📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 সম্পদ উৎপাদনের উপর ব্যবস্থাত্রয়ের সামগ্রিক প্রভাব

📄 সম্পদ উৎপাদনের উপর ব্যবস্থাত্রয়ের সামগ্রিক প্রভাব


উপরে সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র ও ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের সংক্ষিপ্ত একটা পরিচয় বিধৃত হয়েছে। অর্থনীতির উপর এ তিন ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রভাব অত্যন্ত দীর্ঘ এক আলোচনার বিষয়। এখানে তার দিকে শুধু ইঙ্গিতই করা যেতে পারে। পেছনে আলোচনা করা হয়েছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের প্রেরণাকে একেবারে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়ার ফলে কী অনিষ্ট সৃষ্টি হয়। এসব অনিষ্ট অর্থনৈতিকও আবার নৈতিকও। সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণাকে একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে। ফলে উৎপাদনের পরিমাণ (Quantity) ও গুণগত মান (Quality) উভয়ের মধ্যে ঘাটতি দেখা দেয়। কারণ সমাজতন্ত্রে প্রত্যেক কর্মীই নির্ধারিত মজুরি পায়। এ কারণে কাজের প্রতি তার ব্যক্তিগত উৎসাহ থাকে না। যেটা তাকে কার্যক্রম সুন্দর করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
বাংলাদেশে এবং পাকিস্তানে একবার বিভিন্ন শিল্প জাতীয় মালিকানায় প্রত্যর্পণ করা হয়েছিল। এটা ছিল সমাজতান্ত্রিক প্রপাগান্ডারই পরিণাম। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাতীয় মালিকানায় নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যেতে থাকে। অবশেষে পুনরায় আবার সেগুলো ব্যক্তিমালিকানায় প্রদান করা হচ্ছে। এর জন্য আজকাল ব্যক্তিমালিকানাকরণ (Privatization) পরিভাষা ব্যবহার হচ্ছে।
রাশিয়ায় এ অবস্থাই হয়েছে। সেখানে উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগত মান এত নিচে নেমে গেছে, যাতে দেশ দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তো পরে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়েছে। কিন্তু এর কয়েক বছর আগে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসকগণ কমিউনিজমকে সামলানোর চেষ্টা করছিল, সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্ভাচেভ তাঁর গ্রন্থ পেরেস্ট্রয়কায় (Perestroica) দেশ পুনর্গঠনের প্রোগ্রাম পেশ করেছিলেন। সে গ্রন্থে তিনি কমিউনিজমকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন নি। তবে একথার উপর খুব জোর দিয়েছেন, সমাজতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর এ নতুন ব্যাখ্যায় তিনি বার বার স্বীকার করেন, এখন আমাদের অর্থনীতিকে নতুনভাবে গঠন করার জন্য বাজার শক্তিকে (Market Forces) অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।
ইসলাম একদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগত মান বৃদ্ধির কারণ হয়। অন্যদিকে সে তার উপর এমন সব বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে যা তাকে ঐসব অর্থনৈতিক ও নৈতিক স্খলন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুদের অনুমতির আর একটা দিক হল, কোনো কারবারের মূলধন সরবরাহকারী কারবারের সমৃদ্ধি সম্পর্কে পুরোপুরি সম্পর্কহীন থাকে। কারবারে লাভ হল না ক্ষতি হল সে ব্যাপারে তার কোনো চিন্তা নেই। কারণ সে সর্বাবস্থায় নির্ধারিত হারে সুদ পাবে। তার বিপরীতে ইসলামে যেহেতু সুদ হারাম, এ কারণে কোনো কারবারে বিনিয়োগ (Financing) করার ভিত্তি শিরকাত ও মুদারাবার উপরই হতে পারে। এ অবস্থায় পুঁজি সরবরাহকারীর পূর্ণ কামনা ও চেষ্টা থাকবে, যে কারবারে সে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে তার যেন উন্নতি হয় এবং তার লাভ অর্জিত হয়। স্পষ্টত এর দ্বারা সম্পদ উৎপাদনের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 সম্পদ বণ্টনের উপর ব্যবস্থাত্রয়ের প্রভাব

📄 সম্পদ বণ্টনের উপর ব্যবস্থাত্রয়ের প্রভাব


সমাজতন্ত্র শুরুতে সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে দাবি করেছিল, পরিকল্পিত অর্থনীতিতে আয়ের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। যার অর্থ ছিল, সকল ব্যক্তির আয় সমান হবে, কিন্তু এটা ছিল শুধু এক কাল্পনিক স্বপ্ন। পরবর্তীতে কার্যত কখনো সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি শুধু তাই নয়; বরং তাত্ত্বিকভাবেও সাম্যের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। সেখানেও মজুরির মধ্যে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। মজুরি নির্ধারণ যেহেতু পুরোটাই সরকার করত, তাই এ ব্যাপারে একজন সাধারণ শ্রমিকের কোনো হাত ছিল না। এ মজুরি নির্ধারণ যদি তার কাছে অন্যায্য মনে হত, তাহলে তার বিরুদ্ধে মুখ খোলারও কোনো অবকাশ ছিল না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অন্তত এতটুকু সুযোগ আছে, শ্রমিক যদি তার মজুরি বৃদ্ধি করাতে চায় তাহলে সে কেবল আওয়াজ তুলতে পারবে তাই নয়; বরং দাবি জানানোর অন্যান্য মাধ্যম যেমন হরতাল ইত্যাদিও অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে এ ধরনের আওয়াজ তোলা বা দাবি আদায়ের মাধ্যম অবলম্বন করারও কোনো অবকাশ নেই। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কার্যত শ্রমিকের বিশেষ কোনো উপকার হয় নি। বরং শেষে পরিণতি দাঁড়াল যে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্রমিকদের তুলনায়ও নিচে নেমে গেল। অবশেষে মানুষ বিরক্ত হয়ে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে পালায়ন করেছিল, তাকেই পুনরায় স্বাগত জানায়। এ পরিণাম সেসব দেশে বেশি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যেখানে একই দেশের কিছু অংশ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে আর কিছু অংশ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে ছিল। যেমন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি। পশ্চিম জার্মানি উন্নতি করে কোথায় চলে গেছে। তার তুলনায় পূর্ব জার্মানি থেকে গেছে অনেক পেছনে। সেখানকার শ্রমিকদের অবস্থাও পশ্চিম জার্মানির তুলনায় শোচনীয় ছিল। এমনকি লোকেরা অতিষ্ঠ হয়ে বার্লিন প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে এবং কার্যত সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেয়। তবে তার অর্থ এটা নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ বণ্টন বাস্তবিকই সুষম ছিল। প্রকৃত ব্যাপার হল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার যেসব দোষ-ত্রুটির বিরোধিতায় সমাজতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, সেগুলো অনেকাংশে আজও বিদ্যমান রয়েছে। ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের প্রেরণাকে বেপরোয়া ছেড়ে দেয়ায় আজও একচেটিয়া ইজারাদারি জন্ম নেয়। সুদ, জুয়া এবং হুন্ডির বাজার এখনো গরম। যার পরিণতিতে হাজার হাজার জনগণের সম্পদ নিংড়ে নিংড়ে কতিপয় ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। জনগণের কুপ্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে তার থেকে অর্থ উপার্জনের কাজ এখনো অব্যাহত আছে। বহু পুঁজিবাদী দেশে লাখ লাখ লোক এমন আছে যার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। শীতের রাতে রেল স্টেশনের ঠাণ্ডা মাটিতে আশ্রয় নেয়।
এ অবস্থার দায়-দায়িত্ব অনেকখানি পতিত হয় সুদ, জুয়া ও হুন্ডির উপর। জুয়া ও হুন্ডির ব্যাপার তো পরিষ্কার, এর মাধ্যমে বহু মানুষের পুঁজি গড়িয়ে গড়িয়ে কোনো এক ব্যক্তির পকেটে জমা হয়, কিন্তু সুদের কারণে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয় সেদিকে সাধারণত দৃষ্টি দেয়া হয় না। অথচ সুদ সর্বাবস্থায় সম্পদ বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। কারণ যে ব্যক্তি অন্য কারো থেকে ঋণ গ্রহণ করে কারবার চালায়, যদি তার কারবারে লোকসান হয় তাহলে ঋণদাতা যেকোনো অবস্থায় তার সুদের দাবি অব্যাহত রাখে; বরং সুদ চক্র বৃদ্ধি হারে বেড়ে তার পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ অনেক মোটা অংকে উপনীত হয়। এভাবে ঋণগ্রহীতা পুরোপুরি লোকসানের মধ্যে থাকে আর ঋণদাতা থাকে পুরোপুরিভাবে লাভের মধ্যে। অন্যদিকে যে বৃহৎ পুঁজিপতি ব্যাংক থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে বৃহদায়তনের কারবার পরিচালনা করে তার কারবারে বিপুল পরিমাণ লাভ হয়। সে তার খুব সামান্য অংশ সুদ আকারে ব্যাংককে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে আমানতকারী জনগণকে প্রদান করে। আর বাকি সমস্ত লভ্যাংশ সে নিজে রেখে দেয়। এভাবে উভয় অবস্থায় সম্পদ বণ্টন হয় বৈষম্যপূর্ণ।
বিষয়টি একটা সরল দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝার প্রয়োজন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অধিকাংশ সময় এমন হয়, এক ব্যক্তি কোনো কারবারে তার নিজের পকেট থেকে শুধু দশ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করল আর বাকি নব্বই লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করল। এভাবে সে মোট এক কোটি টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করল। এত বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে যখন ব্যবসা করা হবে তখন তার লাভও হবে অনেক বেশি। মনে করুন, কারবারে পঞ্চাশ শতাংশ লাভ হল। সুতরাং এক কোটি টাকায় হয়ে গেল দেড় কোটি টাকা। এখন পুঁজিপতি পঞ্চাশ লাখ মুনাফা থেকে মাত্র পনের লাখ টাকা সুদ হিসেবে ব্যাংককে প্রদান করবে। এর মধ্য থেকে ব্যাংক তার নিজের মুনাফা রেখে সর্ব্বোচ্চ দশ থেকে বার লাখ টাকা সেসব জনগণের মধ্যে বণ্টন করবে যাদের আমানত তার কাছে জমা রয়েছে।
যার নিরেট ফল হল এই, এ কারবারে যে শত শত মানুষ নব্বই লাখ টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল এবং যাদের পুঁজিই প্রকৃতপক্ষে এত বিপুল পরিমাণের মুনাফা অর্জন সম্ভব করেছে তাদের মধ্যে বণ্টিত হল মাত্র দশ বার লাখ টাকা। আর যে পুঁজিপতি সর্বমোট দশ লাখ টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল, কারবারের মুনাফা হিসেবে সে পেল পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা। তারপর মজার ব্যাপার হল, এ পনের লাখ টাকা যা ব্যাংককে প্রদান করা হল এবং ব্যাংকের মাধ্যমে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছল তাকে পুঁজিপতি তার শিল্পদ্রব্যের উৎপাদন খরচের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। যা অবশেষে তার নিজের উপর পড়ে না; বরং সাধারণ ভোক্তাদের উপর গিয়ে পড়ে। কারণ এ কারবারে সে যে দ্রব্য প্রস্তুত করেছে তার মূল্য নির্ধারণের সময় ব্যাংককে প্রদত্ত সুদের টাকাও মূল্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এভাবে মূলত তার নিজের পকেট থেকে কিছুই ব্যয় হল না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্ঘটনা ইত্যাদির কারণে যদি কারবারে লোকসান হয় তাহলে এ লোকসানের ক্ষতিপূরণ করিয়ে নেয়া হয় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মাধ্যমে।
আর এ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছেও জমা থাকে এমন হাজার হাজার জনগণের টাকা, যারা মাসে মাসে বা বছরে বছরে নিজের উপার্জনের একটা অংশ কোম্পানিতে জমা করাতে থাকে। কিন্তু তাদের কোনো ব্যবসা কেন্দ্রে আগুনও লাগে না বা অন্য কোনো দুর্ঘটনাও ঘটে না। একারণে সাধারণত তারা টাকা জমাই রাখে, উত্তোলনের সুযোগ হয় খুবই কম।
অপরদিকে যদি এ ধরনের বহু পুঁজিপতি কোনো বড় ধরনের ক্ষতির কারণে তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারে এবং এর পরিণামে ব্যাংক দেওলিয়া হয়ে যায়, তাহলে এ অবস্থায় পুঁজিপতিদের তো অল্প টাকা ক্ষতি হবে। বিপুল পরিমাণের ক্ষতি হবে সে সমস্ত আমানতকারীদের যাদের টাকা দিয়ে পুঁজিপতি কারবার পরিচালনা করে।
মোট কথা হল, এ সুদী ব্যবস্থার কারণে পুরো জাতির পুঁজি কতিপয় বড় পুঁজিপতি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে, আর তার বিনিময়ে জাতিকে প্রদান করে খুবই সামান্য অংশ। এ সামান্য অংশও দ্রব্যের উৎপাদন খরচের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে পুনরায় তা সাধারণ ভোক্তাদের থেকেই উসুল করে নেয়। নিজের লোকসানের ক্ষতিপূরণও আদায় করে জনসাধারণের সঞ্চয় থেকে। এভাবে সুদের সামগ্রিক গতি এদিকে থাকে যে, জনগণের সঞ্চয়ের ব্যবসায়িক ফায়দা বেশির ভাগ বড় পুঁজিপতির কাছেপৌঁছে। আর সাধারণ জনগণ তার থেকে উপকৃত হয় সবচেয়ে কম। এভাবে সম্পদের গতি প্রবাহ সবসময় উপরের দিকে অর্থাৎ বড় বড় পুঁজিপতির দিকেই থাকে।
দুঃখজনক হল, যখন থেকে পৃথিবীতে শিল্প বিপ্লব সূচিত হয়েছে তখন থেকে কোনো দেশ এমন দৃষ্টান্ত পেশ করতে পারে নি, যেখানে শিল্প বাণিজ্যের উন্নয়নের সাথে সাথে ইসলামের অর্থনৈতিক বিধানও পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। এ কারণে কোনো বাস্তব নমুনার উদ্ধৃতি দিয়ে একথা বলা যায় না যে ইসলামের শিক্ষার উপর আমল করলে কিভাবে সম্পদ বণ্টনে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু খাঁটি দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করলে এ ফলাফলে পৌঁছতে বিলম্ব হবে না যে, ইসলামী শিক্ষার উপর আমল করলে সম্পদের বণ্টন ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সুষম হবে। কেবল সুদ হারাম হওয়ার বিষয় নিয়ে চিন্তা করলেও একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে। কারণ সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর কোনো কারবারে পুঁজি বিনিয়োগ কেবল লাভ লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই হতে পারে। আর তার ফলাফল দাঁড়াবে এরূপ, যদি অর্থ গ্রহণকারীর লোকসান হয় তাহলে অর্থ সরবরাহকারীও তাতে শরিক করবে। আর যদি লাভ হয় তাহলে অর্থ সরবরাহকারী সে লাভের শতকরা নির্দিষ্ট হারের হকদার হবে।
সুতরাং উপরোল্লিখিত উদাহরণে যদি পুঁজিপতি ব্যাংক থেকে নব্বই লাখ টাকা নেয়ার সময় শিরকাত বা মুদারাবার ভিত্তিতে লেনদেন করে এবং তার ও ব্যাংকের মধ্যে যদি ষাট শতাংশ ও চল্লিশ শতাংশ হারও ধার্য হয়, তাহলে পঞ্চাশ লাখ মুনাফার মধ্যে কমপক্ষে বিশ লাখ তার ব্যাংককে প্রদান করতে হবে। ব্যাংককে প্রদেয় মুনাফা যেহেতু দ্রব্য বিক্রির পরে নির্ধারিত হবে, এ কারণে তা দ্রব্যের উৎপাদন খরচের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে মূল্যের মাধ্যমে জনগণ থেকে উসুল করা যাবে না।
তারপর এভাবে পুঁজিপতির যে মুনাফা অর্জিত হবে তার মধ্য থেকেও যাকাত সাদাকাহ ইত্যাদির মাধ্যমে একটা বিরাট অংশ সে গরিব জনগণের দিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হবে। এর সুস্পষ্ট ফলাফল হল, সম্পদের প্রাচুর্য প্রবাহ কতিপয় পুঁজিপতির স্থলে দেশের সাধারণ জনগণের দিকে যাবে। যে জনগণের সঞ্চয় দ্বারা দেশের শিল্প বাণিজ্য অগ্রগতি লাভ করছে, তার মুনাফায় সে অধিক হারে অংশীদার হবে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ব্যবসায়ের প্রকারভেদ (মালিকানা হিসেবে) (Different kinds of Business)

📄 ব্যবসায়ের প্রকারভেদ (মালিকানা হিসেবে) (Different kinds of Business)


সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু সব অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা সরকারি পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হয়। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ও একক প্রকৃতির ব্যবসায়ের প্রশ্নই উঠে না। সুতরাং ব্যবসায়ের শ্রেণী বিভাগের উপর এ আলোচনা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর প্রযোজ্য। মালিকানা হিসেবে ব্যবসায় তিন প্রকার :
১. একমালিকানা ব্যবসায় (Private Proprietorship)।
২. অংশীদারি ব্যবসায় (Partnership)।
৩. যৌথমূলধনী কোম্পানি (Joint Stock Company)।
যখন থেকে মানুষ কারবার করছে, তখন থেকেই প্রথম দুই প্রকারের কারবার প্রচলিত। ফুকাহায়ে কিরামও তার মৌলিক ব্যাখ্যা এবং সে সম্পর্কিত বিধান আলোচনা করেছেন। তার বর্তমান রূপ অতীত থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন নয়। এ কারণে তার বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হবে না। তবে 'কোম্পানি' কারবারের একটি নতুন প্রকার। পূর্বের ফুকাহায়ে কিরামের যুগে এর অস্তিত্ব ছিল না। তাই এখানে তার বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 সুদী ব্যাংকিংয়ের বিকল্প ব্যবস্থা

📄 সুদী ব্যাংকিংয়ের বিকল্প ব্যবস্থা


পেছনের আলোচনায় ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত ব্যবস্থার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেছে, বর্তমান ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে সুদ। এখন প্রশ্ন হল, সুদ বন্ধ করা হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনার বিকল্প পন্থা কী হবে? এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত যে প্রস্তাবনাগুলো সামনে এসেছে, নিম্নে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হল।
সুদী ব্যাংকিংয়ের বিকল্প ব্যবস্থার উপর আলোকপাত করার আগে কিছু মৌলিক বিষয় জেনে নেয়া জরুরি।
১. সুদী ব্যাংকিংয়ের বিকল্প অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য এমন হওয়া উচিৎ নয় যে, প্রচলিত ব্যাংক যত কাজ যে প্রক্রিয়ায় করে চলেছে তার সব কাজ কমবেশি সে প্রক্রিয়ায় সম্পাদন করতে হবে এবং তার উদ্দেশে কোনো পার্থক্য হতে পারবে না। কেননা, এখন পর্যন্ত যা কিছু হয়ে আসছে যদি তাই করতে হয়, তাহলে 'বিকল্প ব্যবস্থার' কোনো প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না।
বরং 'বিকল্প'-এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বর্তমান বাণিজ্যিক পরিবেশে ব্যাংকের জন্য যে কাজ জরুরি বা উপকারী, তা সম্পাদন করার জন্য এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করা যা শরীয়তের মূলনীতির গণ্ডির মধ্যে থাকে, যা দ্বারা শরীয়তের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়। আর যে কাজ শরয়ী মূলনীতির আলোকে জরুরি বা উপকারী নয় এবং যাকে শরয়ী মূলনীতি অনুযায়ী সাজানো যায় না, তা থেকে দূরে থাকা।
২. যেহেতু সম্পদ বণ্টনের পুরো ব্যবস্থার উপর সুদ নিষিদ্ধের প্রভাব পড়ে, তাই এ আশা করাও ভুল যে, সুদের শরয়ী বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর করলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের লাভের হার তাই থাকবে যা এখন সুদী ব্যবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে; বরং বাস্তব হল, যদি ইসলামী বিধান সঠিকভাবে কার্যকর করা হয় তাহলে এ অনুপাতের মধ্যে বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে; বরং এ পরিবর্তন একটি দৃষ্টান্তমূলক ইসলামী অর্থনীতির জন্য অপরিহার্যভাবে কাম্য।
৩. বর্তমানে ব্যাংক যে সেবা প্রদান করে তন্মধ্যে এ বিষয়টা উপকারী; বরং বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে জরুরি, সে মানুষের বিক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয়কে একত্র করে তা শিল্প ও বাণিজ্যে ব্যবহার করার মাধ্যম হয়। এ সঞ্চয় যদি মানুষের পকেটে পড়ে থাকত তাহলে তা দ্বারা শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণে কোনো ফায়দা পাওয়া যেত না। বলাবাহুল্য, সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশ অলস পড়ে থাকা শরীয়তের দৃষ্টিতেও কাম্য নয় এবং অর্থনৈতিকভাবেও তাকে কল্যাণকর বলা যায় না।
কিন্তু এ সঞ্চয়কে শিল্প ও বাণিজ্যে ব্যবহার করার জন্য যে পন্থা প্রচলিত ব্যাংক অবলম্বন করেছে, তা ঋণের পন্থা। সুতরাং এ প্রতিষ্ঠান পুঁজিপতিদের উৎসাহিত করে, সে অন্যের আর্থিক উপকরণগুলো নিজের লাভের জন্য এমনভাবে ব্যবহার করবে যাতে ঐ উপকরণ থেকে উৎপাদিত সম্পদের বেশিরভাগ অংশ তার নিজের কাছেই জমা থাকে এবং পুঁজির আসল মালিকরা উপরে উঠার যথাযথ সুযোগ না পায়।
সুতরাং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংক হল শুধু এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা টাকার লেনদেন করে। এ টাকা দ্বারা যে কারবার হচ্ছে তার লাভ কত আর এর দ্বারা কার উপকার হচ্ছে আর কার ক্ষতি হচ্ছে- এর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
ইসলামী বিধানের আলোকে ব্যাংক এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবশিষ্ট থাকতে পারে না যার কাজ শুধু অর্থের লেনদেন করা। তার পরিবর্তে তাকে এমন এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বানাতে হবে, যে বিভিন্ন মানুষের সঞ্চয় একত্র করে তা সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে। আর যেসব লোকের সঞ্চয় সে জমা করবে তারা সবাই সরাসরি সে ব্যবসার অংশীদার হবে। তাদের লাভ ক্ষতি সে ব্যবসার লাভ ক্ষতির সাথে সংশ্লিষ্ট হবে, যা তাদের পুঁজি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সুতরাং সুদী ব্যাংকিংয়ের বিকল্প যে ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হবে তার উপর এ আপত্তি করা উচিৎ নয় যে, ব্যাংক তার পূর্বের অবস্থান শেষ করে দিয়ে একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কেননা, যার কারণে বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা হচ্ছে সে প্রয়োজন এ ছাড়া পূর্ণ হতে পারে না।
৪. চতুর্থ কথা হল, শত শত বছর ধরে জেঁকে বসা কোনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে তার স্থলে অন্য একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করতে গেলে সর্বদা সমস্যা একটু হবেই, কিন্তু ব্যবস্থার পরিবর্তন যদি জরুরি হয় তাহলে শুধু এ সমস্যার উপর ভিত্তি করে নতুন ব্যবস্থা অগ্রহণযোগ্য বলে স্থির করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। এ অবস্থায় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হয়। সমস্যার ভয়ে পিছপা হওয়া যায় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00