📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি 📄 শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের শর্তাবলী

📄 শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের শর্তাবলী


১. শেয়ার কম-বেশি দামে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার একটি শর্ত হল, কোম্পানির সম্পত্তি শুধু নগদ ও ঋণ আকারে না হওয়া। যদি কোম্পানি কোনো স্থাবর সম্পত্তি (যেমন বিল্ডিং যন্ত্রপাতি ইত্যাদি) বা ব্যবসায়িক সরঞ্জাম না কিনে; বরং তার কাছে কেবল নগদ অর্থ বা কারো কাছে ঋণ থাকে, তাহলে এ অবস্থায় শেয়ারের নামিক মূল্য (Face Value) থেকে কম-বেশি দামে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। কারণ শেয়ার এখন শুধু নগদ অর্থের প্রতিনিধিত্ব করছে। যেমন দশ টাকার শেয়ার শুধু দশ টাকার প্রতিনিধিত্ব করছে। যদি তা এগার টাকায় বিক্রি করা হয় তাহলে দশ টাকা বিক্রি হল এগার টাকার বিনিময়ে, এটা জায়েয নেই।
যখন নগদ অর্থ ছাড়া কোম্পানির অন্যান্য সম্পত্তিও অর্জিত হয় তখন তার সম্পত্তি মিশ্রিত হয়ে যায়। তার মধ্যে নগদ-অনগদ উভয়টা অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন শেয়ার বিক্রির অর্থ, কোম্পানির সম্পত্তিতে প্রত্যেকের আনুপাতিক অংশ বিক্রি হচ্ছে। এ মাসআলার ভিত্তি এখন 'مدعجوة -এর মাসআলার উপর হবে। 'مدعجوة' ইমাম আবু হানিফা রাহ. এবং ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর মাঝে একটি ইখতেলাফী মাসআলার শিরোনাম। যাকে "سيف محلى" এবং "منطقة مفضضة' হিসেবেও ব্যক্ত করা হয়। এ মাসআলার সারকথা হল, সুদযুক্ত মাল ও সুদমুক্ত মালে মিশ্রিত কোনো সম্পদ খাঁটি সুদযুক্ত সম্পদের বিনিময়ে বিক্রি করা। যেমন তরবারির উপর স্বর্ণ লাগানো। তরবারি সুদমুক্ত মাল ও স্বর্ণ সুদযুক্ত মাল। তা যদি দিনারের বিনিময়ে বিক্রি হয় তাহলে তার ক্রয়-বিক্রয়ের কী হুকুম? এর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর মতে এরকম মিশ্রিত মাল খাঁটি সুদের মালের বিনিময়ে বিক্রি জায়েয নেই, যতক্ষণ মিশ্রিত মাল থেকে সুদের মাল পৃথক করা না হবে। ইমাম আবু হানিফা রাহ. এর মতে বেচাকেনা জায়েয হবে। শর্ত হল, খাঁটি সুদযুক্ত মাল মিশ্রণে অবস্থিত সুদের মাল থেকে বেশি হতে হবে। সুদের মালের মুকাবেলায় সুদের মাল হবে এবং অতিরিক্ত খাঁটি সুদের মাল সুদমুক্ত মালের মুকাবেলায় হবে।
তবে কিছু শাফেয়ী ও হাম্বলীর অভিমত হল, যদি মিশ্রণের মধ্যে সুদের মাল বেশি হয় তাহলে খাঁটি সুদের মাল দ্বারা বিক্রি নাজায়েয হবে। আর যদি মিশ্রণের মধ্যে সুদমুক্ত মাল বেশি হয় এবং সুদের মাল কম হয়, তাহলে খাঁটি সুদের মালের বিনিময়ে বিক্রি জায়েয হবে।
ঠিক একই অবস্থা এখানেও। নগদ ও অনগদের বিক্রি শুধু নগদ দ্বারা হচ্ছে। সুতরাং ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর মতানুসারে এরূপ অবস্থায় শেয়ার বিক্রি জায়েয নেই। আর কিছু শাফেয়ী ও হাম্বলীর মতানুসারে যদি কোম্পানির সম্পত্তি অধিক হয় আর নগদ অর্থ কম হয়, তাহলে শেয়ার বিক্রি জায়েয হবে। যদি নগদ অর্থ বেশি এবং আন্যান্য সম্পত্তি কম হয়, তাহলে শেয়ার বেচাকেনা নাজায়েয হবে। আজকাল আরব দেশের উলামায়ে কিরামের অধিকাংশ এ ফতোয়াই দিচ্ছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে শেয়ার ক্রয়ের আগে কোম্পানির সম্পত্তির এবং তার নগদ অর্থ বেশি না অনগদ বেশি, তার খোঁজ-খবর নেয়া জরুরি, কিন্তু হানাফীদের মতে এ তথ্যানুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। যখন এতটুকু জানা যাবে, কোম্পানির কিছু সম্পত্তি অনগদও আছে, তখন নামিক মূল্য (Face Value) থেকে বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে। তবে প্রত্যেক শেয়ারের ভাগে কোম্পানির নগদ অর্থ ও ঋণের যে পরিমাণ আসে, যদি শেয়ারের মোট মূল্য তার সমান বা তার থেকে কম হয়, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। যেমন দশ টাকার শেয়ারে যদি আট টাকা হয় নগদ ও ঋণের মুকাবেলায়, আর দুই টাকা হয় স্থাবর সম্পত্তির মুকাবেলায়, তাহলে আট টাকা বা তার চেয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি জায়েয হবে না। তবে নয় টাকা বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি জায়েয হবে।
২. শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হওয়ার জন্য এটাও শর্ত, কোম্পানিকে হালাল কাজ করতে হবে। যদি কোম্পানির আসল ব্যবসাই হয় হারাম, তাহলে তার শেয়ার নেয়া জায়েয হবে না। যেমন কোনো কোম্পানি মদের কারবার করে বা কোম্পানির আসল কারবারই সুদের উপর, যেমন ব্যাংক ইত্যাদি।
৩. কখনো এমন হয়, কোম্পানি মৌলিকভাবে হালাল ব্যবসাই করে, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে তা সুদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যায়। যেমন ব্যাংক থেকে সুদের ভিত্তিতে ঋণ গ্রহণ করে। অথবা অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকে রেখে তার উপর সুদ গ্রহণ করে। এটা কোম্পানির আসল কারবার নয়; বরং একটি আনুষঙ্গিক ও অন্তর্বর্তী কাজ। বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানি এ ধরনের। এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার গ্রহণের কী হুকুম? এ বিষয়ে সমকালীন উলামায়ে কিরামের মতভেদ আছে। কিছু আলেমের দৃষ্টিভঙ্গি হল, কোম্পানি সুদী কারবার মৌলিকভাবে করুক বা প্রাসঙ্গিকভাবে করুক, সুদী কারবার কম হোক বা বেশি হোক, সর্বাবস্থায়; যেহেতু সুদী কারবার করে এবং কোনো ব্যক্তি যদি কোম্পানির শেয়ার গ্রহণ করে, তাহলে সে কোম্পানিকে সুদী কারবারের উকিল বানায়। সুতরাং কোম্পানির সুদী লেনদেন তার সাথে সংশ্লিষ্ট হবে। তাই যে কোম্পানি কোনো না কোনোভাবে সুদী লেনদেনে যুক্ত থাকে, তার প্রকৃত ব্যবসা সঠিক হলেও তার শেয়ার গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
কিন্তু এটাই সঠিক বলে মনে হয়, কোম্পানির সুদী লেনদেনের দুটি প্রক্রিয়া আছে। এক. কোম্পানি ঋণ গ্রহণ করে তার উপর সুদ প্রদান করে। এ অবস্থায় কোম্পানির আয়ের মধ্যে কোনো হারাম উপাদান মিশ্রিত হয় না। কারণ, যখন কোনো ব্যক্তি সুদের উপর ঋণ গ্রহণ করে তখন এ কাজটি হারাম ও কঠিন পাপাচার হবে ঠিক, কিন্তু সে ঋণের মালিক হয়ে যাবে। তা দ্বারা ব্যবসা করে যে আয় হবে সেটাও হালাল হবে। এ অবস্থায় বেশির বেশি এ অভিযোগ করা যায়, কোম্পানি যেহেতু শেয়ারহোল্ডারের উকিল, এ কারণে সুদী ঋণ গ্রহণের সংশ্লিষ্টতা তার সাথে যুক্ত হবে এবং তাকে সুদী ঋণ গ্রহণে সম্মত মনে করা হবে। তার উত্তর হযরত হাকীমুল উম্মত থানবী রাহ. দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শেয়ারহোল্ডার কোনোভাবে এ আওয়াজ উঠাবে, আমি সুদী কারবারে সম্মত নই, তাহলে সে তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। কোম্পানির দায়িত্বশীলদের কাছে এ বিষয়ে চিঠি লেখে দেওয়াও যথেষ্ট হতে পারে' (আজকাল তার উত্তম পদ্ধতি হল বার্ষিক সাধারণ সভায় (A.G.M) আওয়াজ উঠানো যেতে পারে)। আর একটা বিষয়ের উপরও আপত্তি হতে পারে যা হযরত থানবী রাহ. উল্লেখ করেন নি। সেটা হল, কোম্পানির পরিচালকগণ অংশীদারিত্বের কারণে তার উকিল তো ঠিক আছে। আর এটাও জানা কথা, যে আওয়াজ তোলা হচ্ছে তা কার্যকর হবে না। তাহলে ওকালতি ক্ষমতা থাকা অবস্থায় এরূপ অকার্যকর আওয়াজ তোলা দ্বারা সে দায়মুক্ত হয় কি করে? তার উত্তর হল, কোম্পানির ওকালতি ক্ষমতা অংশীদারিত্বের (Partnership) ওকালতি ক্ষমতা থেকে ভিন্ন। অংশীদারিত্বের মধ্যে প্রত্যেক অংশীদারের ওকালতি ক্ষমতা এ পরিমাণ শক্তিশালী হয় যে, এক অংশীদারও যদি কোনো কারবারে দ্বিমত করে বসে তাহলে সে কারবার আর করা যায় না। অংশীদারিত্বের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় সর্বসম্মত রায়ের মাধ্যমে। অথচ কোম্পানির মধ্যে উকিল এবং মক্কেলের সম্পর্ক এতটা শক্তিশালী নয় যে, একজন শেয়ারহোল্ডার যদি ভিন্ন মত পোষণ করে বসে তাহলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে না। কোম্পানির মধ্যে সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত রায় দ্বারা গৃহীত হয় না এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তমূলে কাজ করাও সম্ভব হয় না। এখানে সিদ্ধান্ত হয় অধিকাংশের মতানুসারে। এখন যেখানে অধিকাংশের মতানুসারে সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে কোনো ব্যক্তি সুদী লেনদেনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠাল, কিন্তু সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে তা কার্যকর হল না এবং সুদী লেনদেন স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত থাকল। তাহলে এখানে এটা বলা যায় না, এ সুদী লেনদেন তার বিরুদ্ধে আওয়াজ উচ্চারণকারীর ওকালতি ক্ষমতা ও সন্তুষ্টিতে হচ্ছে। সুতরাং এটাই সঠিক মনে হয়, যখন কোম্পানির আসল কারবার জায়েয হয় আর আনুষঙ্গিকভাবে কখনো সে সুদের উপর ঋণ গ্রহণ করে তাহলে তার শেয়ার নেয়া জায়েয হবে। শর্ত হল, সুদ থেকে দায়মুক্তির আওয়াজ উচ্চারণ করতে হবে।
কোম্পানির সুদী লেনদেনের দ্বিতীয় পদ্ধতি হল, কোম্পানির কাউকে ঋণ দিয়ে সুদ গ্রহণ করা। যেমন বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের সেভিং একাউন্টে জমা রেখে তার উপর সুদ গ্রহণ করে। এখানে দুটি আপত্তি আছে। এক. সুদী লেনদেনের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। উপরের আলোচনাটি এর সমাধান। দ্বিতীয় আপত্তি হল, কোম্পানি যে মুনাফা (Dividend) বণ্টন করবে তার মধ্যে সুদও অন্তর্ভুক্ত হবে। আয়ের যে অংশ সুদের মাধ্যমে অর্জিত হবে তা হারাম। এ ব্যাপারে হযরত থানবী রাহ. দুটি কথা বলেছেন। এক. প্রত্যেক কোম্পানি সম্পর্কে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, সে সুদ গ্রহণ করছে। অনুপুঙ্খ তথ্যানুসন্ধানের জন্য আমরা আদিষ্ট নই। দ্বিতীয় কথা হল, সুদ গ্রহণ করে থাকলেও তা পরিমাণে অল্প, যা হালাল মালের মধ্যে মিশ্রিত হয়ে গেছে। সুদ মিশ্রিত মালের বেশির ভাগ হালাল হলে তা ব্যবহারের অবকাশ আছে। কিন্তু এর উপর একটি আপত্তি উঠে। কোনো ব্যক্তি সুদ মিশ্রিত মাল থেকে হাদিয়া প্রদান করল এবং সে মিশ্রিত মালে হারাম অংশ খুব সামান্য, তখন হাদিয়া গ্রহণ করা এজন্য জায়েয আছে, মনে করা হবে সে হালাল মাল থেকে প্রদান করছে। কিন্তু কোম্পানির লাভের (Dividend) অবস্থাটা তার থেকে ভিন্ন ধরনের। কারণ কোম্পানির যতগুলো খাত থেকে আয় হয়, প্রত্যেক খাতের আয়ের একটি আনুপাতিক অংশ সে লাভের (Dividend) সাথে যুক্ত হয়। সুতরাং সুদের একটা আনুপাতিক অংশও লাভের (Dividend) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যদি কোম্পানির আয়ের শতকরা দশ ভাগ অংশ সুদী একাউন্ট থেকে অর্জিত হয়, তাহলে লাভের ও (Dividend) শতকরা দশ ভাগ অংশ সুদযুক্ত হবে। সুতরাং মুনাফার (Dividend) যে অংশ সুদযুক্ত তা সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত সাদাকাহ করা জরুরি। আয়ের কতটুকু অংশ সুদী তা কোম্পানির (Income Statements) থেকে জানা যেতে পারে। যদি তাতে এ বিবরণ না থাকে তাহলে কোম্পানির পরিচালকদের থেকেও জানা যেতে পারে। সারকথা, কোনো কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য চারটি শর্ত আছে:
১. কোম্পানির মূল ব্যবসায় হালাল হওয়া।
২. নামিক মূল্য (Face Value) থেকে কম বা বেশি দামে বিক্রির জন্য কোম্পানির সম্পত্তি শুধু নগদ অর্থ আকারে না থাকা জরুরি।
৩. সুদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে।
৪. কোম্পানির আয়ে সুদ মিশ্রিত থাকলে লভ্যাংশের সে পরিমাণ সাদাকাহ করতে হবে।

টিকাঃ
ইমদাদুল ফাতাওয়া জ ৩ সং ৪১৯।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি 📄 শেয়ার ব্যবসার (Capital Gain) হুকুম

📄 শেয়ার ব্যবসার (Capital Gain) হুকুম


এতক্ষণ শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে যে আলোচনা করা হল তা ঐ অবস্থায় প্রযোজ্য যখন শেয়ার ক্রেতা কোম্পানির অংশীদার হয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করাই উদ্দেশ্য হয়। ক্রেতার উদ্দেশ্য যদি পুঁজি বিনিয়োগ না হয়; বরং এ উদ্দেশে ক্রয় করে, তার মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করবে। এ পদ্ধতিতে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের হুকুম কী? এর মধ্যেও দুটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। ফিকাহ, বিশেষত ফিকহুল মুআমালাতের ব্যাপারে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুসলিম বিশ্বের প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ মুহাম্মদ ছিদ্দিক আদ দারিরের মত হল, এ প্রক্রিয়ার ভিত্তিমূল কেবল ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, যাকে (Speculation) বলে, এ কারণে এটা জায়েয হবে না। তাঁর বক্তব্য হল, অনুমানভিত্তিক ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতি প্রদান ফটকাবাজির পথ খুলে দেয়। তাঁর মতে শেয়ার শুধু সে অবস্থায় ক্রয় করা জায়েয হবে যখন ক্রেতা কোম্পানির লাভ-লোকসানে অংশগ্রহণ করে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য ক্রয় করে।
মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ক্রেতা কী উদ্দেশ্যে বা কোন্ নিয়তে ক্রয় করছে সেটা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, মৌলিকভাবে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য বস্তু কিনা। যখন এটা স্বীকার করা হল, শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য। শেয়ার বিক্রয় মূলত কোম্পানির সম্পত্তির আনুপাতিক অংশের বিক্রয়। তখন যে নিয়তেই ক্রয় করুক ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে। শেয়ার নিজের কাছে রেখে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য হোক বা মূল্য বৃদ্ধির পর বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের জন্য হোক। কোনো বস্তু ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য স্বীকার করে নেয়ার পর শুধু নিয়তের কারণে জায়েয নাজায়েযের পার্থক্যের কোনো ফিকহী কারণ নেই। তবে ক্রয়-বিক্রয়ের শরয়ী শর্তগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এ শর্তগুলো মেনে চললে ফটকাবাজির পথ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
একটা কথা প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে, আন্দাজ অনুমানভিত্তিক লেনদেন, যাকে (Speculation) বলে, সেটা মৌলিকভাবে হারাম। এ ধারণা ভুল। অনুমান (Speculation) হল, কোন্ বস্তুর মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কোন্ বস্তুর মূল্য কমছে, এ জরিপ চালানো। যার মূল্য কমে যাওয়ার আশংকা হয় তা বিক্রি করে দেয়া এবং যার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা রেখে দেয়া। এটা মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ নয়। এটা তো প্রত্যেক ব্যবসায়ের মধ্যেই হয়ে থাকে। নিষিদ্ধ হল, ক্রয়-বিক্রয়ের শরয়ী শর্তসমূহ রক্ষা না করা। যেমন অমালিকানা বস্তু বা অদখলকৃত বস্তু বিক্রি করা অথবা বিক্রয়-জুয়ার আকৃতি ধারণ করা। জুয়া হয় দুটি বিষয় মিলে। এক. এক পক্ষ থেকে প্রদেয় নির্ধারিত হওয়া এবং অপর পক্ষ থেকে আনুমানিক হওয়া। দ্বিতীয় হল, যার পক্ষ থেকে প্রদেয় আদায় হয়ে গেছে তার অর্থ দুটি বিষয়ের মধ্যে আবর্তিত হবে। হয় এ অর্থ নিজেই চলে যাবে, নয় তো আরো অর্থ টেনে আনবে।
এ ব্যাখ্যার আলোকে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের উপর চিন্তা করলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সামনে আসে:
১. পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে, কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব লাভ করার পূর্বেই স্টক এক্সচেঞ্জে তা লিস্টিং হয়ে যায়। এরূপ (Provisionally Listed) কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় জায়েয নেই। কারণ শেয়ার বিক্রি মূলত কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি। আর এক্ষেত্রে এখনো কোম্পানির মালিকানায় কোনো সম্পত্তিই অর্জিত হয় নি। সুতরাং এটা অমালিকানা বস্তুর বিক্রি, যা জায়েয নেই। কার্যত এরূপ শেয়ারের ক্রয়-বিক্রয় স্টক এক্সচেঞ্জে হয়। এরূপ দৃষ্টান্তও বর্তমান আছে, একটি কোম্পানির অস্তিত্ব লাভের পূর্বে তার দশ টাকার শেয়ার একশ আশি টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
২. Future Sales অর্থাৎ শেয়ারের এরূপ ক্রয়-বিক্রয়ে যেখানে শেয়ার নেয়া বা দেয়া উদ্দেশ্য নয়, কেবল লাভ-লোকসান সমান করে মুনাফা অর্জন উদ্দেশ্য, এটাও শরয়ীভাবে জায়েয নেই।
৩. অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়- যাতে বিক্রয় ভবিষ্যতের সাথে সংযুক্ত করা হয়, এটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। কারণ, বিক্রিকে ভবিষ্যৎকালের সাথে সংযুক্ত বা সম্পৃক্ত করা সকল ফুকাহায়ে কিরামের মতেই নাজায়েয। তবে ভবিষ্যতে বিক্রির প্রতিশ্রুতি দেয়া যেতে পারে, কিন্তু সময় আসলে স্বাভাবিক বিক্রি সম্পাদন করতে হবে।
৪. শেয়ার নগদ ক্রয়-বিক্রয় জায়েয, পুঁজি বিনিয়োগের নিয়তে হোক বা বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের নিয়তে হোক।
৫. নগদ কেনাবেচায়ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু অপারগতার কারণে শেয়ার হাতে আসতে এক থেকে তিন সপ্তাহ বিলম্ব হয়। নগদ বিক্রি হয়ে যাবার পর শেয়ার হস্তগত করার আগে তা অগ্রিম বিক্রি করা জায়েয আছে কি না? এ মাসআলার ভিত্তি এর উপর যে, এ বিক্রি দখলের আগে কিনা? যদি বিক্রি দখল করার আগে হয় তাহলে জায়েয নেই, অন্যথায় জায়েয আছে। এটা দখলের পূর্বে না পরে বিক্রি তা নির্ধারণ করার জন্য আগে জানতে হবে, শেয়ারের দখল বলা হবে কোন্ জিনিসকে। যেমন উপরে আলোচনা করা হয়েছে, 'শেয়ার' মূলত কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পত্তির মধ্যে আনুপাতিক অংশীদারিত্বের নাম, আর 'শেয়ার সার্টিফিকেট' মূলত এ অংশীদারিত্বের লিখিত দলিল। সুতরাং বিক্রয়যোগ্য বস্তু লিখিত দলিল নয়; বরং কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পত্তির একটি যৌথ অংশ। এ যৌথ অংশ বিক্রি পূর্ণ হওয়া মাত্রই ক্রেতার দিকে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। যেহেতু এটা যৌথ অংশ, তাই তার উপর বাহ্যিক দখল সম্ভব নয়। সুতরাং তার মধ্যে কৃত্রিম দখলই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিৎ। এখন দুটি অবস্থা হল। হয় এটা বলতে হবে, কৃত্রিম দখল তখনি হবে যখন সার্টিফিকেট হাতে আসবে। অথবা বলা হবে, যখন সে যৌথ অংশ ক্রেতার জামানতে আসবে তখন কৃত্রিম দখল মনে করা হবে। এ বিষয়টি স্থির করার জন্য দখলপূর্ব বিক্রির স্বরূপ জানা জরুরি। দখলপূর্ব বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞার দুটো কারণ- ১. দখলের আগে বিক্রীত বস্তু হস্তান্তরযোগ্য হয় না। সুতরাং এটা নিশ্চিত নয় যে, বিক্রেতা অবশ্যই ক্রেতাকে বিক্রীত বস্তুর দখল বুঝিয়ে দেবে। এটা ধোঁকা মাত্র, একারণে বিক্রি জায়েয নেই। বিক্রির বহু অবস্থা এমন আছে যার মধ্যে এ ধোকার কারণ পাওয়া যায় না। বিক্রীত বস্তু বাহ্যিক দখল না হওয়া সত্ত্বেও তা আইনগতভাবে ক্রেতার অধিকারে চলে আসে। সুতরাং এরূপ অবস্থায় দখলপূর্ব বিক্রি পাওয়া যাবে না। ২. দখলপূর্ব বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হল, দখলের পূর্বে বিক্রীত বস্তু বিক্রেতার জামিনে আসে না। আর 'রিহ মাল লাম ইয়াদমান' (অর্থাৎ যার জামিন হয় নি তার থেকে লাভ হাসিল করা) জায়েয নেই।
অতএব যেখানে বাহ্যিক দখল হয় নি কিন্তু ক্রেতার আইনগত দখল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, অর্থাৎ বিক্রীত পণ্য থেকে উপকৃত হওয়ার বিষয়টা ক্রেতার অধিকারে এসে গেছে এবং তার জামিনও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেখানে তার বিক্রয় জায়েয হবে। স্টক এক্সচেঞ্জের লোকদের সাথে বিস্ত ারিত আলোচনা করে এ বিষয়গুলো জানা গেছে, নগদ বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর শেয়ারের সকল অধিকার ও দায়দায়িত্ব ক্রেতার দিকে স্থানান্তরিত হয়ে সেটা ক্রেতার জামিনে প্রবেশ করে। সুতরাং নগদ বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর শেয়ারের উপর বাহ্যিক দখলের পূর্বে যদি কোনো দুর্ঘটনায় কোম্পানি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি মনে করা হবে ক্রেতার। স্টক এক্সচেঞ্জ বিক্রেতাকে টাকা প্রদান করিয়ে দেবে। এরূপভাবে দখলের পূর্বে মুনাফা (Dividend) বণ্টন হলে কোম্পানি বিক্রেতার নামে ঠিকই মুনাফা জারি করবে। কারণ, কোম্পানি রেকর্ডে এখনো পর্যন্ত বিক্রেতার নামই লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু কারবারী রীতিনীতি অনুযায়ী সে শেয়ারের সাথে মুনাফাও ক্রেতাকে প্রদান করতে বাধ্য। এসব কথা দ্বারা বুঝা গেল, বাহ্যিক দখলের পূর্বেও সে শেয়ার ক্রেতার জামিনে চলে আসে। এখন শুধু শেয়ারের মালিকানার লিখিত প্রমাণপত্র ক্রেতার হাতে আসা বাকি থাকে।
আর শুধু এতটুকু ব্যাপার দিয়ে দখল বাধাগ্রস্ত হয় না। এ অবস্থার দাবি হল, সার্টিফিকেট হস্তগত হওয়ার আগেও শেয়ারের বিক্রি জায়েয হবে, কিন্তু অন্যদিকে যদি চিন্তা করা হয়, প্রত্যেক বস্তুর দখল প্রক্রিয়া প্রচলিত রীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, আর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শেয়ারের দখল পাওয়া গেছে তখনি মনে করা হয় যখন সার্টিফিকেট হাতে আসে। সুতরাং জায়েয না হওয়ার হুকুম দেয়া উচিৎ। বিশেষত যখন এভাবে ফটকাবাজি কারবারের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণও হতে পারে। সুতরাং এ বিপরীত দিক বর্তমান থাকায় সতর্কতা হল, সার্টিফিকেট হস্তগত না হওয়ার আগে অগ্রিম বিক্রি না করা।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি 📄 শেয়ারের উপর যাকাত

📄 শেয়ারের উপর যাকাত


কোম্পানির শেয়ারের উপর যাকাতের কী হুকুম? এ ব্যাপারে তিনটি বিষয় উল্লেখযোগ্য:
১. কোম্পানি হিসেবে কোম্পানির উপর (যা আইনগত সত্তা) যাকাত ওয়াজিব নয়। এর ভিত্তি হচ্ছে 'خلطة الشيوع' এর মাসআলার উপর। ইমামত্রয় রাহ. এর নিকট 'خلطة الشيوع'-গ্রহণযোগ্য এবং সমষ্টির উপর যাকাত ওয়াজিব হয়। ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, ' خلطة الشيوع'-এর গ্রহণযোগ্যতা কেবল মুক্তভাবে বিচরণকারী পশুর ক্ষেত্রেই নয়; বরং ব্যবসায়িক পণ্যের মধ্যেও আছে। এ কারণে তাঁদের মতে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। যদিও কোম্পানি কোনো মুকাল্লাফ (নির্দেশিত) ব্যক্তি নয় এবং যাকাত একটি ইবাদত, যা মুকাল্লাফের উপর ওয়াজিব হয়, কিন্তু শাফেয়ীদের মূলনীতি হল, যাকাত মানুষের উপর নয়; বরং সম্পদের উপর ওয়াজিব হয়। এ কারণে তাঁদের মতে নবালেগের সম্পদেও যাকাত ওয়াজিব হয়। অথচ সে মুকাল্লাফ নয়। সুতরাং তাঁদের মতে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব, কিন্তু শেয়ার মালিকের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।
কারণ হাদীসে মূলনীতি বর্ণিত আছে: 'لاثني في الاسلام অর্থাৎ এক সম্পদে দুবার যাকাত ওয়াজিব হয় না। হানাফীদের নিকট "خلطة الشيوع" -এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাদের মতে যাকাত ওয়াজিব হবে মানুষের উপর। এ কারণে হানাফীদের মতে আইনগত ব্যক্তিসত্তা হিসেবে কোম্পানির উপর যাকাত ওয়াজিব নয়; বরং শেয়ারমালিকের উপর ওয়াজিব হবে।
২. শেয়ারের যাকাত কোন্ হিসেবে প্রদান করা হবে? এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত শেয়ারের মূল্য তিন রকমের হয়ে থাকে। ক. ফেস ভ্যালু, অর্থাৎ সার্টিফিকেটে লিখিত মূল্য। খ. মার্কেট ভ্যালু অর্থাৎ বাজারমূল্য, যার উপর বাজারে শেয়ার বিক্রি হয়। গ. ব্রেক আপ ভ্যালু (Break Up Value) অর্থাৎ যদি কোম্পানি বিলুপ্ত হয় তাহলে প্রত্যেক শেয়ারের মুকাবেলায় কোম্পানির সম্পত্তির যে অংশ আসবে তাই ব্রেক আপ ভ্যালু। এ তিন ধরনের মূল্যের মধ্য থেকে কোন্ মূল্যের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে? যদি কোনো কোম্পানির ব্রেক আপ ভ্যালু সহজে জানা সম্ভব হয় তাহলে সম্ভবত যাকাতের হিসেবের ভিত্তি হওয়ার জন্য এটাই সর্বাধিক উপযুক্ত, কিন্তু ব্রেক আপ ভ্যালু নির্ধারণ করা খুব কঠিন। আর সাধারণ অংশীদারদের জন্য তো আরো কঠিন। সুতরাং সমকালীন প্রায় সকল আলেম এ বিষয়ে একমত, বাজারমূল্য গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ, নামিক মূল্য যদিও শুরুতে পুঁজি বিনিয়োগের সময় প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু যখন পুঁজি কোম্পানির সম্পত্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যাবে তখন আর ফেস ভ্যালু প্রকৃত অবস্থার খুব কাছাকাছি নয়। কারণ, সম্পত্তির মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি পেতে থাকে। মার্কেট ভ্যালুতে সম্পত্তি ছাড়া অন্য উপাদান প্রভাব ফেললেও সেটা প্রকৃত অবস্থার বেশি কাছাকাছি।
দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় হল, শেয়ার কোম্পানির যাবতীয় সম্পত্তির মধ্যে আনুপাতিক হারে মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে। কোম্পানির কিছু সম্পত্তি হয় যাকাত প্রদানযোগ্য। যেমন নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদি। আবার কিছু যাকাত প্রদানযোগ্য নয়। যেমন বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। শেয়ারের যাকাত আদায় করতে যাকাতযোগ্য ও যাকাত অযোগ্য মালের মধ্যে পার্থক্য করা হবে কিনা? এ ব্যাপারে বর্তমান ফকীহদের দুটি অভিমত রয়েছে। মিসরের শায়খ আবু যুহরা মরহুমের অভিমত হল, শেয়ার নিজে ব্যবসায়ের উপাদান হয়ে গেছে। এ কারণে তার পুরো মার্কেট ভ্যালুর উপর যাকাত দিতে হবে। কী পরিমাণ সম্পত্তি যাকাতযোগ্য আর কী পরিমাণ সম্পত্তি যাকাতযোগ্য নয়, এটা অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। অন্য উলামায়ে কিরামের অভিমত হল, শেয়ার যেহেতু কোম্পানির সম্পত্তির মধ্যেই মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে, তাই সম্পত্তির যাকাতযোগ্য হওয়া বা যাকাতযোগ্য না হওয়ার অনুসন্ধান করা যেতে পারে। আমি এ দুটি অভিমতের মধ্যে এভাবে সমন্বয় বিধান করেছি, যদি কোনো ব্যক্তি কোম্পানির মুনাফায় অংশগ্রহণ করার জন্য শেয়ার নেয় তাহলে তাকে ব্যবসায়ের উপাদান হিসেবে গণ্য করা কঠিন। এক্ষেত্রে অবকাশ আছে, যদি কারো পক্ষে যাকাতযোগ্য এবং যাকাত অযোগ্য সম্পত্তির অনুসন্ধান সম্ভব হয় তাহলে সে অনুসন্ধান করে শুধু যাকাতযোগ্য সম্পত্তির যাকাত প্রদান করবে। আর যে ব্যক্তি অনুসন্ধান করতে না পারবে সে সতর্কতামূলক পুরো বাজার মূল্যের উপর যাকাত প্রদান করবে। আর যদি কেউ শেয়ার ব্যবসায়ের (Capital Gain) এবং ভবিষ্যতে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে ক্রয় করে, তাহলে এটা ব্যবসায়ের পণ্য হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, সে যেন কোম্পানির সম্পত্তির একটা আনুপাতিক অংশ পরে বিক্রির জন্য ক্রয় করেছে। তাই পূর্ণ মূল্যের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।
৩. ফিকহী মূলনীতি হল, কারো উপর ঋণ থাকলে ঋণ বাদ দিয়ে বাকি সম্পদের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। কিন্তু বর্তমানে এটা একটা বিবেচনার বিষয়, অধিকাংশ বড় বড় পুঁজিপতি ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এত ঋণ নিয়ে রাখে যে, তাদের ঋণ সাধারণত যাকাতযোগ্য পুঁজি থেকে বেশি থাকে। সাধারণত অবস্থা এমন হয়, যদি তাদের ঋণ বাদ দেয়া হয় তাহলে তাদের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়া তো দূরের কথা; বরং কখনো তারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য সাব্যস্ত হবে। এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব করা হয়, মেশিনারির উপর যাকাত ওয়াজিব সাব্যস্ত করা যেতে পারে, কিন্তু মেশিনারিকে যাকাতের মাল সাব্যস্ত করা যায় না বিধায় একথা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা নছ দ্বারা স্বীকৃত। এর সঠিক সমাধান হল, যাকাত থেকে ঋণ বাদ দেয়া ফুকাহায়ে কিরামের সর্বসম্মত অভিমত নয়। হানাফী ও হাম্বলীদের মতে ঋণ বাদ হয়। শাফেয়ীদের মতে বাদ হয় না। আর মালেকীদের মতে নগদ অর্থের বেলায় বাদ হয়, কিন্তু অনগদ সম্পত্তির বেলায় বাদ হয় না।¹ এ ব্যাপারে অধমের ক্ষুদ্র অভিমত হল, দেখতে হবে, যে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে সেটা কোথায় ব্যয় করা হয়েছে। যদি এ ঋণ দ্বারা এমন বস্তু ক্রয় করা হয় যা নিজে যাকাতযোগ্য, তাহলে এ ঋণ যাকাত থেকে বাদ পড়বে। আর যদি ঋণ দ্বারা এমন বস্তু ক্রয় করা হয় যা যাকাতযোগ্য নয়, তাহলে এ ঋণ বাদ পড়বে না। এমন ঋণের ব্যাপারে মালেকী ও শাফেয়ীদের বক্তব্যের উপর আমল করা হবে। এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর হাফেজ মারদীনী রাহ.-এর গ্রন্থ 'আল জাওহারুন নাকী' তে নজরে পড়ল, ইমাম মালেক রাহ. এর বক্তব্যও এর কাছাকাছি। তিনি বলেন:
ان كان عنده عروض تفى بدينه عليه زكاة العين (الجـوهـر النقـى حاشـية بيهقى ص (١٤٩ ج ٤ باب الدين مع الصدقة
-অর্থাৎ যদি তার কাছে পণ্যদ্রব্য থাকে যা তার ঋণকে পরিবেষ্টন করে, তাহলে তার উপর নগদ টাকার যাকাত ওয়াজিব হবে।

টিকাঃ
كتاب الفقه على المذاهب الأربعة للحزري ١: ٦٠٢- ٦٠٥ مبحث زكاة الدين، وفقه الاسلام وادلة ٢: ٧٤٧ .

ফন্ট সাইজ
15px
17px