📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা

📄 ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা


এবার সংক্ষিপ্তভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শন পর্যালোচনা করতে হয়। সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর পাশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে অত্যন্ত জোরেশোরে বগল বাজানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, বাস্তব জগতে যেহেতু সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অথচ ব্যাপার হল, সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশুদ্ধতা ছিল না; বরং তার কারণ ছিল, সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত ভুলগুলো সংশোধনের পরিবর্তে অন্য একটি ভুল পথ অবলম্বন করেছিল। সুতরাং এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শনগত ভুলগুলো অধিক সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝা দরকার। বস্তুত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে এতটুকু কথা সঠিক ছিল, অর্থনৈতক সমস্যা সমাধান করার জন্য ব্যাক্তগত মুনাফার প্রেরণা এবং বাজার শক্তি অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নেয়া জরুরি। কারণ এটা মানবীয় প্রকৃতির দাবি। কিন্তু ভুলটা মূলত এখানে হয়েছে, একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য লাগামহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না। সামগ্রিক কল্যাণের প্রতিও তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সুতরাং তার জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করাও বৈধ হয়ে যায় যার পরিণামে সে সর্বোচ্চ সম্পদশালী হয়ে বাজারের উপর নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একচ্ছত্র আধিপত্যের অর্থ হল, কোনো বিশেষ পণ্যের যোগান ও সরবরাহ করা কোনো এক ব্যক্তি বা এক গ্রুপের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সে ব্যক্তি বা গ্রুপ ছাড়া অন্য কেউ ঐ বস্তু উৎপাদন করতে পারে না। এ একচ্ছত্র আধিপত্যের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল, মানুষ সে বস্তু তার স্বেচ্ছাচার-নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য হয়। মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে লাগামহীন ছাড় দেয়া এবং তার উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোর দেয়ার ফলে যে অনিষ্ট পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তা সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নরূপ-
১. মুনাফা অর্জনের জন্য যেহেতু হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না, এ কারণে তার থেকে বহু নৈতিক অনিষ্ট সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। কেননা, সর্বাধিক মুনাফা উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষের নিচু প্রকৃতিকে জাগ্রত করে তার কুপ্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর উপায় উপকরণ যোগান দেয়। যা দ্বারা সমাজে নৈতিক বিকৃতি ছড়ায়। সুতরাং এটাও পাশ্চাত্য জগতের উলঙ্গপনা ও অশ্লীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সেখানে উলঙ্গ ছবি ও চলচ্চিত্রের সয়লাব বইয়ে দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ ব্যক্তিগত মুনাফার আকাঙ্ক্ষা মেটাচ্ছে। নারীরা তাদের শরীরের এক একটি অঙ্গ এ আকাঙ্ক্ষার অধীনে বাজারে বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুসারে সার্ভিসের কারবারে মডেল গার্লসের কারবার সর্বাধিক লাভজনক। যারা নিজেদের ছবি শিল্পপতিদের নিজস্ব শিল্পদ্রব্যের উপর ছাপানোর জন্য বা প্রচারের মডেল বানানোর জন্য সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে তারা অত্যন্ত চড়া মূল্য আদায় করে। এমনকি আমেরিকায় এ শ্রেণী সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, তাদের যে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করা হয় তা অবশেষে উৎপাদন-ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধে গিয়ে পড়ে। এভাবে পুরো জাতি এ সব অনৈতিকতার আর্থিক মূল্যও পরিশোধ করে।
২. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের উপর যেহেতু বিশেষ কোনো নৈতিক বিধি-নিষেধ নেই এ কারণে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টনে জনকল্যাণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। যখন অধিক মুনাফা অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারিত হয় তখন এ অধিক মুনাফা যদি উলঙ্গ ফিল্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাহলে এক ব্যক্তি বাস্তুহীন মানুষের আবাসনের জন্য অর্থ কেন ব্যয় করবে? যখন এখাতে তুলনামূলক লাভ কম।
৩. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার উপর হালাল হারামের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে সুদ, জুয়া, হুন্ডি ইত্যাদি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈধ। অথচ এগুলো এমন বস্তু যা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। যার একটা নিদর্শন হল, এর ফলে অধিক পরিমাণে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব একচেটিয়া আধিপত্য বর্তমান থাকতে বাজারের প্রাকৃতিক শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধান পঙ্গু হয়ে পড়ে, তা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। একদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাবি, আমরা বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নিতে চাই। অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দিয়ে তা একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। যা দ্বারা যোগান ও চাহিদার শক্তি অকার্যকর বা প্রভাবহীন হয়ে পড়ে।
এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হল, যোগান ও চাহিদা শক্তি অর্থনীতিতে ভারসাম্য সৃষ্টিকরণে তখনি কার্যকর হয়, যখন বাজারে স্বাধীন প্রতিযোগিতার (Free competition) পরিবেশ থাকে। কিন্তু যখন বাজারে কোনো ব্যক্তির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন মূল্যব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে না। আর অর্থনীতির চার মৌলিক সমস্যার ব্যাপারে হওয়া সিদ্ধান্ত গুলো সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন ও চাহিদার চিত্র তুলে ধরে না। এখানেও একটা কৃত্রিম ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। এক দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টা বুঝা যাক। মনে করুন, চিনির উৎপাদন প্রয়োজন মোতাবেক এ পরিমাণ হওয়া উচিৎ যাতে যোগান ও চাহিদার মাধ্যমে বাজারে তার উপযুক্ত দাম নির্ধারিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত দাম তখনি নির্ধারণ সম্ভব যখন চিনি প্রস্তুত করার জন্য বিভিন্ন কারখানা বিদ্যমান থাকে। আর ক্রেতাদের এ অধিকার থাকে, এক কারখানার চিনির দাম যদি বেশি হয় তাহলে সে অন্য কারখানা থেকে ক্রয় করতে পারবে। যদি বাজারে এ প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকে তাহলে কোনো কারখানাই দাম নির্ধারণে স্বেচ্ছাচার করতে পারবে না। এ অবস্থায় বাজারে চিনির যে দাম নির্ধারিত হবে তা প্রকৃতপক্ষে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য অনুসারে হবে এবং তা হবে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য। কিন্তু যদি একজন মাত্র ব্যক্তি চিনির কারবারের ইজারাদার বনে যায়, আর মানুষ কেবল তার থেকেই চিনি ক্রয়ে বাধ্য হয়, তাহলে তার নির্ধারিত দামে চিনি ক্রয় করা ছাড়া মানুষের কাছে আর কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় চিনির যে দাম হবে তা নিঃসন্দেহে ঐ অবস্থা থেকে বেশি হবে যখন বাজারে একাধিক চিনি সরবরাহকারী থাকবে এবং তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থাকবে। মনে করুন, স্বাধীন প্রতিযোগিতার পরিবেশে চিনির মূল্য কিলোগ্রাম প্রতি আট টাকা। একচেটিয়া পরিবেশে সেটা কিলো প্রতি দশ বা বার টাকা হতে পারে। এখন যদি মানুষ বার টাকায় চিনি ক্রয় করে তাহলে এ লেনদেন তার প্রকৃত চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এক কৃত্রিম অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে, যা এক চিনি ব্যবসায়ীর একচেটিয়া আধিপত্য দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রকৃত যোগান ও চাহিদা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয়।
সুতরাং যদিও একথা বলাটা সঠিক ছিল, যোগান ও চাহিদা শক্তির অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর অনেকাংশে সমাধান করা উচিৎ। কিন্তু এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হালাল হারামের পার্থক্য ছাড়াই যখন ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তখন সে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্ঠা করে নিজে যোগান ও চাহিদা শক্তির সঠিকভাবে কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করে। এভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি মূলনীতি কার্যত তার অন্য মূলনীতিকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
৪. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল ধারণা যদিও এমন ছিল, কায়-কারবার ও ব্যবসা বাণিজ্যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না হোক, কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর কার্যত এ মূলনীতি পুরোপুরি বহাল থাকতে পারে নি। প্রায় সকল ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ হতে থাকে। যেমন সরকার বিভিন্ন আইনের বিশেষত ট্যাক্সের মাধ্যমে কোনো ব্যবসাকে উৎসাহিত আবার কোনো ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করতে থাকে। এখন সম্ভবত এমন কোনো ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই যাতে সরকারের পক্ষ থেকে কায়-কারবার ও ব্যবসায়ের উপর কোনো না কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় না। সুতরাং সরকারের হস্তক্ষেপ না করার (Laissez Faire) মূলনীতি সঠিকভাবে পালনকারী কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সরকারের এসব হস্তক্ষেপ কখনো হয় সরকারি আমলা ও ধনীদের পরস্পর গাঁটছড়া বাধার পরিণতি। যার সুফল শুধু প্রভাবশালী পুঁজিপতিদের কাছেই পৌঁছে। এ কারণে সামগ্রিক কল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষিত হয় না। এ বিধি-নিষেধগুলো যদি সরকারি আমলা ও ধনীদের গাঁটছড়া বাধা ও দুর্নীতি থেকে মুক্তও হয়, তবুও তা খাঁটি সেক্যুলার চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার পক্ষ নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার আলোকে যে বিধি-নিষেধ উপযুক্ত মনে করে তাই আরোপ করে। অথচ নিছক বিবেক সব মানবীয় সমস্যা সমাধান করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণেই এসব বিধি-নিষেধ অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঠিক প্রতিকার হতে পারে নি।
৫. পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশেষভাবে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা বৈষম্যের শিকার থাকে। এ বৈষম্যের এক বিরাট কারণ সুদ ও জুয়া। পরিণামে সম্পদের গতি প্রবাহ ধনীদের দিকে থাকে। দরিদ্র ও জনসাধারণের দিকে থাকে না। এর ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সম্পদ বণ্টন সম্পর্কিত আলোচনায় আসবে।

টিকাঃ
১. Utopian অর্থ 'নিরাশ্রয়'। মূলত এটা একটা বইয়ের নাম। প্রাচীন কালে কোনো ল্যাটিন বা গ্রিক রাজা লেখেছিলেন। এর মধ্যে এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। যেখানে সকল বস্তু মানুষের যৌথ মালিকানাধীন। প্রত্যেক ব্যক্তি যে বস্তু ইচ্ছা নিজের চাহিদামতো বিনামূল্যে লাভ করতে পারে। কারো প্রতি কোনো বিধি-নিষেধ নেই। এটা বাস্তবায়ন যেহেতু অসম্ভব ধারণা ছিল, তাই এ শব্দটি এক কাল্পনিক স্বর্গের অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। যা লাভ করার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং যে ব্যক্তি এ ধরনের কাল্পনিক পরিকল্পনা তৈরি করে তাকে Utopian বলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00