📄 সীমিত দায়ের বিশ্লেষণ
কোম্পানির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য যা শরয়ী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণীয়, তা হলো Limited Liability অর্থাৎ 'সীমাবদ্ধ দায়'।
এখানে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল আপত্তি হলো, মুদারাবার ক্ষেত্রে রব্বুলমালের দায় তো সীমাবদ্ধ, কিন্তু মুদারিবের দায় তো সীমাবদ্ধ নয়। সুতরাং ঋণদাতাগণ রব্বুলমাল কর্তৃক প্রদত্ত মূলধনের অতিরিক্ত ঋণ মুদারিব থেকে আদায় করতে পারে। পক্ষান্তরে কোম্পানির ডাইরেক্টরদের দায় সীমাবদ্ধ। স্বয়ং কোম্পানি নামক আইনগত সত্তার দায়ও সীমাবদ্ধ। তাই কোম্পানির সম্পত্তির অতিরিক্ত ঋণ হয়ে গেলে তা পরিশোধের কোনো পথ থাকবে না।
এ আপত্তির কারণে সমকালীন কিছু আলেমের অভিমত হলো, সীমাবদ্ধ দায়ের ধারণা শরয়ীভাবে সঠিক নয়। কিন্তু বিষয়টা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রতীয়মান হয়- কোম্পানির সীমাবদ্ধ দায়ের ধারণাটি মূলত আইনগত সত্তার ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। 'আইনগত সত্তা' স্বীকার করার পর 'সীমাবদ্ধ দায়' মেনে নিতে কোনো বাঁধা থাকে না। বিশেষত কোম্পানির সাথে লেনদেনকারী যখন বোঝে-শুনে লেনদেন করে যে- “এ কোম্পানি লিমিটেড। তাই সকল দায় শুধু কোম্পানির সম্পত্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে।” এ কারণে সমকালীন অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত হলো, ‘সীমাবদ্ধ দায়’ বৈশিষ্ট্যটির কারণে কোম্পানি নামক শিরকত চুক্তিকে ফাসিদ বলা যায় না।
📄 সীমিত দায়ের শরয়ী দৃষ্টান্ত
শেয়ার মালিকদের 'সীমাবদ্ধ দায়' এর একটি শরয়ী দৃষ্টান্ত বিদ্যমান আছে। আর তা হলো, 'মুদারাবা' (مُضَارَبَة) পদ্ধতিতে ব্যবসার দৃষ্টান্ত। 'রব্বুলমাল' (رَبُّ الْمَال) তথা অর্থ প্রদানকারী যতক্ষণ 'মুদারিব' (مُضَارِب) তথা ব্যবসায়িকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি না দিবে, ততক্ষণ রব্বুলমালের দায় মূলধন পর্যন্তই সীমিত থাকে। এমন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হলে রব্বুলমাল বড়জোর মূলধন পর্যন্তই দায় গ্রহণ করবে- তারচে' বেশি রব্বুলমালের কাছ কাছ থেকে দাবি করা হবে না। এই মূলনীতির ভিত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের দায় সীমাবদ্ধ হওয়া সঠিক বলে মনে হয়।
📄 লিমিটেড কোম্পানির ফিকহি দৃষ্টান্ত
ফিকহি মাসআলায় লিমিটেড কোম্পানির একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত আছে- যা লিমিটেড কোম্পানির সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তা হলো عَبْدٌ مَأْذُوْنٌ فِي التَّجَارَةِ (ব্যবসার অনুমতিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস)। সে তার মনিবের মালিকানাধীন থাকে এবং মনিবের অনুমতিক্রমে ব্যবসা করে। সে ঋণগ্রস্ত হলে তা তার মূল্যসীমা পর্যন্ত সীমিত থাকে- তারচে' অতিরিক্তের দাবি ক্রীতদাস থেকেও করা যায় না, মনিব থেকেও না। এ দৃষ্টান্ত লিমিটেড কোম্পানির সাথে খুবই মিলে।
📄 অবলেখন (Under Writing)-এর বিশ্লেষণ
যে চুক্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কমিশনের শর্তে নব-আবির্ভূত কোনো কোম্পানিকে নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, তাদের জারিকৃত শেয়ারগুলো জনগণ গ্রহণ না করলে তারা গ্রহণ করবে তাকে ‘অবলেখন’ বলে। এক্ষেত্রে দু'টি বিষয় বিবেচ্য: (১) দায় গ্রহণ (২) কমিশন গ্রহণ।
(১) দায় গ্রহণ: ফিকহি দৃষ্টিতে দায় গ্রহণের চুক্তিটি একটি অঙ্গীকার- যাকে মালেকী মাজহাবের অনুসারীদের পরিভাষায় ইলতিযাম (الإلتزام) বলা যেতে পারে। মালেকীদের মতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালন করা আইনগতভাবেও অত্যাবশ্যক হয়ে যায়।
(২) কমিশন গ্রহণ: ফিকহি দৃষ্টিতে অবলেখনের ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণ না-জায়েয। কেননা, শেয়ার গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান শেয়ার গ্রহণের মাধ্যমে নতুন কোম্পানিটির অংশীদার হয়ে যায়। তবে দায় গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান যদি 'বাস্তব খরচ' (اَلتَّكْلِفَةُ الْفِعْلِيَّةُ) নেয় বা দালাল (وكিল) হিসেবে পারিশ্রমিক নেয়, তবে তা বৈধ হতে পারে।
টিকাঃ
১. জামানত বা কাফালাত (الكفالة) মূলত আরবী শব্দ। একে ইংরেজীতে বলে Guarantee (নিশ্চয়তা)। অন্যদিকে নিজের উপর থাকা আর্থিক দায়বদ্ধতাকে অন্যের সম্মতিতে পরিপূর্ণভাবে তার উপর ন্যস্ত করে দিয়ে নিজে সাময়িকভাবে মোটামুটি দায়মুক্ত হয়ে যাওয়াকে বলে হাওয়ালা। হাওয়ালাকে আরবীতে বলা যায়- نَقْلُ ذِمَّةِ।