📄 শিরকাত ও মুদারাবার সমস্যা
শিরকাত ও মুদারাবা চালু করতে সাধারণত দুধরনের সমস্যার কথা বলা হয়:
১. আজকাল বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর মান অনেক নিচে নেমে গেছে। কাউকে শিরকাতের ভিত্তিতে মূলধন সরবরাহ করলে সে কখনো প্রকৃত লাভের কথা বলে না; বরং লাভের স্থলে লোকসান দেখায়। এ কারণে শিরকাত ও মুদারাবার ভিত্তিতে কাজ করা কঠিন। এর উত্তর, বাস্ত বিকই সমাজে অবিশ্বস্ততার অবস্থা দুঃখজনক, কিন্তু অবিশ্বস্ততার কারণে কখনো কোনো কাজ বন্ধ হয় না। বিভিন্ন পন্থায় অবিশ্বস্ততার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন অডিট ব্যবস্থা, একাউন্টস ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ইত্যাদি। মুশারাকা ও মুদারাবার মধ্যেও এ ধরনের কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। সে সাথে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে একবার অবিশ্বস্ততা প্রমাণিত হবে, তাকে সব ব্যাংকে ব্লাক লিস্টভুক্ত করা যেতে পারে। যার অর্থ, এরূপ ব্যক্তি ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক থেকে মূলধন লাভ থেকে বঞ্চিত থাকবে। যদি আইন করে এটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় তাহলে মানুষ মিথ্যাচার করতে ভয় পাবে। এর দ্বারা এ ক্ষতিকারক উপসর্গ অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া অন্য আরো আইনী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এক ব্যাংক একা যদি এ কাজ করে তাহলে তার জন্য সত্যিই কষ্টকর, কিন্তু যদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ কাজ করা হয় এবং সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা এ নিয়ম অনুযায়ী চলে, তাহলে মিথ্যাচারের পথ বন্ধ করার রাস্তা বের হতে পারে।
২. দ্বিতীয় সমস্যা হয় ইনকাম ট্যাক্স ব্যবস্থার কারণে। সাধারণত ব্যবসায়ীগণ দুধরনের খাতা বানায়। ইনকাম ট্যাক্সের জন্য আলাদা খাতা থাকে, আর প্রকৃত খাতা থাকে অন্য আরেকটা। এ অবস্থায় মুশারাকা বা মুদারাবার ভিত্তিতে মূলধন গ্রহণকারী যদি প্রকৃত লাভ দেখায় তাহলে ইনকাম ট্যাক্সওয়ালা আটকাবে। আর যদি সে ব্যাংককে প্রকৃত লাভ না দেখায় তাহলে প্রকৃত লাভের বণ্টন হয় না। এর উত্তর হচ্ছে, সরকারীভাবে এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা হলে দেখা যায়, মুশারাকা ও মুদারাবাকে সফল করার জন্য ট্যাক্স ব্যবস্থার সংশোধনও জরুরি। ট্যাক্সকে আমদানির সাথে সম্পৃক্ত না করে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ট্যাক্সের এমন কোনো ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে মিথ্যাচারের এ রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।
তাছাড়া অর্থ বিনিয়োগের অনেক খাত এমন আছে যেখানে শিরকাত ও মুদারাবার মধ্যে অনেক দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হবে না। যেমন রপ্তানি সংক্রান্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম থেকে রপ্তানিকৃত মালামালের ব্যয় এবং সম্ভাব্য ধারণাকৃত মূল্য জানা থাকে। সুতরাং এর মধ্যে শিরকাত বা মুদারাবায় ধোঁকা প্রতারণার সম্ভাবনা অনেক কম।
তেমনিভাবে ব্যাংক ব্যবসায়ীর পুরো কারবারের মধ্যে শরিক হওয়া জরুরি নয়। সে কারবারের কোনো নির্দিষ্ট অংশেও শরিক হতে পারে, যাতে লাভ নির্ধারণ বেশি কঠিন হবে না। এছাড়া ব্যাংকের জন্য যেহেতু ব্যবসায়ীর সাথে স্থায়ী ও সার্বক্ষণিক শরিক থাকা জরুরি নয়; বরং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা তাদের দালান, মেশিনারি ইত্যাদি পূর্ব থেকেই বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংক ছয় মাস বা এক বছরের জন্য তার সাথে শিরকাতের লেনদেন করতে পারে। এ কারণে পরস্পর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে চুক্তি হতে পারে, এ নির্দিষ্ট ও সীমিত শিরকাতের মধ্যে কারবারের শুধু প্রত্যক্ষ ব্যয় (Direct Expenses) মেনে নেয়া হবে আর মোট লাভ (Gross profit) উভয় পক্ষের মধ্যে বণ্টিত হবে। আর যেহেতু স্থাবর সম্পত্তি ব্যবসায়ী সরবরাহ করে, তাই তার লাভের অনুপাতও বৃদ্ধি করা যেতে পারে, কিন্তু এ স্থাবর সম্পত্তির ব্যয় এবং পরোক্ষ ব্যয় শিরকাতের উপর চাপানো উচিৎ নয়। এভাবে হিসাব নিকাশও সহজ হয়ে যাবে আর অবিশ্বস্ততার আশঙ্কাও কমে যাবে। আর ট্যাক্স যেহেতু উপার্জিত লাভের উপর আরোপ হয়, এ কারণে ট্যাক্স সমস্যারও সমাধান বেরিয়ে আসবে। শিরকাত ও মুদারাবাকে কোন্ ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তার আরো বিবরণ সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
মূল ইসলামী পদ্ধতি মুশারাকা ও মুদারাবাই, কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে মুশারাকা বা মুদারাবা সম্ভব হয় না। যেমন কোনো কৃষকের ট্রাক্টর ক্রয়ের জন্য পুঁজির দরকার। এ ক্ষেত্রে শিরকাত ও মুদারাবা সম্ভব নয়। এরূপ অবস্থায় বিনিয়োগের আরো কিছু পদ্ধতি আছে। এখন তার আলোচনা করা হচ্ছে।
📄 ইজারা
এটাও পুঁজি বিনিয়োগের একটি শরয়ী পন্থা, যাকে Leasing বলে। এর ব্যাখ্যা পূর্বে (কোম্পানির জন্য মূলধন সরবরাহ শিরোনামের অধীনে) করা হয়েছে। এখানে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা জরুরি যে, শুধু ইজারা শব্দ দেখে কোনো লেনদেনকে শরীয়তসম্মত বলে স্থির করা উচিৎ নয়। কারণ, বর্তমানে সাধারণত ইজারায় যে লেনদেন হয় তার মধ্যে ইজারার প্রকৃত অবস্থা বিদ্যমান নেই। ইজারার প্রকৃত অবস্থা হল, ইজারাদাতা (Lessor) যে মেশিনারি ইত্যাদি ভাড়ায় দিচ্ছে সে তার মালিক ও দায়বহনকারী হবে, কিন্তু বিনিয়োগ ইজারায় বর্তমানে কার্যত এরূপ হয় না। ইজারাদাতা (Lessor) মেশিনারির কোনো প্রকার দায় গ্রহণ করে না। যদি যন্ত্রপাতির কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তা ইজারা গ্রহণকারীর (Lessee) ক্ষতি বলে মনে করা হয়। এমনকি কোনো দুর্ঘটনায় যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে গেলে তখনও ইজারা গ্রহীতা তার ভাড়া প্রদান করতে থাকে। যন্ত্রপাতির সাথে ইজারাদাতার সম্পর্ক শুধু এতটুকু থাকে, ভাড়া পরিশোধ না করলে সে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে নিজের ঋণ উসুল করে নেবে। সুতরাং বর্তমানে সাধারণত প্রকৃত ইজারা হয় না। আসল উদ্দেশ্য তো শুধু সুদের উপর ঋণ প্রদান করা, কিন্তু ট্যাক্স থেকে বাঁচার জন্য ইজারার নাম ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের লেনদেন শরয়ীভাবে জায়েয নেই। তবে হাঁ, যদি প্রকৃতপক্ষে ইজারাদাতা যন্ত্রপাতির মালিক হয় এবং সে এর দায় স্বীকার করে নিয়ে ইজারাচুক্তি করে, তাহলে তার অবকাশ আছে। আর ভাড়া নির্ধারিত করার সময় এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, যন্ত্রপাতির মূল্য কিছু লাভসহ উসুল হলে তার মধ্যেও শরয়ী কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু চুক্তির মধ্যে এ শর্ত আরোপ করা যাবে না যে, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রপাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইজারা গ্রহীতার মালিকানায় চলে যাবে। কারণ, এর মধ্যে 'صفقة في صفقة (চুক্তির ভিতর আরেক চুক্তি)-এর অবস্থা তৈরি হয়। তবে পূর্ব শর্তারোপ ছাড়া মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার কাছে মালিকানা স্থানান্তরের অবকাশ আছে।
📄 মুরাবাহা মুআজ্জালা
এটাও অর্থ বিনিয়োগের একটি শরয়ী পদ্ধতি হতে পারে। এর সারকথা হল, যখন কোনো লোক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করার জন্য আসবে, তখন ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করবে, কোন্ বস্তুর জন্য অর্থ দরকার। ব্যাংক তাকে নগদ অর্থ প্রদানের পরিবর্তে সে বস্তু ক্রয় করে মুরাবাহা হিসেবে লাভের উপর বাকিতে বিক্রি করে দেবে। লভ্যাংশ দরদাম করে যে কোনো মূল্য স্থির করে নেয়া যেতে পারে, কিন্তু লাভের একটা হার নির্ধারণ করে মুরাবাহা এ জন্য করা হয়, যাতে নীতিমালার মধ্যে সমতা থাকে এবং সব মানুষ থেকে একই হারে লাভ উসুল হয়। লাভের যে হার নির্ধারণ করা হয় তাকে বলা হয় মার্ক আপ (Mark up)।
এটাও পুঁজি বিনিয়োগের একটি জায়েয পদ্ধতি হতে পারে। শর্ত হল, সঠিক ও প্রয়োজনীয় শর্তের সাথে সম্পাদন করতে হবে। কারণ, বাকির কারণে মূল্য বৃদ্ধি করা ফুকাহাদের সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক হারে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এটা খুবই স্পর্শকাতর পদ্ধতি। এর মধ্যে সামান্যতম অসতর্কতা তাকে সুদী ব্যবস্থার সাথে মিশ্রিত করে দেয়। আজকাল ব্যাংকগুলোতে মুরাবাহার মূল তত্ত্ব না বুঝে এবং তার প্রয়োজনীয় শর্তাদি পূরণ না করেই তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে তাতে বহু দোষ সৃষ্টি হয়। সাধারণত ব্যাংক থেকে মুরাবাহার লেনদেন করার সময় যে ভুলগুলো হয়ে থাকে এবং সঠিক শরয়ী পদ্ধতিতে মুরাবাহা করার সময় যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি, সেগুলো এখানে চিহ্নিত করে দেয়া হল।
📄 প্রচলিত মুরাবাহার মধ্যে শরয়ী ত্রুটিসমূহ
১. মুরাবাহার সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে, ব্যাংক কোনো বস্তু ক্রয় করে লাভে (Mark up) তা বিক্রি করে দেবে, কিন্তু পাকিস্তানি ব্যাংকগুলোতে এমনও হচ্ছে, যে বস্তুর উপর মুরাবাহার চুক্তি হচ্ছে সে বস্তু ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহীতার কাছে আগে থেকেই মজুদ থাকে। ব্যাংক তার থেকে সে বস্তু নগদে কম মূল্যে ক্রয় করে আবার তার কাছেই বাকিতে লাভ ধরে পুনরায় বিক্রি করে দেয়। একে বাই ব্যাক (Buy Back) বলে। এভাবে প্রকৃত মুরাবাহার স্থলে লাভ (Mark up)-কে 'বাই ব্যাক' এর সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে, যা শরয়ীভাবে একেবারে নাজায়েয। কেননা, একই ব্যক্তি থেকে কম মূল্যে ক্রয় করে তৎক্ষণাৎ তার কাছে অধিক মূল্যে বাকিতে বিক্রি করা মূলত সুদী ঋণেরই একটি রূপ। যেখানে প্রথম কেনাবেচার মধ্যেই এ শর্ত থাকে, তার কাছেই পুনরায় বিক্রি করতে হবে।
২. বাই ব্যাক (Buy Back)-এর বাহানাও (বৈধকরণ প্রক্রিয়া) বাস্ত বে হয় না। সাধারণত কেবল কৃত্রিম কার্যক্রম হয়ে থাকে। এমন কোনো পণ্য আগে থেকে মজুদই থাকে না যার উপর বাই ব্যাক করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের এমন ব্যয় যার দ্বারা কোনো পণ্য ক্রয় করা যায় না, যেমন বেতন বিল ইত্যাদি পরিশোধের জন্যও ব্যাংক থেকে মুরাবাহার উপর ঋণ পাওয়া যায়।
৩. যদি Buy Back নাও হয়, প্রকৃত মুরাবাহাই হয়, তবুও মুরাবাহার উপর বিক্রীত পণ্য প্রথমে ব্যাংকের দখলে ও দায়বদ্ধতার মধ্যে আসার ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ মুরাবাহা সঠিক হওয়ার জন্য ঐ পণ্য প্রথমে ব্যাংকের দখলে ও দায়বদ্ধতায় আসা জরুরি।
৪. ব্যাংকের কাছে যখন কোনো ব্যক্তি মূলধন লাভের জন্য আসে তখন ব্যাংক অর্থ বিনিয়োগের সীমা নির্দিষ্ট (تحديد السقف) করে দেয় যে, ব্যাংক এত পরিমাণ মূলধন মুরাবাহা করার জন্য প্রস্তুত আছে। চুক্তির (Agreements) উপর স্বাক্ষর করানো হয়। সে সময় ব্যাংক ঐ ব্যক্তিকে পণ্য ক্রয়ের উকিল বানিয়ে দেয়, কিন্তু তখন কোনো ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয় না; বরং সেটা শুধু একটা পারস্পরিক চুক্তি হয় যে, ব্যাংক প্রয়োজন মোতাবেক এ শর্তাদির উপর তার গ্রাহককে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে সরবরাহ করবে। এখানে প্রয়োজন ছিল, যখন গ্রাহকের কোনো জিনিসের প্রয়োজন হবে তখন সে ব্যাংককে বলবে। তারপর উত্তম পন্থা হল, ব্যাংক সে বস্তু তার নিজস্ব মাধ্যম দ্বারা ক্রয় করে নিজের দখলে আনবে। তারপর গ্রাহককে মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি করবে, কিন্তু ব্যাংক যদি নিজে ক্রয় করার বদলে সেই গ্রাহককেই ক্রয়-বিক্রয়ের উকিল বানায়, তাহলে তার মধ্যে অন্তত এটা জরুরি, প্রথমে গ্রাহক ব্যাংকের উকিল হিসেবে সে বস্তু ক্রয় করে ব্যাংককে অবহিত করবে। তারপর তার থেকে ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে নিজের জন্য ক্রয় করবে। এখানে গ্রাহকের দুটি অবস্থান পরস্পর পৃথক রাখা অত্যাবশক ছিল। প্রথমে তার অবস্থান উকিলের। যতক্ষণ পর্যন্ত সে এ অবস্থানে থাকবে তার উপর উকিলের বিধান প্রযোজ্য হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংকের উকিল হিসেবে পণ্যের উপর তার দখল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পণ্য ব্যাংকের মালিকানায় এবং তারই জামানতে থাকবে। সুতরাং যদি এ সময় উকিলের কোনো ধরনের অবহেলা ছাড়া ঐ পণ্য ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে সে ক্ষতি ব্যাংকের হওয়া উচিৎ। তারপর যখন সে ব্যাংককে অবহিত করে তার থেকে সে পণ্য নিজের জন্য ক্রয় করবে, তখন পণ্য গ্রাহকের মালিকানায় ও জামানতে আসবে, এর পরে ক্ষতি হলে তা গ্রাহকের হবে।
গ্রাহকের এ দুই অবস্থান সম্পূর্ণরূপে একটা অন্যটা থেকে পৃথক হওয়া অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু আজকাল অধিকাংশ ব্যাংক এ বিষয়টির প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না; বরং বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ অর্থাৎ Limit অনুমোদন করার সময় মুরাবাহা চুক্তির উপর যে স্বাক্ষর হয়, তাকেই যথেষ্ট মনে করে নেয়া হয়। তারপর গ্রাহক পণ্য নিজে ক্রয় করে তা ব্যবহার করতে থাকে। ব্যাংক থেকে ক্রয়ের জন্য আলাদা কোনো ইজাব কবুল করা হয় না। যার ফলে এটা শুধু একটা কৃত্রিম কার্যক্রম হয়ে থাকে। কার্যত ফলাফল এটাই দাঁড়ায়, ব্যাংক গ্রাহককে অর্থ প্রদান করল এবং মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করল। পণ্য ব্যাংকের জামিনে আসা তারপর তার মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া এবং এ উদ্দেশে ইজাব কবুল ইত্যাদি কিছুই হয় না। এ পদ্ধতি একদম হারাম ও নাজায়েয।
৫. এ ভুলও হয়, বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করার চুক্তির উপর স্বাক্ষর হওয়ার সময়ই ব্যাংক সে ব্যাক্তি থেকে Bill of Exchange (হুন্ডি) বা প্রমিসারি নোটের উপর স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এটা ভুল এ কারণে, হুন্ডির উপর স্বাক্ষর তখন হয় যখন কোনো ব্যক্তি ঋণী হয়ে যায়। আর এ ব্যক্তি এখনো ব্যাংকের ঋণগ্রহক হয় নি। এখন তো শুধু ভবিষ্যতে মুরাবাহা মুআজ্জালা করার উপর চুক্তি হল। গ্রাহক ব্যাংকের ঋণী তখন হবে যখন সে পণ্য ব্যাংকের কাছ থেকে নিজের জন্য ক্রয় করবে। সুতরাং প্রমিসারি নোটের উপর স্বাক্ষরও তখন হওয়া উচিৎ।
৬. সুদী ব্যবস্থায় ঋণ পরিশোধের সময় হলে ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম বা এখন পরিশোধ করতে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে এ ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হয়। আগের সুদ ঋণের মধ্যে গণ্য হয় আর তার উপর অতিরিক্ত সুদ ধার্য করে আরো সময় প্রদান করা হয়। তাকে বলা হয় রুল অভার (Roll Over) করা। মুরাবাহার মধ্যেও এ কারবার শুরু করা হয়েছে। মুরাবাহার মূল্য পরিশোধের সময় হলে মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম না হলে এখানেও ঋণকে রুল অভার করে দেয়া হয়। অথচ এটা ছিল একটা ক্রয়-বিক্রয়। এর মধ্যে পণ্যের একটি মূল্য নির্ধারিত ছিল। এ মূল্যে এখন হ্রাস-বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এ মুরাবাহার উপর আরেক মুরাবাহাও করা যাবে না। মুরাবাহার মূল তত্ত্ব এবং তার শর্তাদি পূর্ণ না করার কারণে এ ধরনের অনিষ্টতা সৃষ্টি হয়। যার কারণে লেনদেন শরয়ীভাবে জায়েয থাকে না। তাই মুরাবাহার উপর আমল করার জন্য তার শর্তাদির প্রতি খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এখানে মুরাবাহা মুআজ্জালার সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় মাসআলা বর্ণনা করা হল: