📄 নৈতিক বিধি-নিষেধ
যেমন পেছনে বলা হয়েছে, খাঁটি অর্থে ইসলাম কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নাম নয়; বরং একটি দ্বীন বা জীবনবিধানের নাম। এ দ্বীনের শিক্ষা এবং বিধান জীবনের অন্যান্য বিভাগের ন্যায় অর্থনীতি সম্পর্কেও অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দ্বীনের শিক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তা থেকে অর্জিত বৈষয়িক উপকার মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। কুরআন ও হাদীসে সকল জোর একথার উপর দেয়া হয়েছে, পার্থিব জীবন সীমিত কয়েকদিনের জীবনমাত্র। এরপর এমন এক অনন্ত জীবন আসবে যার কোনো শেষ নেই। মানুষের মূল কাজ হল তার পার্থিব জীবনকে সেই পরকালীন জীবনের জন্য সোপান বানানো। সেখানকার সুখের চিন্তা করা। সুতরাং অন্যের তুলনায় চার পয়সা বেশি উপার্জন করা মানুষের আসল সফলতা নয়; বরং তার সফলতা হল, পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে বেশি বেশি সুখ- শান্তির ব্যবস্থা করা। যার পথ হচ্ছে পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় এমন কাজ করা যা তার জন্য সর্বাধিক নেকী ও সওয়াবের কারণ হয়।
যখন মানুষের মধ্যে এ মানসিকতা সৃষ্টি হয় তখন তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয় শুধু এটা থাকে না যে, কোন্ অবস্থায় কেমন করে আমার আলমারি বেশি পূর্ণ হবে। বরং কখনো তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এ ভিত্তিতেও হয়, কোন্ কাজে আমার আখেরাতের লাভ বেশি হবে। এভাবে অনেক ব্যাপারে শরীয়ত কোনো অবশ্য পালনীয় নির্দেশ (Mandatory Order) দেয় নি বটে। তবে কোনো বিশেষ বিষয়ের পরকালীন ফযীলত মর্যাদার কথা বর্ণনা করেছে, যা একজন মুমিনের জন্য অনেক বড় আকর্ষণের কারণ। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেই নিজের উপর অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নেয়। নৈতিক নিষেধাজ্ঞা দ্বারা আমার উদ্দেশ্য এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা।
এর একটি সরল দৃষ্টান্ত হল, এক ব্যক্তির কাছে পুঁজি বিনিয়োগের দুটি পথ আছে। একটি হল, সে তার পুঁজি কোনো বৈধ বিনোদনমূলক কিন্তু ব্যবসায়িক প্রকল্পে খাটাতে পারে। এর মধ্যে তার অধিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় হল, সে এ পুঁজি গৃহহীন লোকদের জন্য বাড়ি নির্মাণ করে সস্তায় বিক্রি করার কাজে ব্যয় করতে পারে। এতে তুলনামূলক কম লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। একজন সেক্যুলার চিন্তাধারার মানুষ অবশ্যই প্রথম পথ গ্রহণ করবে। কেননা, তাতে লাভ বেশি। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্ত রে পরকালের চিন্তা গ্রথিত সে পথের বিপরীত এ চিন্তা করবে, যদিও আবাসন প্রকল্পে আর্থিক লাভ তুলনামূলক কম, কিন্তু গরীব মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করে নিজের জন্য পরকালে বেশি সওয়াব লাভ করতে পারি। এ জন্য আমাকে বিনোদনমূলক প্রকল্প গ্রহণ না করে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিৎ।
এখানে যদিও উভয় পথই শরয়ীভাবে বৈধ ছিল, কোনোটার উপরই কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, কিন্তু পরকালীন বিশ্বাসনির্ভর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ঐ ব্যক্তির অন্তরে এক অভ্যন্তরীণ বাধা সৃষ্টি করে দিয়েছে। যা দ্বারা প্রয়োজনের উত্তম অগ্রগণ্যতা নির্বাচন এবং উত্তম উপকরণ নির্দিষ্টকরণ বিধি কার্যকর হয়েছে। এটা একটা ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু যদি প্রকৃতপক্ষেই কারো অন্তরে ইসলামের পরকালীন বিশ্বাস পরিপূর্ণভাবে বদ্ধমূল হয়ে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকে তাহলে সে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কল্যাণে অনেক বড় অবদান রাখতে পারে।
অনৈসলামী সমাজেও নৈতিকতার একটা অবস্থান আছে, তা আমি অস্বীকার করি না। সে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরও প্রভাব ফেলে। কিন্তু যেহেতু ঐসব নৈতিক ধারণার পেছনে পরকালের মজবুত বিশ্বাস বর্তমান নেই, এ কারণে সেটা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না। পক্ষান্তরে ইসলাম তার যাবতীয় শিক্ষাসহ ব্যাপকভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর হলে অর্থনীতির উপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তার নৈতিক শিক্ষার প্রভাব পড়বে। যেমন অতীতে তার অসংখ্য জীবন্ত দৃষ্টান্ত চোখে পড়েছে। সুতরাং নৈতিক বিধি-নিষেধের এ উপাদান খাঁটি ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে কোনোক্রমেই কোনো দুর্বল উপাদান নয়; বরং তার গুরুত্ব অনেক বেশি।