📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ঋণের দলিল

📄 ঋণের দলিল


মুরাবাহা মুআজ্জালার মধ্যে পণ্যের দাম ক্রেতার উপর ঋণ হয়ে যায়। সুতরাং ব্যাংক ঋণের দলিল হিসেবে কাফালত বা রেহেন দাবি করতে পারে। রেহেনের বিভিন্ন ধরন বর্তমানে প্রচলিত আছে। এর শরয়ী বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আমার আরবি গ্রন্থ 'احكام البيع بالتقسيط '-এর মধ্যে রয়েছে। এখানে তার সার সংক্ষেপ পেশ করা হল।
মূল্যের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যেতে পারে:
১. বিক্রীত পণ্যকেই প্রমাণ হিসেবে নিজের কাছে রাখা যায়। এর হুকুম হল, মূল্য পরিশোধের জন্য বিক্রীত পণ্য আটক করে নিজের কাছে রাখা জায়েয নেই। কারণ, বায়ে মুআজ্জাল (বাকি বিক্রি)-এর ক্ষেত্রে বিক্রেতার বিক্রীত পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকে না।¹ তবে বিক্রীত পণ্য রেহেন হিসেবে নিজের কাছে রাখা যেতে পারে। শর্ত হল, ক্রেতা পণ্য হস্তগত করার পর পুনরায় রেহেন রাখতে হবে।² বিক্রীত পণ্য আটক আর রেহেনের মধ্যে পার্থক্য হল, পণ্য আটকের বেলায় পণ্য অর্থের জামানত হবে। পণ্য নষ্ট হয়ে গেলে বিক্রয়চুক্তি রহিত হয়ে যাবে। আর রেহেনের বেলায় পণ্য মূল্যের জামানত হবে। পণ্য নষ্ট হয়ে গেলে বিক্রয়চুক্তি রহিত হবে না।
২. বর্তমানে রেহেনের একটি ধরন প্রচলিত আছে, যাকে সাধারণ বন্ধক (Simple Mortgage) বা “ঋণপত্র” (Floating Charge) বলে। এর মূলকথা হল, রেহেন, রেহেনদাতার দখলেই থাকে। সে তা ব্যবহারও করতে থাকে। রেহেন গ্রহীতা রেহেন হস্তগত করে না। তবে রেহেন গ্রহীতার অধিকার থাকে, সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে সে তা বিক্রি করে ঋণ উসুল করতে পারবে। আর রেহেনদাতা ঋণ পরিশোধের পূর্বে রেহেন নিজে ব্যবহার করতে পারবে; কিন্তু তার মালিকানা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না।
এ রেহেনের মধ্যে আপত্তি হতে পারে, এক্ষেত্রে রেহেনকৃত বস্তুর দখল রেহেন গ্রহীতার কাছে স্থানান্তরিত হয় না। অথচ দৃশ্যত রেহেন গ্রহীতার রেহেনকৃত বস্তু হস্তগত হওয়া রেহেন শুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরি, কিন্তু কতিপয় কারণে (যার বিবরণ আলোচ্য গ্রন্থে আছে) রেহেনের এ প্রকার জায়েয মনে হয়।
৩. ঋণের নিরাপত্তার একটা পন্থা হল, তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জামিনদার বানিয়ে নেয়া। একে ফিকহী পরিভাষায় কাফালত ‘জামানত’ বলে। এ পদ্ধতিও জায়েয আছে। এর বিস্তারিত আহকাম ফকীহগণ লেখেছেন, কিন্তু তার উপর পারিশ্রমিক বা ফিস গ্রহণ করা শরয়ীভাবে বৈধ নয়।

টিকাঃ
১. الهندية ج ٣ : ص ١٥ كتاب البيوع، الباب الرابع .
২. رد المحتار مع الدر المختار ج 6 : ص ٤٩٧ كتاب الرهن .

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ঋণ পরিশোধের বিলম্বে জরিমানা

📄 ঋণ পরিশোধের বিলম্বে জরিমানা


সুদী ব্যবস্থায় ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হলে আপনা আপনি সুদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ভয়ে ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে দেয়, কিন্তু মুশারাকা, মুদারাবা অথবা মুরাবাহার মধ্যে এ ব্যবস্থা থাকে না। এ কারণে মানুষ সুযোগের অপব্যবহার করে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করে। এ পথ বন্ধ করার কী উপায়? এ মাসআলা বর্তমানে আলেমদের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এতটুকু পর্যন্ত তো স্থিরীকৃত যে, ঋণ পরিশোধে বিলম্ব ঋণগ্রহীতার অভাবের কারণে হলে তার বিধান কুরআন ঘোষণা করে দিয়েছে: 'وان كان ذوعسرة فنظرة إلى ميسرة' (খাতক যদি অভাবী হয় তাহলে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত অবকাশ দেয়া উচিৎ)। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতার উপর কোনো ধরনের জরিমানা আরোপ না করে আরো সময় দিতে হবে। কিন্তু যদি সে টালবাহানার আশ্রয় নেয়, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অকারণে যদি বিলম্ব করে, তাহলে তার প্রতিরোধ হবে কী ভাবে?
এ ব্যাপারে বর্তমানের কোনো কোনো আলেম বিলম্বের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার উপর ক্ষতিপূরণ (Compensation) আরোপ করা জায়েয বলেছেন। কোনো কোনো ব্যাংকে এর উপর কার্যক্রম চলছে। এর ফরমুলা তৈরি করা হয়েছে, প্রথমে তার টালবাহানা যাচাই করার জন্য এক মাস পর্যন্ত তাকে নোটিশ দেয়া হবে। যদি এক মাসের নোটিশ সত্ত্বেও সে ঋণ পরিশোধ না করে তাহলে দেখতে হবে, সে যতদিন বিলম্ব করেছে ততদিন পর্যন্ত ব্যাংকের 'ইনভেস্টমেন্ট একাউন্টে' 'حساب الاستثمار' কত লাভ হয়েছে। সে হিসেবে তার উপর ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হবে। যেটা সরকার নয়; বরং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ অর্থাৎ ব্যাংক পাবে। যেমন ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট একাউন্টে শতকরা পাঁচ ভাগ লাভ হলে ঋণের শতকরা পাঁচ ভাগ তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে হবে। যদি এ সময়ে ব্যাংকের কোনো লাভ না হয় তাহলে তার থেকেও কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
কিন্তু অধিকাংশ আলেম 'আর্থিক ক্ষতিপূরণ' সমর্থন করেন না। এর বৈধতার উপর যে দলিল পেশ করা হয় তা ত্রুটিপূর্ণ (এর বিস্তারিত বিবরণ আমার 'احكام البيع بالتقسيط' গ্রন্থে রয়েছে)। শরয়ীভাবে তার দলিল ত্রুটিপূর্ণ তো আছেই, কার্যক্ষেত্রেও এটা ফলদায়ক নয়। কারণ, এর দ্বারা ঋণগ্রহীতার উপর ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ পড়বে না। কারণ, 'ইনভেস্টমেন্ট একাউন্ট'-এর লাভ সাধারণত অল্প হয়। আর মুরাবাহার হার হয় অনেক বেশি। সুতরাং কেউ দীর্ঘমেয়াদের জন্য অধিক হারে মুরাবাহা না করে স্বল্প মেয়াদের জন্য মুরাবাহা করে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করতে পারে এবং 'আর্থিক ক্ষতিপূরণ' স্বীকার করে নিতে পারে। এর মধ্যে নিজের জন্য কোনো চাপ নেই; বরং লাভজনকই মনে করবে। সুতরাং বিলম্বের পথ বন্ধ করার উপযুক্ত পন্থা যেটা আমি প্রথমে পেশ করেছিলাম। পরবর্তীতে এটা যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। সেটা হল, মুরাবাহা অথবা ইজারা চুক্তির (Agreement) মধ্যে ঋণগ্রহীতা একথাও লেখবে, যদি আমি ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করি তাহলে এত টাকা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করব। এ টাকা ঋণের আনুপাতিক হার হিসেবেও নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের টাকা দিয়ে একটি জনকল্যাণ ফান্ডও গঠন করা যেতে পারে। এ ফান্ড থেকে কাউকে সাহায্যও করা যেতে পারে। এর থেকে মানুষকে বিনা সুদে ঋণও দেয়া যেতে পারে, কিন্তু এ টাকা ব্যাংকের আয়ের মধ্যে গণ্য হবে না। এ পদ্ধতি বেশি উপকারী। কারণ, এ পদ্ধতিতে টাকার হার নির্দিষ্ট নেই। অধিক হারেও রাখা যেতে পারে। এর দ্বারা ঋণগ্রহীতার উপর চাপ পড়বে।
এর বৈধতা হল, এ টাকা জরিমানাও নয় সুদও নয়; বরং ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে নিজের উপর অত্যাবশ্যকীকরণ, যাকে 'يمين اللجاج' বলে। এ অত্যাবশ্যকীকরণের আলোচনা ইমাম খাত্তাবী রাহ. তাঁর 'تحرير الكلام في مسائل الالتزام' গ্রন্থে করেছেন।
اما اذا التزم المدعى عليه للمدعى انه ان لم يوفه حقه في وقت كذا وكذا فله عليه كذا وكذا فهذا لا يختلف في بطلانه لانه صريح الربا --- الى قوله واما اذا التزم انه ان لم يوفه حقه في وقت كذا فعليه كذا لفلان أو صدقة للمساكين فهذا هو محل الخلاف المعقود له هذا الباب فالمشهور انه لا يقضى به كما تقدم وقال ابن دينار يقضى به (ص ١٦٧- طبع بيروت)
অতপর ঋণদাতার জন্য যদি ঋণী নিজের উপর কিছু আরোপ করে, যদি সে তার প্রাপ্য যথা সময়ে প্রদান না করে তাহলে সে তাকে এতকিছু প্রদান করবে, তাহলে তা বাতিল হওয়ার ব্যাপারে কারো মতভেদ নেই। কারণ, এটা স্পষ্ট সুদ। আর যদি সে এরূপ অত্যাবশ্যক করে, যদি সে তার প্রাপ্য যথা সময়ে পরিশোধ না করে তাহলে সে এত পরিমাণ অমুককে দেবে বা গরীবকে সাদকা করে দেবে। এক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে। প্রসিদ্ধ অভিমত হল সে তা পূরণ করবে না। যেমন পেছনে আলোচিত হয়েছে। ইবনে দীনার বলেন, সে তা পরিশোধ করবে।
এ দ্বারা বুঝা গেল, এ অত্যাবশ্যকীকরণ সর্বসম্মতিক্রমে নৈতিকভাবে (দিয়ানাতান) জরুরি হয়ে যায়। আর আইনগতভাবে (কাযাআন) জরুরি হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। বর্তমান প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে সেসব মনীষীর কথার উপর আমল করায় কোনো ক্ষতি নেই যারা আইনগতভাবেও তা অত্যাবশ্যক মনে করেন।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 সময়ের পূর্বে পরিশোধ করায় ঋণ কমিয়ে দেয়া

📄 সময়ের পূর্বে পরিশোধ করায় ঋণ কমিয়ে দেয়া


ঋণগ্রহীতা যদি তার ঋণ নির্ধারিত সময়ের পূর্বে পরিশোধ করে দেয় তাহলে সুদী ব্যবস্থায় সুদ হ্রাস পায়। প্রশ্ন হল, এরূপ অবস্থায় মুরাবাহার মূল্য হ্রাস করা যায় কিনা? এ মাসআলার দুটি দিক:
১. একদিক যাকে ফকীহগণ 'ضع و تعجل' বলে ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা তার ঋণদাতাকে বলবে, তুমি ঋণ কমিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে উসুল করে নাও। এর বিধান সম্পর্কে ফকীহদের ঘোর মতবিরোধ আছে, কিন্তু অধিকাংশের মতে এটা নাজায়েয এবং এটাই বিশুদ্ধ (বিস্তারিত দলিল ‘احكام البيع بالتقسيط’ গ্রন্থে আছে)।
২. পরবর্তী কিছু হানাফী আলেম মুরাবাহা মুআজ্জালার মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে পরিশোধের ক্ষেত্রে মূল্য হ্রাস করা জায়েয বলেছেন। কিন্তু ব্যাংকগুলোকে যদি এর অবাধ সুযোগ দেয়া হয় তাহলে মুরাবাহা এবং সুদী ব্যবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য অবশিষ্ট থাকবে না। তাই এটাই যুক্তিযুক্ত হবে, চুক্তির মধ্যে স্পষ্ট থাকবে না, আগে পরিশোধ করলে মূল্য কমে যাবে, কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি সময়ের আগে পরিশোধ করে দেয় তাহলে তখন কোনো পূর্ব সিদ্ধান্ত ব্যতীত কমিয়ে দেয়া হলে ক্ষতি নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00