📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 শিরকাত ও মুদারাবা

📄 শিরকাত ও মুদারাবা


সুদের বিপরীতে সঠিক ইসলামী বিকল্প পদ্ধতি হচ্ছে শিরকাত ও মুদারাবা। যা সুদের চেয়ে কয়েকগুণ ভাল ফলাফল বহনকারী। এটা পুঁজি বিনিয়োগের অত্যন্ত সুষম ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি। সম্পদ বণ্টনের উপর যার খুবই ভাল প্রভাব পড়ে। এ দ্বারা ব্যাংকিংয়ের এ ধারণাও বিদূরিত হতে পারে, ব্যাংক ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থেকে শুধু পুঁজির যোগান দেয়ার মাধ্যম হয়। শিরকাত ও মুদারাবা ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংকের নাম ব্যাংকই থাকুক আর যাই থাকুক, কিন্তু ব্যাংকের এ অবস্থান শেষ হয়ে যাবে। তখন ব্যাংক যথারীতি কারবার পরিচালনা করবে।
শিরকাত ও মুদারাবার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, শিরকাতের মধ্যে অংশীদারগণ মূলধনের মধ্যেও শরিক হয় এবং কাজের মধ্যেও শরিক হতে পারে। কেউ কার্যত কারবারে হস্তক্ষেপ না করলে সে ভিন্ন কথা। আর মুদারাবার মধ্যে মূলধন থাকে পুঁজি সরবরাহকারীর আর কাজ করে কারবারী। পুঁজি সরবরাহকারী কারবারে অংশগ্রহণ করে না।
এখানে শিরকাত ও মুদারাবার কিছু মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করা হল। শিরকাত ও মুদারাবা পদ্ধতিতে কারবার করলে তা অনুসরণ করা জরুরি।
১. মূলধনের অনুপাতে লভ্যাংশ নির্ধারণ করা শরয়ীভাবে জায়েয নেই। লভ্যাংশ নির্ধারণ করার সঠিক শরয়ী পদ্ধতি হল প্রকৃতপক্ষে যে লাভ হবে তার শতকরা হার নির্ধারণ করতে হবে।
২. পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে মুনাফার যে কোনো আনুপাতিক হার নির্ধারণ করা যাবে। যেমন কারো মূলধন চল্লিশ শতাংশ, কিন্তু তার জন্য ষাট শতাংশ লাভ নির্ধারণের শর্ত করা, অন্যজনের মূলধন ষাট শতাংশ, তার জন্য চল্লিশ শতাংশ লাভ নির্ধারণের শর্তারোপ করা, এমন করা জায়েয। পুঁজির পরিমাণ অনুসারে লভ্যাংশ বণ্টন জরুরি নয়। এ দ্বারা বুঝা গেল, বিভিন্ন অংশীদারদের জন্য মুনাফার বিভিন্ন হার স্থির করা যেতে পারে। বর্তমানের পরিভাষায় একে 'পরিমাপ' (Weightage) দেয়া বলে। বিভিন্ন অংশীদারকে বিভিন্ন পরিমাপ দেয়া যেতে পারে। তবে যে অংশীদার কাজ না করার শর্তারোপ করেছে তার মুনাফা তার পুঁজির অনুপাতের চেয়ে বেশি হতে পারবে না।
৩. লভ্যাংশের মধ্যে বিভিন্ন অংশীদারকে বিভিন্ন পরিমাপ দেয়া যেতে পারে, কিন্তু লোকসানের মধ্যে এমন করা জায়েয নেই। লোকসান সর্বাবস্থায় পুঁজির অনুপাতে হবে। যাকে ফুকাহাগণ এভাবে ব্যক্ত করেন : الربح على ما اصطلحوا عليه والوضيعة بقدر رأس المال (লভ্যাংশ হবে নির্ধারণের ভিত্তিতে আর ক্ষতি হবে মূলধনের ভিত্তিতে)।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 শিরকাত ও মুদারাবার সমস্যা

📄 শিরকাত ও মুদারাবার সমস্যা


শিরকাত ও মুদারাবা চালু করতে সাধারণত দুধরনের সমস্যার কথা বলা হয়:
১. আজকাল বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর মান অনেক নিচে নেমে গেছে। কাউকে শিরকাতের ভিত্তিতে মূলধন সরবরাহ করলে সে কখনো প্রকৃত লাভের কথা বলে না; বরং লাভের স্থলে লোকসান দেখায়। এ কারণে শিরকাত ও মুদারাবার ভিত্তিতে কাজ করা কঠিন। এর উত্তর, বাস্ত বিকই সমাজে অবিশ্বস্ততার অবস্থা দুঃখজনক, কিন্তু অবিশ্বস্ততার কারণে কখনো কোনো কাজ বন্ধ হয় না। বিভিন্ন পন্থায় অবিশ্বস্ততার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন অডিট ব্যবস্থা, একাউন্টস ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ইত্যাদি। মুশারাকা ও মুদারাবার মধ্যেও এ ধরনের কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। সে সাথে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে একবার অবিশ্বস্ততা প্রমাণিত হবে, তাকে সব ব্যাংকে ব্লাক লিস্টভুক্ত করা যেতে পারে। যার অর্থ, এরূপ ব্যক্তি ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক থেকে মূলধন লাভ থেকে বঞ্চিত থাকবে। যদি আইন করে এটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় তাহলে মানুষ মিথ্যাচার করতে ভয় পাবে। এর দ্বারা এ ক্ষতিকারক উপসর্গ অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া অন্য আরো আইনী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এক ব্যাংক একা যদি এ কাজ করে তাহলে তার জন্য সত্যিই কষ্টকর, কিন্তু যদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ কাজ করা হয় এবং সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা এ নিয়ম অনুযায়ী চলে, তাহলে মিথ্যাচারের পথ বন্ধ করার রাস্তা বের হতে পারে।
২. দ্বিতীয় সমস্যা হয় ইনকাম ট্যাক্স ব্যবস্থার কারণে। সাধারণত ব্যবসায়ীগণ দুধরনের খাতা বানায়। ইনকাম ট্যাক্সের জন্য আলাদা খাতা থাকে, আর প্রকৃত খাতা থাকে অন্য আরেকটা। এ অবস্থায় মুশারাকা বা মুদারাবার ভিত্তিতে মূলধন গ্রহণকারী যদি প্রকৃত লাভ দেখায় তাহলে ইনকাম ট্যাক্সওয়ালা আটকাবে। আর যদি সে ব্যাংককে প্রকৃত লাভ না দেখায় তাহলে প্রকৃত লাভের বণ্টন হয় না। এর উত্তর হচ্ছে, সরকারীভাবে এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা হলে দেখা যায়, মুশারাকা ও মুদারাবাকে সফল করার জন্য ট্যাক্স ব্যবস্থার সংশোধনও জরুরি। ট্যাক্সকে আমদানির সাথে সম্পৃক্ত না করে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ট্যাক্সের এমন কোনো ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে মিথ্যাচারের এ রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।
তাছাড়া অর্থ বিনিয়োগের অনেক খাত এমন আছে যেখানে শিরকাত ও মুদারাবার মধ্যে অনেক দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হবে না। যেমন রপ্তানি সংক্রান্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম থেকে রপ্তানিকৃত মালামালের ব্যয় এবং সম্ভাব্য ধারণাকৃত মূল্য জানা থাকে। সুতরাং এর মধ্যে শিরকাত বা মুদারাবায় ধোঁকা প্রতারণার সম্ভাবনা অনেক কম।
তেমনিভাবে ব্যাংক ব্যবসায়ীর পুরো কারবারের মধ্যে শরিক হওয়া জরুরি নয়। সে কারবারের কোনো নির্দিষ্ট অংশেও শরিক হতে পারে, যাতে লাভ নির্ধারণ বেশি কঠিন হবে না। এছাড়া ব্যাংকের জন্য যেহেতু ব্যবসায়ীর সাথে স্থায়ী ও সার্বক্ষণিক শরিক থাকা জরুরি নয়; বরং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা তাদের দালান, মেশিনারি ইত্যাদি পূর্ব থেকেই বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংক ছয় মাস বা এক বছরের জন্য তার সাথে শিরকাতের লেনদেন করতে পারে। এ কারণে পরস্পর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে চুক্তি হতে পারে, এ নির্দিষ্ট ও সীমিত শিরকাতের মধ্যে কারবারের শুধু প্রত্যক্ষ ব্যয় (Direct Expenses) মেনে নেয়া হবে আর মোট লাভ (Gross profit) উভয় পক্ষের মধ্যে বণ্টিত হবে। আর যেহেতু স্থাবর সম্পত্তি ব্যবসায়ী সরবরাহ করে, তাই তার লাভের অনুপাতও বৃদ্ধি করা যেতে পারে, কিন্তু এ স্থাবর সম্পত্তির ব্যয় এবং পরোক্ষ ব্যয় শিরকাতের উপর চাপানো উচিৎ নয়। এভাবে হিসাব নিকাশও সহজ হয়ে যাবে আর অবিশ্বস্ততার আশঙ্কাও কমে যাবে। আর ট্যাক্স যেহেতু উপার্জিত লাভের উপর আরোপ হয়, এ কারণে ট্যাক্স সমস্যারও সমাধান বেরিয়ে আসবে। শিরকাত ও মুদারাবাকে কোন্ ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তার আরো বিবরণ সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
মূল ইসলামী পদ্ধতি মুশারাকা ও মুদারাবাই, কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে মুশারাকা বা মুদারাবা সম্ভব হয় না। যেমন কোনো কৃষকের ট্রাক্টর ক্রয়ের জন্য পুঁজির দরকার। এ ক্ষেত্রে শিরকাত ও মুদারাবা সম্ভব নয়। এরূপ অবস্থায় বিনিয়োগের আরো কিছু পদ্ধতি আছে। এখন তার আলোচনা করা হচ্ছে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ইজারা

📄 ইজারা


এটাও পুঁজি বিনিয়োগের একটি শরয়ী পন্থা, যাকে Leasing বলে। এর ব্যাখ্যা পূর্বে (কোম্পানির জন্য মূলধন সরবরাহ শিরোনামের অধীনে) করা হয়েছে। এখানে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা জরুরি যে, শুধু ইজারা শব্দ দেখে কোনো লেনদেনকে শরীয়তসম্মত বলে স্থির করা উচিৎ নয়। কারণ, বর্তমানে সাধারণত ইজারায় যে লেনদেন হয় তার মধ্যে ইজারার প্রকৃত অবস্থা বিদ্যমান নেই। ইজারার প্রকৃত অবস্থা হল, ইজারাদাতা (Lessor) যে মেশিনারি ইত্যাদি ভাড়ায় দিচ্ছে সে তার মালিক ও দায়বহনকারী হবে, কিন্তু বিনিয়োগ ইজারায় বর্তমানে কার্যত এরূপ হয় না। ইজারাদাতা (Lessor) মেশিনারির কোনো প্রকার দায় গ্রহণ করে না। যদি যন্ত্রপাতির কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তা ইজারা গ্রহণকারীর (Lessee) ক্ষতি বলে মনে করা হয়। এমনকি কোনো দুর্ঘটনায় যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে গেলে তখনও ইজারা গ্রহীতা তার ভাড়া প্রদান করতে থাকে। যন্ত্রপাতির সাথে ইজারাদাতার সম্পর্ক শুধু এতটুকু থাকে, ভাড়া পরিশোধ না করলে সে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে নিজের ঋণ উসুল করে নেবে। সুতরাং বর্তমানে সাধারণত প্রকৃত ইজারা হয় না। আসল উদ্দেশ্য তো শুধু সুদের উপর ঋণ প্রদান করা, কিন্তু ট্যাক্স থেকে বাঁচার জন্য ইজারার নাম ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের লেনদেন শরয়ীভাবে জায়েয নেই। তবে হাঁ, যদি প্রকৃতপক্ষে ইজারাদাতা যন্ত্রপাতির মালিক হয় এবং সে এর দায় স্বীকার করে নিয়ে ইজারাচুক্তি করে, তাহলে তার অবকাশ আছে। আর ভাড়া নির্ধারিত করার সময় এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, যন্ত্রপাতির মূল্য কিছু লাভসহ উসুল হলে তার মধ্যেও শরয়ী কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু চুক্তির মধ্যে এ শর্ত আরোপ করা যাবে না যে, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রপাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইজারা গ্রহীতার মালিকানায় চলে যাবে। কারণ, এর মধ্যে 'صفقة في صفقة (চুক্তির ভিতর আরেক চুক্তি)-এর অবস্থা তৈরি হয়। তবে পূর্ব শর্তারোপ ছাড়া মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার কাছে মালিকানা স্থানান্তরের অবকাশ আছে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 মুরাবাহা মুআজ্জালা

📄 মুরাবাহা মুআজ্জালা


এটাও অর্থ বিনিয়োগের একটি শরয়ী পদ্ধতি হতে পারে। এর সারকথা হল, যখন কোনো লোক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করার জন্য আসবে, তখন ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করবে, কোন্ বস্তুর জন্য অর্থ দরকার। ব্যাংক তাকে নগদ অর্থ প্রদানের পরিবর্তে সে বস্তু ক্রয় করে মুরাবাহা হিসেবে লাভের উপর বাকিতে বিক্রি করে দেবে। লভ্যাংশ দরদাম করে যে কোনো মূল্য স্থির করে নেয়া যেতে পারে, কিন্তু লাভের একটা হার নির্ধারণ করে মুরাবাহা এ জন্য করা হয়, যাতে নীতিমালার মধ্যে সমতা থাকে এবং সব মানুষ থেকে একই হারে লাভ উসুল হয়। লাভের যে হার নির্ধারণ করা হয় তাকে বলা হয় মার্ক আপ (Mark up)।
এটাও পুঁজি বিনিয়োগের একটি জায়েয পদ্ধতি হতে পারে। শর্ত হল, সঠিক ও প্রয়োজনীয় শর্তের সাথে সম্পাদন করতে হবে। কারণ, বাকির কারণে মূল্য বৃদ্ধি করা ফুকাহাদের সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক হারে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এটা খুবই স্পর্শকাতর পদ্ধতি। এর মধ্যে সামান্যতম অসতর্কতা তাকে সুদী ব্যবস্থার সাথে মিশ্রিত করে দেয়। আজকাল ব্যাংকগুলোতে মুরাবাহার মূল তত্ত্ব না বুঝে এবং তার প্রয়োজনীয় শর্তাদি পূরণ না করেই তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে তাতে বহু দোষ সৃষ্টি হয়। সাধারণত ব্যাংক থেকে মুরাবাহার লেনদেন করার সময় যে ভুলগুলো হয়ে থাকে এবং সঠিক শরয়ী পদ্ধতিতে মুরাবাহা করার সময় যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি, সেগুলো এখানে চিহ্নিত করে দেয়া হল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00