📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 নগদ ও অগ্রিম ক্রয়

📄 নগদ ও অগ্রিম ক্রয়


শেয়ারের ক্রয়-বিক্রয় নগদ ও অগ্রিম- এ দুভাবেই হয়। একটাকে নগদ বিক্রয় (Spot Sale) এবং অন্যটাকে অগ্রিম বিক্রয় (Forward Sale) বলে।
নগদ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে শেয়ারের বিক্রি তাৎক্ষণিক হয়ে যায় এবং অধিকারও সাথে সাথে স্থানান্তরিত হয়। ক্রেতা তখন থেকেই শেয়ার নেয়ার হকদার হয়ে যায়, কিন্তু কিছু ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অপারগতার কারণে শেয়ার সার্টিফিকেট হস্তান্তরে (ডেলিভারি) দেরি হয়। শেয়ার সার্টিফিকেট হস্তান্তর সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বিলম্বিত হয়, কিন্তু এ বিলম্ব বেশি হয় রেজিস্ট্রার্ড শেয়ার হস্তান্তরের বেলায়। যার উপর গ্রাহকের নাম লিখিত থাকে। গ্রাহকের নাম পরিবর্তনের জন্য কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হয়, এ কারণেই বিলম্ব বেশি হয়। বিয়ারার শেয়ারের বেলায় বেশি বিলম্ব হয় না। নগদ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেও যেহেতু শেয়ার হস্তগত করতে বিলম্ব হয়ে যায়, এ কারণে এখানেও ক্রেতা শেয়ার সার্টিফিকেট নিজের হাতে পাওয়ার পূর্বে অন্য জনের কাছে বিক্রি করে দেয়। কখনো হাতে আসতে আসতে তা কয়েকবার বিক্রি হয়ে যায়।
নগদ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে শেয়ার বিক্রি হওয়ার পর হস্তগত হওয়ার আগে যদি কোম্পানি মুনাফা বণ্টন করে, তাহলে কোম্পানি বিক্রেতার নামেই মুনাফা বণ্টন করে। কিন্তু রীতি এটাই, যেহেতু বিক্রি হওয়ার পর মুনাফা বণ্টন হয়েছে, তাই বিক্রেতা এ মুনাফা ক্রেতাকে দিয়ে দেয়।
অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে বিক্রি তখনি হয়ে যায়, কিন্তু প্রযুক্ত হয় ভবিষ্যতের সাথে। যেমন শেয়ার বিক্রি এখনি হয়ে গেছে কিন্তু দখল ইত্যাদির অধিকার পাবে অমুক তারিখে। অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে শেয়ার পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ আসলে তখন কোনো সময় শেয়ার ক্রেতাকে হস্তান্তর করা হয়। কোনো সময় এমনও করা হয়, বিক্রেতা ও ক্রেতা শেয়ার গ্রহণের পরিবর্তে বিক্রির তারিখের মূল্য এবং পরিশোধের তারিখের মূল্যের পার্থক্য পরস্পর সমান করে নেয়। যেমন ৩০ মার্চ পরিশোধের তারিখ নির্ধারণ করে ১ জানুয়ারি অগ্রিম বিক্রয় এবং প্রতি শেয়ার দশ টাকা মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু ৩০ মার্চ তারিখ যখন আসল তখন শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে বার টাকা হয়ে গেল। এখন বিক্রেতা ক্রেতাকে শেয়ার না দিয়ে শেয়ার প্রতি দুটাকা করে পরিশোধ করে দিল। অথবা মূল্য যদি আট টাকা হয় তাহলে ক্রেতা বিক্রেতাকে দশ টাকা দিয়ে তার থেকে শেয়ার আদায় করার পরিবর্তে তাকে শেয়ার প্রতি দুটাকা করে দিয়ে দিল এবং শেয়ার আদায় করল না। তারপর অগ্রিম বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রির তারিখের পর থেকে পরিশোধের তারিখ আসা পর্যন্ত কখনো কয়েক দফা ক্রয়-বিক্রয় হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথম ক্রেতা দ্বিতীয় ব্যক্তিকে, দ্বিতীয় ব্যক্তি তৃতীয় ব্যক্তিকে এভাবে বিক্রি করতে থাকে। আবার কখনো শেষে শেয়ার লেনদেনের পরিবর্তে মূল্যের পার্থক্য সমান করে নেয়।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 পণ্যদ্রব্যের মধ্যে নগদ ও অগ্রিম বিক্রি

📄 পণ্যদ্রব্যের মধ্যে নগদ ও অগ্রিম বিক্রি


কোনো কোনো দেশে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে যেমন শেয়ার নগদ ও অগ্রিম বিক্রি হয়, তেমনি পণ্যদ্রব্য এবং খাদ্যদ্রব্যও নগদ ও অগ্রিম বিক্রয় হয়। এ বিক্রয় নির্বাচিত কিছু বড় বড় পণ্যের বেলায় হয়ে থাকে। যেমন গম, কার্পাস ইত্যাদি।
দ্রব্যের নগদ বিক্রি হচ্ছে, কোনো বস্তু এখনি বিক্রি হল এবং অধিকারও স্থানান্তরিত হল। আর ক্রেতা এখন থেকেই তা দখলের হকদার হিসেবে স্বীকৃতি পেল। কোনো ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অপারগতার কারণে দখলে বিলম্ব হওয়া ভিন্ন কথা, কিন্তু সে দখলের অধিকারী হয়ে গেছে।
অগ্রিম বিক্রি হচ্ছে, বিক্রি হয়ে গেল ঠিক, কিন্তু দখলের জন্য ভবিষ্যতের কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়। আইনগতভাবে তাকে Forward Sale এবং Future Saleও বলে। কিন্তু আজকাল কার্যত এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য হয়। অগ্রিম বিক্রির মধ্যে উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য যদি নির্দিষ্ট তারিখে নেয়া দেয়াই হয় অর্থাৎ ক্রেতার উদ্দেশ্য দ্রব্য উসুল করা এবং বিক্রেতার উদ্দেশ্য মূল্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাকে Forward Sale বলে। আর যদি উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট তারিখে নেয়া দেয়া না হয়; বরং দ্রব্যকে শুধু লেনদেনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাকে Future Sale বলে। আরবীতে তাকে ‘ مستقبلیات’ বলে। এর মধ্যে দ্রব্য গ্রহণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য এ দুটো বিষয়ের যে কোনো একটা।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ফটকাবাজি (Speculation)

📄 ফটকাবাজি (Speculation)


নির্ধারিত তারিখে পণ্যদ্রব্য লেনদেনের পরিবর্তে মূল্যের পার্থক্য সমান করে মুনাফা অর্জন করা হয়। যেমন ১ ডিসেম্বরে চুক্তি স্থির হল, ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাস একলাখ টাকা মূল্যে প্রদান করতে হবে। কিন্তু না বিক্রেতার উদ্দেশ্য থাকে কার্পাস প্রদান করার না ক্রেতার উদ্দেশ্য থাকে কার্পাস নেয়ার; বরং নির্ধারিত তারিখ আসলে দুজনেই পরস্পর লাভ ক্ষতি সমান ভাগ করে নেয়। যদি ১ জানুয়ারি একশ গাঁটের মূল্য এক লাখ দশ হজার টাকা হয়ে যায়, তাহলে বিক্রেতা ক্রেতাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি শেষ করে ফেলবে। আর ১ জানুয়ারি যদি মূল্য নব্বই হাজার টাকা হয়ে যায় তাহলে বিক্রেতা ক্রেতা থেকে দশ হাজার টাকা আদায় করে চুক্তি শেষ করবে।
২. Future Sale-এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল, সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করা। তাকে Hedging আরবীতে ‘تأمين ضد الخسارة’ বলা হয়। এর সারকথা হল, কেউ কোনো পণ্য আগাম ক্রয় (Forward Sale) করে এবং প্রকৃতপক্ষে পণ্য গ্রহণ করাই তার উদ্দেশ্য থাকে, ফটকাবাজি উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু ক্রেতা আশংকা বোধ করে, নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত এ পণ্যের মূল্য কমে গেলে তার ক্ষতি হবে। সে এ ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য ঐ পণ্য Future Market-এ সে তারিখের জন্য Future-এর উপর বিক্রি করে দেয়। যাতে পণ্যের মূল্য যদি কমে যায় তাহলে প্রথম লেনদেনে যত ক্ষতি হবে তত দ্বিতীয় লেনদেনে উসুল হয়ে যায়।
যেমন যায়েদ ১ ডিসেম্বর একশ গাঁট কার্পাস এক লাখ টাকা দিয়ে ক্রয় করল। ১ জানুয়ারি হস্তগত হওয়ার সিদ্ধান্ত হল। তার আশা, ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাস নিয়ে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করবে, কিন্তু আশংকা হল, ১ জানুয়ারি কার্পাসের মূল্য কমে গেলে তার ক্ষতি হয়ে যাবে। যায়েদ এ ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য একশ গাঁট কার্পাস ১ জানুয়ারি পর্যন্ত Future মার্কেটে খালেদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দিল। এখন ১ জানুয়ারি একশ গাঁট কার্পাসের মূল্য যদি নব্বই হাজার টাকা হয়ে যায়, তাহলে যায়েদের দশ হাজার টাকা ক্ষতি হবে, কিন্তু এ পরিমাণ গাঁট যেহেতু সে খালেদের কাছে Futures মার্কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। এ কারণে ১ জানুয়ারি সে নব্বই হাজার টাকায় অন্য গাঁট খরিদ করে খালেদের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করবে। এভাবে প্রথম লেনদেনে যায়েদের যে দশ হাজার ক্ষতি হয়েছিল তা সে খালেদের সাথে কৃত লেনদেনের মাধ্যমে আদায় করে নিল। এভাবে 'ফিউচার সেল' ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যও হয়ে থাকে, তাকে হেজিং (Hedging) বলে। Futures ইত্যাদির কারবার কোনো কোনো দেশে স্টক এক্সচেঞ্জেই হয় আবার কোনো কোনো দেশে তার জন্য ভিন্ন বাজার থাকে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 (Options) الخيارات

📄 (Options) الخيارات


কোনো বিশেষ পণ্য বিশেষ মূল্যে বিক্রয় বা ক্রয়ের অধিকার প্রদানকে 'خيارات' (Options) বলে। এক ব্যক্তি অন্য একজনের কাছে অঙ্গীকার করে, যদি তুমি চাও তাহলে আমি অমুক পণ্য এত দামে এত সময়ের মধ্যে ক্রয় করার চুক্তি করতে পারি। তুমি যখন ইচ্ছা বিক্রি করতে পার, তাকে বিক্রির অপশন বলে। Option-দাতা এ অধিকার দেয়ার কারণে ফিস গ্রহণ করে। Option-দাতা নির্ধারিত মেয়াদের ভিতর ঐ পণ্য নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য, কিন্তু Option গ্রাহক বিক্রি করতে বাধ্য নয়। তেমনি এর বিপরীতে কখনো এক ব্যক্তির সাথে অঙ্গীকার করে, আমি তোমার কাছে অমুক পণ্য অমুক তারিখ পর্যন্ত এত মূল্যে বিক্রি করার চুক্তি করছি। এ তারিখ পর্যন্ত তুমি যখন ইচ্ছা আমার থেকে এ দামে এ পণ্য কিনে নিতে পার, এটা ক্রয়ের অপশন। Option- কারেন্সির উপরও হয় আবার পণ্যের উপরও হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, Option-দাতা গ্রহীতাকে ঐ কারেন্সি বা পণ্যের মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির ব্যাপারে নিশ্চিত করে এবং এ নিশ্চয়তা দেয়ার বিপরীতে সে কমিশন নেয়। যেমন এক লোক পঁচিশ টাকা দিয়ে একটি ডলার ক্রয় করল। সে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, যদি এটা নিজের কাছে রাখি তাহলে তার মূল্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার যদি এখনি বিক্রি করে দেই তাহলে ভবিষ্যতে এর মূল্য বেড়ে গেলে লাভ থেকে বঞ্চিত হব। এখন অন্য এক ব্যক্তি তাকে নিশ্চয়তা প্রদান করে বলল, ডলার তোমার কাছে রাখ। আমি তোমার সাথে অঙ্গীকার করছি, তিন মাস পর্যন্ত আমি এ ডলার পঁচিশ টাকায় ক্রয় করব, আর এ অঙ্গীকারের বিনিময়ে এত টাকা ফিস নেব। এ কারণে সে ব্যক্তি মূল্য হ্রাস পাওয়ার আশংকা থেকে নিশ্চিত থাকবে। আর যদি মূল্য বৃদ্ধি পায় তাহলে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবে। মূল্য কমে গেলে Option বিক্রেতাকে পঁচিশ টাকায় বিক্রি করে দেবে।
Option-কে স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক পণ্য মনে করা হয়। এর অগ্রিমও বিক্রি হয়ে যায়। এ কারবার অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে হচ্ছে। আর এর প্রক্রিয়াও দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00