📄 অর্থনীতির ইসলামী দর্শন
ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লাভের পর আমরা অর্থনীতির মৌলিক সমস্যা চতুষ্টয়ের ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করবো।
স্মর্তব্য যে, ইসলাম কোনো অর্থনৈতিক দর্শনের নাম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম- যার বিধানাবলীর ব্যাপ্তি জীবনের প্রতিটি শাখায়। তাই 'কোরআন' ও 'হাদিস' বর্তমানে প্রচলিত অর্থের কোনো অর্থনৈতিক দর্শন বা মতবাদ উপস্থাপন করেনি।
ইসলামী বিধান ও শিক্ষার আলোকে প্রতীয়মান হয়, ইসলাম বাজার-শক্তি তথা চাহিদা-যোগান বিধিকে সমর্থন করে। অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর সমাধানে এ বিধির প্রয়োগকে ইসলাম যথার্থ সহায়ক মনে করে। কোরআনে এরশাদ হয়েছে- نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا। অর্থ: "পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা তো আমিই বণ্টন করেছি এবং আমিই তাদের একজনকে অপরজনের উপর মর্যাদায় উন্নিত করেছি, যাতে তাদের একে অন্যের দ্বারা কাজ নিতে পারে।" (সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৩২)
ইসলাম ব্যক্তি-মুনাফার প্রেরণাকে এবং বাজারশক্তি উভয়টিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে। ব্যক্তি-মুনাফার উপর আরোপিত এসব বিধি-নিষেধগুলো মৌলিকভাবে তিন প্রকার-
১. ঐশী বিধি-নিষেধ: সর্বপ্রথম ইসলাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর হালাল-হারামের এমন কিছু স্থায়ী বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে যা সর্বযুগে, সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন: সুদ, জুয়া, লটারী, গুদামজাত করা সহ সকল প্রকার অবৈধ লেনদেনকে চিরতরে হারাম করা হয়েছে।
২. রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ: উল্লেখিত খোদায়ী বিধি-নিষেধগুলো সর্বকালের সর্বযুগেই শিরোধার্য থাকবে। এর সাথে সাথে শরিয়ত প্রতি যুগের শাসককে যুগোপযোগিতার ভিত্তিতে এমন বস্তু বা কাজের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের অধিকার দিয়েছে যা মূলত হারাম নয়, বরং মুবাহ বা বৈধ, কিন্তু তা তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কোনো সামগ্রিক অকল্যাণ বয়ে আনছে। এ মূলনীতির আলোকে রাষ্ট্র জনগণের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।
৩. নৈতিক বিধি-নিষেধ: ইসলামে শিক্ষার প্রতিটি পদক্ষেপেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আর তদোলব্ধ বৈষয়িক কল্যাণই জীবনের চরম চাওয়া-পাওয়া নয়। মানুষের আসল দায়িত্ব হলো দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের সোপান বানানো। অন্যের চেয়ে চার পয়সা বেশি উপার্জন করা সফলতা নয়- বরং সফলতা হলো আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য বেশি থেকে বেশি আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করা। নৈতিক বিধি-নিষেধ দ্বারা এ প্রকার বিধি-নিষেধই উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
১. أخرجه مسلم في "صحيحه" برقم ١٥٢٢ ، عن جابر رضي الله عنه。
২. أخرجه أبو داؤد في "سننه" من "باب في التسعير"।
১. أُولِي الأمْرِ কারা এ ব্যাখ্যায় তাফসীরে 'ফাতহুল কাদীর' এর লেখক আল্লামা শাওকানী রহ. নিম্নোক্ত সাত শ্রেণীকে উল্লেখ করেছেন- ১. উলামা-ফুকাহায়ে কেরাম। ২. রাজা-বাদশাহ। ৩. বিচারক বা কাজী। ৪. প্রত্যেক এমন ব্যক্তি যাকে শরীয়তের পক্ষ থেকে কোনো কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে। ৫. আহলে কুরআন ও ইলম। ৬. সাহাবীগণ। ৭. ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদ। তবে তাফসীরে মাআরিফুল কোরআনে 'রাষ্ট্রপ্রধান' ও 'উলামায়ে কেরাম'- উভয় শ্রেণীকেই أولي أمر হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১. উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, সরকার কর্তৃক আরোপিত বিধি-নিষেধগুলো তিন ধরনের হতে পারে- ১. শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। ২. শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং জনকল্যাণমূলকও নয়। ৩. শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয় (বরং মুবাহ) এবং জনকল্যাণমূলক। এ ধরনের সরকারি বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রেই এ পুস্তকে বলা হয়েছে যে, أولي الأمر -এর আনুগত্য হিসেবে এগুলো পালন করা আবশ্যক।