📄 মুদ্রার মূল্যমান মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা সংকোচন এবং মূল্য সূচক
আগের আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, কাগজী নোটের (Paper Currency) নিজস্ব কোনো প্রকৃত মূল্য নেই। এটা কিছু পণ্য ও সেবার (Goods and Services) ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। এ ক্রয় ক্ষমতাকে 'মুদ্রার মূল্যমান' (Value of Money) বলে। নোটের মূল্য নির্ধারিত হয় পণ্য ও সেবার মূল্য দ্বারা। পণ্য ও সেবার মূল্য কমে গেলে নোটের মূল্য বৃদ্ধি পায় আর বৃদ্ধি পেলে নোটের মূল্য কমে যায়। সুতরাং পণ্য ও সেবার মূল্য এবং নোটের মূল্য পরস্পর বিপরীত দিকে চলে। যখন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পায় তখন দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল দ্রব্য মূল্যও বৃদ্ধি পায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মুদ্রার মূল্যমান কমে আসে। এ অবস্থাকে বাংলায় মুদ্রাস্ফীতি, আরবিতে 'تضخم' এবং ইংরেজিতে Inflation বলে। পরে পরিভাষায় ব্যাপকতা আসায় দ্রব্য-মূল্যের যে কোনো বৃদ্ধির জন্য তা ব্যবহার করা হয়। এ বৃদ্ধি মুদ্রার অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক। যদি মুদ্রাস্ফীতি (মূল্য বৃদ্ধি) দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হয় তাহলে তাকে Demand Pull Inflation আরবিতে 'تضخم بسبب الطلب' বলে। আর মুদ্রাস্ফীতি যদি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি যেমন শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হয় তাহলে তাকে Cost Push Inflation এবং আরবিতে 'تضخم بسبب رفع الاسعار' বলে। এর বিপরীতে যদি দ্রব্যমূল্য কমে যায় আর মুদ্রার মূল্যমান বৃদ্ধি পায় তাহলে তাকে বাংলায় মুদ্রা সংকোচন, আরবিতে 'انکماش' এবং ইংরেজিতে Deflation বলে।
📄 মূল্য সূচক
মুদ্রার মূল্যমান, মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রা সংকোচন ইত্যাদি মাপা হয় পণ্য ও সেবার মূল্য দ্বারা। দ্রব্যমূল্য দেখে মুদ্রার মূল্যমান, মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রা সংকোচনের পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য একটি গাণিতিক ব্যবস্থা আছে। যাকে আরবিতে 'قائمة الاسعار, বাংলায় মূল্য সূচক এবং ইংরেজিতে Price Index বলা হয়।¹
এর প্রক্রিয়া হচ্ছে, যেসব পণ্যদ্রব্য নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং যার মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি মানুষকে অধিক প্রভাবিত করে, তার একটা তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তারপর যে সময়ের মধ্যকার মুদ্রার মূল্যমানের হ্রাস-বৃদ্ধির পরিমাণ জানা আবশ্যক, সে সময়ের শুরু এবং শেষের মূল্য ধরে তার গড় বের করা হয়। অর্থাৎ দেখা হয়, এ সময়ের মধ্যে মূল্য গড়ে কত শতাংশ হ্রাস বা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা মূল্যের হ্রাস বৃদ্ধির সাধারণ গড়। এর দ্বারা মুদ্রার মূল্যমানের সঠিক পরিমাপ হয় না। কারণ, এ গড় বের করার জন্য সব বস্তু এক সমান রাখা হয়েছে। অথচ সব পণ্য মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি মানুষকে এক সমান প্রভাবিত করে না। যে বস্তুর প্রয়োজন বেশি হয় তার মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি বেশি প্রভাবিত করে। আর যার গুরুত্ব এবং প্রয়োজন কম তার মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি তত বেশি প্রভাবিত করে না। সুতরাং সঠিক পরিমাপের জন্য প্রত্যেক বস্তুর গুরুত্ব অনুযায়ী তা পরিমাপ করা হয়। এ পরিমাপকে আরবিতে وزن البضائع' এবং ইংরেজিতে Weight of Commodity বলে।
এ পরিমাপকে সাধারণ গড়ের সাথে গুণ করে যে গড় পাওয়া যায় তাকে পরিমিত গড়, আরবিতে 'المعدل الموزون' এবং ইংরেজিতে Weighted Average বলে। এ পরিমিত গড়ের সমষ্টি মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির সূচক হবে। এভাবে মুদ্রার মূল্যমানের হ্রাস-বৃদ্ধি অনুমান করা হয়। নিম্নেলিখিত নকশা থেকে মূল্য সূচকের (Price Index) সংক্ষিপ্ত ধারণা পাওয়া যাবে।
| পণ্য | ১৯১১ সালের মূল্য | ১৯১২ সালের মূল্য | সাধারণ গড় | ওজন | পরিমিত গড় |
| :--- | :--- | :--- | :--- | :--- | :--- |
| খাদ্য | ৫০ | ১০০ | ২ | ৫ | ১.০০ |
| কাপড় | ২০ | ৩০ | ১.৫ | ০.২ | ০.৩ |
| বাড়ি | ৩০ | ৬০ | ২ | ০.৩ | ০.৬ |
| সমষ্টির গড় | | | ১.৮৩ | সমষ্টি | ১.৯ |
সাধারণ গড় থেকে জানা যায়, মূল্য এক থেকে ১.৮৩ হয়ে গেছে। সুতরাং মুদ্রার মূল্যমান ৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর পরিমিত গড় থেকে জানা গেল, মূল্য এক থেকে ১.৯০ হয়ে গেছে। সুতরাং মুদ্রার মূল্যমান ৯০ শতাংশ কমেছে।
এ ব্যাখ্যা দ্বারা বুঝা গেল, মূল্য সূচক একটি কাল্পনিক বিষয়, বাস্তব নয়। কারণ, তাতে কোন্ বস্তু গ্রহণ করা হবে তার সিদ্ধান্ত অনুমানকৃত। তারপর প্রত্যেক বস্তুকে যে ওজন দেয়া হয় সেটাও অনুমানকৃত। প্রত্যেক বস্তুর যে মূল্য ধরা হয় সেটাও অনুমানকৃত।
কখনো কতগুলো লেনদেন মূল্য সূচকের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া হয়। যেমন এক সময় পাকিস্তানে চাকরিজীবীদের বেতন মূল্য সূচকের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, মুদ্রার মূল্য যত কম হবে বেতন তত বৃদ্ধি পাবে। কোনো বস্তুকে মূল্য সূচকের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়াকে ইনডেকসেশন (Indexation) বলে।
টিকাঃ
১. কতিপয় দ্রব্যের নির্দিষ্ট সময়ের গড়পড়তা মূল্যকে অন্য কোনো ভিত্তি সময়ের গড়পড়তা মূল্যের তুলনায় শতাংশরূপে প্রকাশ করার জন্য যে সংখ্যা ব্যবহার করা হয়, তাকে দামস্তরের সূচক সংখ্যা বলে। সূচক সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পণ্যের দাম বেড়েছে ও টাকার দাম কমেছে এবং সূচক সংখ্যা হ্রাস পেলে পণ্যের দাম কমেছে ও টাকার দাম বেড়েছে বুঝায়। সূচক সংখ্যা বের করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। লাসপেয়ারের ফর্মুলা অনুযায়ী সূচক সংখ্যা বের করার পদ্ধতি হল:
সূচক সংখ্যা = চলতি বছরের দাম X উৎপাদনের পরিমাণ X ১০০/ভিত্তি বছরের দাম X উৎপাদনের পরিমাণ
📄 দেনা পরিশোধে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব
নোটের একটা মূল্য তাই, যা তার গায়ে লেখা থাকে। তাকে নামিক মূল্য "القيمة الاسمية" (Face Value) বলে। আর একটা হচ্ছে ক্রয় ক্ষমতা, যাকে প্রকৃত মূল্য 'القيمة الحقيقية" (Real Value) বলে। লিখিত মূল্য সর্বদা একই থাকে, কিন্তু প্রকৃত মূল্য (ক্রয় ক্ষমতা) মুদ্রাস্ফীতির সময় হ্রাস পায়।
এখন কারো উপর যদি অন্যের ঋণ থাকে তাহলে কিছুদিন পর সেটা লিখিত মূল্য অনুসারে পরিশোধ করা হবে না ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে? যেমন কোনো ব্যক্তির উপর অন্যের একশ টাকা ঋণ ছিল। এক বছর পর একশ টাকার ক্রয় ক্ষমতা দশ শতাংশ কমে গেছে। এখন লিখিত মূল্য অনুযায়ী তো একশ টাকার নোটই দিতে হবে। আর প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী একশ দশ টাকা দিতে হবে। এ প্রশ্ন আজকাল অহরহ উঠছে, দেনা পরিশোধ লিখিত মূল্য অনুযায়ী করতে হবে না প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী করতে হবে? আরো বলা হচ্ছে, লিখিত মূল্য দিয়ে পরিশোধ করা হলে ঋণদাতার ক্ষতি এবং তার উপর জুলুম হয়। বিশেষ করে সেসব দেশে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতির হার খুব বেশি। যেমন বৈরুতের মুদ্রা (লিরা) এক সময় ডলারের কাছাকাছি ছিল। এখন তার মূল্য এত কমে গেছে যে, এক ডলারে ছয় সাতশ লিরা পাওয়া যায়। এ মাসআলা সমাধান করার জন্য অর্থনীতিবিদ ও উলামায়ে কিরাম বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। এখানে সব দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে তার উপর পর্যালোচনা করা হচ্ছে:
১. নোট ঋণ দেয়ার অর্থ মূলত সে স্বর্ণ ঋণ দেয়া যা তার বিপরীতে আছে। এখন সে পরিমাণ স্বর্ণ তার প্রাপ্য। সে এ পরিমাণ স্বর্ণ বা তার মূল্য টাকার মাধ্যমে নিতে পারে। তবে এ দৃষ্টিভঙ্গি সে ধারণার উপর নির্ভরশীল, যেখানে নোটের বিপরীতে স্বর্ণ আছে। আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, এ ধারণা ভুল।
২. নোটের বিপরীতে স্বর্ণ থাক বা না থাক, সর্বাবস্থায় মনে করা হবে, নোটের লেনদেন মূলত স্বর্ণের লেনদেন। কারণ, প্রথমে স্বর্ণ অর্থ ছিল, এখন নোট স্বর্ণের স্থান দখল করেছে। সুতরাং নোটের লেনদেন স্বর্ণেরই লেনদেন। অতএব দেনা পরিশোধ স্বর্ণের মূল্যের সাথে সংশ্লিষ্ট।
এ যুক্তিও সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ, এ কথা স্থিরীকৃত, এখন আর নোট স্বর্ণের প্রতিনিধিত্ব করে না। এটা নিজেই প্রচলিত মুদ্রা এবং ফুলুসের ন্যায়। প্রচলিত মুদ্রা ও ফুলুসের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব মূল্যমান গ্রহণযোগ্য হয়। দেনা পরিশোধে তাকে স্বর্ণের সাথে সম্পৃক্ত করা যায় না।
এখানে কেউ ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. এর অভিমত অনুসারে দলিল পেশ করেন। তাঁর অভিমত হল, দেনা পরিশোধের আগে যদি ফুলুসের মূল্য হ্রাস বৃদ্ধি পায় তাহলে তার মূল্য হিসেবে দেনা পরিশোধ করতে হবে,¹ কিন্তু এ দলিল পেশ সঠিক মনে হয় না। কারণ, নোট ও ফুলুসের মধ্যে পার্থক্য আছে। ফুলুস স্বর্ণ-রুপার সাথে সম্পৃক্ত এবং তার মূল্য সোনা-রুপার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হত। সুতরাং এ ফুলুসের অবস্থা ছিল দীনার ও দিরহামের খুচরার মতো এবং দীনার ও দিরহামের সাথে ফুলুসের এক বিশেষ সম্পর্ক থাকত। যেমন এক ফুলুস রুপার দিরহামের এক দশমাংশ।
বাজারের পরিভাষায় এ অনুপাতের বদলকেই ফুলুসের মূল্যমানের হ্রাস-বৃদ্ধি বলে ব্যক্ত করা হয়। এরূপ অবস্থায় যখন ফুলুস সোনা-রুপার সাথে সম্পৃক্ত এবং দীনার ও দিরহামের জন্য খুচরার ন্যায় হল, তখন ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. ফুলুসের মূল্য দিয়ে দেনা পরিশোধ করা জরুরি সাব্যস্ত করেছেন। নোটের অবস্থা তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা সোনা-রুপার সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং স্বতন্ত্র পারিভাষিক মুদ্রা। তার নিজস্ব একটা মূল্যমান আছে, যার সোনা- রুপার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
তারপর সে যুগের ফুলুস ও বর্তমানের নোটের মধ্যে আরো একটা পার্থক্য আছে। সেটা হল ফুলুসের মূল্য জানার জন্য স্বর্ণ- রুপার একটা স্পষ্ট মানদণ্ড বর্তমান ছিল। যা সামনে রেখে ফুলুসের মূল্য নিশ্চিতভাবে জানা যেত, কিন্তু এখন নোটের মূল্যমানের আনুমানিক ধারণা করা যেতে পারে, প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে না। যেমন মূল্য সূচকের আলোচনায় বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে।
৩. তৃতীয় যে দর্শনটা খুব জোরেশোরে পেশ করা হয় সেটা হল, ইনডেকসেশনের দর্শন। অর্থাৎ দেনাকে মূল্য সূচকের (Price Index) সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া। এ দর্শনের দলিল পেশ করা হয়, নোট নিজে কোনো কিছুই নয়। এটা سلة البضائع" (Basket of Goods), অর্থাৎ কিছু পণ্যের ঝুড়ি ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং কেউ যখন কাউকে কিছু নোট ঋণ দিল তখন যেন সে তাকে 'سلة البضائع (Basket of Goods) দিল ' الا قراش تقضى با مثالها (ঋণ তার সমজাতীয় বস্তু দ্বারা পরিশোধ করণ)-এর দাবি হল, এখন এ পণ্যের ঝুড়িই (Basket of Goods) ফিরিয়ে দিতে হবে। এর পদ্ধতি হল, ঋণকে (Price Index) মূল্য সূচকের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে। অর্থাৎ পরিশোধের সময় এ পরিমাণ নোট বেশি আদায় করা হবে যা মুদ্রাস্ফীতির হারের সমান হয়ে যায়। যেমন একশ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছিল, পরিশোধের সময় মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে দশ শতাংশ। সুতরাং এখন একশ দশ টাকা পরিশোধ করা হবে।
ফিকাহর আলোকে এ অভিমতও কতিপয় কারণে ভুল: প্রথম কারণ হল, যদি নোটের বিপরীতে কিছু বিশেষ এবং নির্দিষ্ট পণ্য থাকত, তাহলে এটা বলা যেত, নোট প্রকৃতপক্ষে 'سلة البضائع'-এর প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু পূর্বের আলোচনায় স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, 'سلة البضائع কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয়। এটা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তন হতে থাকে। অনুমান ছাড়া তা নির্দিষ্ট করার কোনো পথ নেই। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে ' سلة البضائع' নোটের মূল নয়; বরং তার থেকে হাসিলযোগ্য উপকার। সুতরাং কাউকে নোট দেয়ার অর্থ 'سلة البضائع' প্রদান করা নয়; বরং এমন বিনিময়- উপকরণ দেয়া, যা দ্বারা 'سلة البضائع' ক্রয় করা যায়।
দ্বিতীয় কারণ হল, এ অভিমতের মূল কথা হচ্ছে, দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে সমতা প্রকৃত মূল্য (Real Value) হিসেবে গৃহীত হওয়া উচিৎ। শুধু নামিক মূল্যের (Face Value) মধ্যে সমতার রেয়াত করা সঠিক নয়। শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিষয়টা তার উল্টো। শরীয়তে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে পরিমাণের সমতা ধর্তব্য। প্রকৃত মূল্যের সমতা ধর্তব্য নয়। যেমন কেউ গম ঋণ নিল। যখন ফিরিয়ে দেয়ার সময় হবে তখন সে গমের মূল্য বাড়ুক বা কমুক, সে পরিমাণ গমই ফিরিয়ে দিবে। এ যুক্তির ভিত্তিতে যে, ধর্তব্য হবে পরিমাণ; প্রকৃত মূল্য নয়। হযরত ইবনে উমর রা. এর এক হাদীস এর সুস্পষ্ট দলিল। সে হাদীসের সারকথা হল, তিনি 'নাকী' বাজারে উট বিক্রি করতেন। কখনো এমনও হত, বিক্রি হত দেরহামের মুদ্রায় আর মূল্য পরিশোধ হত দিনারের মুদ্রায়। আবার কখনো বিক্রি হত দিনারের মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ হত দেরহামের মুদ্রায়। এ ব্যাপারে রাসূল সা.-এর কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ শর্তে অনুমতি দেন, পরিশোধের দিনের মূল্য অনুযায়ী হতে হবে।¹ এ থেকে বুঝা গেল, তার উপর সে বস্তুর সমপরিমাণই ওয়াজিব হয়েছে যে বস্তুর বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিল। তারপর পরিশোধের সময় সে দিনের মূল্য অনুসারে বিনিময় হতে পারে। আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা গেল, ঋণের ক্ষেত্রে যে জিনিস ওয়াজিব হয় সেটা হল ঋণের পরিমাণ; মূল্য নয়। যদি মূল্য ওয়াজিব হত তাহলে ওয়াজিব হওয়ার দিনের মূল্য হিসেবে বিনিময় হত।
তৃতীয় কারণ হল, সুদী মালের মধ্যে শরীয়ত প্রকৃত সমতা জরুরি ঘোষণা করেছে। এ কারণে শরীয়ত সুদী মালের মধ্যে অনুমানভিত্তিক বেচাকেনা জায়েয রাখে নি। দেনা পরিশোধকে মূল্য সূচকের সাথে সম্পৃক্ত করলে অনুমানভিত্তিক বেচাকেনা হয়ে যায়। কারণ, একথা আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, মূল্য সূচক হয় অনুমানভিত্তিক।
থাকল একটা আপত্তি তা হল, নোটের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পরও যে পরিমাণ নোট নিয়েছিল সে পরিমাণ ফিরিয়ে দেয়া ঋণদাতার উপর জুলুম হবে। এর উত্তরের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখা ভাল: ক. টাকার মূল্য কমে যাওয়ার ব্যাপারে ঋণগ্রহীতারও কোনো হাত নেই। সুতরাং সে দায় ঋণগ্রহীতার উপর চাপানো তার প্রতি জুলুম। খ. কাউকে অর্থ প্রদানের দুটি পদ্ধতি আছে। এক হল লভ্যাংশে শরিক হওয়ার জন্য দেয়া। লভ্যাংশে শরিক হওয়ার এ পদ্ধতি ঋণ নয়; বরং শিরকাত বা মুদারাবা। দ্বিতীয় পদ্ধতি হল, সহানুভূতির জন্য কাউকে ঋণ প্রদান করা। সহানুভূতির জন্য কাউকে ঋণ প্রদান করা হুবহু তাই, যেমন নিজের কাছে টাকা সংরক্ষিত করে রাখা। যদি ঋণদাতা টাকা নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখত তাহলে মূল্য কমে যাওয়ার জন্য কেউ দায়ী হত না। এখানেও কেউ দায়ী হবে না।
গ. যদি ইনডেকসেশন সঠিক নীতি হয়, তাহলে এটা ব্যাংকের কারেন্ট একাউন্টেও চালু হওয়া উচিৎ। অথচ কারেন্ট একাউন্টে তা কেউ চালু করে না।
ঘ. মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) অবস্থায় যেমন অতিরিক্ত পরিশোধকে জরুরি মনে করা হয়, তেমনি মুদ্রা সংকোচনের (Deflation) বেলায় পরিশোধের মধ্যেও কম হওয়া উচিৎ, অথচ তা কেউ বলে না।
তবে যেখানে কোনো মুদ্রার মূল্য এ পরিমাণ পড়ে যায় যাতে অর্থনীতি মন্দার শিকার হয়, যেমন বৈরুতে হয়েছে, তাহলে তার হুকুম ভিন্ন হতে পারে।
তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার উলামায়ে কিরামের জন্য বিবেচ্য বিষয়। তা হল, মুদ্রার মূল্য কখনো এভাবে হ্রাস পায় যে, খোদ সরকারই তার মুদ্রার মূল্য কমিয়ে দেয়, একে বলা হয় অবমূল্যায়ন (Devaluation)। এ প্রেক্ষিতে বিবেচ্য হচ্ছে, তাহলে এ অবস্থায় কি বলা যাবে, এখন সরকার আগের মুদ্রা বাতিল করে নতুন একটা মুদ্রা চালু করেছে যার মূল্য আগের মুদ্রার তুলনায় কম? যদি সরকারের পক্ষ থেকে মুদ্রার অবমূল্যায়নের ব্যাপারে এ ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে তখন একথা বলা যায় যে, পূর্বের মুদ্রার মূল্যের সমতুল্য নতুন মুদ্রা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। যেমন কেউ একশ টাকা ঋণ নিয়েছিল, তখন একশ টাকা চার ডলারের সমান ছিল। পরে সরকার টাকার মূল্য কমিয়ে তা তিন ডলারের সমান করেছে। অর্থাৎ সরকার যেন এমন একটা নতুন মুদ্রা চালু করেছে যা পূর্বের মুদ্রার তুলনায় ৩৩ শতাংশ কম। সুতরাং এখন এ নতুন মুদ্রার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করা হলে ১৩৩ টাকা দিতে হবে। এ মাসআলা উলামায়ে কিরামের জন্য গবেষণার বিষয়, কিন্তু তার ফয়সালা করার সময় এ কথা মাথায় রাখতে হবে, সরকারের পক্ষ থেকে টাকার অবমূল্যায়ন করার প্রত্যক্ষ প্রভাব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের উপর পড়ে, অভ্যন্তরীণ লেনদেনের উপর পড়ে তার পরোক্ষ প্রভাব। দ্বিতীয়ত অবমূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নতুন মুদ্রা চালু করা হয় না; বরং পুরনো মুদ্রা বা নোটেরই মূল্য পরিবর্তন করা হয়, কিন্তু যেহেতু নোটের মূল্য যাই আছে তা কেবল প্রচলিত, প্রকৃত মূল্য নয়। এ কারণে সরকারের ঘোষণা দ্বারা অর্থগতভাবে এ নোট বদলে যায়।
টিকাঃ
رسائل ابن عابدين ص ۹ ج ۲ .
ابو داود كتاب البيوع ص ٢٥ ج ٢ رقم ٢٢٥٤ .