📄 মুরাবাহা মুআজ্জালা
এটাও অর্থ বিনিয়োগের একটি শরয়ী পদ্ধতি হতে পারে। এর সারকথা হল, যখন কোনো লোক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করার জন্য আসবে, তখন ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করবে, কোন্ বস্তুর জন্য অর্থ দরকার। ব্যাংক তাকে নগদ অর্থ প্রদানের পরিবর্তে সে বস্তু ক্রয় করে মুরাবাহা হিসেবে লাভের উপর বাকিতে বিক্রি করে দেবে। লভ্যাংশ দরদাম করে যে কোনো মূল্য স্থির করে নেয়া যেতে পারে, কিন্তু লাভের একটা হার নির্ধারণ করে মুরাবাহা এ জন্য করা হয়, যাতে নীতিমালার মধ্যে সমতা থাকে এবং সব মানুষ থেকে একই হারে লাভ উসুল হয়। লাভের যে হার নির্ধারণ করা হয় তাকে বলা হয় মার্ক আপ (Mark up)।
এটাও পুঁজি বিনিয়োগের একটি জায়েয পদ্ধতি হতে পারে। শর্ত হল, সঠিক ও প্রয়োজনীয় শর্তের সাথে সম্পাদন করতে হবে। কারণ, বাকির কারণে মূল্য বৃদ্ধি করা ফুকাহাদের সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক হারে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এটা খুবই স্পর্শকাতর পদ্ধতি। এর মধ্যে সামান্যতম অসতর্কতা তাকে সুদী ব্যবস্থার সাথে মিশ্রিত করে দেয়। আজকাল ব্যাংকগুলোতে মুরাবাহার মূল তত্ত্ব না বুঝে এবং তার প্রয়োজনীয় শর্তাদি পূরণ না করেই তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে তাতে বহু দোষ সৃষ্টি হয়। সাধারণত ব্যাংক থেকে মুরাবাহার লেনদেন করার সময় যে ভুলগুলো হয়ে থাকে এবং সঠিক শরয়ী পদ্ধতিতে মুরাবাহা করার সময় যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি, সেগুলো এখানে চিহ্নিত করে দেয়া হল।
📄 প্রচলিত মুরাবাহার মধ্যে শরয়ী ত্রুটিসমূহ
১. মুরাবাহার সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে, ব্যাংক কোনো বস্তু ক্রয় করে লাভে (Mark up) তা বিক্রি করে দেবে, কিন্তু পাকিস্তানি ব্যাংকগুলোতে এমনও হচ্ছে, যে বস্তুর উপর মুরাবাহার চুক্তি হচ্ছে সে বস্তু ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহীতার কাছে আগে থেকেই মজুদ থাকে। ব্যাংক তার থেকে সে বস্তু নগদে কম মূল্যে ক্রয় করে আবার তার কাছেই বাকিতে লাভ ধরে পুনরায় বিক্রি করে দেয়। একে বাই ব্যাক (Buy Back) বলে। এভাবে প্রকৃত মুরাবাহার স্থলে লাভ (Mark up)-কে 'বাই ব্যাক' এর সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে, যা শরয়ীভাবে একেবারে নাজায়েয। কেননা, একই ব্যক্তি থেকে কম মূল্যে ক্রয় করে তৎক্ষণাৎ তার কাছে অধিক মূল্যে বাকিতে বিক্রি করা মূলত সুদী ঋণেরই একটি রূপ। যেখানে প্রথম কেনাবেচার মধ্যেই এ শর্ত থাকে, তার কাছেই পুনরায় বিক্রি করতে হবে।
২. বাই ব্যাক (Buy Back)-এর বাহানাও (বৈধকরণ প্রক্রিয়া) বাস্ত বে হয় না। সাধারণত কেবল কৃত্রিম কার্যক্রম হয়ে থাকে। এমন কোনো পণ্য আগে থেকে মজুদই থাকে না যার উপর বাই ব্যাক করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের এমন ব্যয় যার দ্বারা কোনো পণ্য ক্রয় করা যায় না, যেমন বেতন বিল ইত্যাদি পরিশোধের জন্যও ব্যাংক থেকে মুরাবাহার উপর ঋণ পাওয়া যায়।
৩. যদি Buy Back নাও হয়, প্রকৃত মুরাবাহাই হয়, তবুও মুরাবাহার উপর বিক্রীত পণ্য প্রথমে ব্যাংকের দখলে ও দায়বদ্ধতার মধ্যে আসার ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ মুরাবাহা সঠিক হওয়ার জন্য ঐ পণ্য প্রথমে ব্যাংকের দখলে ও দায়বদ্ধতায় আসা জরুরি।
৪. ব্যাংকের কাছে যখন কোনো ব্যক্তি মূলধন লাভের জন্য আসে তখন ব্যাংক অর্থ বিনিয়োগের সীমা নির্দিষ্ট (تحديد السقف) করে দেয় যে, ব্যাংক এত পরিমাণ মূলধন মুরাবাহা করার জন্য প্রস্তুত আছে। চুক্তির (Agreements) উপর স্বাক্ষর করানো হয়। সে সময় ব্যাংক ঐ ব্যক্তিকে পণ্য ক্রয়ের উকিল বানিয়ে দেয়, কিন্তু তখন কোনো ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয় না; বরং সেটা শুধু একটা পারস্পরিক চুক্তি হয় যে, ব্যাংক প্রয়োজন মোতাবেক এ শর্তাদির উপর তার গ্রাহককে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে সরবরাহ করবে। এখানে প্রয়োজন ছিল, যখন গ্রাহকের কোনো জিনিসের প্রয়োজন হবে তখন সে ব্যাংককে বলবে। তারপর উত্তম পন্থা হল, ব্যাংক সে বস্তু তার নিজস্ব মাধ্যম দ্বারা ক্রয় করে নিজের দখলে আনবে। তারপর গ্রাহককে মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি করবে, কিন্তু ব্যাংক যদি নিজে ক্রয় করার বদলে সেই গ্রাহককেই ক্রয়-বিক্রয়ের উকিল বানায়, তাহলে তার মধ্যে অন্তত এটা জরুরি, প্রথমে গ্রাহক ব্যাংকের উকিল হিসেবে সে বস্তু ক্রয় করে ব্যাংককে অবহিত করবে। তারপর তার থেকে ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে নিজের জন্য ক্রয় করবে। এখানে গ্রাহকের দুটি অবস্থান পরস্পর পৃথক রাখা অত্যাবশক ছিল। প্রথমে তার অবস্থান উকিলের। যতক্ষণ পর্যন্ত সে এ অবস্থানে থাকবে তার উপর উকিলের বিধান প্রযোজ্য হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংকের উকিল হিসেবে পণ্যের উপর তার দখল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পণ্য ব্যাংকের মালিকানায় এবং তারই জামানতে থাকবে। সুতরাং যদি এ সময় উকিলের কোনো ধরনের অবহেলা ছাড়া ঐ পণ্য ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে সে ক্ষতি ব্যাংকের হওয়া উচিৎ। তারপর যখন সে ব্যাংককে অবহিত করে তার থেকে সে পণ্য নিজের জন্য ক্রয় করবে, তখন পণ্য গ্রাহকের মালিকানায় ও জামানতে আসবে, এর পরে ক্ষতি হলে তা গ্রাহকের হবে।
গ্রাহকের এ দুই অবস্থান সম্পূর্ণরূপে একটা অন্যটা থেকে পৃথক হওয়া অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু আজকাল অধিকাংশ ব্যাংক এ বিষয়টির প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না; বরং বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ অর্থাৎ Limit অনুমোদন করার সময় মুরাবাহা চুক্তির উপর যে স্বাক্ষর হয়, তাকেই যথেষ্ট মনে করে নেয়া হয়। তারপর গ্রাহক পণ্য নিজে ক্রয় করে তা ব্যবহার করতে থাকে। ব্যাংক থেকে ক্রয়ের জন্য আলাদা কোনো ইজাব কবুল করা হয় না। যার ফলে এটা শুধু একটা কৃত্রিম কার্যক্রম হয়ে থাকে। কার্যত ফলাফল এটাই দাঁড়ায়, ব্যাংক গ্রাহককে অর্থ প্রদান করল এবং মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করল। পণ্য ব্যাংকের জামিনে আসা তারপর তার মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া এবং এ উদ্দেশে ইজাব কবুল ইত্যাদি কিছুই হয় না। এ পদ্ধতি একদম হারাম ও নাজায়েয।
৫. এ ভুলও হয়, বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করার চুক্তির উপর স্বাক্ষর হওয়ার সময়ই ব্যাংক সে ব্যাক্তি থেকে Bill of Exchange (হুন্ডি) বা প্রমিসারি নোটের উপর স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এটা ভুল এ কারণে, হুন্ডির উপর স্বাক্ষর তখন হয় যখন কোনো ব্যক্তি ঋণী হয়ে যায়। আর এ ব্যক্তি এখনো ব্যাংকের ঋণগ্রহক হয় নি। এখন তো শুধু ভবিষ্যতে মুরাবাহা মুআজ্জালা করার উপর চুক্তি হল। গ্রাহক ব্যাংকের ঋণী তখন হবে যখন সে পণ্য ব্যাংকের কাছ থেকে নিজের জন্য ক্রয় করবে। সুতরাং প্রমিসারি নোটের উপর স্বাক্ষরও তখন হওয়া উচিৎ।
৬. সুদী ব্যবস্থায় ঋণ পরিশোধের সময় হলে ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম বা এখন পরিশোধ করতে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে এ ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হয়। আগের সুদ ঋণের মধ্যে গণ্য হয় আর তার উপর অতিরিক্ত সুদ ধার্য করে আরো সময় প্রদান করা হয়। তাকে বলা হয় রুল অভার (Roll Over) করা। মুরাবাহার মধ্যেও এ কারবার শুরু করা হয়েছে। মুরাবাহার মূল্য পরিশোধের সময় হলে মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম না হলে এখানেও ঋণকে রুল অভার করে দেয়া হয়। অথচ এটা ছিল একটা ক্রয়-বিক্রয়। এর মধ্যে পণ্যের একটি মূল্য নির্ধারিত ছিল। এ মূল্যে এখন হ্রাস-বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এ মুরাবাহার উপর আরেক মুরাবাহাও করা যাবে না। মুরাবাহার মূল তত্ত্ব এবং তার শর্তাদি পূর্ণ না করার কারণে এ ধরনের অনিষ্টতা সৃষ্টি হয়। যার কারণে লেনদেন শরয়ীভাবে জায়েয থাকে না। তাই মুরাবাহার উপর আমল করার জন্য তার শর্তাদির প্রতি খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এখানে মুরাবাহা মুআজ্জালার সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় মাসআলা বর্ণনা করা হল:
📄 ঋণের দলিল
মুরাবাহা মুআজ্জালার মধ্যে পণ্যের দাম ক্রেতার উপর ঋণ হয়ে যায়। সুতরাং ব্যাংক ঋণের দলিল হিসেবে কাফালত বা রেহেন দাবি করতে পারে। রেহেনের বিভিন্ন ধরন বর্তমানে প্রচলিত আছে। এর শরয়ী বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আমার আরবি গ্রন্থ 'احكام البيع بالتقسيط '-এর মধ্যে রয়েছে। এখানে তার সার সংক্ষেপ পেশ করা হল।
মূল্যের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যেতে পারে:
১. বিক্রীত পণ্যকেই প্রমাণ হিসেবে নিজের কাছে রাখা যায়। এর হুকুম হল, মূল্য পরিশোধের জন্য বিক্রীত পণ্য আটক করে নিজের কাছে রাখা জায়েয নেই। কারণ, বায়ে মুআজ্জাল (বাকি বিক্রি)-এর ক্ষেত্রে বিক্রেতার বিক্রীত পণ্য আটকে রাখার অধিকার থাকে না।¹ তবে বিক্রীত পণ্য রেহেন হিসেবে নিজের কাছে রাখা যেতে পারে। শর্ত হল, ক্রেতা পণ্য হস্তগত করার পর পুনরায় রেহেন রাখতে হবে।² বিক্রীত পণ্য আটক আর রেহেনের মধ্যে পার্থক্য হল, পণ্য আটকের বেলায় পণ্য অর্থের জামানত হবে। পণ্য নষ্ট হয়ে গেলে বিক্রয়চুক্তি রহিত হয়ে যাবে। আর রেহেনের বেলায় পণ্য মূল্যের জামানত হবে। পণ্য নষ্ট হয়ে গেলে বিক্রয়চুক্তি রহিত হবে না।
২. বর্তমানে রেহেনের একটি ধরন প্রচলিত আছে, যাকে সাধারণ বন্ধক (Simple Mortgage) বা “ঋণপত্র” (Floating Charge) বলে। এর মূলকথা হল, রেহেন, রেহেনদাতার দখলেই থাকে। সে তা ব্যবহারও করতে থাকে। রেহেন গ্রহীতা রেহেন হস্তগত করে না। তবে রেহেন গ্রহীতার অধিকার থাকে, সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে সে তা বিক্রি করে ঋণ উসুল করতে পারবে। আর রেহেনদাতা ঋণ পরিশোধের পূর্বে রেহেন নিজে ব্যবহার করতে পারবে; কিন্তু তার মালিকানা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না।
এ রেহেনের মধ্যে আপত্তি হতে পারে, এক্ষেত্রে রেহেনকৃত বস্তুর দখল রেহেন গ্রহীতার কাছে স্থানান্তরিত হয় না। অথচ দৃশ্যত রেহেন গ্রহীতার রেহেনকৃত বস্তু হস্তগত হওয়া রেহেন শুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরি, কিন্তু কতিপয় কারণে (যার বিবরণ আলোচ্য গ্রন্থে আছে) রেহেনের এ প্রকার জায়েয মনে হয়।
৩. ঋণের নিরাপত্তার একটা পন্থা হল, তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জামিনদার বানিয়ে নেয়া। একে ফিকহী পরিভাষায় কাফালত ‘জামানত’ বলে। এ পদ্ধতিও জায়েয আছে। এর বিস্তারিত আহকাম ফকীহগণ লেখেছেন, কিন্তু তার উপর পারিশ্রমিক বা ফিস গ্রহণ করা শরয়ীভাবে বৈধ নয়।
টিকাঃ
১. الهندية ج ٣ : ص ١٥ كتاب البيوع، الباب الرابع .
২. رد المحتار مع الدر المختار ج 6 : ص ٤٩٧ كتاب الرهن .
📄 ঋণ পরিশোধের বিলম্বে জরিমানা
সুদী ব্যবস্থায় ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হলে আপনা আপনি সুদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ভয়ে ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে দেয়, কিন্তু মুশারাকা, মুদারাবা অথবা মুরাবাহার মধ্যে এ ব্যবস্থা থাকে না। এ কারণে মানুষ সুযোগের অপব্যবহার করে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করে। এ পথ বন্ধ করার কী উপায়? এ মাসআলা বর্তমানে আলেমদের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এতটুকু পর্যন্ত তো স্থিরীকৃত যে, ঋণ পরিশোধে বিলম্ব ঋণগ্রহীতার অভাবের কারণে হলে তার বিধান কুরআন ঘোষণা করে দিয়েছে: 'وان كان ذوعسرة فنظرة إلى ميسرة' (খাতক যদি অভাবী হয় তাহলে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত অবকাশ দেয়া উচিৎ)। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতার উপর কোনো ধরনের জরিমানা আরোপ না করে আরো সময় দিতে হবে। কিন্তু যদি সে টালবাহানার আশ্রয় নেয়, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অকারণে যদি বিলম্ব করে, তাহলে তার প্রতিরোধ হবে কী ভাবে?
এ ব্যাপারে বর্তমানের কোনো কোনো আলেম বিলম্বের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার উপর ক্ষতিপূরণ (Compensation) আরোপ করা জায়েয বলেছেন। কোনো কোনো ব্যাংকে এর উপর কার্যক্রম চলছে। এর ফরমুলা তৈরি করা হয়েছে, প্রথমে তার টালবাহানা যাচাই করার জন্য এক মাস পর্যন্ত তাকে নোটিশ দেয়া হবে। যদি এক মাসের নোটিশ সত্ত্বেও সে ঋণ পরিশোধ না করে তাহলে দেখতে হবে, সে যতদিন বিলম্ব করেছে ততদিন পর্যন্ত ব্যাংকের 'ইনভেস্টমেন্ট একাউন্টে' 'حساب الاستثمار' কত লাভ হয়েছে। সে হিসেবে তার উপর ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হবে। যেটা সরকার নয়; বরং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ অর্থাৎ ব্যাংক পাবে। যেমন ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট একাউন্টে শতকরা পাঁচ ভাগ লাভ হলে ঋণের শতকরা পাঁচ ভাগ তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে হবে। যদি এ সময়ে ব্যাংকের কোনো লাভ না হয় তাহলে তার থেকেও কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
কিন্তু অধিকাংশ আলেম 'আর্থিক ক্ষতিপূরণ' সমর্থন করেন না। এর বৈধতার উপর যে দলিল পেশ করা হয় তা ত্রুটিপূর্ণ (এর বিস্তারিত বিবরণ আমার 'احكام البيع بالتقسيط' গ্রন্থে রয়েছে)। শরয়ীভাবে তার দলিল ত্রুটিপূর্ণ তো আছেই, কার্যক্ষেত্রেও এটা ফলদায়ক নয়। কারণ, এর দ্বারা ঋণগ্রহীতার উপর ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ পড়বে না। কারণ, 'ইনভেস্টমেন্ট একাউন্ট'-এর লাভ সাধারণত অল্প হয়। আর মুরাবাহার হার হয় অনেক বেশি। সুতরাং কেউ দীর্ঘমেয়াদের জন্য অধিক হারে মুরাবাহা না করে স্বল্প মেয়াদের জন্য মুরাবাহা করে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করতে পারে এবং 'আর্থিক ক্ষতিপূরণ' স্বীকার করে নিতে পারে। এর মধ্যে নিজের জন্য কোনো চাপ নেই; বরং লাভজনকই মনে করবে। সুতরাং বিলম্বের পথ বন্ধ করার উপযুক্ত পন্থা যেটা আমি প্রথমে পেশ করেছিলাম। পরবর্তীতে এটা যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। সেটা হল, মুরাবাহা অথবা ইজারা চুক্তির (Agreement) মধ্যে ঋণগ্রহীতা একথাও লেখবে, যদি আমি ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করি তাহলে এত টাকা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করব। এ টাকা ঋণের আনুপাতিক হার হিসেবেও নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের টাকা দিয়ে একটি জনকল্যাণ ফান্ডও গঠন করা যেতে পারে। এ ফান্ড থেকে কাউকে সাহায্যও করা যেতে পারে। এর থেকে মানুষকে বিনা সুদে ঋণও দেয়া যেতে পারে, কিন্তু এ টাকা ব্যাংকের আয়ের মধ্যে গণ্য হবে না। এ পদ্ধতি বেশি উপকারী। কারণ, এ পদ্ধতিতে টাকার হার নির্দিষ্ট নেই। অধিক হারেও রাখা যেতে পারে। এর দ্বারা ঋণগ্রহীতার উপর চাপ পড়বে।
এর বৈধতা হল, এ টাকা জরিমানাও নয় সুদও নয়; বরং ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে নিজের উপর অত্যাবশ্যকীকরণ, যাকে 'يمين اللجاج' বলে। এ অত্যাবশ্যকীকরণের আলোচনা ইমাম খাত্তাবী রাহ. তাঁর 'تحرير الكلام في مسائل الالتزام' গ্রন্থে করেছেন।
اما اذا التزم المدعى عليه للمدعى انه ان لم يوفه حقه في وقت كذا وكذا فله عليه كذا وكذا فهذا لا يختلف في بطلانه لانه صريح الربا --- الى قوله واما اذا التزم انه ان لم يوفه حقه في وقت كذا فعليه كذا لفلان أو صدقة للمساكين فهذا هو محل الخلاف المعقود له هذا الباب فالمشهور انه لا يقضى به كما تقدم وقال ابن دينار يقضى به (ص ١٦٧- طبع بيروت)
অতপর ঋণদাতার জন্য যদি ঋণী নিজের উপর কিছু আরোপ করে, যদি সে তার প্রাপ্য যথা সময়ে প্রদান না করে তাহলে সে তাকে এতকিছু প্রদান করবে, তাহলে তা বাতিল হওয়ার ব্যাপারে কারো মতভেদ নেই। কারণ, এটা স্পষ্ট সুদ। আর যদি সে এরূপ অত্যাবশ্যক করে, যদি সে তার প্রাপ্য যথা সময়ে পরিশোধ না করে তাহলে সে এত পরিমাণ অমুককে দেবে বা গরীবকে সাদকা করে দেবে। এক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে। প্রসিদ্ধ অভিমত হল সে তা পূরণ করবে না। যেমন পেছনে আলোচিত হয়েছে। ইবনে দীনার বলেন, সে তা পরিশোধ করবে।
এ দ্বারা বুঝা গেল, এ অত্যাবশ্যকীকরণ সর্বসম্মতিক্রমে নৈতিকভাবে (দিয়ানাতান) জরুরি হয়ে যায়। আর আইনগতভাবে (কাযাআন) জরুরি হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। বর্তমান প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে সেসব মনীষীর কথার উপর আমল করায় কোনো ক্ষতি নেই যারা আইনগতভাবেও তা অত্যাবশ্যক মনে করেন।