📄 অবলেখন (Under Writing)-এর বিশ্লেষণ
যে চুক্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কমিশনের শর্তে নব-আবির্ভূত কোনো কোম্পানিকে নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, তাদের জারিকৃত শেয়ারগুলো জনগণ গ্রহণ না করলে তারা গ্রহণ করবে তাকে ‘অবলেখন’ বলে। এক্ষেত্রে দু'টি বিষয় বিবেচ্য: (১) দায় গ্রহণ (২) কমিশন গ্রহণ।
(১) দায় গ্রহণ: ফিকহি দৃষ্টিতে দায় গ্রহণের চুক্তিটি একটি অঙ্গীকার- যাকে মালেকী মাজহাবের অনুসারীদের পরিভাষায় ইলতিযাম (الإلتزام) বলা যেতে পারে। মালেকীদের মতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালন করা আইনগতভাবেও অত্যাবশ্যক হয়ে যায়।
(২) কমিশন গ্রহণ: ফিকহি দৃষ্টিতে অবলেখনের ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণ না-জায়েয। কেননা, শেয়ার গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান শেয়ার গ্রহণের মাধ্যমে নতুন কোম্পানিটির অংশীদার হয়ে যায়। তবে দায় গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান যদি 'বাস্তব খরচ' (اَلتَّكْلِفَةُ الْفِعْلِيَّةُ) নেয় বা দালাল (وكিল) হিসেবে পারিশ্রমিক নেয়, তবে তা বৈধ হতে পারে।
টিকাঃ
১. জামানত বা কাফালাত (الكفالة) মূলত আরবী শব্দ। একে ইংরেজীতে বলে Guarantee (নিশ্চয়তা)। অন্যদিকে নিজের উপর থাকা আর্থিক দায়বদ্ধতাকে অন্যের সম্মতিতে পরিপূর্ণভাবে তার উপর ন্যস্ত করে দিয়ে নিজে সাময়িকভাবে মোটামুটি দায়মুক্ত হয়ে যাওয়াকে বলে হাওয়ালা। হাওয়ালাকে আরবীতে বলা যায়- نَقْلُ ذِمَّةِ।
📄 শেয়ারের প্রকৃত স্বরূপ (حَيْث)
সমকালীন হাতে গোনা কিছু আলেমের অভিমত হলো, 'শেয়ার' কোম্পানির সম্পত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কোম্পানির মৌলিক ধারণা এবং এ সমন্ধে লিখিত প্রবন্ধাবলীর আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, কোম্পানির সম্পত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের আনুপাতিক মালিকানা থাকে। এ কারণেই কোম্পানির অবসায়ন ঘটালে শেয়ারহোল্ডারদেরকে শুধু তাদের 'বিনিয়োগকৃত অর্থ' ফেরত দেয়া হয় না; বরং কোম্পানির সম্পত্তির প্রত্যেকের 'আনুপাতিক অংশ' ফেরত দেয়া হয়। অতএব শেয়ার কোম্পানির সম্পত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের আনুপাতিক মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে।
টিকাঃ
১. আইপিও (IPO) পদ্ধতি: IPO-এর পূর্ণ রূপ Initial Public Offering -যার অর্থ হয় 'প্রাথমিক প্রকাশ্য প্রস্তাব'। এ পদ্ধতিতে কোম্পানি তার শেয়ার ক্রয় করার প্রস্তাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সামনে পেশ করে।
📄 শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের স্বরূপ (حَيْثُ)
শেয়ারের এ স্বরূপ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, শেয়ার নিজে কোনো বস্তু নয়; বরং তার বিপরীতে যে অর্থ ও সম্পত্তি আছে সেটাই আসল বস্তু। সুতরাং শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় মূলত কোম্পানির সম্পত্তি থেকে আনুপাতিক মালিকানার ক্রয়-বিক্রয়। কোম্পানির সম্পত্তি বিভিন্ন অবস্থায় থাকে- নগদ ক্যাশ, আদায়যোগ্য ঋণ, স্থাবর সম্পত্তি এবং ব্যবসায়ী সরঞ্জাম ইত্যাদি। সুতরাং শেয়ার বিক্রয়ের অর্থ হচ্ছে: 'কোম্পানিতে বিদ্যমান নগদ ক্যাশ, আদায়যোগ্য ঋণ, স্থাবর সম্পত্তি এবং ব্যবসায়ী সরঞ্জাম'- প্রত্যেকটি থেকে নিজের আনুপাতিক অংশের মালিকানা স্বত্ব বিক্রি করা।
📄 শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের শর্তাবলী
১. শেয়ার ফেইস ভ্যালুর চেয়ে কম-বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, কোম্পানির সম্পত্তি শুধু ক্যাশ আকারে না থাকা। যতক্ষণ পর্যন্ত কোম্পানি বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ভৌত সম্পত্তি (Fixed Assets) না কিনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শেয়ারের নামিক মূল্য (Face Value) থেকে কম-বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হবে না।
২. শেয়ার ক্রয় বিক্রয় বৈধ হওয়ার আরেকটি শর্ত হলো, কোম্পানির মূল কারবার হারাম না হওয়া। যেমন: মদের ব্যবসা বা সুদের ব্যবসা।
৩. যদি কোম্পানি মৌলিকভাবে হালাল ব্যবসা করে কিন্তু আনুষঙ্গিকভাবে সুদি ঋণ নেয় বা সুদ গ্রহণ করে, তবে শেয়ারহোল্ডারদেরকে বার্ষিক সভায় এর বিরুদ্ধে দাবি উত্থাপন করতে হবে।
৪. কোম্পানির বণ্টিত লভ্যাংশ (Dividend) থেকে সুদের অংশটুকু সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সদকা করে দিতে হবে।
টিকাঃ
১. ফুকাহায়ে কেরামের নিকট বস্তু দু'প্রকার: ১. সমতুল্য (مِثْلِىّ) বস্তু, ২. মূল্যনির্ভর (قِيْمِىّ) বস্তু।
২. বর্তমান অনেক কোম্পানি সরকারি অনুমোদন লাভের পর পরই স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হয়ে যায়। এ ধরনের অস্তিত্বহীন কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।
১. আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা. কিছু শর্ত সাপেক্ষে শেয়ার কেনা-বেচাকে বৈধ বলছেন। তবে শুরু থেকেই জেনে-শুনে শেয়ারবাজারে জড়িত হওয়া কিছুতেই সমীচীন হবে না।