📄 আইনগত সত্তার বিশ্লেষণ
প্রথম বিষয়: আইনগত সত্তা
শিরকতের স্বতন্ত্র কোনো আইনগত অস্তিত্ব হয় না, কিন্তু কোম্পানির নিজস্ব স্বতন্ত্র আইনগত অস্তিত্ব হয়ে থাকে- যাকে বলা হয় আইনসম্মত ব্যক্তিসত্তা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইনগত সত্তার ধারণা শরীয়তে বৈধ কি-না। অনুসন্ধান করে এমন মনে হয় যে, শরীয়তে 'আইনগত সত্তা' পরিভাষাটি ব্যবহৃত না হলেও এর দৃষ্টান্ত বিদ্যমান আছে।
📄 শরীয়তে আইনগত সত্তার দৃষ্টান্তসমূহ
* ওয়াকফ (وقف): 'ওয়াকফ' এর জন্য যদিও 'আইনগত সত্তা' পরিভাষাটি ব্যবহার হয় না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা একটি আইনগত সত্তা। কারণ ওয়াকফ সত্তা মালিক হয়। ওয়াকফ ঋণীও হয়। আদালতে মামলা হলে ওয়াকফ বাদী বা বিবাদী হয়, আর মুতাওয়াল্লী তার প্রতিনিধিত্ব করে। মালিক হওয়া, ঋণদাতা হওয়া, ঋণী হওয়া, বাদী-বিবাদী হওয়া ব্যক্তিসত্তার বৈশিষ্ট্য।
* রাজকোষ (بَيْتُ الْمَالِ): বাইতুল মালের সম্পদে সকল জনসাধারণের অধিকার সংশ্লিষ্ট বটে, কিন্তু কেউ স্বতন্ত্রভাবে নিজের মালিকানার দাবি করতে পারে না। বরং সমুদয় সম্পত্তির মালিক বাইতুল মালই হয়। বাইতুল মালের প্রতিটি বিভাগ স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা। ইমাম যাইলায়ী রহ. লিখেছেন, যদি রাজকোষের এক বিভাগে অর্থ না থাকে, তাহলে প্রয়োজনের মুহূর্তে অন্য বিভাগ থেকে ঋণ গ্রহণ করা যাবে।
* পুরোপুরি ঋণে জর্জরিত পরিত্যক্ত সম্পত্তি (تَرِكَةٌ مُسْتَغْرِقَةٌ بِالدِّينِ): মৃত ব্যক্তির সমস্ত সম্পদই যদি ঋণের দায়ে দায়গ্রস্ত থাকে তাহলে তাকে ঋণী বলা যায় না। এখানে ঋণগ্রস্ত বলে গণ্য হবে 'পরিত্যক্ত সম্পত্তি'- যা 'আইনগত সত্তা' হিসেবে বিবেচ্য।
* যৌথ সম্পত্তি (خلطة الشيوع): অন্য তিন ইমামের মাজহাব অনুযায়ী যাকাতের সম্পত্তি যৌথ মালিকানায় থাকলে যাকাত ব্যক্তিগত অংশের উপর নয়; বরং সমষ্টির উপর ফরয হয়। এতে বুঝা যায়, তিন ইমামের নিকট যৌথ মালিকানা একটি আইনগত সত্তা।
এসব দৃষ্টান্ত থেকে বুঝা যায়, 'আইনগত সত্তা'-এর ধারণা মৌলিকভাবে কোনো না-জায়েয ধারণা নয়। ইসলামী ফিকহের জন্য কোনো অপরিচিত ধারণাও নয়। তবে এ পরিভাষাটি অবশ্যই নতুন।
টিকাঃ
১. তবিইয়ীনুল হাকায়েক, কিতাবুস সিয়ার।
📄 সীমিত দায়ের বিশ্লেষণ
কোম্পানির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য যা শরয়ী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণীয়, তা হলো Limited Liability অর্থাৎ 'সীমাবদ্ধ দায়'।
এখানে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল আপত্তি হলো, মুদারাবার ক্ষেত্রে রব্বুলমালের দায় তো সীমাবদ্ধ, কিন্তু মুদারিবের দায় তো সীমাবদ্ধ নয়। সুতরাং ঋণদাতাগণ রব্বুলমাল কর্তৃক প্রদত্ত মূলধনের অতিরিক্ত ঋণ মুদারিব থেকে আদায় করতে পারে। পক্ষান্তরে কোম্পানির ডাইরেক্টরদের দায় সীমাবদ্ধ। স্বয়ং কোম্পানি নামক আইনগত সত্তার দায়ও সীমাবদ্ধ। তাই কোম্পানির সম্পত্তির অতিরিক্ত ঋণ হয়ে গেলে তা পরিশোধের কোনো পথ থাকবে না।
এ আপত্তির কারণে সমকালীন কিছু আলেমের অভিমত হলো, সীমাবদ্ধ দায়ের ধারণা শরয়ীভাবে সঠিক নয়। কিন্তু বিষয়টা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রতীয়মান হয়- কোম্পানির সীমাবদ্ধ দায়ের ধারণাটি মূলত আইনগত সত্তার ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। 'আইনগত সত্তা' স্বীকার করার পর 'সীমাবদ্ধ দায়' মেনে নিতে কোনো বাঁধা থাকে না। বিশেষত কোম্পানির সাথে লেনদেনকারী যখন বোঝে-শুনে লেনদেন করে যে- “এ কোম্পানি লিমিটেড। তাই সকল দায় শুধু কোম্পানির সম্পত্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে।” এ কারণে সমকালীন অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত হলো, ‘সীমাবদ্ধ দায়’ বৈশিষ্ট্যটির কারণে কোম্পানি নামক শিরকত চুক্তিকে ফাসিদ বলা যায় না।
📄 সীমিত দায়ের শরয়ী দৃষ্টান্ত
শেয়ার মালিকদের 'সীমাবদ্ধ দায়' এর একটি শরয়ী দৃষ্টান্ত বিদ্যমান আছে। আর তা হলো, 'মুদারাবা' (مُضَارَبَة) পদ্ধতিতে ব্যবসার দৃষ্টান্ত। 'রব্বুলমাল' (رَبُّ الْمَال) তথা অর্থ প্রদানকারী যতক্ষণ 'মুদারিব' (مُضَارِب) তথা ব্যবসায়িকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি না দিবে, ততক্ষণ রব্বুলমালের দায় মূলধন পর্যন্তই সীমিত থাকে। এমন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হলে রব্বুলমাল বড়জোর মূলধন পর্যন্তই দায় গ্রহণ করবে- তারচে' বেশি রব্বুলমালের কাছ কাছ থেকে দাবি করা হবে না। এই মূলনীতির ভিত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের দায় সীমাবদ্ধ হওয়া সঠিক বলে মনে হয়।