📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও বণ্টন নীতি

📄 সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও বণ্টন নীতি


সমাজতন্ত্রের বক্তব্য হলো, উৎপাদনের উপাদান চারটি নয়, বরং দু'টি- 'ভূমি' ও 'শ্রম'। এ দুইয়ের সমন্বয়ে উৎপাদন অস্তিত্বে আসে। অবশিষ্ট 'মূলধন' ও 'উদ্যোক্তা' উৎপাদনের উপাদান নয়। 'মূলধন' এজন্য নয় যে, তা নিজেই কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অস্তিত্বে এসে অন্য কোনো উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। উদ্যোক্তাকেও স্বতন্ত্র উপাদান হিসেবে গণ্য করার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা ঝুঁকি গ্রহণের সুযোগও নেই, বরং সরকারই একচ্ছত্রভাবে এ কাজের নিয়ন্ত্রণ করে।

অতএব, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপাদান দু'টিই: 'ভূমি' ও 'শ্রম'। তন্মধ্যে ভূমি ব্যক্তি মালিকানাধীন নয় বলে তার ভিন্ন খরচ বহন করার প্রয়োজন নেই। তাই মুনাফার হকদার শুধু একটি উপাদানই সাব্যস্ত হয়- আর তা হলো: 'মজুরি'- যা সরকারি পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়িত হয়। কার্ল মার্কসের প্রসিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি হলো: কোনো বস্তুর মূল্য বৃদ্ধি কেবল শ্রমের মাধ্যমেই হতে পারে। মুনাফা লাভের বাস্তব হকদার শুধু শ্রমিকই। এই দর্শনকে 'উদ্বৃত্ত মূল্য তথ্য' (Theory of Surplus Value) বলা হয়।

টিকাঃ
১. 'কাঁচামাল' ও 'শ্রম' এ দুই বস্তুর সমন্বয়ে 'পণ্য' অস্তিত্বে আসে। এক্ষেত্রে কাঁচামাল হচ্ছে প্রকৃতির দান, মূল ভূমিকা হচ্ছে শ্রমের যা কাঁচামালের উপর প্রয়োগ করার পর এর মূল্য বেড়ে গিয়েছে। তাই, বস্তুত মূল্য বৃদ্ধির পেছনে মূল অবদান শ্রমের।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 ইসলামী দর্শনে উৎপাদন ও বণ্টন নীতি

📄 ইসলামী দর্শনে উৎপাদন ও বণ্টন নীতি


কোরআন-সুন্নাহ অর্থনীতির শাস্ত্রীয় ভঙ্গিমায় সম্পদ উৎপাদন-বণ্টনের আলোচনা করেনি। কিন্তু কোরআন-সুন্নায় অর্থনীতি সংক্রান্ত বিক্ষিপ্ত আলোচনাগুলো গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝে আসে, ইসলাম মূলধন (Capital) ও উদ্যোক্তার (Entrepreneur) ভিন্নতাকে স্বীকার করেনি। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা অর্থদাতাকে নির্দিষ্ট হারে সুদ দিয়ে কারবারের সকল ঝুঁকি উদ্যোক্তার ঘাড়ে চাপিয়েছে। কিন্তু ইসলামে সুদ হারাম করা হয়েছে। আর কারবারের সকল ঝুঁকি অর্থদাতার ঘাড়ে রাখা হয়েছে। তাই অর্থদাতা ঝুঁকি গ্রহণের ভিত্তিতে (উদ্যোক্তার সাথে মিলে) লভ্যাংশ প্রাপ্তির অধিকারী হয়।

সারমর্ম হলো- যেভাবে নির্ধারিত হারে ভূমিকে ভাড়া, শ্রমকে মজুরি দেয়া হয়, সেভাবে অর্থকে নির্ধারিত সুদ দেয়া যাবে না। ইসলামী বিধানের আলোকে সাব্যস্ত হয় 'ভূমি' তিন দিক (সত্তাগত অক্ষুণ্ণতা, মূল্যগত ক্ষুণ্ণতা এবং দায়বদ্ধতা) বিবেচনায় 'অর্থ' থেকে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।

প্রথম মৌলিক স্বাতন্ত্র্য: ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থদাতাকে নির্দিষ্ট হারে ঝুঁকিমুক্ত সুদ দেয়া হয়। পক্ষান্তরে ইসলাম অর্থদাতাকে লভ্যাংশ দেয়- সাথে সাথে তাকে বহন করতে হয় সম্ভাব্য লোকসানের ঝুঁকি।

দ্বিতীয় মৌলিক স্বাতন্ত্র্য: ইসলামী শিক্ষার সারকথা হলো, প্রত্যেক বস্তুর প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তা'আলার। তাই উৎপাদনের কোনো উপাদানই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে উৎপন্ন আয়ের হকদার নয়; বরং আল্লাহ তা'আলা যাদের হকদার বলে স্বীকৃতি দিবেন তারাই শুধু হকদার বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যক্ষ উপাদানগুলোকে প্রথম হকদার হিসেবে সাব্যস্ত করার সাথে সাথে দ্বিতীয় হকদার হিসেবে পরোক্ষ উপাদানেরও (নিঃস্ব শ্রেণী) একটি তালিকা বাতলে দিয়েছেন। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর হকদারদের নিকট সম্পদ পৌঁছানোর জন্য ইসলাম যাকাত, উশর, সদকা, খরাজ, বিভিন্ন কাফফারা ইত্যাদির বিধান দিয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ (الذاريات: ১৯) অর্থ: তাদের মালে মুখাপেক্ষী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।

টিকাঃ
১. 'অর্থদাতা'-কে ইসলাম 'উদ্যোক্তা' নামক উপাদানটিতে শামিল করেছে। কেননা, অর্থদাতা ঝুঁকি বহন করে, যা মূলত উদ্যোক্তার কাজ। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে উৎপাদনের উপাদান হলো তিনটি- ভূমি, শ্রম, উদ্যোক্তা; ভূমির ভাড়া, শ্রমের মজুরি দেয়ার পর যা লাভ থাকবে তা উদ্যোক্তা নিবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px