📄 কোম্পানির উদ্ভব/ বৈশিষ্ট্য/ ক্রমবিকাশ
কোম্পানির উদ্ভব
ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের পর সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বড় বড় কলকারখানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহৎ পুঁজির প্রয়োজন পড়ে। এ পুঁজি একক বা কতক ব্যক্তি মিলে ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিলো না। তাই জনগণের বিক্ষিপ্ত সঞ্চয়গুলোকে একত্র করে সামষ্টিক কল্যাণের লক্ষে কোম্পানির উদ্ভব ঘটে।
কোম্পানির বৈশিষ্ট্য
সাধারণ শিরকত চুক্তি থেকে কোম্পানির স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ শিরকত চুক্তিতে প্রত্যেক সদস্যের মালিকানা পৃথক বলে বিবেচিত হয়, আর কোম্পানির ক্ষেত্রে সদস্যদের সম্মিলিত সমষ্টিকে অভিন্ন এক 'আইনসম্মত ব্যক্তিসত্তা' ধরা হয়। এই আইনসম্মত ব্যক্তিসত্তাকে 'কর্পোরেশন' বলে- যার একটি প্রকার হলো কোম্পানি।
কোম্পানির ক্রমবিকাশ
শুরুতে কোম্পানি সাধারণত আধা সরকারি হতো, সরকারের অনুমতিক্রমে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য গঠন করা হতো। তাদের ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হতো, এমনকি রাজ্যে ব্যবসায়ী নীতি জারি করার অনুমতিও কখনো দেয়া হতো। মুদ্রা চালু করা থেকে নিয়ে পুলিশ বাহিনী রাখারও অনুমতি থাকতো। উপমহাদেশে ‘উপনিবেশ’ স্থাপনকারী ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ এ ধরনেরই একটি কোম্পানি ছিলো। বর্তমানে ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন ঔপনিবেশিক কোম্পানি বিদ্যমান নেই, শুধু ব্যবসায়ী কোম্পানিই আছে- যা রাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পাকিস্তানে কোম্পানি গঠনের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘কর্পোরেট ল-অথরিটি’ (Corporate Law Authority) নামে পরিচিত- যা অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান।
টিকাঃ
১. (ওমুক এন্ড কোং. / ওমুক এন্ড ব্রাদার্স / فلان وشركائه ) ⇒ আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য। (ওমুক কোং. / ওমুক কোম্পানি লিমিটেড) ⇒ পারিভাষিক অর্থ উদ্দেশ্য।
২. কর্পোরেশন বলতে বুঝায় এমন কোনো বৃহৎ ব্যবসায়িক সংস্থা- যার স্বতন্ত্র পরিচালনা বোর্ড থাকে। একাধিক সংস্থা যৌথভাবে পরিচালিত হলেও তাকে কর্পোরেশন বলে। অপরপক্ষে কোম্পানির ক্ষেত্রে যৌথ অবকাঠামো হয় না এবং বৃহৎ অবকাঠামো হওয়াও জরুরি নয়। তবে রূপক অর্থে কোম্পানি শব্দটি উভয়টির অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
৩. এ ধরনের কোম্পানিকে 'সনদপ্রাপ্ত কোম্পানি' (Chartered Company) বলা হয়। বাংলাদেশে ১৮৪৪ সালে কোম্পানি আইন পাশ হওয়ার আগে তৎকালীন গ্রেট ব্রিটেনের রাজা বা রাণীর বিশেষ ফরমান বা সনদবলে এসব কোম্পানি গঠন করা হতো। বর্তমানে এ ধরনের কোম্পানি গঠনের আইনত সুযোগ নেই।
১. ‘উপনিবেশ’ অর্থ জীবিকা নির্বাহের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য দলবদ্ধভাবে বিদেশে স্থাপিত বসতি বা Colony। এটি বিশেষ্য পদ, যার বিশেষণ হচ্ছে ‘ঔপনিবেশিক’। যার অর্থ হয়, উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছে এমন।
২. আমাদের দেশে ব্যবসায়িক কোম্পানিগুলোও গঠনগত দিক আবার দুই প্রকার। এক. নিবন্ধিত কোম্পানি (Registered Company), দুই. সংবিধিবদ্ধ কোম্পানি (Statutory Company)। এ কিতাবের সকল আলোচনা নিবন্ধিত কোম্পানি সম্পর্কে। সংবিধিবদ্ধ কোম্পানি সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সংক্ষেপে সংবিধিবদ্ধ কোম্পানির পরিচয় হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বা জনকল্যাণমূলক কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে আইন পরিষদের বিশেষ আইন দ্বারা বা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বলে গঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিই হলো সংবিধিবদ্ধ কোম্পানি। এ সকল কোম্পানিকে সাধারণত একচেটিয়া ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং এগুলোকে কোম্পানি আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়। এগুলো সাধারণত পরিবহণ, জলবিদ্যুৎ এবং সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে গঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বিআরটিএ, বিসিআইসি, ওয়াসা ইত্যাদি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ।
৩. আমাদের দেশে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘রেজিস্টার্ড অব জয়েন্ট স্টোক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস’ (RJSCF) এর মাধ্যমে কোম্পানির নিবন্ধন করাতে হয়।
📄 কোম্পানির গঠন পদ্ধতি
প্রথম ধাপ
সর্বপ্রথম বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। এতে প্রস্তাবিত কোম্পানির সাফল্যের সম্ভাবনা নিরূপণ করে সম্ভাব্য উপকরণ ও পুঁজির পরিসংখ্যান করা হয়। একে تَقْرِيرُ الإِمْكَانِيَّات (Feasibility Report) বলা হয়।
দ্বিতীয় ধাপ
দ্বিতীয় পর্যায়ে কোম্পানির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়- যাতে কোম্পানির নাম, ব্যবসার ধরন, প্রার্থীত মূলধন, বর্তমানে পরিচালক কারা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তাদের নিয়োগ-বরখাস্তের মূলনীতি ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করা হয়। একে مُذَكَّرَة / Memorandom (মেমোরেন্ডাম) বলা হয়।
তৃতীয় ধাপ
অতঃপর কোম্পানির ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা লিখা হয়- যাকে আরবীতে لَائِحَةُ الْجَمْعِيَّةِ বা النظام الجمعية এবং ইংরেজিতে Articles of Association বলা হয়।
চতুর্থ ধাপ
অতঃপর Memorandom এবং Articles of Association সম্বলিত আবেদনপত্র সরকারের কাছে পেশ করা হয়। অর্থমন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত সংস্থা 'কর্পোরেট ল-অথরিটি' (Corporate Law Authority) কর্তৃক আবেদনপত্র মঞ্জুর হলে কোম্পানি অস্তিত্ব লাভ করেছে বলে বিবেচিত হয়।
📄 কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা
আইনানুগ অনুমোদন লাভের মাধ্যমে কোম্পানি একটি কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে- যা প্রকৃত ব্যক্তিসত্তার ন্যায় ক্রয়-বিক্রয়, বাদী-বিবাদী, দাতা-গ্রহীতা সবই হতে পারে। একে 'আইনগত ব্যক্তিসত্তা' (Legal Person বা Juristic Person বা Juridical Person) বলা হয়। কখনো একে 'কাল্পনিক ব্যক্তিসত্তা' (Fictitious Person)-ও বলা হয়।
📄 কোম্পানির কার্যারম্ভ
কোম্পানি গঠনের পর জনসাধারণকে শেয়ার গ্রহণের আহ্বান করার পূর্বে সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মপন্থা সম্পর্কে অবগত করা আইনত আবশ্যক। এতে জনগণ কোম্পানি সম্পর্কে আস্থাবান হতে পারে। জনসাধারণকে কোম্পানির কার্যপ্রণালী ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবগত করানোর জন্য যে লিখিত বিবরণ প্রচার করা হয় তাকে আরবীতে نَشْرَةُ الْإِصْدَارِ এবং ইংরেজিতে Prospectus (প্রোস্পেকটাস্- যার অর্থ বিজ্ঞাপনপত্র) বলা হয়।