📄 পণ্যদ্রব্যের মধ্যে নগদ ও অগ্রিম বিক্রি
কোনো কোনো দেশে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে যেমন শেয়ার নগদ ও অগ্রিম বিক্রি হয়, তেমনি পণ্যদ্রব্য এবং খাদ্যদ্রব্যও নগদ ও অগ্রিম বিক্রয় হয়। এ বিক্রয় নির্বাচিত কিছু বড় বড় পণ্যের বেলায় হয়ে থাকে। যেমন গম, কার্পাস ইত্যাদি।
দ্রব্যের নগদ বিক্রি হচ্ছে, কোনো বস্তু এখনি বিক্রি হল এবং অধিকারও স্থানান্তরিত হল। আর ক্রেতা এখন থেকেই তা দখলের হকদার হিসেবে স্বীকৃতি পেল। কোনো ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অপারগতার কারণে দখলে বিলম্ব হওয়া ভিন্ন কথা, কিন্তু সে দখলের অধিকারী হয়ে গেছে।
অগ্রিম বিক্রি হচ্ছে, বিক্রি হয়ে গেল ঠিক, কিন্তু দখলের জন্য ভবিষ্যতের কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়। আইনগতভাবে তাকে Forward Sale এবং Future Saleও বলে। কিন্তু আজকাল কার্যত এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য হয়। অগ্রিম বিক্রির মধ্যে উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য যদি নির্দিষ্ট তারিখে নেয়া দেয়াই হয় অর্থাৎ ক্রেতার উদ্দেশ্য দ্রব্য উসুল করা এবং বিক্রেতার উদ্দেশ্য মূল্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাকে Forward Sale বলে। আর যদি উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট তারিখে নেয়া দেয়া না হয়; বরং দ্রব্যকে শুধু লেনদেনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাকে Future Sale বলে। আরবীতে তাকে ‘ مستقبلیات’ বলে। এর মধ্যে দ্রব্য গ্রহণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য এ দুটো বিষয়ের যে কোনো একটা।
📄 ফটকাবাজি (Speculation)
নির্ধারিত তারিখে পণ্যদ্রব্য লেনদেনের পরিবর্তে মূল্যের পার্থক্য সমান করে মুনাফা অর্জন করা হয়। যেমন ১ ডিসেম্বরে চুক্তি স্থির হল, ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাস একলাখ টাকা মূল্যে প্রদান করতে হবে। কিন্তু না বিক্রেতার উদ্দেশ্য থাকে কার্পাস প্রদান করার না ক্রেতার উদ্দেশ্য থাকে কার্পাস নেয়ার; বরং নির্ধারিত তারিখ আসলে দুজনেই পরস্পর লাভ ক্ষতি সমান ভাগ করে নেয়। যদি ১ জানুয়ারি একশ গাঁটের মূল্য এক লাখ দশ হজার টাকা হয়ে যায়, তাহলে বিক্রেতা ক্রেতাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি শেষ করে ফেলবে। আর ১ জানুয়ারি যদি মূল্য নব্বই হাজার টাকা হয়ে যায় তাহলে বিক্রেতা ক্রেতা থেকে দশ হাজার টাকা আদায় করে চুক্তি শেষ করবে।
২. Future Sale-এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল, সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করা। তাকে Hedging আরবীতে ‘تأمين ضد الخسارة’ বলা হয়। এর সারকথা হল, কেউ কোনো পণ্য আগাম ক্রয় (Forward Sale) করে এবং প্রকৃতপক্ষে পণ্য গ্রহণ করাই তার উদ্দেশ্য থাকে, ফটকাবাজি উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু ক্রেতা আশংকা বোধ করে, নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত এ পণ্যের মূল্য কমে গেলে তার ক্ষতি হবে। সে এ ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য ঐ পণ্য Future Market-এ সে তারিখের জন্য Future-এর উপর বিক্রি করে দেয়। যাতে পণ্যের মূল্য যদি কমে যায় তাহলে প্রথম লেনদেনে যত ক্ষতি হবে তত দ্বিতীয় লেনদেনে উসুল হয়ে যায়।
যেমন যায়েদ ১ ডিসেম্বর একশ গাঁট কার্পাস এক লাখ টাকা দিয়ে ক্রয় করল। ১ জানুয়ারি হস্তগত হওয়ার সিদ্ধান্ত হল। তার আশা, ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাস নিয়ে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করবে, কিন্তু আশংকা হল, ১ জানুয়ারি কার্পাসের মূল্য কমে গেলে তার ক্ষতি হয়ে যাবে। যায়েদ এ ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য একশ গাঁট কার্পাস ১ জানুয়ারি পর্যন্ত Future মার্কেটে খালেদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দিল। এখন ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাসের মূল্য যদি নব্বই হাজার টাকা হয়ে যায়, তাহলে যায়েদের দশ হাজার টাকা ক্ষতি হবে, কিন্তু এ পরিমাণ গাঁট যেহেতু সে খালেদের কাছে Futures মার্কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। এ কারণে ১ জানুয়ারি সে নব্বই হাজার টাকায় অন্য গাঁট খরিদ করে খালেদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করবে। এভাবে প্রথম লেনদেনে যায়েদের যে দশ হাজার ক্ষতি হয়েছিল তা সে খালেদের সাথে কৃত লেনদেনের মাধ্যমে আদায় করে নিল। এভাবে 'ফিউচার সেল' ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যও হয়ে থাকে, তাকে হেজিং (Hedging) বলে। Futures ইত্যাদির কারবার কোনো কোনো দেশে স্টক এক্সচেঞ্জেই হয় আবার কোনো কোনো দেশে তার জন্য ভিন্ন বাজার থাকে।
📄 (Options) الخيارات
কোনো বিশেষ পণ্য বিশেষ মূল্যে বিক্রয় বা ক্রয়ের অধিকার প্রদানকে 'خيارات' (Options) বলে। এক ব্যক্তি অন্য একজনের কাছে অঙ্গীকার করে, যদি তুমি চাও তাহলে আমি অমুক পণ্য এত দামে এত সময়ের মধ্যে ক্রয় করার চুক্তি করতে পারি। তুমি যখন ইচ্ছা বিক্রি করতে পার, তাকে বিক্রির অপশন বলে। Option-দাতা এ অধিকার দেয়ার কারণে ফিস গ্রহণ করে। Option-দাতা নির্ধারিত মেয়াদের ভিতর ঐ পণ্য নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য, কিন্তু Option গ্রাহক বিক্রি করতে বাধ্য নয়। তেমনি এর বিপরীতে কখনো এক ব্যক্তির সাথে অঙ্গীকার করে, আমি তোমার কাছে অমুক পণ্য অমুক তারিখ পর্যন্ত এত মূল্যে বিক্রি করার চুক্তি করছি। এ তারিখ পর্যন্ত তুমি যখন ইচ্ছা আমার থেকে এ দামে এ পণ্য কিনে নিতে পার, এটা ক্রয়ের অপশন। Option- কারেন্সির উপরও হয় আবার পণ্যের উপরও হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, Option-দাতা গ্রহীতাকে ঐ কারেন্সি বা পণ্যের মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির ব্যাপারে নিশ্চিত করে এবং এ নিশ্চয়তা দেয়ার বিপরীতে সে কমিশন নেয়। যেমন এক লোক পঁচিশ টাকা দিয়ে একটি ডলার ক্রয় করল। সে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, যদি এটা নিজের কাছে রাখি তাহলে তার মূল্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার যদি এখনি বিক্রি করে দেই তাহলে ভবিষ্যতে এর মূল্য বেড়ে গেলে লাভ থেকে বঞ্চিত হব। এখন অন্য এক ব্যক্তি তাকে নিশ্চয়তা প্রদান করে বলল, ডলার তোমার কাছে রাখ। আমি তোমার সাথে অঙ্গীকার করছি, তিন মাস পর্যন্ত আমি এ ডলার পঁচিশ টাকায় ক্রয় করব, আর এ অঙ্গীকারের বিনিময়ে এত টাকা ফিস নেব। এ কারণে সে ব্যক্তি মূল্য হ্রাস পাওয়ার আশংকা থেকে নিশ্চিত থাকবে। আর যদি মূল্য বৃদ্ধি পায় তাহলে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবে। মূল্য কমে গেলে Option বিক্রেতাকে পঁচিশ টাকায় বিক্রি করে দেবে।
Option-কে স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক পণ্য মনে করা হয়। এর অগ্রিমও বিক্রি হয়ে যায়। এ কারবার অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে হচ্ছে। আর এর প্রক্রিয়াও দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
📄 পুঁজিবাজার (Financial Market) السوق المالية
স্টক এক্সচেঞ্জ একটি বড় বাজারের অংশ। যাকে আরবীতে 'السوق المالية', ইংরেজিতে Financial Market বা Capital Market এবং বাংলায় 'পুঁজি বাজার' বলে। এর মধ্যে শুধু কোম্পানির শেয়ারই নয়; বরং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের (ব্যাংক অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার ইত্যাদি) জারিকৃত আর্থিক সনদাদির ক্রয়-বিক্রয়ও হয়। যদিও এ বাজারের কোনো পৃথক ভৌগোলিক অস্তিত্ব জরুরি নয়। কার্যত এ সব কাজ স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যেই হতে পারে, কিন্তু পরিভাষায় তার একটা অর্থগত ধারণা আছে। এ Financial Market-এ 'সরকারি ঋণপত্রের'ও (Government Securities) কেনাবেচা হয়। যে সনদ সরকার বিভিন্ন সময়ে জনসাধারণ থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য জারি করে তাকে 'সরকারি ঋণপত্র' বলে। সরকারের আয়ের উৎস (ট্যাক্স ইত্যাদি) বাজেটের জন্য যখন অপর্যাপ্ত হয়, তখন সরকার জনগণ থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য এ আর্থিক সনদ জারি করে। যেমন:
১. প্রাইজ বন্ড: এর মধ্যে প্রত্যেক বন্ডের উপর লাভ হয় না। সব বন্ড থেকে প্রাপ্য অর্থের উপর সমষ্টিগতভাবে মুনাফা হয়, যা বণ্টিত হয় লটারির মাধ্যমে।
২. ডিফেন্স সেভিং সার্টিফিকেট।
৩. বিশেষ ডিপোজিট সার্টিফিকেট।
৪. ফরেন এক্সচেঞ্জ বিয়ারার সার্টিফিকেট।¹ আগে জনসাধারণের জন্য ফরেন এক্সচেঞ্জ (বৈদেশিক মুদ্রা) রাখার অনুমতি ছিল না। পরিণামে কারো যখন ফরেন এক্সচেঞ্জের প্রয়োজন হত তখন তাতে বহু আইনি জটিলতা দেখা দিত। এ অবস্থার এক ক্ষতি ছিল, মানুষ অবৈধ মাধ্যমে ফরেন এক্সচেঞ্জ লাভ করত এবং নিজের কাছে রাখত। দ্বিতীয় ক্ষতি ছিল, লোকজন বাইরে থেকে ফরেন এক্সচেঞ্জ যেমন ডলার আনত, কিন্তু সে সরকারকে প্রদান করত না। অথচ সরকারের তা প্রয়োজন। সুতরাং তাকে আইনগত বৈধতা দিয়ে লোকদের থেকে ঋণ হিসেবে ফরেন এক্সচেঞ্জ নেয়ার জন্য যে সনদ সরকার জারি করে, তাকে 'ফরেন এক্সচেঞ্জ বিয়ারার সার্টিফিকেট' (F.E.B.C) বলে। এর পদ্ধতি হল, সরকার ডলার নিয়ে তখনকার মূল্য অনুযায়ী দেশীয় টাকার সার্টিফিকেট জারি করে দেয়। যেমন এখন ডলারের মূল্য পঁচিশ² টাকা। বাইরে থেকে কেউ একশ ডলার নিয়ে আসল। সরকার তার থেকে একশ ডলার নিয়ে তাকে দুই হাজার পাঁচশ দেশীয় টাকার সার্টিফিকেট জারি করবে। যার অর্থ হবে সরকার সার্টিফিকেটধারীর কাছে দেশীয় আড়াই হাজার টাকা ঋণী।
এফ.ই.বি.সি.এর উপর বার্ষিক শতকরা বার ভাগ হারে বর্ধিত পাওয়া যায়। গ্রাহক যখন ইচ্ছা এ সার্টিফিকেট পেশ করে পুনরায় ডলার নিতে পারে। আবার সে এ সার্টিফিকেট বিক্রিও করতে পারে। এগুলো সব সরকারি দলিল। এর মধ্যে আসল লেনদেন তো সরকার ও ঋণদাতার (সার্টিফিকেটধারী) মধ্যে হয়। কিন্তু জনসাধারণের সুবিধার জন্য তাকে বিক্রিরও অবকাশ দেয়া হয়েছে। পুঁজি বাজারে (Financial Market) তার ক্রয়-বিক্রয় হয়। সনদধারী যখন এটা বিক্রি করে দেবে তখন আর সে ঋণদাতা থাকবে না। সরকারের সাথে তার লেনদেন চুকে যাবে। এখন ক্রেতা হবে ঋণদাতা এবং সরকারের লেনদেন ক্রেতার সাথে সম্পৃক্ত হবে। যেখানে শেয়ার বা ঋণের সনদাদি ইস্যুকারী ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়, সে বাজারকে 'সেকেন্ডারি মার্কেট' (Secondary Market) বলে। যে সনদের কোনো দ্বিতীয় বাজার থাকে, অর্থাৎ তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে বিক্রি করা যায়, তাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করা হয়। লোক টাকার বিনিময়ে এ সনদ নেয়ার জন্য এ কারণে বেশি আগ্রহ দেখায়, সে যখন ইচ্ছা তা সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করে নগদ টাকা লাভ করতে পারবে।
টিকাঃ
১. এগুলো পাকিস্তান সরকারের প্রবর্তিত ঋণপত্র। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ঋণপত্রগুলো হচ্ছে,
২. এ মূল্য ছিল পাকিস্তানী মুদ্রার মান অনুযায়ী। বর্তমানে বাংলাদেশী মুদ্রায় এক ডলারের মূল্য প্রায় সত্তর টাকার মত।