📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 শেয়ারের উপর যাকাত

📄 শেয়ারের উপর যাকাত


কোম্পানির শেয়ারের উপর যাকাতের কী হুকুম? এ ব্যাপারে তিনটি বিষয় উল্লেখযোগ্য:
১. কোম্পানি হিসেবে কোম্পানির উপর (যা আইনগত সত্তা) যাকাত ওয়াজিব নয়। এর ভিত্তি হচ্ছে 'خلطة الشيوع' এর মাসআলার উপর। ইমামত্রয় রাহ. এর নিকট 'خلطة الشيوع'-গ্রহণযোগ্য এবং সমষ্টির উপর যাকাত ওয়াজিব হয়। ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, ' خلطة الشيوع'-এর গ্রহণযোগ্যতা কেবল মুক্তভাবে বিচরণকারী পশুর ক্ষেত্রেই নয়; বরং ব্যবসায়িক পণ্যের মধ্যেও আছে। এ কারণে তাঁদের মতে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। যদিও কোম্পানি কোনো মুকাল্লাফ (নির্দেশিত) ব্যক্তি নয় এবং যাকাত একটি ইবাদত, যা মুকাল্লাফের উপর ওয়াজিব হয়, কিন্তু শাফেয়ীদের মূলনীতি হল, যাকাত মানুষের উপর নয়; বরং সম্পদের উপর ওয়াজিব হয়। এ কারণে তাঁদের মতে নবালেগের সম্পদেও যাকাত ওয়াজিব হয়। অথচ সে মুকাল্লাফ নয়। সুতরাং তাঁদের মতে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব, কিন্তু শেয়ার মালিকের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।
কারণ হাদীসে মূলনীতি বর্ণিত আছে: 'لاثني في الاسلام অর্থাৎ এক সম্পদে দুবার যাকাত ওয়াজিব হয় না। হানাফীদের নিকট "خلطة الشيوع" -এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাদের মতে যাকাত ওয়াজিব হবে মানুষের উপর। এ কারণে হানাফীদের মতে আইনগত ব্যক্তিসত্তা হিসেবে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব নয়; বরং শেয়ারমালিকের উপর ওয়াজিব হবে।
২. শেয়ারের যাকাত কোন্ হিসেবে প্রদান করা হবে? এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত শেয়ারের মূল্য তিন রকমের হয়ে থাকে। ক. ফেস ভ্যালু, অর্থাৎ সার্টিফিকেটে লিখিত মূল্য। খ. মার্কেট ভ্যালু অর্থাৎ বাজারমূল্য, যার উপর বাজারে শেয়ার বিক্রি হয়। গ. ব্রেক আপ ভ্যালু (Break Up Value) অর্থাৎ যদি কোম্পানি বিলুপ্ত হয় তাহলে প্রত্যেক শেয়ারের মুকাবেলায় কোম্পানির সম্পত্তির যে অংশ আসবে তাই ব্রেক আপ ভ্যালু। এ তিন ধরনের মূল্যের মধ্য থেকে কোন্ মূল্যের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে? যদি কোনো কোম্পানির ব্রেক আপ ভ্যালু সহজে জানা সম্ভব হয় তাহলে সম্ভবত যাকাতের হিসেবের ভিত্তি হওয়ার জন্য এটাই সর্বাধিক উপযুক্ত, কিন্তু ব্রেক আপ ভ্যালু নির্ধারণ করা খুব কঠিন। আর সাধারণ অংশীদারদের জন্য তো আরো কঠিন। সুতরাং সমকালীন প্রায় সকল আলেম এ বিষয়ে একমত, বাজারমূল্য গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ, নামিক মূল্য যদিও শুরুতে পুঁজি বিনিয়োগের সময় প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু যখন পুঁজি কোম্পানির সম্পত্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যাবে তখন আর ফেস ভ্যালু প্রকৃত অবস্থার খুব কাছাকাছি নয়। কারণ, সম্পত্তির মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি পেতে থাকে। মার্কেট ভ্যালুতে সম্পত্তি ছাড়া অন্য উপাদান প্রভাব ফেললেও সেটা প্রকৃত অবস্থার বেশি কাছাকাছি।
দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় হল, শেয়ার কোম্পানির যাবতীয় সম্পত্তির মধ্যে আনুপাতিক হারে মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে। কোম্পানির কিছু সম্পত্তি হয় যাকাত প্রদানযোগ্য। যেমন নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদি। আবার কিছু যাকাত প্রদানযোগ্য নয়। যেমন বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। শেয়ারের যাকাত আদায় করতে যাকাতযোগ্য ও যাকাত অযোগ্য মালের মধ্যে পার্থক্য করা হবে কিনা? এ ব্যাপারে বর্তমান ফকীহদের দুটি অভিমত রয়েছে। মিসরের শায়খ আবু যুহরা মরহুমের অভিমত হল, শেয়ার নিজে ব্যবসায়ের উপাদান হয়ে গেছে। এ কারণে তার পুরো মার্কেট ভ্যালুর উপর যাকাত দিতে হবে। কী পরিমাণ সম্পত্তি যাকাতযোগ্য আর কী পরিমাণ সম্পত্তি যাকাতযোগ্য নয়, এটা অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। অন্য উলামায়ে কিরামের অভিমত হল, শেয়ার যেহেতু কোম্পানির সম্পত্তির মধ্যেই মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে, তাই সম্পত্তির যাকাতযোগ্য হওয়া বা যাকাতযোগ্য না হওয়ার অনুসন্ধান করা যেতে পারে। আমি এ দুটি অভিমতের মধ্যে এভাবে সমন্বয় বিধান করেছি, যদি কোনো ব্যক্তি কোম্পানির মুনাফায় অংশগ্রহণ করার জন্য শেয়ার নেয় তাহলে তাকে ব্যবসায়ের উপাদান হিসেবে গণ্য করা কঠিন। এক্ষেত্রে অবকাশ আছে, যদি কারো পক্ষে যাকাতযোগ্য এবং যাকাত অযোগ্য সম্পত্তির অনুসন্ধান সম্ভব হয় তাহলে সে অনুসন্ধান করে শুধু যাকাতযোগ্য সম্পত্তির যাকাত প্রদান করবে। আর যে ব্যক্তি অনুসন্ধান করতে না পারবে সে সতর্কতামূলক পুরো বাজার মূল্যের উপর যাকাত প্রদান করবে। আর যদি কেউ শেয়ার ব্যবসায়ের (Capital Gain) এবং ভবিষ্যতে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে ক্রয় করে, তাহলে এটা ব্যবসায়ের পণ্য হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, সে যেন কোম্পানির সম্পত্তির একটা আনুপাতিক অংশ পরে বিক্রির জন্য ক্রয় করেছে। তাই পূর্ণ মূল্যের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।
৩. ফিকহী মূলনীতি হল, কারো উপর ঋণ থাকলে ঋণ বাদ দিয়ে বাকি সম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কিন্তু বর্তমানে এটা একটা বিবেচনার বিষয়, অধিকাংশ বড় বড় পুঁজিপতি ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এত ঋণ নিয়ে রাখে যে, তাদের ঋণ সাধারণত যাকাতযোগ্য পুঁজি থেকে বেশি থাকে। সাধারণত অবস্থা এমন হয়, যদি তাদের ঋণ বাদ দেয়া হয় তাহলে তাদের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়া তো দূরের কথা; বরং কখনো তারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য সাব্যস্ত হবে। এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব করা হয়, মেশিনারির উপর যাকাত ওয়াজিব সাব্যস্ত করা যেতে পারে, কিন্তু মেশিনারিকে যাকাতের মাল সাব্যস্ত করা যায় না বিধায় একথা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা নছ দ্বারা স্বীকৃত। এর সঠিক সমাধান হল, যাকাত থেকে ঋণ বাদ দেয়া ফুকাহায়ে কিরামের সর্বসম্মত অভিমত নয়। হানাফী ও হাম্বলীদের মতে ঋণ বাদ হয়। শাফেয়ীদের মতে বাদ হয় না। আর মালেকীদের মতে নগদ অর্থের বেলায় বাদ হয়, কিন্তু অনগদ সম্পত্তির বেলায় বাদ হয় না।¹ এ ব্যাপারে অধমের ক্ষুদ্র অভিমত হল, দেখতে হবে, যে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে সেটা কোথায় ব্যয় করা হয়েছে। যদি এ ঋণ দ্বারা এমন বস্তু ক্রয় করা হয় যা নিজে যাকাতযোগ্য, তাহলে এ ঋণ যাকাত থেকে বাদ পড়বে। আর যদি ঋণ দ্বারা এমন বস্তু ক্রয় করা হয় যা যাকাতযোগ্য নয়, তাহলে এ ঋণ বাদ পড়বে না। এমন ঋণের ব্যাপারে মালেকী ও শাফেয়ীদের বক্তব্যের উপর আমল করা হবে। এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর হাফেজ মারদীনী রাহ.-এর গ্রন্থ 'আল জাওহারুন নাকী' তে নজরে পড়ল, ইমাম মালেক রাহ. এর বক্তব্যও এর কাছাকাছি। তিনি বলেন:
ان كان عنده عروض تفى بدينه عليه زكاة العين (الجـوهـر النقـى حاشـية بيهقى ص (١٤٩ ج ٤ باب الدين مع الصدقة
-অর্থাৎ যদি তার কাছে পণ্যদ্রব্য থাকে যা তার ঋণকে পরিবেষ্টন করে, তাহলে তার উপর নগদ টাকার যাকাত ওয়াজিব হবে।

টিকাঃ
كتاب الفقه على المذاهب الأربعة للحزري ١: ٦٠٢- ٦٠٥ مبحث زكاة الدين، وفقه الاسلام وادلة ٢: ٧٤٧ .

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00