📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 অর্থনীতির মূল কথা

📄 অর্থনীতির মূল কথা


ইংরেজি Economics শব্দটির অনুবাদ উর্দুতে 'معاشیات' করা হয়, কিন্তু তাতে Economics-এর বাস্তব অর্থ ফুটে ওঠে না- বরং আরবী اقتصاد শব্দটিতেই এর যথার্থ অর্থ প্রস্ফুটিত হয়। এ শব্দ থেকেই প্রতীয়মান হচ্ছে, সকল অর্থনৈতিক দর্শন এ স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, “মানবীয় অভাবের তুলনায় উপকরণ অপ্রতুল"। আর 'প্রচলিত অর্থনীতি' বিলাস-আকাঙ্ক্ষাকেও অভাবের অন্তর্ভুক্ত করে! ফলে মানুষের অভাব অসীম আর সম্পদ সসীম। প্রশ্ন জাগে- কিভাবে এই অসীম অভাব সসীম সম্পদে নিবারিত হবে?!

Economics এবং اقتصاد এর অর্থই হচ্ছে, সসীম উপকরণগুলো এমনভাবে কাজে লাগানো যাতে যথাসম্ভব অসীম উপযোগ লাভ হয়। এজন্যই এ শাস্ত্রকে Economics এবং اقتصاد বলা হয়।

টিকাঃ
১. অর্থনীতির উর্দু পরিভাষা 'معاشیات'-এর মূল অর্থ 'জীবনোপকরণ সম্বন্ধীয় বিষয়'। আর ইংরেজি পরিভাষা 'Economics'- যার অর্থ অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে লিখা হয়েছে: "The study of how a society organizes its money, trade and industry"। অর্থাৎ, সমাজ কিভাবে অর্থ-বাণিজ্য ও কল-কারখানার সুষম ব্যবস্থাপনা করতে পারে, সে সম্পর্কীয় জ্ঞানকে Economics বলে। আর اقتصاد এর মূল অর্থ "পরিমিত ব্যয়"। যেহেতু পরিমিত ব্যয়ের মাধ্যমেই সমাজের আর্থিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা সুষম হয়, তাই Economics এর বাস্তব অর্থ اقتصاد এর মধ্যে পাওয়া গেলো- 'معاشیات' এর মধ্যে নয়।
২. আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদ মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন দা.বা. বলেন- ইসলামের দৃষ্টিতে অভাব বা চাহিদা বলতে এতো ব্যাপক অর্থ বুঝায় না। ফুকাহায়ে কেরাম মানবীয় চাহিদাগুলোকে পাঁচ স্তরে ভাগ করেছেন- ① জরুরত (ضرورت): যা গ্রহণ না করলে জান-মাল, ইজ্জত-সম্মানের ক্ষতি হবে কিংবা কোনো অঙ্গহানি হবে এবং তাৎক্ষণিক অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও পাওয়া যায় না। ② হাজত (حاجت): যা গ্রহণ না করলে সীমাহীন কষ্ট হবে। ③ মানফাআত বা রাহাত (منفعت يا راحت): যা গ্রহণ করলে শারীরিক উপকার লাভ হবে, তবে গ্রহণ না করলেও কোনো ক্ষতি হবে না। ④ যীনাত (زينة): যা দ্বারা কোনো শারীরিক শক্তি অর্জন হয় না- শুধু আন্তরিক প্রশান্তি লাভ হয়। ⑤ ফুযূল (فضول): বৈধতার গণ্ডির বাহিরে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করার আকাঙ্ক্ষা। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খণ্ড: ৭, পৃ:৩৫) "ইসলাম প্রথম চার প্রকার মানবীয় চাহিদাকে বৈধতার স্বীকৃতি দিয়েছে এবং পঞ্চম স্তরের চাহিদাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। তাই প্রচলিত অর্থনীতির কথিত 'অসীম অভাব'-এর ধারণাটি ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে অভাবের সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সে সীমার মধ্যে থেকে সম্পদ ব্যবহার করলে আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ সীমিত মনে হবে না এবং বাস্তবেও তা সীমিত নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন- (২:২৯) هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا (البقرة) অপর্যাপ্ত ধরা হলে বান্দার প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহ প্রকাশ হয় না। আর এটা স্পষ্ট যুক্তি পরিপন্থি যে, আল্লাহ তা'আলা পর্যাপ্ত উপকরণ ব্যবস্থা না করেই মানুষকে দুনিয়াতে পাঠাবেন। কেননা, কেউ কাউকে কোথাও নিমন্ত্রণ জানালে পর্যাপ্ত মেহমানদারীর ব্যবস্থা করার পরই নিমন্ত্রণ করে।
১. এটি প্রচলিত অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি। ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনীতি ঐ বিদ্যাকে বলে যার মাধ্যমে অর্থকে অর্থের মালিকের বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 অর্থনীতির মৌলিক সমস্যা

📄 অর্থনীতির মৌলিক সমস্যা


সসীম সম্পদে অসীম অভাব পূরণের প্রয়াসে প্রতিটি অর্থব্যবস্থাই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে স্ব-স্ব সমাধান পেশ করেছে। এগুলোকে 'মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা' বলে- যা মূলত চারটি:-

১. প্রয়োজন নিরূপণ (Determination of Priorities): অর্থনীতি শাস্ত্রের প্রথম সমস্যাটির নাম 'প্রয়োজন নিরূপণ'। এর সারকথা হলো মানুষের অভাব অগণিত আর উপকরণ সীমিত। এটা তো সুস্পষ্ট যে, এই সীমিত উপকরণ দিয়ে সীমাহীন প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই কিছু প্রয়োজন ও চাহিদাকে এগিয়ে দিতে হবে, আর কিছুকে পিছিয়ে দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, কোন প্রয়োজনকে আগানো হবে, আর কোন প্রয়োজনকে পিছানো হবে? উদাহরণস্বরূপ, আমার কাছে পঞ্চাশ টাকা আছে। এ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আটাও ক্রয় করতে পারি, কাপড়ও ক্রয় করতে পারি, কোনো রেস্তোরাঁয় বসে উন্নত খাবারও খেতে পারি। এ চার-পাঁচটি অবকাশ আমার সামনে আছে। এখন আমি এই পঞ্চাশ টাকা 'কোন কাজে' খরচ করবো? এর সমাধানকেই বলে 'প্রয়োজন নিরূপণ'। এ প্রশ্ন যেমন ব্যক্তিজীবনে, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনকে ঘিরেও। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশে কিছু প্রাকৃতিক, কিছু মানবিক, কিছু খনিজ সম্পদ আর কিছু কাঁচামাল আছে। দেশের অগণিত প্রয়োজনের তুলনায় উপকরণগুলো নিতান্তই অপ্রতুল। এখন সর্বাগ্রে নির্ধারণ করতে হবে, উপকরণগুলো কোন কাজে ব্যয় করা হবে? কোন জিনিসের উৎপাদন আগে করা হবে? এরই নাম 'প্রয়োজন নিরূপণ'।

২. উপকরণ বিভাজন (Allocation of Resources): আমাদের কাছে উৎপাদনের উপকরণ তথা ভূমি, শ্রম ও মূলধন আছে। সেগুলোকে আমরা কোন কাজে কতটুকু ব্যবহার করবো? মনেকরি, আমাদের ভূমি আছে। এখন 'কতটুকুতে' গম আর 'কতটুকুতে' ধান বা তুলা চাষ করবো? তেমনি আমাদের কাপড়, জুতা বা খাদ্য তৈরির কারখানা নির্মাণের সামর্থ আছে। এখন 'কয়টি' কারখানা কাপড় তৈরিতে লাগাবো? আর 'কয়টি' জুতা বা খাদ্য তৈরিতে লাগাবো? এর সমাধানের নামই 'উপকরণ বিভাজন'।

৩. আয় বণ্টন (Distribution of Income): উপরোক্ত উপকরণগুলো কাজে লাগিয়ে যা উৎপন্ন হলো, তা সমাজে 'কিভাবে' ছড়িয়ে দেয়া হবে? এ সমস্যা সমাধানের নামই 'আয় বণ্টন'।

৪. উন্নয়ন (Development): নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানকে কিভাবে উন্নতির উচ্চতর শিখরে উন্নীত করা যায়? কিভাবে নিজস্ব পণ্যসমূহের মানগত সমৃদ্ধি এবং পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়? কিভাবে নিত্য-নতুন কারিগরি কৌশল উদ্ভাবন করা যায়? কীভাবে জনগণ পায় আয়ের নব দিগন্তের দিশা? এগুলোর সমাধানের নামই 'উন্নয়ন'।

এ চারটি মৌলিক সমস্যা সর্বযুগীয় হলেও শাস্ত্রীয় পর্যালোচনা বিগত শতাব্দীগুলোতেই হয়েছে। ফলশ্রুতিতে পরস্পর বিরোধী দু'টি মতবাদের অবতারণা ঘটেছে- এক: ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism / الرَّأْسُمَالِيَّة), দুই: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Socialism / الاشتراكية)

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 এক. ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা (الرَّأْسُمَالِيَّةُ/Capitalism)

📄 এক. ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা (الرَّأْسُمَالِيَّةُ/Capitalism)


সর্বপ্রথম আমাদের বুঝতে হবে, উল্লেখিত চারটি মৌলিক সমস্যা নিরসনে ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কী দর্শন পেশ করে। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার বক্তব্য হলো, শিল্প-বাণিজ্যে পূর্ণ ব্যক্তি-স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বেশি থেকে বেশি উপার্জনে ব্যক্তি থাকবে পূর্ণ স্বাধীন। এতেই অন্তর্নিহিত আছে সমস্যা চতুষ্টয়ের নিপুণ সমাধান। কেননা, স্বাধীনভাবে অধিক উপার্জনের প্রয়াসই ব্যক্তিকে সমাজের প্রয়োজনীয় বস্তুটি উৎপাদনে সদা ব্রত রাখবে। ফলশ্রুতিতে সমস্যা চতুষ্টয়ে এক স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় সাধন হবে। প্রশ্ন জাগে- 'স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়' আবার কীভাবে হবে?! এর উত্তর খানিক বিশ্লেষণীয়- যার পূর্বে নিম্নোক্ত দু'টি ভূমিকা উল্লেখ্য:

ভূমিকা এক: দুনিয়ার বহু বস্তু আল্লাহর কুদরতের অদৃশ্য কলকাঠিতে নিয়ন্ত্রিত হয়ে এক অভিন্ন চক্রবিধিতে আবর্তমান আছে। এমনই এক চক্রবিধির নাম 'চাহিদা ও যোগান বিধি'। বাজারে দ্রব্যের মোট বিক্রয়যোগ্য পরিমাণকে বলে 'যোগান'। আর নির্দিষ্ট মূল্যে তা ক্রয় করার জন্য ক্রেতার সাধ্যাধীন ইচ্ছাকেই বলে 'চাহিদা'। এই চাহিদা ও যোগানের প্রাকৃতিক বিধান হলো, "বস্তুর যোগান বৃদ্ধি পেলে দাম কমে যায়, আর চাহিদা বৃদ্ধি পেলে দাম বৃদ্ধি পায়।" উদাহরণস্বরূপ, গ্রীষ্মকালে বাজারে বরফের ক্রেতা বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, বাজারে বরফের চাহিদা বেড়ে গেছে। এখন বরফের যোগান যদি বর্ধিত চাহিদার তুলনায় কম হয়, তাহলে নির্ঘাত বরফের দাম বেড়ে যাবে। তবে বরফের যোগানকেও চাহিদা অনুপাতে বাড়ানো হলে মূল্য স্থির থাকবে। অপরপক্ষে, শীতকালে বরফের ক্রেতা হ্রাস পায়। যার অর্থ হলো, বাজারে বরফের চাহিদা কমে গেছে। এখন বাজারে বরফের যোগান যদি এই চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে নির্ঘাত বরফের দাম কমে যাবে। এ এক প্রাকৃতিক বিধি, যাকে চাহিদা ও যোগান বিধি (Law of Demand & Supply) বলে。

ভূমিকা দুই: ধনতান্ত্রিক দর্শন হলো, চাহিদা যোগানের প্রাকৃতিক নীতিই মূলত কৃষককে বলে দেয়- সে কী উৎপন্ন করবে? কারিগর ও শিল্পপতিদের নির্ধারণ করে দেয়- সে কোন জিনিস কী পরিমাণে বাজারজাত করবে? এভাবেই সমস্যা চতুষ্টয়ে 'স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়' সাধন হবে。

এবার ব্যাখ্যায় আসা যাক-
প্রথমত 'চাহিদা ও যোগান বিধি' দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'প্রয়োজন নিরূপণ' কিভাবে হবে? আমরা যখন শিল্প-বাণিজ্যে ব্যক্তির পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবো, তখন প্রত্যেকেই বেশি থেকে বেশি মুনাফার প্রেরণায় সমাজের প্রয়োজনীয় বস্তুগুলোই বাজারজাত করবে। কৃষক এমন পণ্যের উৎপাদনকে প্রাধান্য দিবে, বাজারে যার চাহিদা বেশি। শিল্পপতিও ঐ দ্রব্য উৎপাদনে বেশি প্রয়াসী হবেন, বাজারে যার চাহিদা বেশি। কেননা, যদি তারা এর বিপরীতটি করেন তাহলে তাদের অভীষ্ট মুনাফা ফসকে যাবে। কাজেই এই দর্শনের ফলাফল হলো, যদিও প্রত্যেকে নিজস্ব মুনাফার জন্য কাজ করছে, কিন্তু চাহিদা-যোগানের অদৃশ্য কলকাঠি তাকে বাধ্য করছে সমাজের চাহিদা পূরণ করে দিতে। এভাবে, সমাজের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত উৎপাদন যেহেতু ব্যবসায়ীর জন্য লাভজনক নয়, তাই এখন সে তার উৎপাদনও বন্ধ করে দিবে। এভাবে সমাজে শুধু ঐ দ্রব্যই উৎপাদন হবে- যা সমাজে নিতান্তই প্রয়োজন; ঐ পরিমাণই উৎপাদন হবে- যা সমাজের প্রকৃত চাহিদা। এরই নাম 'প্রয়োজন নিরূপণ'।

দ্বিতীয়ত আসা যাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'উপকরণ বিভাজন'-এর ব্যাখ্যায়! এ বিষয়টি প্রয়োজন নিরূপণের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেননা, কোনো ব্যক্তি যখন যথাযথ প্রয়োজন নিরূপণ করে নিবে, তখন নিজের সম্পদগুলোকে সেমতে বিভাজন করে কাজে লাগিয়ে নিবে। তাই বলা যায়, চাহিদা ও যোগান বিধি প্রয়োজন নিরূপণের সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'উপকরণ বিভাজন'-ও করে দেয়। ফলশ্রুতিতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার ভূমি, শ্রম, মূলধনকে ঐ লাভজনক খাতেই বিনিয়োগ করতে সক্ষম হবে যা বাজারের উচ্চ চাহিদা হেতু দ্বিগুণ মুনাফা বয়ে আনবে。

তৃতীয়ত আসা যাক- 'চাহিদা ও যোগান বিধি' দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'আয় বণ্টন' কিভাবে হবে? আর সেটাকে কোন ভিত্তিতে সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হবে? পুঁজিবাদের বক্তব্য হলো, লব্ধ আয় উৎপাদনের উপাদানগুলোর মাঝেই বণ্টিত হবে। আর এরূপ উপাদান চারটি: (১) ভূমি, (২) শ্রম, (৩) মূলধন, (৪) উদ্যোক্তা বা সংঘটক (যিনি কারবারের সকল ঝুঁকি নিজের উপর নিয়ে ভূমি, শ্রম ও মূলধনের সমন্বয় সাধন করতঃ উৎপাদন কার্য পরিচালনা করেন)। ভূমির মালিককে 'ভাড়া', শ্রমিককে 'মজুরি' আর মূলধন বিনিয়োগকারীকে 'সুদ' প্রদানের পর অবশিষ্ট লভ্যাংশ উদ্যোক্তা বা সংঘটকের।

প্রশ্ন হচ্ছে: ভাড়া, মজুরি ও সুদের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হবে? জবাব একই- চাহিদা-যোগান বিধিই তা নির্ধারণ করবে। যে উপাদানটির চাহিদা বেশি তার খরচও সে হারে বেশি পড়বে। ধরা যাক, যায়েদ একটি কারখানা তৈরি করতে যাচ্ছে। যেহেতু সে উপাদান সমন্বয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাই অর্থনীতির পরিভাষায় তাকেই উদ্যোক্তা (Entrepreneur) বলা হবে। এবার উদ্যোক্তার নিজস্ব ভূমি না থাকলে ভাড়ায় নিতে হবে। এই ভাড়া নির্ধারণ হবে চাহিদা-যোগান সংঘাতের মাধ্যমে। ভাড়া প্রদানেচ্ছুর তুলনায় গ্রহণেচ্ছু কম হলে ভাড়া কম হবে। কেননা, এক্ষেত্রে যোগান বেশি, চাহিদা কম। আবার এর বিপরীত প্রেক্ষাপটে ভাড়া বেশি হবে। এভাবে চাহিদা-যোগান বিধিই ভাড়া বাতলে দিবে।

এরপর উদ্যোক্তার উপর বর্তাবে শ্রমিক নিয়োগ ও তাদের মজুরি গুনার দায়। এ মজুরির পরিমাণও চাহিদা-যোগান বিধি নির্ধারণ করে দিবে। কর্মেচ্ছু শ্রমিক বেশি হলে মজুরি কম হবে। পক্ষান্তরে, কর্মেচ্ছু শ্রমিক কম হলে মজুরি বেশি হবে। এভাবে চাহিদা-যোগানের সংঘাতের পর ভারসাম্যপূর্ণ অঙ্কটিই শ্রমের মজুরি হিসেবে নির্ধারিত হবে।

এরপর যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল বাবদ বিপুল পুঁজি যোগাতে গিয়ে পুঁজিপতিকে ঋণের দ্বারস্থ হতে হবে। আর ধনতন্ত্রের মন্ত্র হলো, ঋণের مقابلے সুদ গুনতে হবে। এই সুদের পরিমাণও চাহিদা-যোগান বিধি নির্ধারণ করে দিবে। যদি ঋণদাতার আধিক্য হয়- যার অর্থ হচ্ছে পুঁজির যোগান বেশি- তাহলে স্বল্পসুদেই ঋণ পাওয়া যাবে। আর যদি ঋণদাতার অভাব হয়- যার অর্থ হচ্ছে পুঁজির যোগান কম- তাহলে সুদের হারও বেড়ে যাবে। এভাবে সুদের হারও চাহিদা-যোগান সূত্র বাতলে দেয়। দারুণ! 'ভূমি, শ্রম, মূলধন' সবগুলোই চাহিদা-যোগানের এক সূত্রেই স্থির হয়ে গেলো! এবার কারখানার অবশিষ্ট লাভ উদ্যোক্তার বৈ আর কার?

চতুর্থত আসা যাক- 'চাহিদা ও যোগান বিধি' দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'উন্নয়ন' কিভাবে হবে?! অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির চাকা সচল রাখা যে কোনো দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সমাধানও নিহিত আছে যোগান- চাহিদার সেই অভিন্ন মন্ত্রে। কেননা, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যখন উপার্জনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেয়া হবে, তখন যোগান-চাহিদার অদৃশ্য কলকাঠিই তাকে অনুপ্রাণিত করবে নিত্য-নতুন মানসম্পন্ন পণ্য বাজারজাত করতে- যাতে চাহিদার প্রাবল্য মুনাফার প্রাচুর্য বয়ে আনে।

টিকাঃ
১. ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার অপর নাম 'পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা'- যার সূত্রপাত হয় ইউরোপে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মোটামুটি ১৭৫০-১৮৫০ সময়কালে কৃষি এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থা হতে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে গতি শুরু হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীর সমুদ্র যাত্রা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। এরপর পুঁজিবাদের উদ্ভব, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, কয়লার খনি আর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে অনেক শিল্পশহর আর কারখানা গড়ে উঠে। আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটার আগ পর্যন্ত 'সামন্ততন্ত্র' চালু ছিলো। এই প্রথায় সমস্ত ভূসম্পত্তির মালিক থাকতো রাজা এবং তিনি তার অধীনস্ত সামন্ত জমিদারদের মধ্যে সেই জমি বণ্টন করে দিতেন। জমিদাররা সেই জমি তাদের অধীনস্ত নিম্ন ভূস্বামীদের মধ্যে বিলি করতো। এভাবে সর্বশেষে কৃষকদের মধ্যে সেই জমি বণ্টিত হতো। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে তার ফসল উৎপন্ন করতো কিন্তু সে ফসলের অতি সামান্যই তারা ভোগ করতে পারতো। কালক্রমে এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন দেখা দিল। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। তারপর ফ্রান্সের দেখাদেখি বিপ্লব দেখা দেয় পুরা ইউরোপে। ফরাসি বিপ্লব সামন্ততন্ত্র তথা জমিদারী প্রথাকে উঠিয়ে দিয়ে নিম্নোক্ত তিনটি ইশতেহার কার্যকর করেছিলো। সেগুলো হচ্ছে- (ক) ব্যক্তির স্বাধীনতা, (খ) ক্ষমতার বিভাজন, (গ) ধর্ম থেকে রাষ্ট্র পৃথকীকরণ। অতঃপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে বহু কলকারখানা ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয় তখন এই জমিদারী প্রথা পরিপূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়ে এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার স্থান দখল করে নেয়। শহরগুলোতে বড় বড় কারখানা স্থাপিত হতে থাকে এবং জমিদারের জুলুম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের অধিবাসীরা শহরের দিকে ধাবিত হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হস্তশিল্পগুলো বিলুপ্ত হয়ে বৃহৎ যন্ত্রশিল্পের ব্যাপ্তি ঘটে। জমিদাররাও এতে সুবিধা দেখে এতেই তাদের মূলধন বিনিয়োগ করতে শুরু করল। ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রমিকরা বেকার হয়ে গিয়ে কারখানাগুলোতে ধরনা দিতে থাকে। এ অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পুঁজিপতিরা নামমাত্র পারিশ্রমিকে তাদের খাটিয়ে প্রচুর লাভবান হতে থাকে। এভাবেই ধনতন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ ঘটে।

📘 ইসলাম ও চলমান অর্থবাণিজ্য 📄 ধনতন্ত্রের মূলনীতি

📄 ধনতন্ত্রের মূলনীতি


ধনতন্ত্রের মৌলিক মূলনীতি তিনটি-

১. ব্যক্তি মালিকানা (Private Property): ধনতন্ত্র ব্যক্তিকে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী থেকে নিয়ে শিল্পপণ্য, এমনকি কলকারখানা পর্যন্ত ব্যক্তি মালিকানায় রাখার অনুমতি দেয়। আর সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর বাইরে কোনো কিছুরই মালিক হতে দেয় না।

২. মুনাফা লাভের প্রেরণা (Profit Motive): অবাধে সর্বাধিক মুনাফা লাভের অনুপ্রেরণা ধনতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি।

৩. সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ততা (Laissez Faire): ধনতন্ত্র ব্যক্তিকে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক অনুশাসন থেকে মুক্ত করে অবাধ ব্যবসার অবকাশ দেয়। পরিভাষায় এ বিষয়টিকে "Laissez Faire" বা "সরকারের হস্তক্ষেপ না করার নীতি" বলা হয়। মূলত এটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ "করতে দাও"। সরকারকে যেন এ কথা বলা হচ্ছে- "যে যেভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাকে সেভাবেই করতে দাও; বাধ সেধো না। সরকারের অধিকার নেই যে, সে বলবে- ঐ ব্যবসা করো.. এভাবে করো...।"

এটাই ছিলো ধনতন্ত্রের মুখ্য মূলনীতি। কিন্তু ক্রমে ধনতান্ত্রিক দেশগুলোই এ নীতিকে শিথিল করে নিয়েছে- ব্যবসায়িদের উপর নিত্য নতুন 'বাণিজ্যনীতি' সদা আরোপ করে চলছে। কখনো ট্যাক্স চাপিয়ে নিয়ন্ত্রণ, আবার কখনো সাহস যুগিয়ে প্রলুদ্ধকরণ- এভাবেই চলছে প্রশাসন। ফলে বর্তমানে হস্তক্ষেপমুক্ত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র মোটেও নেই- যা কিনা ছিলো ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার প্রধান প্রতিশ্রুতি। এজন্যই বলা হয়, "ঐ সরকারই সর্বোত্তম সরকার, যে সরকার তার সরকারি (অর্থাৎ হস্তক্ষেপ) কম করে।"

যেহেতু ধনতান্ত্রিক দর্শনের মূল চালিকাশক্তিই হলো, নিজের 'ধন' বা 'পুঁজি' প্রবৃদ্ধির অনুপ্রেরণা; তাই এ দর্শনকে 'ধনতন্ত্র' ও 'পুঁজিবাদ' বলা হয়। এর আরেক নাম হলো 'Market Economy' বা 'বাজার-নির্ভর অর্থব্যবস্থা'। কেননা, এতে Market Forces বা 'বাজারশক্তি' তথা চাহিদা-যোগান বিধিকে কাজে লাগানো হয়।

টিকাঃ
১. আমরা যে সম্পদ উপর্জন করি তার প্রকৃত মালিক কে? মানুষ, সরকার নাকি আল্লাহ তা'আলা- এ ব্যাপারে তিনটি মতবাদ রয়েছে: (১) ধনতান্ত্রিক মতবাদ হলো, সম্পদে তার উপার্জনকারীর একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে অন্য কারো সামান্য পরিমাণও অধিকার নেই। (২) সমাজতান্ত্রিক মতবাদ হলো, ধন-সম্পদ সরকার তার ইচ্ছেমতো খরচ করবে কিংবা বণ্টন করবে। আর ইসলামের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তা'আলার। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَآتُوهُم مِّن مَّالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ (سورة النور ، الآية: ٣٣) "তোমরা ঐ মাল থেকে খরচ করো যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন।" অনুরূপভাবে অন্যত্র এরশাদ হয়েছে- وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الآخرة (سورة القصص، الآية: (۷۷) "যে মাল আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন তা থেকে আখিরাতের ঘর তালাশ করো।" অনেক সময় মানুষ ধারণা করে, নিজের পরিশ্রমে সম্পদ অর্জন হয়েছে। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মানুষের কাজ শুধুমাত্র চেষ্টা করা। আর তার চেষ্টা ফলপ্রসূ ও কৃতকার্য করা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতায়। কুরআনে কারীমে এ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে- أَفَرَأَيْتُم مَّا تَحْرُثُونَ، أَأَنتُمْ تَزْرَعُونَهُ أَمْ نَحْنُ الزَّارِعُونَ (سورة الواقعة، الآية: ٦٣-٦٤) "আচ্ছা, বলো তো দেখি, যা তোমরা চাষাবাদ করো, তা কি তোমরা উদগীরণ করো, না-কি আমি উদগীরণ করি।" এ সমস্ত আয়াত থেকে বুঝে আসে, ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তা'আলা। তবে তিনি মানুষকে প্রতিনিধিমূলক অস্থায়ী মালিকানা দান করেছেন, তাঁর বিধান মতো তা খরচ করার জন্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন- آمنوا بالله ورسوله وأنفقوا مما جعلكم مستخلفين فيه "তোমরা ঈমান আন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং খরচ করো ঐ সম্পদ থেকে যে সম্পদের ব্যাপারে তোমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়েছেন।"
২) অনুদান চুক্তির মাধ্যমে (عقد التبرع): যেমন হেবা (هبة), সদকা (صدقة/تبرع) ধার বা করজ দেয়া (عارية)।
৩) প্রাকৃতিকভাবে সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে (التولد من المملوك): যেমন ফল-ফলাদি, ফসল ও গবাদি পশুর প্রজন্মের মাধ্যমে।
৪) প্রাকৃতিকভাবে উন্মুক্ত সম্পদ করায়ত্তে আনার মাধ্যমে (إحراز المباحات): যেমন নদী-খাল-বিলের মাছ, উন্মুক্ত মাঠের ঘাস, পশু-পাখি ইত্যাদি নিজ দখলে আনার মাধ্যমে।
৫) অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তু থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা (الخلافية): ব্যক্তি থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানার উদাহরণ হলো 'মিরাস' (الإرث) এবং বস্তু থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা হলো 'জরিমানা' (التضمين أو التعويض)。

ফন্ট সাইজ
15px
17px