tender) স্থির করা হয়।
(৯) এক যুগ এমন ছিলো যখন নোটের বিপরীতে ১০০% স্বর্ণ থাকতো। এ ব্যবস্থাকে 'স্বর্ণমান ব্যবস্থা', আরবীতে قاعدة سبائك الذهب এবং ইংরেজিতে Gold Bullion Standard বলে।
(১০) তারপর নোটের বিপরীতে স্বর্ণের হার কমিয়ে দেয়া হয়। এমন নোট যার বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ নেই তাকে النقود الثقة বা Fiduciary Money বলে।
(১১) তারপর স্বর্ণের হার কমতে কমতে শূন্যের কোটায় ঠেকে। এমন নোটকে 'প্রতীকী মুদ্রা' বা النقود الرمزية (Token Money) বলে।
(১২) ১৯৭১ সালে আমেরিকা স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পৃক্ততা শেষ করে দেয়। এখন নোট শুধু পারিভাষিক মূল্য- যা কেবল ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করছে।

টিকাঃ
১. কিতাবে এমনটাই লেখা আছে, কিন্তু ইতিহাসে এর কোনো সমর্থন নেই। এজন্য যে ইতিহাসে এমন কোনো যুগ পাওয়া যায় না যে যুগে কোনোকিছু মুদ্রা হিসেবে প্রচলন ছিল না।
১. মুদ্রার ক্রমবিকাশ ধাপগুলো লক্ষ করি:- (১) প্রথমে 'পণ্য বিনিময় প্রথা' (২) গুরুত্বপূর্ণ বস্তুসমূহ (৩) ছাঁচে ঢালাই ছাড়া স্বর্ণ-রৌপ্য (৪) স্বর্ণমান মুদ্রাব্যবস্থা (৫) দ্বি-ধাতব মুদ্রাব্যবস্থা (৬) রশিদ প্রথা (৭) ব্যাংকিংয়ের গোড়াপত্তন (৮) বিহিত মুদ্রা ঘোষণা (৯) স্বর্ণমান ব্যবস্থা (১০) ফিডিউশারি মানি (১১) প্রতীকী মুদ্রা (১২) স্বর্ণের মজুদহীন বর্তমান ব্যবস্থা।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 বিনিময় হার নির্ধারণ

📄 বিনিময় হার নির্ধারণ


বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পরস্পর বিনিময় হার কিভাবে নির্ধারিত হয়? বিভিন্ন যুগে এর বিভিন্ন পদ্ধতি চালু ছিলো। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। তখন দু'দেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হতো মুদ্রার বিপরীতে ধার্যকৃত স্বর্ণের আনুপাতিক হারে।

এরপর ক্রমান্বয়ে স্বর্ণমান ব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৩০ সালে বিশ্ববাজারে মন্দা দেখা দেয় এবং সব দেশই নোটের পরিবর্তে স্বর্ণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু আমেরিকা তখনো অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী ছিলো। ১৯৪৪ সালে আমেরিকার সহযোগিতায় ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি দেশের এক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকার ব্রেটন উডস (Bretton Woods) শহরে।

টিকাঃ
১. ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এক সার্বিয়াবাসীর গুলিতে সস্ত্রীক নিহত হন। ওই বছরেরই ২৮ জুলাই থেকে যুদ্ধ শুরু হয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 ব্রেটন উডস সম্মেলনে প্রস্তাবিত তিন সংস্থা

📄 ব্রেটন উডস সম্মেলনে প্রস্তাবিত তিন সংস্থা


১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনে তিনটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মুদ্রা বিনিময়ের নীতিমালা নির্ধারিত হয়। প্রস্তাবিত সংস্থা তিনটি হলো- ১ম সংস্থা: ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা’ (International Trade Organization), ২য় সংস্থা: ‘আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল’ (International Monetary Fund) এবং ৩য় সংস্থা: ‘বিশ্বব্যাংক’ (World Bank)।

টিকাঃ
১. ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস শহরে ৪৪টি দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধির অংশগ্রহণে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর মূল নাম ছিলো United Nations Monetary and Financial Conference।

ফন্ট সাইজ
15px
17px