📄 মুদ্রার ক্রমবিকাশ ও বিভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা
প্রাচীনকালে মানুষের মধ্যে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির প্রথা চালু ছিল, যাকে বিনিময়, 'مقايضة' বা Barter বলা হয়,³ কিন্তু তাতে কতগুলো সমস্যা ছিল। যেমন পণ্য স্থানান্তর বা পরিবহন ছিল একটা বড় সমস্যা। এ পদ্ধতিতে একই স্থানে যোগান ও চাহিদার সম্মিলন কম হত। যেমন এক ব্যক্তি গম দিয়ে কাপড় কিনতে চায়, কিন্তু কাপড়ওয়ালা গম নিতে আগ্রহী নয়। পণ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে বিভক্ত করে তা কারবারের ভিত্তি বানানো ছিল কঠিন। 'مقايضة' (Barter)-এর পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তুকেই অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন গম যব চামড়া ইত্যাদি। এরপর স্বর্ণ ও রুপা অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ এটা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ছিল, তা পরিবহন এবং স্থানান্তরও ছিল সহজসাধ্য। প্রাচীন যুগে মুদ্রাঙ্কন ছাড়াই স্বর্ণের পরিমাণের ভিত্তিতে বিনিময় হত। তারপর মুদ্রা প্রস্তুত প্রথার সূচনা হয়। প্রথম দিকে প্রত্যেক ব্যক্তিরই মুদ্রা বানানোর অনুমতি ছিল। সে যুগের ব্যবস্থাকে স্বর্ণমান, আরবিতে ‘قاعدة الذهب’ এবং ইংরেজিতে Gold Standard বলা হয়। এরপর স্বর্ণ ছাড়া রূপার মুদ্রাও তৈরি শুরু হয়। যে মুদ্রা ব্যবস্থায় স্বর্ণ ও রুপা উভয় ধরনের মুদ্রা তৈরি করা হত তাকে দ্বি-ধাতু মান বা Bi-Metallic Standard এবং আরবিতে 'نظام المعدنين' বলা হয়।
তারপর এমন এক যুগ আসে, মানুষ স্বর্ণ রুপার মুদ্রা মহাজনদের নিকট আমানত রেখে দিত। আর মহাজন আমানতের দলিল হিসেবে রসিদ লেখে দিত। প্রয়োজনের মুহূর্তে সে রসিদ দেখিয়ে মহাজন থেকে তার স্বর্ণ ফেরত নিয়ে নিত। তারপর আস্তে আস্তে লোকেরা মহাজনের দেয়া রসিদ দিয়ে পণ্য ক্রয় শুরু করে দিল। অর্থাৎ ক্রেতা আগে মহাজন থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করে বিক্রেতাকে দেয়া এবং বিক্রেতা স্বর্ণ নিয়ে পুনরায় মহাজনের কাছে রাখার পরিবর্তে ক্রেতা বিক্রেতাকে স্বর্ণের রসিদ প্রদান করত। যার অর্থ দাঁড়াত, রসিদের স্বর্ণ বিক্রেতার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এভাবে রসিদের মাধ্যমে লেনদেন শুরু হয়ে যায় এবং মহাজনদের থেকে স্বর্ণ ফেরত আনার অবকাশ কমতে থাকে। মহাজনরা যখন দেখল, মানুষ সচরাচর স্বর্ণ ফেরত নিতে আসে না, তখন তারা মানুষের গচ্ছিত রাখা স্বর্ণ অন্যকে ঋণ দিতে আরম্ভ করল। এভাবে নোট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয়। অর্থাৎ মহাজনদের জারিকৃত রসিদ হয়ে গেল নোট।
ব্যাংকিংয়ের আলোচনার সময় এ বিষয়েও আলোচনা করা হবে। পূর্বে প্রত্যেক ব্যক্তি নোট প্রচলন করতে পারত। কিন্তু সে সময় বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) ছিল না। শুধু মানুষের পারস্পরিক ব্যবহারের কারণে গ্রহণযোগ্য ছিল। এ গ্রহণযোগ্যতা ও সহজসাধ্যতার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে নোটকে বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) স্থির করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির বিহিত মুদ্রার মানসম্পন্ন নোট প্রচলন করার অনুমতি ছিল না। সরকারের অনুমোদিত (Authorised) প্রতিষ্ঠানই (ব্যাংক) তা প্রবর্তন করতে পারত। আগে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকও নোট প্রবর্তন করতে পারত। পরে এ অধিকার শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়।
নোট (Legal Tender) হওয়ার পর তার উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে। এক যুগ এমন ছিল যখন নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ থাকত। যত স্বর্ণ থাকত আইনগতভাবে তত নোট জারি করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ ব্যবস্থাকে স্বর্ণপিণ্ড মান, আরবিতে 'قاعدة سبائك الذهب এবং ইংরেজিতে Gold Bullion Standard বলে। তারপর যখন দেখা গেল স্বর্ণ নেয়ার জন্য মানুষ খুব কম আসে, তখন নোটের বিপরীতে স্বর্ণের হার কমিয়ে দেয়া হল। এতে আনুপাতিক হার পরিবর্তিত হতে অর্থাৎ নোটের বিপরীতে রাখা স্বর্ণের শতকরা হার কমতে থাকে। যে নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ না থাকে তাকে 'نقود الثقة' বা Fiduciary Money বলে। তারপর স্বর্ণের হার কমতে কমতে শূন্যের কোটায় ঠেকে। অন্তত দেশীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে নোটের বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ থাকা জরুরি থাকে নি। এমন নোটকে প্রতীক মুদ্রা "النقود الرمزية" (Token Money) বলে। এ মুদ্রার আইনসম্মত মূল্য প্রকৃত মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন একশ টাকার নোটের আইনসম্মত মূল্য একশ টাকা, কিন্তু তার নিজস্ব মূল্য কিছুই নয়। কিছুকাল ধরে 'النقود الرمزية -এর প্রচলন এত ব্যাপক ছিল যে, বেশির ভাগ দেশ তার নোটগুলোকে ডলারের সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছিল, যেন তাদের নোটের বিপরীতে ডলার ছিল। আর যেহেতু আমেরিকা ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ দেয়ার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, এ কারণে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ ছিল। এভাবে অন্য দেশের নোটও পরোক্ষভাবে স্বর্ণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমেরিকাও স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পৃক্ততা শেষ করে দেয়। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে। এভাবে এখন আর কোনো নোটের বিপরীতে কোনো স্বর্ণ রুপা নেই। এখন নোট শুধু একটা পারিভাষিক মূল্য, যা কেবল ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে।
টিকাঃ
৩. বিভিন্ন গ্রন্থে এ কথাই লেখা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস একথার সমর্থন দেয় না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এমন কোনো যুগ পাওয়া যায় না যেখানে মুদ্রা বা অর্থ হিসেবে কোনো বস্তু প্রচলিত ছিল না।
প্রাচীনকালে মানুষের মধ্যে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির প্রথা চালু ছিল, যাকে বিনিময়, 'مقايضة' বা Barter বলা হয়,³ কিন্তু তাতে কতগুলো সমস্যা ছিল। যেমন পণ্য স্থানান্তর বা পরিবহন ছিল একটা বড় সমস্যা। এ পদ্ধতিতে একই স্থানে যোগান ও চাহিদার সম্মিলন কম হত। যেমন এক ব্যক্তি গম দিয়ে কাপড় কিনতে চায়, কিন্তু কাপড়ওয়ালা গম নিতে আগ্রহী নয়। পণ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে বিভক্ত করে তা কারবারের ভিত্তি বানানো ছিল কঠিন। 'مقايضة' (Barter)-এর পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তুকেই অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন গম যব চামড়া ইত্যাদি। এরপর স্বর্ণ ও রুপা অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ এটা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ছিল, তা পরিবহন এবং স্থানান্তরও ছিল সহজসাধ্য। প্রাচীন যুগে মুদ্রাঙ্কন ছাড়াই স্বর্ণের পরিমাণের ভিত্তিতে বিনিময় হত। তারপর মুদ্রা প্রস্তুত প্রথার সূচনা হয়। প্রথম দিকে প্রত্যেক ব্যক্তিরই মুদ্রা বানানোর অনুমতি ছিল। সে যুগের ব্যবস্থাকে স্বর্ণমান, আরবিতে ‘قاعدة الذهب’ এবং ইংরেজিতে Gold Standard বলা হয়। এরপর স্বর্ণ ছাড়া রূপার মুদ্রাও তৈরি শুরু হয়। যে মুদ্রা ব্যবস্থায় স্বর্ণ ও রুপা উভয় ধরনের মুদ্রা তৈরি করা হত তাকে দ্বি-ধাতু মান বা Bi-Metallic Standard এবং আরবিতে 'نظام المعدنين' বলা হয়।
তারপর এমন এক যুগ আসে, মানুষ স্বর্ণ রুপার মুদ্রা মহাজনদের নিকট আমানত রেখে দিত। আর মহাজন আমানতের দলিল হিসেবে রসিদ লেখে দিত। প্রয়োজনের মুহূর্তে সে রসিদ দেখিয়ে মহাজন থেকে তার স্বর্ণ ফেরত নিয়ে নিত। তারপর আস্তে আস্তে লোকেরা মহাজনের দেয়া রসিদ দিয়ে পণ্য ক্রয় শুরু করে দিল। অর্থাৎ ক্রেতা আগে মহাজন থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করে বিক্রেতাকে দেয়া এবং বিক্রেতা স্বর্ণ নিয়ে পুনরায় মহাজনের কাছে রাখার পরিবর্তে ক্রেতা বিক্রেতাকে স্বর্ণের রসিদ প্রদান করত। যার অর্থ দাঁড়াত, রসিদের স্বর্ণ বিক্রেতার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এভাবে রসিদের মাধ্যমে লেনদেন শুরু হয়ে যায় এবং মহাজনদের থেকে স্বর্ণ ফেরত আনার অবকাশ কমতে থাকে। মহাজনরা যখন দেখল, মানুষ সচরাচর স্বর্ণ ফেরত নিতে আসে না, তখন তারা মানুষের গচ্ছিত রাখা স্বর্ণ অন্যকে ঋণ দিতে আরম্ভ করল। এভাবে নোট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয়। অর্থাৎ মহাজনদের জারিকৃত রসিদ হয়ে গেল নোট।
ব্যাংকিংয়ের আলোচনার সময় এ বিষয়েও আলোচনা করা হবে। পূর্বে প্রত্যেক ব্যক্তি নোট প্রচলন করতে পারত। কিন্তু সে সময় বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) ছিল না। শুধু মানুষের পারস্পরিক ব্যবহারের কারণে গ্রহণযোগ্য ছিল। এ গ্রহণযোগ্যতা ও সহজসাধ্যতার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে নোটকে বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) স্থির করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির বিহিত মুদ্রার মানসম্পন্ন নোট প্রচলন করার অনুমতি ছিল না। সরকারের অনুমোদিত (Authorised) প্রতিষ্ঠানই (ব্যাংক) তা প্রবর্তন করতে পারত। আগে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকও নোট প্রবর্তন করতে পারত। পরে এ অধিকার শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়।
নোট (Legal Tender) হওয়ার পর তার উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে। এক যুগ এমন ছিল যখন নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ থাকত। যত স্বর্ণ থাকত আইনগতভাবে তত নোট জারি করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ ব্যবস্থাকে স্বর্ণপিণ্ড মান, আরবিতে 'قاعدة سبائك الذهب এবং ইংরেজিতে Gold Bullion Standard বলে। তারপর যখন দেখা গেল স্বর্ণ নেয়ার জন্য মানুষ খুব কম আসে, তখন নোটের বিপরীতে স্বর্ণের হার কমিয়ে দেয়া হল। এতে আনুপাতিক হার পরিবর্তিত হতে অর্থাৎ নোটের বিপরীতে রাখা স্বর্ণের শতকরা হার কমতে থাকে। যে নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ না থাকে তাকে 'نقود الثقة' বা Fiduciary Money বলে। তারপর স্বর্ণের হার কমতে কমতে শূন্যের কোটায় ঠেকে। অন্তত দেশীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে নোটের বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ থাকা জরুরি থাকে নি। এমন নোটকে প্রতীক মুদ্রা "النقود الرمزية" (Token Money) বলে। এ মুদ্রার আইনসম্মত মূল্য প্রকৃত মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন একশ টাকার নোটের আইনসম্মত মূল্য একশ টাকা, কিন্তু তার নিজস্ব মূল্য কিছুই নয়। কিছুকাল ধরে 'النقود الرمزية -এর প্রচলন এত ব্যাপক ছিল যে, বেশির ভাগ দেশ তার নোটগুলোকে ডলারের সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছিল, যেন তাদের নোটের বিপরীতে ডলার ছিল। আর যেহেতু আমেরিকা ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ দেয়ার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, এ কারণে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ ছিল। এভাবে অন্য দেশের নোটও পরোক্ষভাবে স্বর্ণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমেরিকাও স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পৃক্ততা শেষ করে দেয়। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে। এভাবে এখন আর কোনো নোটের বিপরীতে কোনো স্বর্ণ রুপা নেই। এখন নোট শুধু একটা পারিভাষিক মূল্য, যা কেবল ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে।
টিকাঃ
৩. বিভিন্ন গ্রন্থে এ কথাই লেখা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস একথার সমর্থন দেয় না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এমন কোনো যুগ পাওয়া যায় না যেখানে মুদ্রা বা অর্থ হিসেবে কোনো বস্তু প্রচলিত ছিল না।
প্রাচীনকালে মানুষের মধ্যে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির প্রথা চালু ছিল, যাকে বিনিময়, 'مقايضة' বা Barter বলা হয়,³ কিন্তু তাতে কতগুলো সমস্যা ছিল। যেমন পণ্য স্থানান্তর বা পরিবহন ছিল একটা বড় সমস্যা। এ পদ্ধতিতে একই স্থানে যোগান ও চাহিদার সম্মিলন কম হত। যেমন এক ব্যক্তি গম দিয়ে কাপড় কিনতে চায়, কিন্তু কাপড়ওয়ালা গম নিতে আগ্রহী নয়। পণ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে বিভক্ত করে তা কারবারের ভিত্তি বানানো ছিল কঠিন। 'مقايضة' (Barter)-এর পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তুকেই অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন গম যব চামড়া ইত্যাদি। এরপর স্বর্ণ ও রুপা অর্থ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ এটা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ছিল, তা পরিবহন এবং স্থানান্তরও ছিল সহজসাধ্য। প্রাচীন যুগে মুদ্রাঙ্কন ছাড়াই স্বর্ণের পরিমাণের ভিত্তিতে বিনিময় হত। তারপর মুদ্রা প্রস্তুত প্রথার সূচনা হয়। প্রথম দিকে প্রত্যেক ব্যক্তিরই মুদ্রা বানানোর অনুমতি ছিল। সে যুগের ব্যবস্থাকে স্বর্ণমান, আরবিতে ‘قاعدة الذهب’ এবং ইংরেজিতে Gold Standard বলা হয়। এরপর স্বর্ণ ছাড়া রূপার মুদ্রাও তৈরি শুরু হয়। যে মুদ্রা ব্যবস্থায় স্বর্ণ ও রুপা উভয় ধরনের মুদ্রা তৈরি করা হত তাকে দ্বি-ধাতু মান বা Bi-Metallic Standard এবং আরবিতে 'نظام المعدنين' বলা হয়।
তারপর এমন এক যুগ আসে, মানুষ স্বর্ণ রুপার মুদ্রা মহাজনদের নিকট আমানত রেখে দিত। আর মহাজন আমানতের দলিল হিসেবে রসিদ লেখে দিত। প্রয়োজনের মুহূর্তে সে রসিদ দেখিয়ে মহাজন থেকে তার স্বর্ণ ফেরত নিয়ে নিত। তারপর আস্তে আস্তে লোকেরা মহাজনের দেয়া রসিদ দিয়ে পণ্য ক্রয় শুরু করে দিল। অর্থাৎ ক্রেতা আগে মহাজন থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করে বিক্রেতাকে দেয়া এবং বিক্রেতা স্বর্ণ নিয়ে পুনরায় মহাজনের কাছে রাখার পরিবর্তে ক্রেতা বিক্রেতাকে স্বর্ণের রসিদ প্রদান করত। যার অর্থ দাঁড়াত, রসিদের স্বর্ণ বিক্রেতার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এভাবে রসিদের মাধ্যমে লেনদেন শুরু হয়ে যায় এবং মহাজনদের থেকে স্বর্ণ ফেরত আনার অবকাশ কমতে থাকে। মহাজনরা যখন দেখল, মানুষ সচরাচর স্বর্ণ ফেরত নিতে আসে না, তখন তারা মানুষের গচ্ছিত রাখা স্বর্ণ অন্যকে ঋণ দিতে আরম্ভ করল। এভাবে নোট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয়। অর্থাৎ মহাজনদের জারিকৃত রসিদ হয়ে গেল নোট।
ব্যাংকিংয়ের আলোচনার সময় এ বিষয়েও আলোচনা করা হবে। পূর্বে প্রত্যেক ব্যক্তি নোট প্রচলন করতে পারত। কিন্তু সে সময় বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) ছিল না। শুধু মানুষের পারস্পরিক ব্যবহারের কারণে গ্রহণযোগ্য ছিল। এ গ্রহণযোগ্যতা ও সহজসাধ্যতার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে নোটকে বিহিত মুদ্রা (Legal Tender) স্থির করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির বিহিত মুদ্রার মানসম্পন্ন নোট প্রচলন করার অনুমতি ছিল না। সরকারের অনুমোদিত (Authorised) প্রতিষ্ঠানই (ব্যাংক) তা প্রবর্তন করতে পারত। আগে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকও নোট প্রবর্তন করতে পারত। পরে এ অধিকার শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়।
নোট (Legal Tender) হওয়ার পর তার উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে। এক যুগ এমন ছিল যখন নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ থাকত। যত স্বর্ণ থাকত আইনগতভাবে তত নোট জারি করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এ ব্যবস্থাকে স্বর্ণপিণ্ড মান, আরবিতে 'قاعدة سبائك الذهب এবং ইংরেজিতে Gold Bullion Standard বলে। তারপর যখন দেখা গেল স্বর্ণ নেয়ার জন্য মানুষ খুব কম আসে, তখন নোটের বিপরীতে স্বর্ণের হার কমিয়ে দেয়া হল। এতে আনুপাতিক হার পরিবর্তিত হতে অর্থাৎ নোটের বিপরীতে রাখা স্বর্ণের শতকরা হার কমতে থাকে। যে নোটের বিপরীতে শতভাগ স্বর্ণ না থাকে তাকে 'نقود الثقة' বা Fiduciary Money বলে। তারপর স্বর্ণের হার কমতে কমতে শূন্যের কোটায় ঠেকে। অন্তত দেশীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে নোটের বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ থাকা জরুরি থাকে নি। এমন নোটকে প্রতীক মুদ্রা "النقود الرمزية" (Token Money) বলে। এ মুদ্রার আইনসম্মত মূল্য প্রকৃত মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন একশ টাকার নোটের আইনসম্মত মূল্য একশ টাকা, কিন্তু তার নিজস্ব মূল্য কিছুই নয়। কিছুকাল ধরে 'النقود الرمزية -এর প্রচলন এত ব্যাপক ছিল যে, বেশির ভাগ দেশ তার নোটগুলোকে ডলারের সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছিল, যেন তাদের নোটের বিপরীতে ডলার ছিল। আর যেহেতু আমেরিকা ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ দেয়ার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, এ কারণে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ ছিল। এভাবে অন্য দেশের নোটও পরোক্ষভাবে স্বর্ণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমেরিকাও স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পৃক্ততা শেষ করে দেয়। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে। এভাবে এখন আর কোনো নোটের বিপরীতে কোনো স্বর্ণ রুপা নেই। এখন নোট শুধু একটা পারিভাষিক মূল্য, যা কেবল ক্রয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে।
টিকাঃ
৩. বিভিন্ন গ্রন্থে এ কথাই লেখা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস একথার সমর্থন দেয় না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এমন কোনো যুগ পাওয়া যায় না যেখানে মুদ্রা বা অর্থ হিসেবে কোনো বস্তু প্রচলিত ছিল না।
📄 বিনিময় হার নির্ধারণ
বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পরস্পর বিনিময় হার কিভাবে নির্ধারিত হয়? এরও বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ১৮৮০ খৃস্টাব্দ থেকে ১৯১৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। যদিও এ সময়কালের পূর্বেও স্বর্ণমান ব্যবস্থা চালু ছিল, কিন্তু এ যুগে যেমন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু ছিল, তেমনটি আগে ছিল না।
স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রত্যেক দেশের কারেন্সি স্বর্ণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের প্রতিনিধিত্ব করত। যেমন ইংল্যান্ড স্থির করেছিল, এক পাউন্ডের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। আমেরিকাও স্থির করেছিল, আমেরিকান ডলারের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। যখন এ স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তখন দুদেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হত মুদ্রার বিপরীতে বিদ্যমান স্বর্ণের পরিমাণের আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ দেখা হত, প্রত্যেক দেশের মুদ্রার বিপরীতে কী পরিমাণ স্বর্ণ আছে। দুদেশের মুদ্রার বিপরীতে প্রাপ্ত স্বর্ণের পরিমাণের মধ্যে যে অনুপাত হত, সেই আনুপাতিক হারে কারেন্সির বিনিময় হত। যেমন ইংল্যান্ডের পাউন্ডের বিপরীতে যদি চার তোলা স্বর্ণ থাকে আর আমেরিকান ডলারের বিপরীতে দু তোলা স্বর্ণ থাকে, তাহলে পাউন্ড ও ডলারের মধ্যে অনুপাত হল ১:২। সুতরাং এক পাউন্ডে দুই ডলার বিনিময় হবে।
এরপর ক্রমান্বয়ে স্বর্ণমান ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায়। তারপর বিনিময় হার নির্ধারণের কোন্ পদ্ধতি চালু হয়? এটা বুঝার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দরকার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৯৩০ সালে বিশ্ববাজার মন্দা হয়ে পড়ে এবং সব দেশ নোটের উপর স্বর্ণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিকভাবে پঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু আমেরিকা ছিল অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ ছিল। ১৯৪৪ সালে আমেরিকার সহযোগিতায় ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি দেশের এক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকার ব্রেটন উডস (Bretton Woods) শহরে। এ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় ছিল কিভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাঙ্গা করা যায়, কি করে পুঁজি বিনিয়োগ (Investment) উৎসাহিত করা যায়, কিভাবে নতুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়, যার মধ্যে স্বর্ণমান ব্যবস্থার দোষ-ত্রুটিগুলো থাকবে না। এ সম্মেলন তিনটি প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং একটি নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। আগে এ তিন প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল, তারপর নীতিমালা সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পরস্পর বিনিময় হার কিভাবে নির্ধারিত হয়? এরও বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ১৮৮০ খৃস্টাব্দ থেকে ১৯১৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। যদিও এ সময়কালের পূর্বেও স্বর্ণমান ব্যবস্থা চালু ছিল, কিন্তু এ যুগে যেমন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু ছিল, তেমনটি আগে ছিল না।
স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রত্যেক দেশের কারেন্সি স্বর্ণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের প্রতিনিধিত্ব করত। যেমন ইংল্যান্ড স্থির করেছিল, এক পাউন্ডের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। আমেরিকাও স্থির করেছিল, আমেরিকান ডলারের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। যখন এ স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তখন দুদেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হত মুদ্রার বিপরীতে বিদ্যমান স্বর্ণের পরিমাণের আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ দেখা হত, প্রত্যেক দেশের মুদ্রার বিপরীতে কী পরিমাণ স্বর্ণ আছে। দুদেশের মুদ্রার বিপরীতে প্রাপ্ত স্বর্ণের পরিমাণের মধ্যে যে অনুপাত হত, সেই আনুপাতিক হারে কারেন্সির বিনিময় হত। যেমন ইংল্যান্ডের পাউন্ডের বিপরীতে যদি চার তোলা স্বর্ণ থাকে আর আমেরিকান ডলারের বিপরীতে দু তোলা স্বর্ণ থাকে, তাহলে পাউন্ড ও ডলারের মধ্যে অনুপাত হল ১:২। সুতরাং এক পাউন্ডে দুই ডলার বিনিময় হবে।
এরপর ক্রমান্বয়ে স্বর্ণমান ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায়। তারপর বিনিময় হার নির্ধারণের কোন্ পদ্ধতি চালু হয়? এটা বুঝার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দরকার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৯৩০ সালে বিশ্ববাজার মন্দা হয়ে পড়ে এবং সব দেশ নোটের উপর স্বর্ণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিকভাবে پঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু আমেরিকা ছিল অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ ছিল। ১৯৪৪ সালে আমেরিকার সহযোগিতায় ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি দেশের এক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকার ব্রেটন উডস (Bretton Woods) শহরে। এ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় ছিল কিভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাঙ্গা করা যায়, কি করে পুঁজি বিনিয়োগ (Investment) উৎসাহিত করা যায়, কিভাবে নতুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়, যার মধ্যে স্বর্ণমান ব্যবস্থার দোষ-ত্রুটিগুলো থাকবে না। এ সম্মেলন তিনটি প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং একটি নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। আগে এ তিন প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল, তারপর নীতিমালা সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পরস্পর বিনিময় হার কিভাবে নির্ধারিত হয়? এরও বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ১৮৮০ খৃস্টাব্দ থেকে ১৯১৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। যদিও এ সময়কালের পূর্বেও স্বর্ণমান ব্যবস্থা চালু ছিল, কিন্তু এ যুগে যেমন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু ছিল, তেমনটি আগে ছিল না।
স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রত্যেক দেশের কারেন্সি স্বর্ণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের প্রতিনিধিত্ব করত। যেমন ইংল্যান্ড স্থির করেছিল, এক পাউন্ডের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। আমেরিকাও স্থির করেছিল, আমেরিকান ডলারের বিপরীতে এ পরিমাণ স্বর্ণ থাকবে। যখন এ স্বর্ণমান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তখন দুদেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হত মুদ্রার বিপরীতে বিদ্যমান স্বর্ণের পরিমাণের আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ দেখা হত, প্রত্যেক দেশের মুদ্রার বিপরীতে কী পরিমাণ স্বর্ণ আছে। দুদেশের মুদ্রার বিপরীতে প্রাপ্ত স্বর্ণের পরিমাণের মধ্যে যে অনুপাত হত, সেই আনুপাতিক হারে কারেন্সির বিনিময় হত। যেমন ইংল্যান্ডের পাউন্ডের বিপরীতে যদি চার তোলা স্বর্ণ থাকে আর আমেরিকান ডলারের বিপরীতে দু তোলা স্বর্ণ থাকে, তাহলে পাউন্ড ও ডলারের মধ্যে অনুপাত হল ১:২। সুতরাং এক পাউন্ডে দুই ডলার বিনিময় হবে।
এরপর ক্রমান্বয়ে স্বর্ণমান ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায়। তারপর বিনিময় হার নির্ধারণের কোন্ পদ্ধতি চালু হয়? এটা বুঝার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দরকার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৯৩০ সালে বিশ্ববাজার মন্দা হয়ে পড়ে এবং সব দেশ নোটের উপর স্বর্ণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিকভাবে پঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু আমেরিকা ছিল অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ ছিল। ১৯৪৪ সালে আমেরিকার সহযোগিতায় ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি দেশের এক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকার ব্রেটন উডস (Bretton Woods) শহরে। এ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় ছিল কিভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাঙ্গা করা যায়, কি করে পুঁজি বিনিয়োগ (Investment) উৎসাহিত করা যায়, কিভাবে নতুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়, যার মধ্যে স্বর্ণমান ব্যবস্থার দোষ-ত্রুটিগুলো থাকবে না। এ সম্মেলন তিনটি প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং একটি নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। আগে এ তিন প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল, তারপর নীতিমালা সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
📄 ব্রেটন উডস সম্মেলনের তিন সংস্থা
১. এ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে প্রথম প্রতিষ্ঠান হল 'আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা' (International Trade Organization), একে আরবিতে বলা হয় 'منظمة التجارة الدولية'। এর প্রেক্ষাপট হল, ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ নীতি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল যে, প্রত্যেক দেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য স্বর্ণ বৃদ্ধি করবে, রপ্তানি উৎসাহিত এবং আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, এ নীতিকে বলা হয় মার্কেন্টালিজম (Mercantilism) এবং আরবিতে বলা হয় 'مذهب التجاريين', কিন্তু এ নীতি সফল হয় নি, পরে তার স্থলে এ নীতি গৃহীত হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে হবে এবং আমদানির উপর এমন বিধি-নিষেধ আরোপ করা যাবে না যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধার সৃষ্টি করে। এ নীতির প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনে উল্লিখিত সংস্থাটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টিকারী প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ব্যবস্থা করবে, কিন্তু আমেরিকা ছিল এ সংস্থা গঠনের বিরোধী। কারণ, আমেরিকা একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত হয় তাহলে ইউরোপের পণ্য কম দামে আমেরিকায় প্রবেশ করবে, আর কৃষক কৃষি ছেড়ে ব্যবসার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। এতে আমেরিকার কৃষি পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ সংস্থা গঠন দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বিরোধের নিমিত্ত হয়ে ছিল। অন্যান্য দেশ এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছিল আর আমেরিকা তা অস্বীকার করে আসছিল। শেষে ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মাঝে সমঝোতা হয়, ফলে আরো একটি সংস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। তার নাম দেয়া হয় জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ এন্ড ট্রেড (General Agreement on Tariff and Trade)। যার অর্থ বাংলায় 'শুল্ক বাণিজ্য চুক্তি' বলা যায়। এ সংস্থাকে সংক্ষেপে (GATT) গ্যাট বলা হয়, আর আরবিতে 'الاتفاقية العامة للتصرفات الجمركية والتجارة ' বলা হয়।
কৃষি পণ্যকে এ চুক্তির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। কৃষিপণ্য ব্যতীত অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত করার জন্য নিম্নোক্ত মূলনীতি গৃহীত হয় :
১. যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো বিধি-নিষেধ বা প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে অন্যান্য দেশ সে বাধা দূর করানোর জন্য 'গ্যাটের' মাধ্যমে দাবি তুলতে পারবে। আর যে দেশ 'গ্যাটের' সদস্য তার উপর 'গ্যাটের' সিদ্ধান্ত কার্যকর করা অত্যাবশ্যক হবে। ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা দুধরনের হয়ে থাকে- ১. শুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। কোনো দেশ কোনো দেশের শিল্পদ্রব্যের উপর অধিক শুল্ক আরোপ করে। যার কারণে রপ্তানিকারী দেশের পণ্যের মূল্য আমদানীকারক দেশে বৃদ্ধি পায় এবং তার কেনাবেচা কম হয়। ২. অশুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। শুল্ক ছাড়া অন্য কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় যার কারণে বিদেশী পণ্য আমদানি করা মানুষ ঝামেলা মনে করে। যেমন ফ্রান্স জাপানের ভি সি আর আমদানির উপর শর্তারোপ করেছিল, এটি কেবল অমুক ক্ষুদ্র বন্দর দিয়েই প্রবেশ করতে পারবে।
২. দ্বিতীয় মূলনীতি গৃহীত হয়েছিল, কোনো দেশ কোনো দেশের সাথে ব্যতিক্রমী আচরণ করতে পারবে না। কোনো দেশ যদি কোনো দেশের সাথে উত্তম পন্থায় আর অন্য দেশের সাথে অসুবিধাজনক পন্থায় ব্যবসা করে তাহলে এ দেশ তার বিরুদ্ধে 'গ্যাটে' অভিযোগ করতে পারবে।
৩. কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা যাবে না। যদি কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে সে দেশ ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপকারী দেশের বিরুদ্ধে গ্যাটে অভিযোগ তুলতে পারবে।
৪. দরিদ্র দেশের বৈদেশিক পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের অনুমতি থাকবে। কারণ, দরিদ্র দেশও যদি শুল্ক কম ধরে তাহলে বৈদেশিক পণ্য সস্তায় পাওয়া যাবে। ফলে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর চাহিদা কমে গিয়ে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৫. দু দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে 'গ্যাটের' মাধ্যমে পরস্পরে সমঝোতা করে তা দূর করতে হবে।
১. এ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে প্রথম প্রতিষ্ঠান হল 'আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা' (International Trade Organization), একে আরবিতে বলা হয় 'منظمة التجارة الدولية'। এর প্রেক্ষাপট হল, ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ নীতি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল যে, প্রত্যেক দেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য স্বর্ণ বৃদ্ধি করবে, রপ্তানি উৎসাহিত এবং আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, এ নীতিকে বলা হয় মার্কেন্টালিজম (Mercantilism) এবং আরবিতে বলা হয় 'مذهب التجاريين', কিন্তু এ নীতি সফল হয় নি, পরে তার স্থলে এ নীতি গৃহীত হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে হবে এবং আমদানির উপর এমন বিধি-নিষেধ আরোপ করা যাবে না যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধার সৃষ্টি করে। এ নীতির প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনে উল্লিখিত সংস্থাটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টিকারী প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ব্যবস্থা করবে, কিন্তু আমেরিকা ছিল এ সংস্থা গঠনের বিরোধী। কারণ, আমেরিকা একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত হয় তাহলে ইউরোপের পণ্য কম দামে আমেরিকায় প্রবেশ করবে, আর কৃষক কৃষি ছেড়ে ব্যবসার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। এতে আমেরিকার কৃষি পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ সংস্থা গঠন দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বিরোধের নিমিত্ত হয়ে ছিল। অন্যান্য দেশ এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছিল আর আমেরিকা তা অস্বীকার করে আসছিল। শেষে ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মাঝে সমঝোতা হয়, ফলে আরো একটি সংস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। তার নাম দেয়া হয় জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ এন্ড ট্রেড (General Agreement on Tariff and Trade)। যার অর্থ বাংলায় 'শুল্ক বাণিজ্য চুক্তি' বলা যায়। এ সংস্থাকে সংক্ষেপে (GATT) গ্যাট বলা হয়, আর আরবিতে 'الاتفاقية العامة للتصرفات الجمركية والتجارة ' বলা হয়।
কৃষি পণ্যকে এ চুক্তির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। কৃষিপণ্য ব্যতীত অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত করার জন্য নিম্নোক্ত মূলনীতি গৃহীত হয় :
১. যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো বিধি-নিষেধ বা প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে অন্যান্য দেশ সে বাধা দূর করানোর জন্য 'গ্যাটের' মাধ্যমে দাবি তুলতে পারবে। আর যে দেশ 'গ্যাটের' সদস্য তার উপর 'গ্যাটের' সিদ্ধান্ত কার্যকর করা অত্যাবশ্যক হবে। ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা দুধরনের হয়ে থাকে- ১. শুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। কোনো দেশ কোনো দেশের শিল্পদ্রব্যের উপর অধিক শুল্ক আরোপ করে। যার কারণে রপ্তানিকারী দেশের পণ্যের মূল্য আমদানীকারক দেশে বৃদ্ধি পায় এবং তার কেনাবেচা কম হয়। ২. অশুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। শুল্ক ছাড়া অন্য কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় যার কারণে বিদেশী পণ্য আমদানি করা মানুষ ঝামেলা মনে করে। যেমন ফ্রান্স জাপানের ভি সি আর আমদানির উপর শর্তারোপ করেছিল, এটি কেবল অমুক ক্ষুদ্র বন্দর দিয়েই প্রবেশ করতে পারবে।
২. দ্বিতীয় মূলনীতি গৃহীত হয়েছিল, কোনো দেশ কোনো দেশের সাথে ব্যতিক্রমী আচরণ করতে পারবে না। কোনো দেশ যদি কোনো দেশের সাথে উত্তম পন্থায় আর অন্য দেশের সাথে অসুবিধাজনক পন্থায় ব্যবসা করে তাহলে এ দেশ তার বিরুদ্ধে 'গ্যাটে' অভিযোগ করতে পারবে।
৩. কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা যাবে না। যদি কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে সে দেশ ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপকারী দেশের বিরুদ্ধে গ্যাটে অভিযোগ তুলতে পারবে।
৪. দরিদ্র দেশের বৈদেশিক পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের অনুমতি থাকবে। কারণ, দরিদ্র দেশও যদি শুল্ক কম ধরে তাহলে বৈদেশিক পণ্য সস্তায় পাওয়া যাবে। ফলে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর চাহিদা কমে গিয়ে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৫. দু দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে 'গ্যাটের' মাধ্যমে পরস্পরে সমঝোতা করে তা দূর করতে হবে।
১. এ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে প্রথম প্রতিষ্ঠান হল 'আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা' (International Trade Organization), একে আরবিতে বলা হয় 'منظمة التجارة الدولية'। এর প্রেক্ষাপট হল, ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ নীতি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল যে, প্রত্যেক দেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য স্বর্ণ বৃদ্ধি করবে, রপ্তানি উৎসাহিত এবং আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, এ নীতিকে বলা হয় মার্কেন্টালিজম (Mercantilism) এবং আরবিতে বলা হয় 'مذهب التجاريين', কিন্তু এ নীতি সফল হয় নি, পরে তার স্থলে এ নীতি গৃহীত হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে হবে এবং আমদানির উপর এমন বিধি-নিষেধ আরোপ করা যাবে না যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধার সৃষ্টি করে। এ নীতির প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনে উল্লিখিত সংস্থাটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টিকারী প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ব্যবস্থা করবে, কিন্তু আমেরিকা ছিল এ সংস্থা গঠনের বিরোধী। কারণ, আমেরিকা একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত হয় তাহলে ইউরোপের পণ্য কম দামে আমেরিকায় প্রবেশ করবে, আর কৃষক কৃষি ছেড়ে ব্যবসার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। এতে আমেরিকার কৃষি পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ সংস্থা গঠন দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বিরোধের নিমিত্ত হয়ে ছিল। অন্যান্য দেশ এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছিল আর আমেরিকা তা অস্বীকার করে আসছিল। শেষে ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের মাঝে সমঝোতা হয়, ফলে আরো একটি সংস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। তার নাম দেয়া হয় জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ এন্ড ট্রেড (General Agreement on Tariff and Trade)। যার অর্থ বাংলায় 'শুল্ক বাণিজ্য চুক্তি' বলা যায়। এ সংস্থাকে সংক্ষেপে (GATT) গ্যাট বলা হয়, আর আরবিতে 'الاتفاقية العامة للتصرفات الجمركية والتجارة ' বলা হয়।
কৃষি পণ্যকে এ চুক্তির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। কৃষিপণ্য ব্যতীত অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উৎসাহিত করার জন্য নিম্নোক্ত মূলনীতি গৃহীত হয় :
১. যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো বিধি-নিষেধ বা প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে অন্যান্য দেশ সে বাধা দূর করানোর জন্য 'গ্যাটের' মাধ্যমে দাবি তুলতে পারবে। আর যে দেশ 'গ্যাটের' সদস্য তার উপর 'গ্যাটের' সিদ্ধান্ত কার্যকর করা অত্যাবশ্যক হবে। ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা দুধরনের হয়ে থাকে- ১. শুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। কোনো দেশ কোনো দেশের শিল্পদ্রব্যের উপর অধিক শুল্ক আরোপ করে। যার কারণে রপ্তানিকারী দেশের পণ্যের মূল্য আমদানীকারক দেশে বৃদ্ধি পায় এবং তার কেনাবেচা কম হয়। ২. অশুল্ক-প্রতিবন্ধকতা। শুল্ক ছাড়া অন্য কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় যার কারণে বিদেশী পণ্য আমদানি করা মানুষ ঝামেলা মনে করে। যেমন ফ্রান্স জাপানের ভি সি আর আমদানির উপর শর্তারোপ করেছিল, এটি কেবল অমুক ক্ষুদ্র বন্দর দিয়েই প্রবেশ করতে পারবে।
২. দ্বিতীয় মূলনীতি গৃহীত হয়েছিল, কোনো দেশ কোনো দেশের সাথে ব্যতিক্রমী আচরণ করতে পারবে না। কোনো দেশ যদি কোনো দেশের সাথে উত্তম পন্থায় আর অন্য দেশের সাথে অসুবিধাজনক পন্থায় ব্যবসা করে তাহলে এ দেশ তার বিরুদ্ধে 'গ্যাটে' অভিযোগ করতে পারবে।
৩. কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা যাবে না। যদি কোনো দেশের পণ্যের উপর ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে সে দেশ ব্যতিক্রমী শুল্ক আরোপকারী দেশের বিরুদ্ধে গ্যাটে অভিযোগ তুলতে পারবে।
৪. দরিদ্র দেশের বৈদেশিক পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের অনুমতি থাকবে। কারণ, দরিদ্র দেশও যদি শুল্ক কম ধরে তাহলে বৈদেশিক পণ্য সস্তায় পাওয়া যাবে। ফলে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর চাহিদা কমে গিয়ে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৫. দু দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে 'গ্যাটের' মাধ্যমে পরস্পরে সমঝোতা করে তা দূর করতে হবে।
📄 আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল
ব্রেটন উডস সম্মেলনে দ্বিতীয় যে সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল সেটি হল 'আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল'। যাকে আরবিতে صندوق النقد الدولى এবং ইংরেজিতে International Monetary Fund বলা হয়। সহজের জন্য একে আই এম এফ (I.M.F) বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৪ সালে এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৪৮ সালে এটি অস্তিত্ব লাভ করে।¹
একটি দেশে যেমনিভাবে কতগুলো ব্যাংকের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সেন্ট্রাল ব্যাংক) থাকে, তেমনিভাবে কতগুলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেন্ট্রাল ব্যাংক হচ্ছে এ সংস্থা। এটা যেন সমগ্র বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সাময়িক দেনা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন দেশকে স্বল্পমেয়াদী ঋণ প্রদান করে। কখনো কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবসায়ের দেনা পরিশোধের জন্য সাময়িকভাবে তার কাছে নগদ অর্থ থাকে না। এ অবস্থায় এ সংস্থা ঋণ সরবরাহ করে।.
এ সংস্থায় প্রত্যেক দেশের জন্য একটা 'কোটা' (Quota) থাকে। এ কোটা নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সে দেশের বাণিজ্যের অনুপাত হিসেবে। যেমন কোনো দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একশ কোটি ডলারের আর কোনো দেশের বাণিজ্য পাঁচ কোটি ডলারের। তাহলে সে দেশ শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা পাবে। এ কোটার হার কম বেশিও হতে থাকে। তারপর এ কোটার অর্থ ডলারে ব্যক্ত করা হয়। অর্থাৎ যে দেশের কোটা শতকরা পাঁচ ভাগ তার ব্যাপারে নির্ধারিত হয়, এর অর্থ এত ডলার।
প্রত্যেক দেশ তার কোটার পঁচিশ ভাগ স্বর্ণ এবং পঁচাত্তর ভাগ দেশীয় মুদ্রার মাধ্যমে সংস্থার কাছে জমা করে। এভাবে আই এম এফ-এর কাছে কিছু স্বর্ণ এবং বিভিন্ন দেশের কারেন্সি জমা হয়। প্রত্যেক দেশই আই এম এফ-এ ফান্ড জমা দেয়ার পর সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের অধিকার লাভ করে। একে Drawing Rights আরবিতে ‘حقوق السحب' বলে। জমাকৃত অর্থের আনুপাতিক হারে ঋণ লাভের অধিকার অর্জিত হয়। যেমন প্রত্যেক দেশ তার জমাকৃত অর্থের পাঁচ গুণ ঋণ নিতে পারবে। আবার এ হার পরিবর্তনও হতে থাকে। তারপর Drawing Rights-এর উপর যে ঋণ পাওয়া যায় তাকে কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়। প্রত্যেক অংশকে ট্রান্স (Tranche)² বলে। প্রথম ট্রান্স হয় ঐ ঋণের শতকরা পঁচিশ ভাগ যা কোনো দেশ গ্রহণের অধিকার পায়। এ ট্রান্সের উপর ঋণ কোনো শর্ত ছাড়াই পাওয়া যায় এবং সুদও কম হয়। এ ট্রান্সকে গোল্ড ট্রান্স (Gold Tranche) বলে। তার পরের ট্রান্সগুলোতে ঋণ গ্রহণের জটিলতা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। আই এম এফ ঋণ প্রদানের জন্য বহু শর্ত আরোপ করে। ওসব ট্রান্সে সুদও বাড়তে থাকে এবং ঋণ স্বল্প মেয়াদে পাওয়া যায়। এসব ট্রান্সকে কন্ডিশনালিটি ট্রান্স (Conditionality Tranches) বলে।
এ সংস্থার পলিসি সদস্য দেশের মতামতের মাধ্যমে এবং ভোটের অধিকার দেশের সংখ্যার উপরে নয়; বরং কোটার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। যার কোটা বেশি সে ভোটের অধিকারও বেশি পায়। যার কোটা কম সে ভোটের অধিকারও কম পায়। আই এম এফ-এ আরো একটা একাউন্ট আছে যাকে Special Drawing Rights সংক্ষেপে S.D.R, আরবিতে ‘حقوق السحب الخاصة' বলে। যার খোলাসা কথা হল, সদস্যগণ সিদ্ধান্ত নেয়, এ বছর প্রস্তাবিত ঋণ ছাড়াও অতিরিক্ত আরো এ পরিমাণ ঋণ দেয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ঋণ বিভিন্ন দেশের উপর বণ্টনের অনুপাতও কোটার হার অনুযায়ী হয়।
টিকাঃ
১. এ সংস্থার প্রধান কাজ হচ্ছে মুদ্রার বিনিময় হারের স্থায়িত্ব রক্ষা করা, মুদ্রার বহির্মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসার, এস ডি আর নিয়ন্ত্রণ, সদস্য দেশের সাহায্য ইত্যাদি। প্রত্যেক সদস্য দেশের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এ সংস্থার গভর্নর পর্ষদ (Bord of Governors) গঠিত। গভর্নর পর্যদই আই এম এফের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যের একটি কার্যকরী পরিচালক পর্ষদ (Bord of Executive Directors) আছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চীন ও ভারতের প্রতিনিধিগণ এ পর্ষদের স্থায়ী সদস্য এবং অবশিষ্ট ১২ জন সদস্য গভর্নর পর্ষদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। কার্যকরী পরিচালক پর্ষদের সভাপতি হলেন আই এম এফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (Managing Directors)। আই এম এফের বর্তমান সদস্য দেশের সংখ্যা ১৮৪। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের মে মাসে এ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। এর সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত।
২. এটা ফরাসি শব্দ, অর্থ খণ্ড বা টুকরা।
ব্রেটন উডস সম্মেলনে দ্বিতীয় যে সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল সেটি হল 'আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল'। যাকে আরবিতে صندوق النقد الدولى এবং ইংরেজিতে International Monetary Fund বলা হয়। সহজের জন্য একে আই এম এফ (I.M.F) বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৪ সালে এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৪৮ সালে এটি অস্তিত্ব লাভ করে।¹
একটি দেশে যেমনিভাবে কতগুলো ব্যাংকের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সেন্ট্রাল ব্যাংক) থাকে, তেমনিভাবে কতগুলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেন্ট্রাল ব্যাংক হচ্ছে এ সংস্থা। এটা যেন সমগ্র বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সাময়িক দেনা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন দেশকে স্বল্পমেয়াদী ঋণ প্রদান করে। কখনো কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবসায়ের দেনা পরিশোধের জন্য সাময়িকভাবে তার কাছে নগদ অর্থ থাকে না। এ অবস্থায় এ সংস্থা ঋণ সরবরাহ করে।.
এ সংস্থায় প্রত্যেক দেশের জন্য একটা 'কোটা' (Quota) থাকে। এ কোটা নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সে দেশের বাণিজ্যের অনুপাত হিসেবে। যেমন কোনো দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একশ কোটি ডলারের আর কোনো দেশের বাণিজ্য পাঁচ কোটি ডলারের। তাহলে সে দেশ শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা পাবে। এ কোটার হার কম বেশিও হতে থাকে। তারপর এ কোটার অর্থ ডলারে ব্যক্ত করা হয়। অর্থাৎ যে দেশের কোটা শতকরা পাঁচ ভাগ তার ব্যাপারে নির্ধারিত হয়, এর অর্থ এত ডলার।
প্রত্যেক দেশ তার কোটার পঁচিশ ভাগ স্বর্ণ এবং পঁচাত্তর ভাগ দেশীয় মুদ্রার মাধ্যমে সংস্থার কাছে জমা করে। এভাবে আই এম এফ-এর কাছে কিছু স্বর্ণ এবং বিভিন্ন দেশের কারেন্সি জমা হয়। প্রত্যেক দেশই আই এম এফ-এ ফান্ড জমা দেয়ার পর সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের অধিকার লাভ করে। একে Drawing Rights আরবিতে ‘حقوق السحب' বলে। জমাকৃত অর্থের আনুপাতিক হারে ঋণ লাভের অধিকার অর্জিত হয়। যেমন প্রত্যেক দেশ তার জমাকৃত অর্থের পাঁচ গুণ ঋণ নিতে পারবে। আবার এ হার পরিবর্তনও হতে থাকে। তারপর Drawing Rights-এর উপর যে ঋণ পাওয়া যায় তাকে কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়। প্রত্যেক অংশকে ট্রান্স (Tranche)² বলে। প্রথম ট্রান্স হয় ঐ ঋণের শতকরা পঁচিশ ভাগ যা কোনো দেশ গ্রহণের অধিকার পায়। এ ট্রান্সের উপর ঋণ কোনো শর্ত ছাড়াই পাওয়া যায় এবং সুদও কম হয়। এ ট্রান্সকে গোল্ড ট্রান্স (Gold Tranche) বলে। তার পরের ট্রান্সগুলোতে ঋণ গ্রহণের জটিলতা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। আই এম এফ ঋণ প্রদানের জন্য বহু শর্ত আরোপ করে। ওসব ট্রান্সে সুদও বাড়তে থাকে এবং ঋণ স্বল্প মেয়াদে পাওয়া যায়। এসব ট্রান্সকে কন্ডিশনালিটি ট্রান্স (Conditionality Tranches) বলে।
এ সংস্থার পলিসি সদস্য দেশের মতামতের মাধ্যমে এবং ভোটের অধিকার দেশের সংখ্যার উপরে নয়; বরং কোটার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। যার কোটা বেশি সে ভোটের অধিকারও বেশি পায়। যার কোটা কম সে ভোটের অধিকারও কম পায়। আই এম এফ-এ আরো একটা একাউন্ট আছে যাকে Special Drawing Rights সংক্ষেপে S.D.R, আরবিতে ‘حقوق السحب الخاصة' বলে। যার খোলাসা কথা হল, সদস্যগণ সিদ্ধান্ত নেয়, এ বছর প্রস্তাবিত ঋণ ছাড়াও অতিরিক্ত আরো এ পরিমাণ ঋণ দেয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ঋণ বিভিন্ন দেশের উপর বণ্টনের অনুপাতও কোটার হার অনুযায়ী হয়।
টিকাঃ
১. এ সংস্থার প্রধান কাজ হচ্ছে মুদ্রার বিনিময় হারের স্থায়িত্ব রক্ষা করা, মুদ্রার বহির্মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসার, এস ডি আর নিয়ন্ত্রণ, সদস্য দেশের সাহায্য ইত্যাদি। প্রত্যেক সদস্য দেশের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এ সংস্থার গভর্নর পর্ষদ (Bord of Governors) গঠিত। গভর্নর পর্যদই আই এম এফের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যের একটি কার্যকরী পরিচালক পর্ষদ (Bord of Executive Directors) আছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চীন ও ভারতের প্রতিনিধিগণ এ পর্ষদের স্থায়ী সদস্য এবং অবশিষ্ট ১২ জন সদস্য গভর্নর পর্ষদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। কার্যকরী পরিচালক پর্ষদের সভাপতি হলেন আই এম এফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (Managing Directors)। আই এম এফের বর্তমান সদস্য দেশের সংখ্যা ১৮৪। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের মে মাসে এ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। এর সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত।
২. এটা ফরাসি শব্দ, অর্থ খণ্ড বা টুকরা।
ব্রেটন উডস সম্মেলনে দ্বিতীয় যে সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল সেটি হল 'আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল'। যাকে আরবিতে صندوق النقد الدولى এবং ইংরেজিতে International Monetary Fund বলা হয়। সহজের জন্য একে আই এম এফ (I.M.F) বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৪ সালে এ সংস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৪৮ সালে এটি অস্তিত্ব লাভ করে।¹
একটি দেশে যেমনিভাবে কতগুলো ব্যাংকের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সেন্ট্রাল ব্যাংক) থাকে, তেমনিভাবে কতগুলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেন্ট্রাল ব্যাংক হচ্ছে এ সংস্থা। এটা যেন সমগ্র বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সাময়িক দেনা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন দেশকে স্বল্পমেয়াদী ঋণ প্রদান করে। কখনো কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবসায়ের দেনা পরিশোধের জন্য সাময়িকভাবে তার কাছে নগদ অর্থ থাকে না। এ অবস্থায় এ সংস্থা ঋণ সরবরাহ করে।.
এ সংস্থায় প্রত্যেক দেশের জন্য একটা 'কোটা' (Quota) থাকে। এ কোটা নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সে দেশের বাণিজ্যের অনুপাত হিসেবে। যেমন কোনো দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একশ কোটি ডলারের আর কোনো দেশের বাণিজ্য পাঁচ কোটি ডলারের। তাহলে সে দেশ শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা পাবে। এ কোটার হার কম বেশিও হতে থাকে। তারপর এ কোটার অর্থ ডলারে ব্যক্ত করা হয়। অর্থাৎ যে দেশের কোটা শতকরা পাঁচ ভাগ তার ব্যাপারে নির্ধারিত হয়, এর অর্থ এত ডলার।
প্রত্যেক দেশ তার কোটার পঁচিশ ভাগ স্বর্ণ এবং পঁচাত্তর ভাগ দেশীয় মুদ্রার মাধ্যমে সংস্থার কাছে জমা করে। এভাবে আই এম এফ-এর কাছে কিছু স্বর্ণ এবং বিভিন্ন দেশের কারেন্সি জমা হয়। প্রত্যেক দেশই আই এম এফ-এ ফান্ড জমা দেয়ার পর সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের অধিকার লাভ করে। একে Drawing Rights আরবিতে ‘حقوق السحب' বলে। জমাকৃত অর্থের আনুপাতিক হারে ঋণ লাভের অধিকার অর্জিত হয়। যেমন প্রত্যেক দেশ তার জমাকৃত অর্থের পাঁচ গুণ ঋণ নিতে পারবে। আবার এ হার পরিবর্তনও হতে থাকে। তারপর Drawing Rights-এর উপর যে ঋণ পাওয়া যায় তাকে কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়। প্রত্যেক অংশকে ট্রান্স (Tranche)² বলে। প্রথম ট্রান্স হয় ঐ ঋণের শতকরা পঁচিশ ভাগ যা কোনো দেশ গ্রহণের অধিকার পায়। এ ট্রান্সের উপর ঋণ কোনো শর্ত ছাড়াই পাওয়া যায় এবং সুদও কম হয়। এ ট্রান্সকে গোল্ড ট্রান্স (Gold Tranche) বলে। তার পরের ট্রান্সগুলোতে ঋণ গ্রহণের জটিলতা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। আই এম এফ ঋণ প্রদানের জন্য বহু শর্ত আরোপ করে। ওসব ট্রান্সে সুদও বাড়তে থাকে এবং ঋণ স্বল্প মেয়াদে পাওয়া যায়। এসব ট্রান্সকে কন্ডিশনালিটি ট্রান্স (Conditionality Tranches) বলে।
এ সংস্থার পলিসি সদস্য দেশের মতামতের মাধ্যমে এবং ভোটের অধিকার দেশের সংখ্যার উপরে নয়; বরং কোটার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। যার কোটা বেশি সে ভোটের অধিকারও বেশি পায়। যার কোটা কম সে ভোটের অধিকারও কম পায়। আই এম এফ-এ আরো একটা একাউন্ট আছে যাকে Special Drawing Rights সংক্ষেপে S.D.R, আরবিতে ‘حقوق السحب الخاصة' বলে। যার খোলাসা কথা হল, সদস্যগণ সিদ্ধান্ত নেয়, এ বছর প্রস্তাবিত ঋণ ছাড়াও অতিরিক্ত আরো এ পরিমাণ ঋণ দেয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ঋণ বিভিন্ন দেশের উপর বণ্টনের অনুপাতও কোটার হার অনুযায়ী হয়।
টিকাঃ
১. এ সংস্থার প্রধান কাজ হচ্ছে মুদ্রার বিনিময় হারের স্থায়িত্ব রক্ষা করা, মুদ্রার বহির্মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসার, এস ডি আর নিয়ন্ত্রণ, সদস্য দেশের সাহায্য ইত্যাদি। প্রত্যেক সদস্য দেশের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এ সংস্থার গভর্নর পর্ষদ (Bord of Governors) গঠিত। গভর্নর পর্যদই আই এম এফের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যের একটি কার্যকরী পরিচালক পর্ষদ (Bord of Executive Directors) আছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চীন ও ভারতের প্রতিনিধিগণ এ পর্ষদের স্থায়ী সদস্য এবং অবশিষ্ট ১২ জন সদস্য গভর্নর পর্ষদ কর্তৃক নির্বাচিত হন। কার্যকরী পরিচালক پর্ষদের সভাপতি হলেন আই এম এফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (Managing Directors)। আই এম এফের বর্তমান সদস্য দেশের সংখ্যা ১৮৪। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের মে মাসে এ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। এর সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত।
২. এটা ফরাসি শব্দ, অর্থ খণ্ড বা টুকরা।