📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 সমাজতন্ত্রের পর্যালোচনা

📄 সমাজতন্ত্রের পর্যালোচনা


প্রথমেই সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার পর্যালোচনা করবো। কেননা, এর ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা সহজ। সমাজতন্ত্রের এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে এতোটাই লাগামহীন ছেড়ে দেয়া হয়েছে যে, জনকল্যাণের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপেই উপেক্ষিত হয়েছে। প্রত্যেকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। কিন্তু এর সমাধানে সমাজতন্ত্র চরমপন্থার পরিচয় দিয়েছে। জনসাধারণের মানবিক চাহিদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

ধনতন্ত্র তো 'বাজারশক্তি' তথা চাহিদা-যোগান বিধিকে সকল সমস্যা সমাধানের মূলমন্ত্র সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্র এ শক্তিকে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা প্রণয়নকেই সকল ব্যাধির একমাত্র পথ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ সব কাজে পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা কৃত্রিম বন্ধনে পরিণত হয়।
ঠিক তেমনি, কে কোন পেশা গ্রহণ করবে? উৎপাদনের কোন কাজে কে কতটুকু অংশ নিবে? প্রত্যেকে নিজ নিজ সেবা কোন আঙ্গিকে জাতির সামনে তুলে ধরবে? বাস্তবেই এগুলো সামাজিক সমস্যা। এগুলোর সমাধান শুষ্ক পরিকল্পনার উপর ছেড়ে দিলে নিম্নোক্ত ক্ষতিগুলোর সম্মুখীন হতে হবে-

১. সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারই পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজটি আঞ্জাম দেয়। আর 'সরকার' কোনো ফেরেশতাদলের নাম নয় যে, তাদের থেকে কোনো বিচ্যুতি বা খেয়ানত সংঘটিত হবে না। বরং তারাও রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তারাও প্রবৃত্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের কাছে পরাস্ত হতে পারে। তাদের চিন্তা-ভাবনাতেও ভুল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, গোটা রাষ্ট্রের সকল পরিসম্পদ যখন ঐ গুটিকয়েক ব্যক্তিবর্গের হাতে সঁপে দেয়া হবে, তখন তাদেরও নিয়তে কলুষতা আসলে গোটা জাতিকে ভোগান্তি পোহাতে হবে।

২. সমাজতন্ত্রের পরিকল্পিত অর্থব্যবস্থা চরম স্বৈরাচারী শাসক ব্যতীত পরিচালিত হতে পারে না। কেননা, প্রতিটি বিষয়ে নাগরিকদের সার্বক্ষণিক পরিকল্পনার অধীনস্ত রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় জোর-জবরদস্তি আবশ্যক। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিসমাপ্তি অবশ্যম্ভাবী। এভাবে সবদিক থেকে মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে নিষ্পিষ্ট করা হয়。

৩. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেয়া হয়, এ কারণে মানুষের কর্মকাণ্ডে এর খারাপ প্রভাব পড়ে। যখন মানুষ দেখে- 'হাড়ভাঙ্গা খাটুনি' ও 'ফাঁকিবাজী' উভয়টি সমমূল্যায়িত হচ্ছে, তখন তারা কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলে। ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা মূলত খারাপ বিষয় নয়- বরং তা যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে মানুষের প্রতিভা বিকশিত হয়, নতুন নতুন সৃজনশীল কাজে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়। এ স্বভাবজাত স্পৃহাকে সীমার মধ্যে রাখার জন্য বিধি-নিষেধ আরোপ করার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তা সম্পূর্ণরূপে দমিয়ে দিলে মানুষের অনেক প্রতিভা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।

এগুলো কেবল দার্শনিক পর্যালোচনা নয়, বরং সমাজতন্ত্রের প্রথম পরীক্ষাগার রাশিয়ার ৭৪ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকালে রুশ প্রেসিডেন্ট ইয়েলিৎসন বলেছিলেন: “হায়! সমাজতান্ত্রিক (UTOPIAN) দর্শনের পরখটা যদি রাশিয়ার মতো একটি বিশাল দেশে না করে আফ্রিকার কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চলে করা হতো, তাহলে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা জানতে ৭৪ বছর লাগতো না।” (নিউজ উইক)

টিকাঃ
১. তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পার্লামেন্ট ছিলো 'ব্রিটেনের পার্লামেন্ট'। সে পার্লামেন্টে উভয় দলের তর্ক বিতর্ক লেগেই থাকতো। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নিয়ম ছিলো স্পীকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনিই এজলাস পরিচালনা করতেন। তার ডান পার্শ্বে বসতো সরকারি দল আর বাম পার্শ্বে বসতো বিরোধী দল। প্রথম দিকে ধনতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তারা শাসনক্ষমতায় ছিলো, তাই তারা স্পীকারের ডান দিকে বসতো। আর যারা সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তা ছিলো তারা স্পীকারের বাম দিকে বসতো। এ থেকেই ধনতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তাদের 'ডানপন্থি' এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তাদের 'বামপন্থি' বলা শুরু হয়। অতঃপর ক্ষমতায় যেতে পারুক বা না পারুক এটাই উভয় দলের পরিভাষা হয়ে যায়। (ইসলাম আওর সিয়াসী নাযরিয়াত, পৃ: ১২৭)
১. Utopian (ইউটোপিয়ান) অর্থ 'আকাশকুসুম কল্পনা'। মূলত এটি একটি বইয়ের নাম। প্রাচীনকালে কোনো ল্যাটিন বা গ্রিক রাজা লিখেছিলেন। এতে এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিলো- যেখানে সকল বস্তু মানুষের যৌথ মালিকানাধীন। যে কেউ যে কোনো বস্তু ইচ্ছা করলেই বিনামূল্যে লাভ করতে পারে। কারো প্রতি কোনো বিধি-নিষেধ নেই। এটা বাস্তবায়ন যেহেতু অলীক কল্পনা ছিলো, তাই এ শব্দটি এক কাল্পনিক স্বর্গের অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 ধনতন্ত্রের পর্যালোচনা

📄 ধনতন্ত্রের পর্যালোচনা


সমাজতন্ত্রের পতনে ধনতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্ব খুব ধুমধাম উল্লাসে মেতে ওঠে। তারা প্রচারণা চালায়- সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতাই প্রমাণ করছে ধনতন্ত্রের যথার্থতাকে। অথচ বাস্তবতা এই যে, সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ এই নয় যে ধনতন্ত্র যথার্থ- বরং সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ হলো, সমাজতন্ত্র ধনতন্ত্রের ত্রুটিগুলো সংশোধনের স্থলে নতুন বিচ্যুতির অবতারণা ঘটিয়েছে। এজন্য আগে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো সূক্ষ্মভাবে বুঝা প্রয়োজন।

বস্তুত ধনতন্ত্রের এ দর্শনটি সঠিক ছিলো যে, "অর্থনৈতিক সমস্যা নিরসনের মূল চালিকাশক্তি ব্যক্তিগত মুনাফা প্রবৃদ্ধির প্রেরণা। সাথে সাথে 'বাজারশক্তি' তথা চাহিদা-যোগানকে কাজে লাগানো উচিত- কেননা এটা মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা।" কিন্তু মুনাফা প্রবৃদ্ধির পন্থা অবলম্বন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে লাগামহীন স্বাধীনতা দেয়াতেই মূলত বিচ্যুতির সূত্রপাত ঘটে। এতে না হালাল-হারামের তোয়াক্কা ছিলো, না সামষ্টিক কল্যাণের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো। ফলে কারো জন্য এমন পন্থা অবলম্বন করারও সুযোগ থাকে যার মাধ্যমে সে সর্বোচ্চ সম্পদশালী হয়ে বাজারের একচেটিয়া কর্তৃত্ব (Monopoly) অর্জন করে নেয়।

ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের প্রেরণাকে সীমাহীন উন্মুক্ত এবং মাত্রাতিরিক্ত জোর দেয়ার দরুণ ধনতান্ত্রিক দর্শনে যেসব বিচ্যুতি সূচিত হয়েছে তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১. চারিত্রিক অধঃপতন: মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বাছ-বিচার না থাকায় বহু চারিত্রিক অধঃপতনের সূত্রপাত হয়। বেশি থেকে বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য মানুষের হীন প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করে তাদের কাছে কাম প্রবৃত্তির উপকরণ সরবরাহ করে। এতে সমাজে নৈতিক বিকৃতি ছড়িয়ে পড়ে।

২. জনকল্যাণ উপেক্ষিত: মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে নৈতিক বিধি-নিষেধ না থাকার দরুণ 'প্রয়োজন নিরূপণ' ও 'উপকরণ বিভাজন'-এর ক্ষেত্রে জনকল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে না। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনই যখন চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির হলো, তখন উলঙ্গ ফিল্মের মাধ্যমে তা অর্জন করা গেলে গৃহহীনদের গৃহের ব্যবস্থাপনা কে করতে চাইবে? যখন তাতে তুলনামূলক স্বল্প লাভ!

৩. একচেটিয়া ঠিকাদারির উদ্ভব: মুনাফা প্রবৃদ্ধির প্রেরণাকে হালাল-হারামের লাগামহীন উন্মুক্ত ছেড়ে দেয়ায় সুদ, জুয়া, হুন্ডি সবই বৈধতা পাচ্ছে- অথচ এগুলো অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ ও ভারসাম্যকে ভেস্তে দেয়। ফলশ্রুতিতে অসংখ্য ঠিকাদারের উদ্ভব ঘটছে। আর এসব ঠিকাদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিক বাজারশক্তি তথা চাহিদা-যোগানের গতিপ্রবাহ থমকে যাচ্ছে। একদিকে তো পুঁজিবাদী দর্শন দাবি করে, আমরা বাজার শক্তি তথা চাহিদা-যোগান বিধিকে কাজে লাগানোতে তৎপর। অন্যদিকে মুনাফা প্রবৃদ্ধির প্রেরণাকে লাগামহীন ছেড়ে দিয়ে একচেটিয়া ঠিকাদারির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে- যা চাহিদা-যোগানের প্রাকৃতিক শক্তিকে অকেজো ও স্তিমিত করে দেয়।

৪. দুর্নীতিমূলক হস্তক্ষেপ: যদিও ধনতন্ত্রের মূল দর্শন ছিলো শিল্প-বাণিজ্যে পূর্ণ ব্যক্তি-স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তব ময়দানে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে এ নীতির উপর অটল থাকা সম্ভব হয়নি। মোটামুটি সকল রাষ্ট্রেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু-না-কিছু হস্তক্ষেপ হতে থাকে। কিন্তু এই হস্তক্ষেপ সাধারণত প্রভাবশালী পুঁজিপতিরাই সরকারি আমলাদের বাগিয়ে নিয়ে বাস্তবায়ন করায়। ফলে এর প্রত্যক্ষ ফায়দা কেবল পুঁজিপতিরাই লুটে, জনসাধারণের কপালে শুধু দুঃখই জুটে!

৫. বণ্টন বৈষম্য: ধনতন্ত্রে চরম বৈষম্যপূর্ণভাবে সম্পদ বণ্টন হয়ে থাকে। এ বৈষম্যের একটি বড় কারণ 'সুদ' ও 'জুয়া'। এগুলোর দ্বারা সম্পদের স্রোত দরিদ্র জনসাধারণ থেকে ধনীদের দিকে প্রবাহিত হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px