📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 বিষয়বস্তুর পরিচিতি ও প্রয়োজনীয়তা

📄 বিষয়বস্তুর পরিচিতি ও প্রয়োজনীয়তা


এ ক্লাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আধুনিক লেনদেনগুলো যে পদ্ধতিতে বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত সে সম্পর্কে ছাত্রদের ন্যূনতম প্রাথমিক ধারণা দেয়া। যাতে এ লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা বুঝে সে ব্যাপারে শরয়ী বিধান উদঘাটন করা যায়। আপনারা জানেন, ফুকাহায়ে কিরাম বলেছেন: من جهل باهل زمانه فهو جاهل شرح عقود رسم المفتى ص: (۹۸)
-যে ব্যক্তি তার সমকালীনদের সম্পর্কে অজ্ঞ (অর্থাৎ সমকালীনদের জীবনপদ্ধতি, তাদের সামাজিক রীতিনীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের রুচি ও স্বভাব সম্পর্কে অবগত নয়), সে মূর্খ।
একজন আলেমের জন্য কুরআন হাদীসের বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া যেমন জরুরি, যুগপ্রথা এবং সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে জানাও তেমন জরুরি। এ ছাড়া শরয়ী মাসায়েলের ব্যাপারে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন না। হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান শায়বানী রাহ.-এর জীবনীতে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, ফিকাহ সংকলনের সময় তিনি নিয়মিত বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বসতেন, তাদের লেনদেন বুঝতেন। বাজারে কী ধরনের প্রথা চালু আছে তা ঘুরে ঘুরে দেখতেন।
বলাবাহুল্য, নিজে ব্যবসা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি কেবল ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক রীতিনীতি ও প্রথাগুলো জানার জন্য তাদের কাছে গিয়ে বসতেন। কারণ এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া একজন আলেম বিশেষত একজন ফকীহ ও মুফতির অত্যাবশ্যক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। যাতে তাঁর নিকট যদি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন আসে তখন যেন তিনি প্রশ্নের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভালভাবে অবগত হয়ে উত্তর দিতে পারেন।
তাছাড়া তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন না। বরং এমনও বলা হয়েছে, যখন কোনো এলাকা বা সমাজে নাজায়েয কারবার বৃদ্ধি পায়, তখন যেহেতু একজন আলেম ও মুফতি কেবল ফতোয়া প্রদানকারীই নন; বরং তিনি একজন দাঈও। তাই তাঁর কাজ এ সীমা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয় না যে, তিনি শুধু বলে দেবেন, অমুক কাজ নাজায়েয ও হারাম। বরং একজন দাঈ হিসেবে কাজটি নাজায়েয ও হারাম ঘোষণা করে তার বিকল্প হালাল পদ্ধতিও বলে দেয়া তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সে বিকল্প পদ্ধতিটি
বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে, আবার শরয়ী বিধান অনুযায়ীও হতে হবে। হযরত ইউসুফ আ. এর কাহিনী কুরআন কারীমে আলোচিত হয়েছে। তাঁর কাছে জেলখানায় যখন বাদশার পয়গام পৌঁছে এবং তাঁর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়, তখন হযরত ইউসুফ আ. সাত বছরব্যাপী দুর্ভিক্ষ আসছে- স্বপ্নের এ ব্যাখ্যা পরে বলেছিলেন। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলার আগে এ দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তিলাভের পথ নির্দেশ করেন। সুতরাং বলা হয়েছে :
فما حصدتم فذروه في سنبله الا قليلا مما تأكلون
-অতপর যা কাটবে তার মধ্যে থেকে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসমেত রেখে দেবে। (সূরা ইউসুফ: ৪৭)
এ আয়াত থেকে ইস্তিম্বাত (উদঘাটন) করা হয়েছে, হকের দাঈ কেবল হারাম কাজকে হারাম ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হবেন না বা কোনো বিপদের কথা জানিয়ে দিয়েই বসে থাকবেন না যে, এ বিপদ আসছে। বরং নিজ সাধ্যমতো তা থেকে মুক্তির পথও বলে দেবেন। আর এ পথ সম্পর্কে তখনি বলা যাবে যখন মানুষ লেনদেন ও তার স্বরূপ সম্পর্কে অবগত হবে। এ বিবেচনা থেকে আধুনিক লেনদেন সম্পর্কিত বিষয়টি তাখাসসুসের নেসাবে একটি ঘণ্টা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি মনে করা হয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতি একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে এবং এর অনেক বিশেষজ্ঞ গবেষকও রয়েছেন। এখানে পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি শাস্ত্র পড়ানো উদ্দেশ্য নয়; বরং এ শাস্ত্রের ওইসব অংশের সাথে পরিচিত করানো উদ্দেশ্য, যেগুলো একজন আলেম ও ফকীহের ফকীহ হিসেবে প্রয়োজন হয় এবং যে সম্পর্কে সচরাচর প্রশ্নও আসে ও তার উত্তর খোঁজার দরকার হয়। সাধারণত মাসআলার অনুসন্ধানী পর্যালোচনার জন্য যে বিষয়গুলো প্রয়োজন হয় সে ব্যাপারে অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ একজন আলেম অবগত থাকেন না। এ কারণে আমি নিজেই এ পাঠদানের ব্যবস্থা করেছি।

এ ক্লাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আধুনিক লেনদেনগুলো যে পদ্ধতিতে বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত সে সম্পর্কে ছাত্রদের ন্যূনতম প্রাথমিক ধারণা দেয়া। যাতে এ লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা বুঝে সে ব্যাপারে শরয়ী বিধান উদঘাটন করা যায়। আপনারা জানেন, ফুকাহায়ে কিরাম বলেছেন: من جهل باهل زمانه فهو جاهل شرح عقود رسم المفتى ص: (۹۸)
-যে ব্যক্তি তার সমকালীনদের সম্পর্কে অজ্ঞ (অর্থাৎ সমকালীনদের জীবনপদ্ধতি, তাদের সামাজিক রীতিনীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের রুচি ও স্বভাব সম্পর্কে অবগত নয়), সে মূর্খ।
একজন আলেমের জন্য কুরআন হাদীসের বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া যেমন জরুরি, যুগপ্রথা এবং সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে জানাও তেমন জরুরি। এ ছাড়া শরয়ী মাসায়েলের ব্যাপারে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন না। হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান শায়বানী রাহ.-এর জীবনীতে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, ফিকাহ সংকলনের সময় তিনি নিয়মিত বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বসতেন, তাদের লেনদেন বুঝতেন। বাজারে কী ধরনের প্রথা চালু আছে তা ঘুরে ঘুরে দেখতেন।
বলাবাহুল্য, নিজে ব্যবসা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি কেবল ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক রীতিনীতি ও প্রথাগুলো জানার জন্য তাদের কাছে গিয়ে বসতেন। কারণ এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া একজন আলেম বিশেষত একজন ফকীহ ও মুফতির অত্যাবশ্যক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। যাতে তাঁর নিকট যদি এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন আসে তখন যেন তিনি প্রশ্নের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভালভাবে অবগত হয়ে উত্তর দিতে পারেন।
তাছাড়া তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন না। বরং এমনও বলা হয়েছে, যখন কোনো এলাকা বা সমাজে নাজায়েয কারবার বৃদ্ধি পায়, তখন যেহেতু একজন আলেম ও মুফতি কেবল ফতোয়া প্রদানকারীই নন; বরং তিনি একজন দাঈও। তাই তাঁর কাজ এ সীমা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয় না যে, তিনি শুধু বলে দেবেন, অমুক কাজ নাজায়েয ও হারাম। বরং একজন দাঈ হিসেবে কাজটি নাজায়েয ও হারাম ঘোষণা করে তার বিকল্প হালাল পদ্ধতিও বলে দেয়া তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সে বিকল্প পদ্ধতিটি
বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে, আবার শরয়ী বিধান অনুযায়ীও হতে হবে। হযরত ইউসুফ আ. এর কাহিনী কুরআন কারীমে আলোচিত হয়েছে। তাঁর কাছে জেলখানায় যখন বাদশার পয়গام পৌঁছে এবং তাঁর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়, তখন হযরত ইউসুফ আ. সাত বছরব্যাপী দুর্ভিক্ষ আসছে- স্বপ্নের এ ব্যাখ্যা পরে বলেছিলেন। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলার আগে এ দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তিলাভের পথ নির্দেশ করেন। সুতরাং বলা হয়েছে :
فما حصدتم فذروه في سنبله الا قليلا مما تأكلون
-অতপর যা কাটবে তার মধ্যে থেকে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসমেত রেখে দেবে। (সূরা ইউসুফ: ৪৭)
এ আয়াত থেকে ইস্তিম্বাত (উদঘাটন) করা হয়েছে, হকের দাঈ কেবল হারাম কাজকে হারাম ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হবেন না বা কোনো বিপদের কথা জানিয়ে দিয়েই বসে থাকবেন না যে, এ বিপদ আসছে। বরং নিজ সাধ্যমতো তা থেকে মুক্তির পথও বলে দেবেন। আর এ পথ সম্পর্কে তখনি বলা যাবে যখন মানুষ লেনদেন ও তার স্বরূপ সম্পর্কে অবগত হবে। এ বিবেচনা থেকে আধুনিক লেনদেন সম্পর্কিত বিষয়টি তাখাসসুসের নেসাবে একটি ঘণ্টা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি মনে করা হয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতি একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে এবং এর অনেক বিশেষজ্ঞ গবেষকও রয়েছেন। এখানে পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি শাস্ত্র পড়ানো উদ্দেশ্য নয়; বরং এ শাস্ত্রের ওইসব অংশের সাথে পরিচিত করানো উদ্দেশ্য, যেগুলো একজন আলেম ও ফকীহের ফকীহ হিসেবে প্রয়োজন হয় এবং যে সম্পর্কে সচরাচর প্রশ্নও আসে ও তার উত্তর খোঁজার দরকার হয়। সাধারণত মাসআলার অনুসন্ধানী পর্যালোচনার জন্য যে বিষয়গুলো প্রয়োজন হয় সে ব্যাপারে অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ একজন আলেম অবগত থাকেন না। এ কারণে আমি নিজেই এ পাঠদানের ব্যবস্থা করেছি।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 অর্থনৈতিক দর্শন ও তার পর্যালোচনা

📄 অর্থনৈতিক দর্শন ও তার পর্যালোচনা


বর্তমান বিশ্বে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো প্রচলিত আছে তার মধ্যে দুটি ব্যবস্থা সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। এক. ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism), যাকে আরবীতে বলা হয় 'الرأسمالية'; দুই. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Socialism), আরবীতে যাকে বলা হয় 'الاشتراكية। এরই চূড়ান্ত রূপ সাম্যবাদ (Communism), যাকে আরবীতে বলা হয় 'الشيوعية'। বিশ্বে যত কারবার বা লেনদেন হচ্ছে, তা এ দুই ব্যবস্থার অধীনেই হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সমাজতন্ত্র যদিও একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং সে সাথে তার অর্থনৈতিক দর্শনও দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু একটি অর্থনৈতিক দর্শন হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য দর্শনের মধ্যে এখনো তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে তার সম্পর্কে জানাও জরুরি। সুতরাং সর্বপ্রথম এ দুটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিচয় তুলে ধরা হল। তারপর তার মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলো উল্লেখ করা হবে।
মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা
সর্বপ্রথম জানা প্রয়োজন অর্থনীতি কী? তার মৌলিক সমস্যাগুলো কী? আজ যাকে আমরা 'معاشیات' (অর্থনীতি) বলি, সেটা মূলত ইংরেজি শব্দ ইকোনোমিকস (Economics)-এর অনুবাদ। মূলত ইকোনোমিকসের সঠিক অর্থ 'মাআশিআত' (অর্থনীতি) নয়। বরং এর সঠিক অর্থ আরবী শব্দ 'اقتصاد' দ্বারা ব্যক্ত করা যায়। এ শব্দ থেকেই প্রতীয়মান হচ্ছে, সকল অর্থনৈতিক দর্শনে, স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, 'মানুষের অভাব ও চাহিদা মানবীয় উপকরণের তুলনায় বেশি'। আর বর্তমান অর্থনীতিতে 'অভাব' শব্দটি যখন ব্যবহার হয়, তখন 'চাহিদা' শব্দটিও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। মোট কথা, মানবীয় উপকরণ সীমিত আর তার মোকাবেলায় অভাব ও চাহিদা অনেক বেশি। এখন প্রশ্ন, সীমাহীন অভাব ও চাহিদা সীমিত উপকরণ দ্বারা কিভাবে পূরণ করা সম্ভব?
'ইকতিসাদ' ও 'ইকোনোমিকস' অর্থ হচ্ছে, সীমিত উপকরণগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে তা দ্বারা যতদূর সম্ভব বেশি প্রয়োজন
মেটানো যায়। এ কারণে অর্থনীতি শাস্ত্ৰকে ইংরেজিতে 'ইকোনোমিকস' এবং আরবীতে 'ইকতিসাদ' বলা হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রত্যেক অর্থনৈতিক দর্শনে কিছু মৌলিক সমস্যা থাকে যা সমাধান না করে সে অর্থনীতি চলতে পারে না। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, এ মৌলিক সমস্যা চারটি।
এক. প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ (Determination of Priorities)
প্রথম সমস্যা যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ' বলা হয়, তার সারকথা হল, মানুষের অভাব ও চাহিদা অগণিত, কিন্তু তার তুলনায় উপকরণ সীমিত। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, এ সীমিত উপকরণ দ্বারা সকল অভাব ও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। অতএব কিছু অভাব ও চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আর কিছুকে পেছনে রাখতে হবে। কিন্তু কোন অভাবটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং কোন অভাবটিকে পেছনে রাখতে হবে এটা একটা জটিল প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। 'যমন আমার কাছে পঞ্চাশ টাকা আছে। এ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আটা চালও কিনতে পারি, কাপড়ও কিনতে পারি। আবার কোনো হোটেলে বসে 'সৌখিন খাবার খেয়েও ব্যয় করতে পারি। এ চার পাঁচটি অপশন (options) আমার সামনে আছে। এখন আমি এ পঞ্চাশ টাকা এসবের মধ্যে থেকে কোন কাজে ব্যয় করব? একে বলা হয় 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ'।
এ সমস্যা যেমন একজন মানুষের জীবনে দেখা দেয় ঠিক তেমনি পুরো দেশ এবং রাষ্ট্রের জীবনেও দেখা দেয়। যেমন মনে করুন, কোনো দেশের কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, কিছু মানব সম্পদ আছে, কিছু খনিজ সম্পদ আছে, কিছু উৎপাদিত সম্পদ আছে। এসব উপকরণ সীমিত। তার তুলনায় 'অভাব ও চাহিদা সীমাহীন। এখন নির্ধারণ করতে হবে, এসব উপকরণ কোন কাজে ব্যয় করা হবে, কোন জিনিসের উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে? এ বিষয়টির নামই 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ'।
দুই. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (Allocation of Resources)
দ্বিতীয় সমস্যা হল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। আমাদের কাছে উৎপাদনের উপকরণ, অর্থাৎ মূলধন, শ্রম, ভূমি আছে। এগুলো আমরা কোন কাজে কী
পরিমাণ ব্যবহার করব? ধরুন, আমাদের ভূমি আছে। এখন কতটুকু জমিতে আমরা গম আবাদ করব? কতটুকু জমিতে ধানের আবাদ করব? কতটুকু জমিতে তুলা চাষ করব? অথবা অনুরূপভাবে আমাদের কারখানা স্থাপনের যোগ্যতা আছে। এখন আমরা কাপড় কলও স্থাপন করতে পারি। জুতা তৈরির কারখানাও স্থাপন করতে পারি। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন কারখানাও স্থাপন করতে পারি। এখন কতগুলো কারখানা কাপড় প্রস্তুতের জন্য ব্যবহার করব? আর কতগুলো জুতা তৈরিতে ব্যবহার করব? আর কতগুলো খাদ্যবস্তু প্রস্তুতের কাজে ব্যবহার করব? এ প্রশ্নের মীমাংসাকে অর্থনীতির পরিভাষায় 'সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার' বলা হয়।
তিন. আয় বণ্টন (Distribution of Income)
তৃতীয় সমস্যা হল, আয় বা উৎপাদিত দ্রব্যের বণ্টন। অর্থাৎ উপরোল্লিখিত উপকরণগুলো কাজে লাগানোর পর তা থেকে যে উৎপাদন বা আয় হল, সেগুলো কিভাবে সমাজে বণ্টন করা হবে, কিসের ভিত্তিতে, বণ্টন করা হবে? অর্থনীতির পরিভাষায় একেই বলে 'আয় বণ্টন'।
চার. উন্নয়ন (Development)
চতুর্থ সমস্যা হল 'উন্নয়ন'। অর্থাৎ নিজের অর্থনৈতিক উৎপাদনগুলোকে কিভাবে উন্নত করা যায়? যাতে যে উৎপাদন হচ্ছে সেগুলো মানের দিক থেকে আগের তুলনায় আরো ভাল হয়, এবং পরিমাণের দিক থেকে আরো বৃদ্ধি পায়। আর কিভাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পদ্রব্য উদ্ভাবন করা যায় যাতে সমাজের উন্নয়ন হয়। মানুষের কাছে অর্থনৈতিক উপকরণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের আয়ের উপায় তাদের হস্তগত হয়। এ বিষয়কে অর্থনীতির পরিভাষায় 'উন্নয়ন' বলা হয়।
এ চারটি মৌলিক সমস্যা অর্থাৎ 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ', 'সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার', 'আয় বণ্টন' এবং 'উন্নয়ন'-এ চারাট সমস্যার সমাধান করা প্রত্যেক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য জরুরি। প্রথমে বুঝতে হবে, এ সমস্যাগুলো যদিও প্রাকৃতিক সমস্যা, কিন্তু তাকে একটি দর্শনের অধীনে নিয়ে চিন্তা করা এবং তার সমাধান খুঁজে বের করার ভাবনা বিগত দিনগুলোতে বেশি হয়েছে। তারই ফলে দুটি পরস্পর বিরোধী দর্শন আমাদের সামনে এসেছে। একটি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism), আর অপরটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Socialism)।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism)
সর্বপ্রথম আমাদের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বুঝতে হবে, সে উপরোল্লিখিত চারটি মৌলিক সমস্যা কোন্ মূলনীতির ভিত্তিতে সমাধান করার দাবি করেছে? সেগুলো সমাধান করার জন্য কী দর্শন পেশ করেছে? ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বক্তব্য হল, এ চারটি সমস্যা সমাধানের একটিমাত্র উপায় আছে। তা হল, প্রত্যেক মানুষকে ব্যবসায়িক ও শিল্পোৎপাদন তৎপরতার জন্য সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন ছেড়ে দিতে হবে। তাকে এ ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে, সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের জন্য সে যে পদ্ধতি উপযুক্ত মনে করবে সেটাই গ্রহণ করতে পারবে। এর দ্বারা অর্থনীতির উপর্যুক্ত চারটি সমস্যাই আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে। কারণ প্রতিটি মানুষ যখন চিন্তা করবে, আমি সর্বাধিক মুনাফা অর্জন করব, তখন প্রত্যেক ব্যক্তি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সে কাজই করবে সমাজে যার প্রয়োজন রয়েছে। এর ফলে চারটি সমস্যাই আপনা আপনি এক বিশেষ ভারসাম্যের সাথে সমাধান হতে থাকবে। এখন প্রশ্ন হল, এ চার সমস্যা কিভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হবে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য কিঞ্চিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য :
১. মূলত এ পৃথিবীতে বহু প্রাকৃতিক বিধান কর্মরত আছে। যেগুলো সবসময় একই ধরনের ফলাফল সৃষ্টি করে। এ ধরনেরই একটি বিধান যোগান (Supply) ও চাহিদা (Demand)। যোগান বলা হয় বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে আনীত কোনো ব্যবসায়িক পণ্যের মোট পরিমাণকে। আর মূল্যের বিনিময়ে বাজার থেকে ক্রেতাদের ব্যবসায়িক পণ্য খরিদ করার আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় চাহিদা। যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধান হল, বাজারে যে বস্তুর যোগান চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তার মূল্য হ্রাস পায়। আর যে বস্তুর চাহিদা তার যোগানের তুলনায় বেশি হয়, তার মূল্য বৃদ্ধি পায়। যেমন ধরুন, গরমের মওসুমে যখন গরম খুব বেশি পড়তে থাকে তখন বাজারে বরফের ক্রেতা বেড়ে যায়। যার অর্থ, বরফের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যদি বরফের মোট উৎপাদন বা বাজারে প্রাপ্ত বরফের মোট
পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম হয় তাহলে নিঃসন্দেহে বরফের দাম বেড়ে যাবে। তবে সে সময় বরফের উৎপাদন যদি ততটুকু বৃদ্ধি পায় যতটুকু চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাহলে দাম বৃদ্ধি পাবে না। পক্ষান্তরে শীতের সময় বরফের ক্রেতা কমে যায়। তার অর্থ, বরফের চাহিদা কমে গেছে। এখন যদি বাজারে বরফের মোট পরিমাণ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বরফের মূল্য কমে যাবে। এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম। একে বলা হয় যোগান ও চাহিদাবিধি (Law of Demand and Supply)।
২. ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দর্শন বলে, প্রকৃতপক্ষে যোগান ও চাহিদার এ প্রাকৃতিক বিধিই কৃষি পেশার মানুষের জন্য নির্ধারণ করে, সে তার জমিতে কী উৎপাদন করবে। এ বিধিই নির্ধারণ করে, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোন্ বস্তু কী পরিমাণ বাজারে আনবে। এভাবে অর্থনীতির উল্লিখিত চারটি সমস্যাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যায়।
৩. যোগান ও চাহিদাবিধির মাধ্যমেও প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ হবে এভাবে: যদি আমরা প্রত্যেককে বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেই, তখন প্রত্যেক ব্যক্তি তার মুনাফা অর্জনের তাগিদে সে বস্তুই বাজারে আনার চেষ্টা করবে যার প্রয়োজন বা চাহিদা বেশি হবে, যাতে সে তার চড়া দাম পায়। কৃষক সে বস্তুর উৎপাদনকে প্রাধান্য দেবে বাজারে যার চাহিদা অধিক হবে। শিল্পপতি সে শিল্পদ্রব্য তৈরি করতে চেষ্টা করবে বাজারে যার কাটতি বেশি হবে। কেননা তারা যদি এমন জিনিস বাজারে আনে যার চাহিদা কম, তাহলে তারা বেশি লাভ পাবে না। তার ফলাফল হবে, প্রত্যেক ব্যক্তি যদিও নিজের মুনাফার জন্য কাজ করছে, কিন্তু যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক শক্তি তাকে বাধ্য করছে সমাজের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করতে। এমনকি যখন কোনো দ্রব্যের উৎপাদন বাজারে তার চাহিদার সমপরিমাণ এসে যায় তখন সে দ্রব্য আরো উৎপাদন করা যেহেতু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির জন্য লাভজনক হবে না, তাই সে তার উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। এভাবে শুধু সে দ্রব্যই প্রস্তুত হবে, সমাজে যার প্রয়োজন রয়েছে। ততটুকু পরিমাণ প্রস্তুত হবে প্রকৃতপক্ষে যতটুকু তার প্রয়োজন পূরণে দরকার। এর নামই প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ।
৪. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (Allocation of Resources) এর সম্পর্কও প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণের সাথে। যখন কোনো ব্যক্তি নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ করে নেয়, তখন সে হিসেবে বিদ্যমান উপকরণগুলোকে বিভিন্ন কাজে লাগায়। সুতরাং যোগান ও চাহিদাবিধি যেমনিভাবে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ করে, তেমনিভাবে সাথে সাথে সম্পদ বণ্টনের কাজও আঞ্জাম দেয়। যার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের উপকরণ, অর্থাৎ ভূমি মূলধন ও শ্রম সে কাজে ব্যবহার করে। যাতে সে এমন জিনিস বাজারে আনতে পারে যার চাহিদা বাজারে বেশি এবং তার লাভ বেশি হয়। সুতরাং যোগান ও চাহিদাবিধির মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের সমস্যাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যায়।
৫. তৃতীয় সমস্যা আয় বণ্টন। কতিপয় উৎপাদন কার্যক্রমের ফলে যে উৎপাদন বা আয় হল তা কিসের ভিত্তিতে সমাজে বণ্টন করা হবে? ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বক্তব্য হল, যে আয় হবে তা সেসব উপাদানের মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিৎ যারা উৎপাদনের কাজে অংশগ্রহণ করেছে। ধনতান্ত্রিক দর্শন অনুযায়ী এ উপাদান মোট চারটি: ১. ভূমি, ২. শ্রম, ৩. মূলধন, ৪. উদ্যোক্তা বা সংগঠক।
উদ্যোক্তা বা সংগঠক দ্বারা সে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে প্রাথমিকভাবে কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার উদ্দেশে প্রথম তিন উপকরণকে এ কাজের জন্য একত্র করে এবং লাভ-লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বক্তব্য হল, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলে যে আয় হবে তা বণ্টিত হবে এভাবে, ভূমিদানকারীকে দেয়া হবে ভাড়া। শ্রমিককে প্রদান করা হবে মজুরি। মূলধন সরবরাহকারীকে দেয়া হবে সুদ। আর এ উৎপাদন কার্যক্রমের মূল উদ্যোক্তা সংগঠককে দেয়া হবে লভ্যাংশ। অর্থাৎ ভূমির ভাড়া, শ্রমের মজুরি ও মূলধনের সুদ পরিশোধ করার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তাই হবে উদ্যোক্তার লভ্যাংশ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কিভাবে নির্ধারিত হবে, ভূমির ভাড়া কত প্রদান করা হবে, শ্রমের মূল্য কত দেয়া হবে, মূলধনের কি পরিমাণ সুদ দেয়া হবে। এসব প্রশ্নের উত্তরে পুঁজিবাদী দর্শন আবার সে যোগান ও চাহিদাবিধিকে উপস্থাপন করে। সে বলে, এ তিন উপকরণের বিনিময় তার
চাহিদা ও যোগানের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। এসব উপকরণের মধ্যে যে উপকরণের চাহিদা বেশি হবে তার বিনিময়ও তত বেশি হবে।
মনে করুন, যায়েদ একটি কাপড়ের কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে যেহেতু এ শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা এবং সে-ই লাভ-লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করে উৎপাদনের উপকরণগুলো সংগঠিত করার দায়িত্ব নিয়েছে। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় তাকে সংগঠক (Entrepreneur) বলা হয়। এখন তার কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন ভূমির। যদি তার কাছে ভূমি না থাকে তাহলে তা কারো থেকে ভাড়া নিতে হবে। ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ হবে জমির যোগান ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ জমি ভাড়াদানকারীর সংখ্যা যদি অনেক হয়, অর্থাৎ জমির যোগান বেশি এবং ভাড়া গ্রহণকারী তার তুলনায় কম হয়, অর্থাৎ চাহিদা কম হয়, তাহলে জমির ভাড়া কম হবে। আর যদি অবস্থা তার বিপরীত হয় তাহলে জমির ভাড়া বেশি হবে। এভাবে যোগান ও চাহিদাবিধি ভাড়া নির্ধারণ করে দেবে।
তারপর কারখানায় কাজের জন্য মজদুর প্রয়োজন হবে। অর্থনীতির পরিভাষায় যাকে শ্রম বলা হয়- তার পারিশ্রমিক দিতে হবে। এ পারিশ্রমিকের পরিমাণও যোগান এবং চাহিদাবিধির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ বহু মজদুর যদি কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে তার অর্থ শ্রমের যোগান বেশি। সুতরাং তার পারিশ্রমিক কম হবে। কিন্তু যদি এ কারখানায় কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিকের সরবরাহ না থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে, তার যোগান কম। সুতরাং তাকে বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে। এভাবে পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে মজুরি এমন পর্যায়ে নির্ধারিত হবে যেখানে যোগান ও চাহিদা উভয় একত্র হয়।
তেমনিভাবে কারখানা প্রতিষ্ঠাকারীর যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল প্রভৃতি ক্রয়ের জন্য মূলধনের প্রয়োজন হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এর উপর তাকে সুদ দিতে হবে। এ সুদের পরিমাণও নির্ধারিত হবে যোগান ও চাহিদাবিধির ভিত্তিতে। ঋণদাতা যদি বেশি থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে পুঁজির যোগান বেশি। সুতরাং অল্প সুদে কাজ চলে যাবে। কিন্তু যদি মূলধনের ঋণদাতা কম হয় তাহলে বেশি সুদ আদায় করতে হবে। এমনিভাবে সুদের পরিমাণও নির্ধারণ হবে যোগান এবং চাহিদার ভিত্তিতে।
যখন যোগান ও চাহিদার উল্লিখিত নিয়মে ভাড়া মজুরি ও সুদ নির্ধারিত হল, তখন কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলে যে আয় হবে তার অবশিষ্ট অংশ উদ্যোক্তা লভ্যাংশ হিসেবে পাবে।
এভাবে দেখা যাচ্ছে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আয় বণ্টনের মৌলিক বিষয়টিও যোগান এবং চাহিদাবিধির আওতায় সম্পন্ন হয়।
৬. অর্থনীতির চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে উন্নয়ন। অর্থাৎ সব অর্থনীতির জন্য জরুরি হল, সে তার উৎপাদনের অগ্রগতি নিশ্চিত করবে এবং পরিমাণ ও মানের দিক থেকে তার উৎপাদন আরো বৃদ্ধি করবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শন অনুযায়ী এ সমস্যাও যোগান এবং চাহিদার ভিত্তিতে সমাধান হয়।
কেননা, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যখন বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে, তখন যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধানই তাকে নতুন নতুন ও ভাল ভাল কোয়ালিটির পণ্য বাজারে আনতে উদ্বুদ্ধ করবে। যাতে তার শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বেশি হয় এবং লাভ বৃদ্ধি পায়।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলনীতি
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক মূলনীতি তিনটি:
১. ব্যক্তিমালিকানা (Private Property)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম মূলনীতি হচ্ছে, এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির এ অধিকার থাকে, সে তার ব্যক্তিমালিকানায় পণ্যদ্রব্যও রাখতে পারে এবং উৎপাদনের উপকরণও রাখতে পারে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী যদিও ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে, কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ যেমন ভূমি বা কারখানা সাধারণত ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে না। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যবহার্য সামগ্রী হোক বা উৎপাদনী সামগ্রী হোক, সব ধরনের বস্তু ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে।
২. ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা (profit Motive)
দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে, উৎপাদন কর্মকাণ্ডে যে প্রেরণা কাজ করে সেটা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণা।
৩. সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ততা (Laissez Faire)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে, সরকার ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না। তারা যেভাবেই কাজ করুক তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোরূপ বাধা প্রদান না করা সরকারের কর্তব্য। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উপর অতিরিক্ত বিধি-নিষেধ আরোপ করা উচিৎ নয়। সাধারণভাবে এ মূলনীতির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ততা (Laissez Faire) পরিভাষা ব্যবহার হয়। মূলত এটি ফরাসি শব্দ। অর্থাৎ 'সরকারের হস্তক্ষেপ না করার নীতি'। এর অর্থ হচ্ছে 'করতে দাও'। অর্থাৎ সরকারকে বলা হচ্ছে, যে ব্যক্তি তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সে যেভাবেই কাজ করছে তাকে সেভাবে করতে দাও। তার কাজে কোনো প্রকারে বাধা দিও না। সরকারের অধিকার নেই, সে লোকদের বলবে, অমুক কাজ কর আর অমুক কাজ করো না। ব্যবসা এভাবে কর, ওভাবে করো না- সরকারের একথাও বলার অধিকার নেই। এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তৃতীয় মূলনীতি এবং মৌলিক দর্শন।
পরবর্তীতে যদিও স্বয়ং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে ক্রমান্বয়ে এ নীতি
সীমিত করে দেয়া হয়েছে এবং কার্যত এমন হয় নি যে, সরকার একেবারেই হস্তক্ষেপ করে নি। বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে বহু বিধি-নিষেধ দেখা যায়। যেমন কখনো ট্যাক্সের মাধ্যমে অনেক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, বা কোনো কাজের প্রতি উৎসাহিত করার জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আজ সারা বিশ্বে এমন একটি দেশও নেই যেখানে ব্যবসা বাণিজ্যে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক দর্শন এটাই ছিল, সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না; বরং ব্যবসায়ীদের পুরো স্বাধীনতা দেবে। সুতরাং এর উপর ভিত্তি করেই বলা হয়ে থাকে, 'যে কর্তৃত্ব কম করে সে সর্বোত্তম সরকার' অর্থাৎ হস্তক্ষেপ না করে।
ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা কার্যকর থাকে, তাই তাকে 'ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা' বলে। তার অপর নাম হচ্ছে 'মার্কেট ইকোনোমি' (Market Economy) বাজার অর্থনীতি। এ কারণে এক্ষেত্রে মার্কেটের শক্তি (Market Forces) অর্থাৎ যোগান ও চাহিদা দ্বারা কাজ আদায় করা হয়।
সমাজতন্ত্র (Socialism)
সমাজতন্ত্র মূলত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিবাদ হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করেছে। পুঁজিবাদী দর্শনের পুরো জোর ছিল এর উপর, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য প্রত্যেকেই স্বাধীন। অর্থনীতির সকল সমস্যা মৌলিকভাবে শুধু যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে সমাধান হয়। এ কারণে এ দর্শনে জনকল্যাণ ও গরীবের স্বার্থ ইত্যাদির প্রতি কোনো সুস্পষ্ট গুরুত্ব ছিল না। আর সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় দুর্বল মানুষের নিষ্পেষিত হওয়ার প্রচুর ঘটনা ঘটে। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান অনেক বেড়ে যায়। এজন্য সমাজতন্ত্র এসব দোষ-ত্রুটি প্রতিহত করার দাবি নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করে অর্থনীতির উপরোল্লিখিত চার মৌলিক সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণা, ব্যক্তিমালিকানা ও বাজারশক্তির ভিত্তিতে সমাধান করার দাবি অস্বীকার করে।
সমাজতন্ত্র বলল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো যোগান ও চাহিদার এক অন্ধ বধির শক্তির উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণার ভিত্তিতে কাজ করে। জনকল্যাণের অনুভূতিই তার থাকে না। বিশেষত আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে এ শক্তি অবিচারমূলক ফলাফল বয়ে আনে। যার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলে তার মজুরি কমে যায়। কখনো শ্রমিক অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হয়। তার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে যে উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে সে এতটুকু অংশও পাচ্ছে না, যা দ্বারা সে তার নিজের ও বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্য স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করতে পারে। যেহেতু তার শ্রমপ্রার্থী পুঁজিপতির এ ব্যাপারে কোনো ভাবনা নেই, যে মজুরিতে সে তার থেকে শ্রম নিচ্ছে সেটা বাস্তবিকপক্ষে তার শ্রমের উপযুক্ত বিনিময় এবং তার প্রয়োজনের প্রকৃত সমাধানকারী কিনা। তার তো কেবল ভাবনা, যোগানের পর্যাপ্ততার কারণে সে তার চাহিদা অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে মেটানো, যার দ্বারা তার মুনাফায় বৃদ্ধি ঘটবে। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক দর্শন অনুযায়ী আয় বণ্টনের জন্য যোগান ও চাহিদার ফর্মুলা
এমন একটি অনুভূতিহীন ফর্মুলা, যাতে গরীবদের প্রয়োজনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই; বরং সে পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার অনুগত এবং একেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
অনুরূপভাবে সমাজতন্ত্রের নিকট প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও যোগান এবং চাহিদার অন্ধ বধির শক্তির হাতে সমর্পণ করা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি তাত্ত্বিক দর্শন অনুযায়ী এটা ঠিক, ব্যক্তিগত মুনাফা প্রেরণার অধীনে একজন কৃষক বা একজন শিল্পমালিক ততক্ষণ পর্যন্ত তার উৎপাদন অব্যাহত রাখবে যতক্ষণ পর্যন্ত তার যোগান চাহিদার সমান না হয়। যখন যোগান চাহিদা থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকবে তখন সে উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। কিন্তু বাস্তব জগতে কোনো ব্যবসায়ী বা কৃষকের কাছে এমন কোনো নির্ধারিত মাপকাঠি নেই, যার সাহায্যে সে সময় মতো জানতে পারে, এখন অমুক উৎপাদিত দ্রব্যের যোগান চাহিদার সমান হয়ে গেছে। সুতরাং সে কখনো এ চিন্তা করে উৎপাদন অব্যাহত রাখে, এখনো এ পণ্যের যোগান প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় কম। অথচ বাজারে তখন প্রকৃত যোগান পর্যাপ্ত হয়ে গেছে। এ অবস্থার খবর সে অনেক পরে পায়। পরিণামে বাজারে কখনো এমন পণ্যের ছড়াছড়ি দেখা যায় যার চাহিদা সে পরিমাণ নয়। এভাবে অর্থনীতি মন্দার শিকার হয়ে পড়ে। ফলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে পড়ে। আরো বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক অসুবিধা সৃষ্টি হয়। সুতরাং শুধু যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে উপরোল্লিখিত চারটি সমস্যার সমাধানের পদ্ধতি কী হওয়া উচিৎ? তার উত্তরে সমাজতন্ত্র এ দর্শন পেশ করল, উৎপাদনের উপাদান অর্থাৎ ভূমি ও কারখানাকে মানুষের ব্যক্তিমালিকানায় স্বীকৃতি দেয়াটাই মূল সমস্যার জন্ম দিয়েছে। হওয়া উচিৎ এমন, সকল উৎপাদন-উপাদান ব্যক্তির ব্যক্তিমালিকানায় না থেকে রাষ্ট্রের সমষ্টিক মালিকানায় থাকবে। যখন সব উপাদান রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকবে তখন সরকার জানতে পারবে তার কাছে মোট কী পরিমাণ উপাদান আছে। সমাজের প্রয়োজনগুলো কী কী। তার উপর ভিত্তি করে সরকার একটি
পরিকল্পনা তৈরি করবে। এতে নির্ধারণ করা হবে সমাজের কোন্ প্রয়োজনগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া যায়। কোন্ বস্তু কী পরিমাণে উৎপাদন করা হবে। বিভিন্ন উপাদানগুলোকে কোন্ নিয়মে কোন্ কোন্ কাজে ব্যবহার করা হবে। এতে যেন প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও উন্নয়ন- তিনটি কাজই সরকারের পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়িত হল। বাকি থাকল আয় বণ্টনের প্রশ্ন। সুতরাং সমাজতন্ত্র দাবি করল, প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের উপকরণ মাত্র দুটি। ভূমি ও শ্রম। ভূমি যেহেতু ব্যক্তিগত মালিকানা নয়; বরং সমষ্টিক মালিকানায় আছে, তাই তার উপর নির্দিষ্ট ভাড়া বা কর দেয়ার প্রয়োজন নেই। বাকি থাকে শুধু শ্রম। সরকার একথা চিন্তা করে তার পরিকল্পনার অধীনে শ্রমের মজুরির পরিমাণও নির্ধারণ করে দেবে যেন শ্রমিক তার উপযুক্ত বিনিময় পায়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেমনিভাবে উল্লিখিত চার মৌলিক সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা এবং বাজার শক্তির উপর ভিত্তি করে সমাধান করতে চেয়েছিল, তেমনিভাবে সমাজতন্ত্র এ চার সমস্যা সমাধানের জন্য একটাই মৌলিক সমাধান প্রস্তাব করল। অর্থাৎ সরকারি পরিকল্পনা। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে পরিকল্পিত অর্থনীতি (Planned Economy) বলা হয়। যার আরবী অনুবাদ করা হয়েছে اقتصاد موجهة বা اقتصاد مخطط ।
সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতি
সমাজতন্ত্রের উপরোল্লিখিত দর্শনের ফল হিসেবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে নিম্নলিখিত মৌলিক মূলনীতি কার্যকর হয়।
১. সমষ্টিক মালিকানা (Collective Property)
এ মূলনীতির অর্থ হচ্ছে, উৎপাদনের উপাদান, অর্থাৎ ভূমি এবং কারখানা ইত্যাদি কোনো লোকের ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকবে না; বরং তা জাতীয় মালিকানায় থাকবে। আর তা পরিচালিত হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে, কিন্তু উৎপাদনের উপাদান কোনো ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে না। এর পরিণাম হল, খাঁটি সমাজতান্ত্রিক দেশে শুধু জমি ও কারখানাই নয়; বরং ব্যবসায়িক দোকান-পাটও কোনো ব্যক্তি বিশেষের মালিকানায় থাকে না। সেখানে সব লোক সরকারের কর্মচারী। উৎপাদিত আয়ের পুরোটা সরকারি কোষাগারে যায়। আর কর্মচারীদের বেতন বা মজুরি সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রদান করা হয়।
২. পরিকল্পনা (Planning)
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বিতীয় মৌলিক নীতি হচ্ছে পরিকল্পনা। এর অর্থ, সবধরনের মৌলিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকার নিজস্ব পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়ন করে। এ পরিকল্পনার মধ্যে সব অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং সকল অর্থনৈতিক উপাদানের পরিমাণ ও সংখ্যা একত্র করা হয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কোন্ উপাদান কোন্ জিনিসের উৎপাদনে লাগানো হবে। কোন্ বস্তু কী পরিমাণ উৎপাদন করা হবে। কোন্ বিভাগের শ্রমিকদের কী পরিমাণ মজুরি নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ধারণা মূলত সমাজতন্ত্র পেশ করেছিল। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে ধনতান্ত্রিক দেশগুলোও আংশিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের পন্থা অবলম্বন করতে শুরু করে। এর কারণ, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ক্রমে ক্রমে তার সে মূলনীতির উপর পরিপূর্ণরূপে অটল থাকতে পারে নি যে, রাষ্ট্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বরং বিভিন্ন সমষ্টিক স্বার্থের খাতিরে পুঁজিবাদী সরকারকেও ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু না কিছু হস্ত
ক্ষেপ করতে হয়েছে। এমনকি মিশ্র অর্থনীতি (Mixed Economy) নামে এক নতুন পরিভাষা অস্তিত্ব লাভ করেছে। এর অর্থ হচ্ছে, যদিও মৌলিকভাবে অর্থনীতি বাজার শক্তির অধীনেই পরিচালিত হবে, কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবসা ও শিল্পের কিছু বিভাগ সরকারি তহবিলেও থাকতে পারে। যেমন কিছু ধনতান্ত্রিক দেশে রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, এয়ারলাইন সার্ভিস ইত্যাদি সরকারি খাতে থাকে। যে ব্যবসা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চালানো হচ্ছে, সরকার তাও কিছু নীতিমালা ও বিধিবিধানের অধীন করে নেয়। প্রথম প্রকারের ব্যবসাকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিভাগ (Public Sector) এবং দ্বিতীয় প্রকারকে ব্যক্তিগত বিভাগ (Private Sector) বলা হয়। এ মিশ্র অর্থনীতিতে যেহেতু এক পর্যায়ে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকে, তাই আংশিকভাবে তাকে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। এ আংশিক পরিকল্পনার পরিণামে সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে তা আংশিক পরিকল্পনা। আর সমাজতন্ত্রের পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সকল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকারি পরিকল্পনার অধীন হয়।
৩. সমষ্টিক স্বার্থ (Collective Interest)
সমাজতন্ত্রের তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে সমষ্টিক স্বার্থ। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের দাবি হল, ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থের অনুগামী হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিকল্পনার মাধ্যমে মৌলিকভাবে সমষ্টিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
৪. আয়ের সুষম বণ্টন (Equitable Distribution of Income)
সমাজতন্ত্রের চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে, উৎপাদনের মাধ্যমে যে আয় হবে তা জনগণের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টিত হবে। ধনী দরিদ্রের মাঝে অতিরিক্ত ব্যবধান থাকবে না। উভয় শ্রেণীর আয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকবে। প্রথমে দাবি করা হয়েছিল, সমাজতন্ত্রে আয়ের সমতা হবে। অর্থাৎ সবার আয় সমান হবে, কিন্তু বাস্তবে এরূপ কখনো হয় নি। মানুষের মজুরি ও বেতন কমবেশি হতে থাকে। তবে সমাজতন্ত্রে অন্তত এ দাবি অবশ্যই করা
উভয় ব্যবস্থার পর্যালোচনা
সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব চলে আসছে। দর্শনগত দিক থেকে উভয়ের মাঝে তুমুল আলোচনা- সমালোচনা, তর্ক-বিতর্কও চলে আসছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে যুদ্ধাংদেহী ভাবও কার্যকর রয়েছে। উভয় পক্ষ থেকে পরস্পরের যে সমালোচনা হয়ে আসছে এবং এ বিষয়ে যত বই পুস্তক লেখা হয়েছে, যদি সেগুলো একত্র করা হয় তাহলে পুরো একটি গ্রন্থাগার পূর্ণ হতে পারে। এখানে তার সবগুলো সমালোচনা তুলে ধরা সম্ভব হবে না। তবে সংক্ষিপ্তভাবে উভয় ব্যবস্থার উপর মৌলিক কিছু পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যা আমি এখানে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করতে চাই।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা
প্রথমে সমাজতন্ত্রের উপর পর্যালোচনা করা এ হিসেবে যুক্তিযুক্ত, তার অনিষ্টগুলো বুঝা তুলনামূলকভাবে সহজ। সমাজতন্ত্রের এতটুকু কথা তো বাস্তবিকই সঠিক ছিল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে এতটা স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, যার ফলে জনকল্যাণের ধারণা হয় তো একেবারেই বাকি থাকে নি, নয় তো অনেক পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু তার যে সমাধান সমাজতন্ত্র প্রস্তাব করেছে সেটা ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী চিন্তা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ব্যক্তিকে এতটা স্বাধীন ও লাগামহীন ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে সে তার মুনাফার জন্য যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াতে পারে। তার বিপরীতে সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে এতটা চেপে ধরেছে, যাতে তার ব্যক্তিস্বাধীনতাটুকুও রহিত হয়ে গেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাকে সব সমস্যার সমাধান স্থির করেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্র এ প্রাকৃতিক বিধান মানতেই অস্বীকার করে। তার স্থানে
সাব্যস্ত করেছে। অথচ মানুষের নিজের তৈরি করা পরিকল্পনা সব জায়গায় কাজ করে না। বহু স্থানে একটি কৃত্রিম জোড় বন্ধন ছাড়া তার আর কোনো ফলাফল বয়ে আনে না।
মানুষের জীবনে অনেক সামাজিক সমস্যা আসে। এসব সমস্যা পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে সমাধান করা সম্ভব হয় না। যেমন একটি সামাজিক সমস্যা হল, প্রত্যেক পুরুষের বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী দরকার আর প্রত্যেক মহিলার জন্য দরকার উপযুক্ত পাত্রের। এ সামাজিক সমস্যা পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সমাধান হয়ে আসছে। প্রত্যেকেই তার নিজের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খোঁজে। যেখানে উভয় পক্ষের মতৈক্য হয় সেখানে বিবাহ সংঘটিত হয়। এ ব্যবস্থার পরিণামে নিঃসন্দেহে কিছু সমস্যাও সামনে আসে। যেমন এ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কোনো সময় ভুলও হয়ে যায়। যার ফলে অমিল অনৈক্য সৃষ্টি হয়। এমনও হয়, কোনো পুরুষ বা কোনো মহিলা বিবাহ থেকে বঞ্চিত থাকে তার প্রতি কারো কোনো আকর্ষণ হয় না বলে। কিন্তু এ সমস্যার এমন সমাধান আজ পর্যন্ত কেউ ভাবে নি, বিবাহ ব্যবস্থাপনাকে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের উপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের কাছে সমর্পণ করা উচিৎ। সে পরিকল্পনা তৈরি করবে কত পুরুষ ও কত মহিলা আছে, কোন্ পুরুষ কোন্ মহিলার জন্য অধিক উপযুক্ত। যদি কোনো সরকার বা রাষ্ট্র এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা করতে চায়, তাহলে সেটা হবে একটি অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম ব্যবস্থা। যা দ্বারা কখনো সন্তোষজনক ফল বের হয়ে আসতে পারে না।
অনুরূপভাবে একটি সমস্যা হল, মানুষ কোন্ পেশা গ্রহণ করবে, উৎপাদনের কোন্ কাজে কতটুকু অংশগ্রহণ করবে, কোন্ভাবে সমাজে তার অবদান পেশ করবে। এটা মূলত একটা সামাজিক বিষয়। এ বিষয় যদি শুধু নীরস পরিকল্পনার ভিত্তিতে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো সৃষ্টি হবে।
১. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিকল্পনা তৈরির কাজ সম্পন্ন করে। আর সরকার ফেরেশতাদের কোনো দলের নাম নয়। যাদের থেকে কোনো ত্রুটি বা দুর্নীতি প্রকাশ পাবে না। সরকার পরিচালনাকারীরাও রক্ত মাংসের মানুষ। তারা নিজেদের প্রবৃত্তি ও ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হতে
পারে। তাদের চিন্তার মাঝেও ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে যখন সারা দেশের সব উৎপাদন-উপকরণ এ শ্রেণীর মানুষের নিকট সমর্পণ করা হবে, তখন তাদের নিয়তে অসৎপ্রবণতা আসলে তার পরিণাম পুরো জাতিকেই ভোগ করতে হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যদি এক ক্ষুদ্র পুঁজিপতি সীমিত উৎপাদন-উপকরণের উপর স্বত্বাধিকার লাভ করে কিছু মানুষকে জুলুমের নিশানা বানাতে পারে, তাহলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কতিপয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি সমগ্র দেশের উৎপাদন-উপকরণের উপর অধিকার পেয়ে তার থেকে অনেকগুণ বেশি জুলুম-নিপীড়ন চালাতে পারে। এর পরিণাম হতে পারে এমন, বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজিপতি খতম হয়ে যাবে, আর তাদের স্থানে জন্ম নেবে বিরাট এক পুঁজিপতি। যে রাষ্ট্রের সব সম্পদ নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করবে।
২. সমাজতন্ত্রের পরিকল্পিত ব্যবস্থা একটি চূড়ান্ত শক্তিশালী; বরং স্বৈরাচারী সরকার ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং চলতেও পারে না। কারণ মানুষকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রের পরিকল্পনার অনুসারী করার জন্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন অত্যাবশ্যক। কেননা, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ ইচ্ছায় কাজ করার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অধীনে কাজ করতে হয়। এ পরিকল্পনা এক প্রবল স্বৈরাচারী শক্তি ছাড়া কাজ করতে পারে না। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিসমাপ্তি অবশ্যম্ভাবী। এভাবে সবদিক থেকে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিষ্পিষ্ট করা হয়।
৩. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেয়া হয়, এ কারণে মানুষের কর্মকাণ্ডে এর খারাপ প্রভাব পড়ে। মানুষ চিন্তা করে, সে উদ্দীপনা ও পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী আগ্রহের সাথে কাজ করুক বা অলসতা ও নিস্পৃহতার সাথে কাজ করুক, সর্বাবস্থায় তার আয় সমান। এ কারণে তার মধ্যে ব্যক্তিগত উত্তম কর্মস্পৃহা অবশিষ্ট থাকে না। ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা সাধারণভাবে খারাপ বিষয় নয়। বরং সেটা যদি সীমার মধ্যে থাকে তাহলে মানুষের যোগ্যতাকে বিকশিত করে। তাকে নতুন নতুন সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে। এ স্বভাবজাত স্পৃহাকে সীমার মধ্যে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণরূপে দমিয়ে
দিলে মানুষের অনেক যোগ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
এসব ত্রুটি বিচ্যুতি শুধু দর্শনগত ব্যাপার নয়। বরং সমাজতন্ত্রের প্রথম পরীক্ষাগার রাশিয়ায় চুয়াত্তর বছরের অভিজ্ঞতা এসব অনিষ্ট পুরোপুরি প্রমাণ করে দিয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সমাজতন্ত্র ও জাতীয়করণের বুলি আওড়ানো হত। যে ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মুখ খুলত তাকে গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল এবং পুঁজিবাদের এজেন্ট বলা হত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় স্বয়ং রুশ প্রেসিডেন্ট ইয়েলিৎসন বলেন, "যদি সমাজতান্ত্রিক (Utopian)¹ দর্শনের পরখটা রাশিয়ার মতো একটা বিশাল দেশে না করে আফ্রিকার কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চলে করা হত, তাহলে তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি জানার জন্য চুয়াত্তর বছর লাগত না। -(নিউজ উইক)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা
এবার সংক্ষিপ্তভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শন পর্যালোচনা করতে হয়। সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর পাশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে অত্যন্ত জোরেশোরে বগল বাজানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, বাস্তব জগতে যেহেতু সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অথচ ব্যাপার হল, সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশুদ্ধতা ছিল না; বরং তার কারণ ছিল, সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত ভুলগুলো সংশোধনের পরিবর্তে অন্য একটি ভুল পথ অবলম্বন করেছিল। সুতরাং এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শনগত ভুলগুলো অধিক সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝা দরকার। বস্তুত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে এতটুকু কথা সঠিক ছিল,
অর্থনৈতক সমস্যা সমাধান করার জন্য ব্যাক্তগত মুনাফার প্রেরণা এবং বাজার শক্তি অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নেয়া জরুরি। কারণ এটা মানবীয় প্রকৃতির দাবি। কিন্তু ভুলটা মূলত এখানে হয়েছে, একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য লাগامহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না। সামগ্রিক কল্যাণের প্রতিও তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সুতরাং তার জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করাও বৈধ হয়ে যায় যার পরিণামে সে সর্বোচ্চ সম্পদশালী হয়ে বাজারের উপর নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একচ্ছত্র আধিপত্যের অর্থ হল, কোনো বিশেষ পণ্যের যোগান ও সরবরাহ করা কোনো এক ব্যক্তি বা এক গ্রুপের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সে ব্যক্তি বা গ্রুপ ছাড়া অন্য কেউ ঐ বস্তু উৎপাদন করতে পারে না। এ একচ্ছত্র আধিপত্যের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল, মানুষ সে বস্তু তার স্বেচ্ছাচার-নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য হয়। মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে লাগামহীন ছাড় দেয়া এবং তার উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোর দেয়ার ফলে যে অনিষ্ট পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তা সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নরূপ-
১. মুনাফা অর্জনের জন্য যেহেতু হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না, এ কারণে তার থেকে বহু নৈতিক অনিষ্ট সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। কেননা, সর্বাধিক মুনাফা উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষের নিচু প্রকৃতিকে জাগ্রত করে তার কুপ্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর উপায় উপকরণ যোগান দেয়। যা দ্বারা সমাজে নৈতিক বিকৃতি ছড়ায়। সুতরাং এটাও পাশ্চাত্য জগতের উলঙ্গপনা ও অশ্লীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সেখানে উলঙ্গ ছবি ও চলচ্চিত্রের সয়লাব বইয়ে দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ ব্যক্তিগত মুনাফার আকাঙ্ক্ষা মেটাচ্ছে। নারীরা তাদের শরীরের এক একটি অঙ্গ এ আকাঙ্ক্ষার অধীনে বাজারে বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুসারে সার্ভিসের কারবারে মডেল গার্লসের কারবার সর্বাধিক লাভজনক। যারা নিজেদের ছবি শিল্পপতিদের নিজস্ব শিল্পদ্রব্যের উপর ছাপানোর জন্য বা প্রচারের মডেল বানানোর জন্য সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে তারা অত্যন্ত চড়া মূল্য আদায় করে। এমনকি আমেরিকায় এ শ্রেণী সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, তাদের যে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করা
হয় তা অবশেষে উৎপাদন-ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধে গিয়ে পড়ে। এভাবে পুরো জাতি এ সব অনৈতিকতার আর্থিক মূল্যও পরিশোধ করে।
২. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের উপর যেহেতু বিশেষ কোনো নৈতিক বিধি-নিষেধ নেই এ কারণে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টনে জনকল্যাণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। যখন অধিক মুনাফা অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারিত হয় তখন এ অধিক মুনাফা যদি উলঙ্গ ফিল্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাহলে এক ব্যক্তি বাস্তুহীন মানুষের আবাসনের জন্য অর্থ কেন ব্যয় করবে? যখন এখাতে তুলনামূলক লাভ কম।
৩. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার উপর হালাল হারামের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে সুদ, জুয়া, হুন্ডি ইত্যাদি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈধ। অথচ এগুলো এমন বস্তু যা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। যার একটা নিদর্শন হল, এর ফলে অধিক পরিমাণে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব একচেটিয়া আধিপত্য বর্তমান থাকতে বাজারের প্রাকৃতিক শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধান পঙ্গু হয়ে পড়ে, তা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। একদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাবি, আমরা বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নিতে চাই। অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দিয়ে তা একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। যা দ্বারা যোগান ও চাহিদার শক্তি অকার্যকর বা প্রভাবহীন হয়ে পড়ে।
এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হল, যোগান ও চাহিদা শক্তি অর্থনীতিতে ভারসাম্য সৃষ্টিকরণে তখনি কার্যকর হয়, যখন বাজারে স্বাধীন প্রতিযোগিতার (Free competition) পরিবেশ থাকে। কিন্তু যখন বাজারে কোনো ব্যক্তির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন মূল্যব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে না। আর অর্থনীতির চার মৌলিক সমস্যার ব্যাপারে হওয়া সিদ্ধান্ত গুলো সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন ও চাহিদার চিত্র তুলে ধরে না। এখানেও একটা কৃত্রিম ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। এক দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টা বুঝা যাক। মনে করুন, চিনির উৎপাদন প্রয়োজন মোতাবেক এ পরিমাণ হওয়া উচিৎ যাতে যোগান ও চাহিদার মাধ্যমে বাজারে তার উপযুক্ত দাম
নির্ধারিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত দাম তখনি নির্ধারণ সম্ভব যখন চিনি প্রস্তুত করার জন্য বিভিন্ন কারখানা বিদ্যমান থাকে। আর ক্রেতাদের এ অধিকার থাকে, এক কারখানার চিনির দাম যদি বেশি হয় তাহলে সে অন্য কারখানা থেকে ক্রয় করতে পারবে। যদি বাজারে এ প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকে তাহলে কোনো কারখানাই দাম নির্ধারণে স্বেচ্ছাচার করতে পারবে না। এ অবস্থায় বাজারে চিনির যে দাম নির্ধারিত হবে তা প্রকৃতপক্ষে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য অনুসারে হবে এবং তা হবে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য। কিন্তু যদি একজন মাত্র ব্যক্তি চিনির কারবারের ইজারাদার বনে যায়, আর মানুষ কেবল তার থেকেই চিনি ক্রয়ে বাধ্য হয়, তাহলে তার নির্ধারিত দামে চিনি ক্রয় করা ছাড়া মানুষের কাছে আর কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় চিনির যে দাম হবে তা নিঃসন্দেহে ঐ অবস্থা থেকে বেশি হবে যখন বাজারে একাধিক চিনি সরবরাহকারী থাকবে এবং তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থাকবে। মনে করুন, স্বাধীন প্রতিযোগিতার পরিবেশে চিনির মূল্য কিলোগ্রাম প্রতি আট টাকা। একচেটিয়া পরিবেশে সেটা কিলো প্রতি দশ বা বার টাকা হতে পারে। এখন যদি মানুষ বার টাকায় চিনি ক্রয় করে তাহলে এ লেনদেন তার প্রকৃত চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এক কৃত্রিম অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে, যা এক চিনি ব্যবসায়ীর একচেটিয়া আধিপত্য দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রকৃত যোগান ও চাহিদা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয়।
সুতরাং যদিও একথা বলাটা সঠিক ছিল, যোগান ও চাহিদা শক্তির অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর অনেকাংশে সমাধান করা উচিৎ। কিন্তু এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হালাল হারামের পার্থক্য ছাড়াই যখন ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তখন সে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্ঠা করে নিজে যোগান ও চাহিদা শক্তির সঠিকভাবে কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করে। এভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি মূলনীতি কার্যত তার অন্য মূলনীতিকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
৪. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল ধারণা যদিও এমন ছিল, কায়-কারবার ও ব্যবসা বাণিজ্যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না হোক, কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর কার্যত এ মূলনীতি পুরোপুরি বহাল থাকতে পারে নি। প্রায় সকল ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু হস্ত
ক্ষেপ হতে থাকে। যেমন সরকার বিভিন্ন আইনের বিশেষত ট্যাক্সের মাধ্যমে কোনো ব্যবসাকে উৎসাহিত আবার কোনো ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করতে থাকে। এখন সম্ভবত এমন কোনো ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই যাতে সরকারের পক্ষ থেকে কায়-কারবার ও ব্যবসায়ের উপর কোনো না কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় না। সুতরাং সরকারের হস্তক্ষেপ না করার (Laissez Faire) মূলনীতি সঠিকভাবে পালনকারী কোনো রাষ্ট্রের অস্তি ত্ব পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সরকারের এসব হস্তক্ষেপ কখনো হয় সরকারি আমলা ও ধনীদের পরস্পর গাঁটছড়া বাধার পরিণতি। যার সুফল শুধু প্রভাবশালী পুঁজিপতিদের কাছেই পৌঁছে। এ কারণে সামগ্রিক কল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষিত হয় না। এ বিধি-নিষেধগুলো যদি সরকারি আমলা ও ধনীদের গাঁটছড়া বাধা ও দুর্নীতি থেকে মুক্তও হয়, তবুও তা খাঁটি সেক্যুলার চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার পক্ষ নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার আলোকে যে বিধি-নিষেধ উপযুক্ত মনে করে তাই আরোপ করে। অথচ নিছক বিবেক সব মানবীয় সমস্যা সমাধান করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণেই এসব বিধি-নিষেধ অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঠিক প্রতিকার হতে পারে নি।
৫. পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশেষভাবে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা বৈষম্যের শিকার থাকে। এ বৈষম্যের এক বিরাট কারণ সুদ ও জুয়া। পরিণামে সম্পদের গতি প্রবাহ ধনীদের দিকে থাকে। দরিদ্র ও জনসাধারণের দিকে থাকে না। এর ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সম্পদ বণ্টন সম্পর্কিত আলোচনায় আসবে।
অর্থনীতির ইসলামী বিধান
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পর এখন সংক্ষিপ্তভাবে এ নিবেদন করতে চাই, অর্থনীতির যে চার মৌলিক সমস্যার কথা বর্ণনা করা হয়েছিল সে ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী? একথা পূর্বেই পরিষ্কার থাকা চাই, ইসলাম কোনো অর্থব্যবস্থার নাম নয়। বরং এটা একটা দ্বীন-জীবনব্যবস্থা। যার বিধান জীবনের প্রত্যেক বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে অর্থনীতিও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কুরআন ও হাদীস প্রচলিত অর্থে কোনো অর্থনৈতিক দর্শন বা মতবাদ পেশ করে নি। যা বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক পরিভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। সুতরাং প্রয়োজনের অগ্রগন্যতা নির্বাচন, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, আয় বণ্টন ও উন্নয়ন শিরোনামে কুরআন হাদীস বা ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে সরাসরি কোনো আলোচনা বিদ্যমান নেই। কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিভাগের মতো ইসলাম অর্থনীতির ব্যাপারেও কিছু বিধান দিয়েছে। এসব বিধান সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন করে আমরা উদ্ভাবন করতে পারি, উল্লিখিত চার সমস্যার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী। এখন এ অধ্যয়ন ও উদ্ভাবনের সার-সংক্ষেপ পেশ করা হচ্ছে।
ইসলামের অর্থনৈতিক বিধান ও শিক্ষার উপর চিন্তা ভাবনা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে, ইসলাম বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধান মেনে নিয়েছে। ইসলাম অর্থনীতির সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য মোটের উপর যোগান ও চাহিদাবিধি ব্যবহারের সহযোগিতা প্রদান করে। আল-কুরআনের ঘোষণা: نحن قسمنا بينهم معيشتهم في الحياة الدنيا ورفعنا بعضهم فوق بعض درجات ليتخذ بعضهم بعضا سخريا -আমি তাদের মাঝে তাদের পার্থিব জীবনের জীবিকা বণ্টন করেছি, মর্যাদায় তাদের কাউকে কারো উপর উচ্চস্থান দিয়েছি, যাতে তারা একজন অন্যজন থেকে কাজ নিতে পারে। (সূরা যুখরুফ: ৩২)
উল্লিখিত আয়াতের মর্ম থেকে এ কথা স্পষ্ট, একে অন্যের থেকে কাজ এভাবে নেবে যে, কাজ গ্রহণকারী কাজের চাহিদা এবং কাজ প্রদানকারী কাজের যোগান। এ চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক টানাপড়েন ও মিল থেকে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি অস্তিত্ব লাভ করে। অনুরূপভাবে রাসূল সা.
এর যুগে যখন পল্লীবাসী তাদের কৃষিপণ্য শহরে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসত, তখন কিছু শহুরে মানুষ পল্লীবাসীদের বলত, তুমি তোমার পণ্য নিজে শহরে নিয়ে বিক্রি করো না; বরং এ মাল আমাকে দিয়ে দাও। আমি উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করে দেব, যাতে বেশি দাম পাওয়া যায়। রাসূল সা. এমন করতে নগরবাসীকে নিষেধ করেছেন। সাথে একথাও বলেছেন,
دعوا الناس يرزق الله بعضهم عن بعض
-মানুষদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও, আল্লাহ তাআলা তাদের কাউকে কারো মাধ্যমে জীবিকা দান করেন।
এভাবে রাসূল সা. বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তির হস্ত ক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন, যাতে বাজারে যোগান ও চাহিদার সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পল্লীবাসী যখন সরাসরি বাজারে কোনো জিনিস বিক্রি করবে তখন তার নিজের উপযুক্ত মুনাফা ধরেই বিক্রি করবে। কিন্তু তাকে যেহেতু তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে, তাই তার মজুদ করে রাখার কোনো অবকাশ নেই। আর সে নিজে বাজারে পৌঁছলে যোগান ও চাহিদার এমন মিশ্রণ হবে যা সঠিক মূল্য নির্ধারণে সাহায্য করবে। পক্ষান্তরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যদি তাদের মাঝখানে আসে এবং মালের মজুদ গড়ে তোলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তা যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সুতরাং উপরোল্লিখিত হাদীস থেকেও একথা বুঝা যায়, রাসূল সা. যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছেন।
তেমনিভাবে যখন তাঁর কাছে আবেদন করা হল, আপনি বাজারে বিক্রীত পণ্যদ্রব্যের দাম সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে দিন, এ অবস্থায়ও রাসূল সা. ঘোষণা করেন:
ان الله هو المسعر القابض الباسط الرازق
-নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলাই মূল্য নির্ধারণকারী। তিনিই পণ্যের যোগানে হ্রাস-বৃদ্ধিকারী এবং তিনিই আহারদাতা।
উল্লিখিত হাদীসে আল্লাহ তাআলাকে মূল্য নির্ধারণকারী স্থির করার সুস্পষ্ট অর্থ, আল্লাহ তাআলা যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধান নির্ধারণ করেছেন। যার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে দাম নির্ধারিত হয়। এ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ছেড়ে কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণ করা পছন্দনীয় নয়।
কুরআন ও হাদীসের এ নির্দেশনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়, ইসলাম বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধানকে মোটামুটিভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তেমনিভাবে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা থেকেও মোটামুটিভাবে কাজ নিয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ প্রেরণাকে একেবারে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পরিণামে ঐ অনিষ্টগুলো সৃষ্টি হয়েছে যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে বহাল রেখে, চাহিদা এবং যোগানের বিধানকে স্বীকৃতি দিয়ে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এর বাস্তবায়ন হলে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা এমন ভুল পথে চলতে পারবে না যা অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে বা তার থেকে অন্য কোনো নৈতিক বা সামাজিক অনিষ্ট সৃষ্টি হয়। ইসলাম ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার উপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. খোদায়ী নিয়ন্ত্রণ
সর্বপ্রথম ইসলাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর হালাল হারামের কিছু চিরস্থায়ী বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা সর্বযুগে সর্বস্থানে কার্যকর। যেমন সুদ জুয়া হুন্ডি মজুদদারি গুদামজাতকরণ এবং অন্যান্য সকল নিষিদ্ধ ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তার কারণ, এসব সাধারণত একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হয়। উপরন্তু এর দ্বারা অর্থনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে ইসলাম এমন সব পণ্যের উৎপাদন এবং ক্রয় বিক্রয় হারাম সাব্যস্ত করেছে যার দ্বারা সমাজ কোনো অনৈতিকতার শিকার হয়, মানুষের নিচু প্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে অবৈধ পন্থায় মুনাফা অর্জনের পথ সৃষ্টি হয়।
এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট থাকা দরকার যে, এ খোদায়ী বিধি-নিষেধ নিয়ন্ত্রণ কুরআন হাদীসের আলোকে আরোপ করা হয়েছে। এগুলোকে ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত বুদ্ধি-বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয় নি, যদি তার বিবেক উপযুক্ত মনে করে তাহলে এ বিধি-নিষেধ আরোপ করবে। আর উপযুক্ত মনে না করলে আরোপ করবে না। তার কারণ, কোনো বস্তু ভাল বা মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য কখনো মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনায় ভিন্নতা এবং মতানৈক্য হয়। কোনো একজন মানুষের বিবেক এক বস্তুকে ভাল এবং অন্য মানুষের বিবেক তাকে মন্দ ভাবতে পারে। সুতরাং এ
বিধি-নিষেধগুলোও যদি শুধু মানবীয় বিবেকের উপর ন্যস্ত করা হত, তাহলে সম্ভাবনা ছিল, মানুষ নিজের বিবেকের আলোকে এসব বিধি-নিষেধগুলো অনুপযুক্ত মনে করে সমাজকে তা থেকে মুক্ত করে দিত। আর যেহেতু আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে এসব বিধি-নিষেধ সর্বযুগে ও সর্বস্থানের জন্য জরুরি ছিল, এ কারণে ওহীর মাধ্যমে এসব বিধি-নিষেধকে চিরস্থায়িত্বের গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যাতে মানুষ তার বিবেকপ্রসূত ব্যাখ্যার আশ্রয়ে তার থেকে মুক্ত হয়ে অর্থনীতি এবং সমাজকে বৈষম্যের মধ্যে নিপতিত করতে না পারে।
এখানে একথা স্পষ্ট হয় যে, কুরআন ও হাদীসে আরোপিত এ খোদায়ী বিধি-নিষেধ পালন করা সর্বাবস্থায় অত্যাবশ্যক। তার যৌক্তিক দর্শন মানুষের বুঝে আসুক বা না আসুক।
যেমন পূর্বে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগে বেশিরভাগ ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রই ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার উপর কিছু না কিছু বিধি-নিষেধ অবশ্যই আরোপ করে। কিন্তু এ বিধিনিষেধ যেহেতু খোদায়ী ওহীনির্ভর নয়, এ কারণে সেটা সুষম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং ঐসব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কোথাও সুদ জুয়া হুন্ডি ইত্যাদির উপর কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় নি যেগুলো অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনেক বড় কারণ।
২. রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
আলোচিত খোদায়ী বিধি-নিষেধগুলো ছিল চিরস্থায়ী প্রকৃতির। তার সাথে ইসলামী শরীয়ত সমকালীন সরকারকে এ অধিকারও প্রদান করেছে, সে কোনো জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এমন কোনো বস্তু বা কাজের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যেগুলো মৌলিকভাবে হারাম নয়; বরং মুবাহ-র আওতাভুক্ত, কিন্তু তা দ্বারা সমাজের কোনো ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী প্রকৃতির হয় না, যা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক স্থানে কার্যকর হবে; বরং তার গুরুত্ব সাময়িক নির্দেশের মতো, যা সাময়িক প্রয়োজন অনুযায়ী হয়। তার একটি সরল দৃষ্টান্ত হল, ফুকাহায়ে কিরাম লেখেছেন, যখন কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটতে থাকে তখন সরকার তরমুজের ক্রয়-বিক্রয় এবং তা
পক্ষ থেকে আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তরমুজ খাওয়া এবং তার ক্রয়-বিক্রয় শরীয়তের দৃষ্টিতেও নাজায়েয হয়ে যাবে। এমনিভাবে উসূলে ফিকাহর মধ্যে 'سد ذرائع' (উপায়-উপকরণ প্রতিরোধ) নামের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে। যার অর্থ, কোনো কাজ যদিও মৌলিকভাবে জায়েয, কিন্তু তার আধিক্য যদি কোনো অপরাধ বা বিশৃঙ্খলার কারণ হয়, তাহলে সরকারের জন্য ঐ বৈধ কাজটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জায়েয।
এ মূলনীতির আলোকে সরকার সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নজরদারি করতে পারে। যেসব কর্মকাণ্ডের কারণে অর্থনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার শংকা দেখা দেয়, সরকার তার উপর উপযুক্ত বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে। কানযুল উম্মাল গ্রন্থে আছে, হযরত উমর ফারুক রা. একবার বাজারে এসে দেখলেন, এক ব্যক্তি কোনো একটি দ্রব্য প্রচলিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করছে। তখন তিনি সে লোককে বললেন:
اما ان تزيد في السعر و اما ترفع عن سوقى
-হয় তোমার পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি কর, নইলে আমাদের বাজার থেকে উঠে যাও।
বর্ণনায় একথা স্পষ্ট নয় যে, হযরত উমর রা. কোন্ কারণে তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তার কারণ হতে পারে, সে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য থেকে অনেক কম মূল্যে বিক্রি করে অন্য ব্যবসায়ীদের বৈধ মুনাফা অর্জনের পথ বন্ধ করে দিচ্ছিল। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাব্য কারণ এও হতে পারে, কম মূল্যে পাওয়ার কারণে লোকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্রয় করছিল। যা দ্বারা অপব্যয়ের রাস্তা উন্মুক্ত হয়। অথবা মানুষের জন্য মজুদদারির অবকাশ সৃষ্টি হয়। যাই হোক, এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, শরীয়তের মূল বিধান হল, এক জন মানুষ তার নিজস্ব মালিকানা বস্তু যে দামে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারে। সুতরাং উল্লিখিত ঘটনায় লোকটির নিজের পণ্য কম মূল্যে বিক্রি করা মৌলিকভাবে বৈধ ছিল। কিন্তু কোনো সমষ্টিক স্বার্থে হযরত উমর রা. তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অবশ্য পালনীয় হওয়ার উৎস কুরআনের এ
يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الأمر منكم
-হে মুমিনগণ, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের ও নিজেদের মধ্যেকার ক্ষমতাসীন লোকদের আনুগত্য কর।
এ আয়াতে اولی الامر (ক্ষমতাসীন লোকের) আনুগত্যকে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য থেকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ, যে সব ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করে নি, সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের নির্দেশ অবশ্য পালনীয়।
এখানে উল্লেখ্য, সরকারের মুবাহ বিষয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এ অধিকার অসীম নয়। বরং তারও কিছু মূলনীতি, কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এর বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু দুটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। প্রথমত সরকারের সে নির্দেশই অবশ্য পালনীয় যা কুরআন ও হাদীসের কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। দ্বিতীয়ত সরকার এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের অধিকার শুধু তখনি পায় যখন কোনো সমষ্টিগত জনস্বার্থ তার আহ্বায়ক হয়। সুতরাং এক প্রসিদ্ধ ফিকহী মূলনীতিতে বিষয়টা এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: تصرف الامام بالرعية منوط بالمصلحة
-জনসাধারণের উপর সরকারের শাসন অধিকার জনস্বার্থের সাথে শর্তযুক্ত।
সুতরাং যদি সরকার কোনো সমষ্টিক স্বার্থ ব্যতীত কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে সেটা জায়েয হবে না। বিচারকের আদালত থেকে তা বাতিল করানো যেতে পারে।
৩. নৈতিক বিধি-নিষেধ
যেমন পেছনে বলা হয়েছে, খাঁটি অর্থে ইসলাম কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নাম নয়; বরং একটি দ্বীন বা জীবনবিধানের নাম। এ দ্বীনের শিক্ষা এবং বিধান জীবনের অন্যান্য বিভাগের ন্যায় অর্থনীতি সম্পর্কেও অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দ্বীনের শিক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তা থেকে অর্জিত বৈষয়িক উপকার মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। কুরআন ও হাদীসে সকল জোর একথার উপর দেয়া হয়েছে, পার্থিব জীবন সীমিত কয়েকদিনের
জীবনমাত্র। এরপর এমন এক অনন্ত জীবন আসবে যার কোনো শেষ নেই। মানুষের মূল কাজ হল তার পার্থিব জীবনকে সেই পরকালীন জীবনের জন্য সোপান বানানো। সেখানকার সুখের চিন্তা করা। সুতরাং অন্যের তুলনায় চার পয়সা বেশি উপার্জন করা মানুষের আসল সফলতা নয়; বরং তার সফলতা হল, পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে বেশি বেশি সুখ- শান্তির ব্যবস্থা করা। যার পথ হচ্ছে পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় এমন কাজ করা যা তার জন্য সর্বাধিক নেকী ও সওয়াবের কারণ হয়।
যখন মানুষের মধ্যে এ মানসিকতা সৃষ্টি হয় তখন তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয় শুধু এটা থাকে না যে, কোন্ অবস্থায় কেমন করে আমার আলমারি বেশি পূর্ণ হবে। বরং কখনো তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এ ভিত্তিতেও হয়, কোন্ কাজে আমার আখেরাতের লাভ বেশি হবে। এভাবে অনেক ব্যাপারে শরীয়ত কোনো অবশ্য পালনীয় নির্দেশ (Mandatory Order) দেয় নি বটে। তবে কোনো বিশেষ বিষয়ের পরকালীন ফযীলত মর্যাদার কথা বর্ণনা করেছে, যা একজন মুমিনের জন্য অনেক বড় আকর্ষণের কারণ। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেই নিজের উপর অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নেয়। নৈতিক নিষেধাজ্ঞা দ্বারা আমার উদ্দেশ্য এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা।
এর একটি সরল দৃষ্টান্ত হল, এক ব্যক্তির কাছে পুঁজি বিনিয়োগের দুটি পথ আছে। একটি হল, সে তার পুঁজি কোনো বৈধ বিনোদনমূলক কিন্তু ব্যবসায়িক প্রকল্পে খাটাতে পারে। এর মধ্যে তার অধিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় হল, সে এ পুঁজি গৃহহীন লোকদের জন্য বাড়ি নির্মাণ করে সস্তায় বিক্রি করার কাজে ব্যয় করতে পারে। এতে তুলনামূলক কম লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। একজন সেক্যুলার চিন্তাধারার মানুষ অবশ্যই প্রথম পথ গ্রহণ করবে। কেননা, তাতে লাভ বেশি। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্ত রে পরকালের চিন্তা গ্রথিত সে পথের বিপরীত এ চিন্তা করবে, যদিও আবাসন প্রকল্পে আর্থিক লাভ তুলনামূলক কম, কিন্তু গরীব মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করে নিজের জন্য পরকালে বেশি সওয়াব লাভ করতে পারি। এ জন্য আমাকে বিনোদনমূলক প্রকল্প গ্রহণ না করে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিৎ।
এখানে যদিও উভয় পথই শরয়ীভাবে বৈধ ছিল, কোনোটার উপরই
কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, কিন্তু পরকালীন বিশ্বাসনির্ভর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ঐ ব্যক্তির অন্তরে এক অভ্যন্তরীণ বাধা সৃষ্টি করে দিয়েছে। যা দ্বারা প্রয়োজনের উত্তম অগ্রগণ্যতা নির্বাচন এবং উত্তম উপকরণ নির্দিষ্টকরণ বিধি কার্যকর হয়েছে। এটা একটা ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু যদি প্রকৃতপক্ষেই কারো অন্তরে ইসলামের পরকালীন বিশ্বাস পরিপূর্ণভাবে বদ্ধমূল হয়ে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকে তাহলে সে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কল্যাণে অনেক বড় অবদান রাখতে পারে।
অনৈসলামী সমাজেও নৈতিকতার একটা অবস্থান আছে, তা আমি অস্বীকার করি না। সে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরও প্রভাব ফেলে। কিন্তু যেহেতু ঐসব নৈতিক ধারণার পেছনে পরকালের মজবুত বিশ্বাস বর্তমান নেই, এ কারণে সেটা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না। পক্ষান্তরে ইসলাম তার যাবতীয় শিক্ষাসহ ব্যাপকভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর হলে অর্থনীতির উপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তার নৈতিক শিক্ষার প্রভাব পড়বে। যেমন অতীতে তার অসংখ্য জীবন্ত দৃষ্টান্ত চোখে পড়েছে। সুতরাং নৈতিক বিধি-নিষেধের এ উপাদান খাঁটি ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে কোনোক্রমেই কোনো দুর্বল উপাদান নয়; বরং তার গুরুত্ব অনেক বেশি।

টিকাঃ
১. Utopian অর্থ 'নিরাশ্রয়'। মূলত এটা একটা বইয়ের নাম। প্রাচীন কালে কোনো ল্যাটিন বা গ্রিক রাজা লেখেছিলেন। এর মধ্যে এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। যেখানে সকল বস্তু মানুষের যৌথ মালিকানাধীন। প্রত্যেক ব্যক্তি যে বস্তু ইচ্ছা নিজের চাহিদামতো বিনামূল্যে লাভ করতে পারে। কারো প্রতি কোনো বিধি-নিষেধ নেই। এটা বাস্তবায়ন যেহেতু অসম্ভব ধারণা ছিল, তাই এ শব্দটি এক কাল্পনিক স্বর্গের অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। যা লাভ করার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং যে ব্যক্তি এ ধরনের কাল্পনিক পরিকল্পনা তৈরি করে তাকে Utopian বলে।

বর্তমান বিশ্বে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো প্রচলিত আছে তার মধ্যে দুটি ব্যবস্থা সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। এক. ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism), যাকে আরবীতে বলা হয় 'الرأسمالية'; দুই. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Socialism), আরবীতে যাকে বলা হয় 'الاشتراكية। এরই চূড়ান্ত রূপ সাম্যবাদ (Communism), যাকে আরবীতে বলা হয় 'الشيوعية'। বিশ্বে যত কারবার বা লেনদেন হচ্ছে, তা এ দুই ব্যবস্থার অধীনেই হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সমাজতন্ত্র যদিও একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং সে সাথে তার অর্থনৈতিক দর্শনও দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু একটি অর্থনৈতিক দর্শন হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য দর্শনের মধ্যে এখনো তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে তার সম্পর্কে জানাও জরুরি। সুতরাং সর্বপ্রথম এ দুটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিচয় তুলে ধরা হল। তারপর তার মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলো উল্লেখ করা হবে।
মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা
সর্বপ্রথম জানা প্রয়োজন অর্থনীতি কী? তার মৌলিক সমস্যাগুলো কী? আজ যাকে আমরা 'معاشیات' (অর্থনীতি) বলি, সেটা মূলত ইংরেজি শব্দ ইকোনোমিকস (Economics)-এর অনুবাদ। মূলত ইকোনোমিকসের সঠিক অর্থ 'মাআশিআত' (অর্থনীতি) নয়। বরং এর সঠিক অর্থ আরবী শব্দ 'اقتصاد' দ্বারা ব্যক্ত করা যায়। এ শব্দ থেকেই প্রতীয়মান হচ্ছে, সকল অর্থনৈতিক দর্শনে, স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, 'মানুষের অভাব ও চাহিদা মানবীয় উপকরণের তুলনায় বেশি'। আর বর্তমান অর্থনীতিতে 'অভাব' শব্দটি যখন ব্যবহার হয়, তখন 'চাহিদা' শব্দটিও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। মোট কথা, মানবীয় উপকরণ সীমিত আর তার মোকাবেলায় অভাব ও চাহিদা অনেক বেশি। এখন প্রশ্ন, সীমাহীন অভাব ও চাহিদা সীমিত উপকরণ দ্বারা কিভাবে পূরণ করা সম্ভব?
'ইকতিসাদ' ও 'ইকোনোমিকস' অর্থ হচ্ছে, সীমিত উপকরণগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে তা দ্বারা যতদূর সম্ভব বেশি প্রয়োজন
মেটানো যায়। এ কারণে অর্থনীতি শাস্ত্ৰকে ইংরেজিতে 'ইকোনোমিকস' এবং আরবীতে 'ইকতিসাদ' বলা হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রত্যেক অর্থনৈতিক দর্শনে কিছু মৌলিক সমস্যা থাকে যা সমাধান না করে সে অর্থনীতি চলতে পারে না। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, এ মৌলিক সমস্যা চারটি।
এক. প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ (Determination of Priorities)
প্রথম সমস্যা যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ' বলা হয়, তার সারকথা হল, মানুষের অভাব ও চাহিদা অগণিত, কিন্তু তার তুলনায় উপকরণ সীমিত। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, এ সীমিত উপকরণ দ্বারা সকল অভাব ও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। অতএব কিছু অভাব ও চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আর কিছুকে পেছনে রাখতে হবে। কিন্তু কোন অভাবটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং কোন অভাবটিকে পেছনে রাখতে হবে এটা একটা জটিল প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। 'যমন আমার কাছে পঞ্চাশ টাকা আছে। এ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আটা চালও কিনতে পারি, কাপড়ও কিনতে পারি। আবার কোনো হোটেলে বসে 'সৌখিন খাবার খেয়েও ব্যয় করতে পারি। এ চার পাঁচটি অপশন (options) আমার সামনে আছে। এখন আমি এ পঞ্চাশ টাকা এসবের মধ্যে থেকে কোন কাজে ব্যয় করব? একে বলা হয় 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ'।
এ সমস্যা যেমন একজন মানুষের জীবনে দেখা দেয় ঠিক তেমনি পুরো দেশ এবং রাষ্ট্রের জীবনেও দেখা দেয়। যেমন মনে করুন, কোনো দেশের কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, কিছু মানব সম্পদ আছে, কিছু খনিজ সম্পদ আছে, কিছু উৎপাদিত সম্পদ আছে। এসব উপকরণ সীমিত। তার তুলনায় 'অভাব ও চাহিদা সীমাহীন। এখন নির্ধারণ করতে হবে, এসব উপকরণ কোন কাজে ব্যয় করা হবে, কোন জিনিসের উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে? এ বিষয়টির নামই 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ'।
দুই. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (Allocation of Resources)
দ্বিতীয় সমস্যা হল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। আমাদের কাছে উৎপাদনের উপকরণ, অর্থাৎ মূলধন, শ্রম, ভূমি আছে। এগুলো আমরা কোন কাজে কী
পরিমাণ ব্যবহার করব? ধরুন, আমাদের ভূমি আছে। এখন কতটুকু জমিতে আমরা গম আবাদ করব? কতটুকু জমিতে ধানের আবাদ করব? কতটুকু জমিতে তুলা চাষ করব? অথবা অনুরূপভাবে আমাদের কারখানা স্থাপনের যোগ্যতা আছে। এখন আমরা কাপড় কলও স্থাপন করতে পারি। জুতা তৈরির কারখানাও স্থাপন করতে পারি। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন কারখানাও স্থাপন করতে পারি। এখন কতগুলো কারখানা কাপড় প্রস্তুতের জন্য ব্যবহার করব? আর কতগুলো জুতা তৈরিতে ব্যবহার করব? আর কতগুলো খাদ্যবস্তু প্রস্তুতের কাজে ব্যবহার করব? এ প্রশ্নের মীমাংসাকে অর্থনীতির পরিভাষায় 'সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার' বলা হয়।
তিন. আয় বণ্টন (Distribution of Income)
তৃতীয় সমস্যা হল, আয় বা উৎপাদিত দ্রব্যের বণ্টন। অর্থাৎ উপরোল্লিখিত উপকরণগুলো কাজে লাগানোর পর তা থেকে যে উৎপাদন বা আয় হল, সেগুলো কিভাবে সমাজে বণ্টন করা হবে, কিসের ভিত্তিতে, বণ্টন করা হবে? অর্থনীতির পরিভাষায় একেই বলে 'আয় বণ্টন'।
চার. উন্নয়ন (Development)
চতুর্থ সমস্যা হল 'উন্নয়ন'। অর্থাৎ নিজের অর্থনৈতিক উৎপাদনগুলোকে কিভাবে উন্নত করা যায়? যাতে যে উৎপাদন হচ্ছে সেগুলো মানের দিক থেকে আগের তুলনায় আরো ভাল হয়, এবং পরিমাণের দিক থেকে আরো বৃদ্ধি পায়। আর কিভাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পদ্রব্য উদ্ভাবন করা যায় যাতে সমাজের উন্নয়ন হয়। মানুষের কাছে অর্থনৈতিক উপকরণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের আয়ের উপায় তাদের হস্তগত হয়। এ বিষয়কে অর্থনীতির পরিভাষায় 'উন্নয়ন' বলা হয়।
এ চারটি মৌলিক সমস্যা অর্থাৎ 'প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ', 'সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার', 'আয় বণ্টন' এবং 'উন্নয়ন'-এ চারাট সমস্যার সমাধান করা প্রত্যেক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য জরুরি। প্রথমে বুঝতে হবে, এ সমস্যাগুলো যদিও প্রাকৃতিক সমস্যা, কিন্তু তাকে একটি দর্শনের অধীনে নিয়ে চিন্তা করা এবং তার সমাধান খুঁজে বের করার ভাবনা বিগত দিনগুলোতে বেশি হয়েছে। তারই ফলে দুটি পরস্পর বিরোধী দর্শন আমাদের সামনে এসেছে। একটি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism), আর অপরটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Socialism)।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Capitalism)
সর্বপ্রথম আমাদের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বুঝতে হবে, সে উপরোল্লিখিত চারটি মৌলিক সমস্যা কোন্ মূলনীতির ভিত্তিতে সমাধান করার দাবি করেছে? সেগুলো সমাধান করার জন্য কী দর্শন পেশ করেছে? ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বক্তব্য হল, এ চারটি সমস্যা সমাধানের একটিমাত্র উপায় আছে। তা হল, প্রত্যেক মানুষকে ব্যবসায়িক ও শিল্পোৎপাদন তৎপরতার জন্য সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন ছেড়ে দিতে হবে। তাকে এ ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে, সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের জন্য সে যে পদ্ধতি উপযুক্ত মনে করবে সেটাই গ্রহণ করতে পারবে। এর দ্বারা অর্থনীতির উপর্যুক্ত চারটি সমস্যাই আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে। কারণ প্রতিটি মানুষ যখন চিন্তা করবে, আমি সর্বাধিক মুনাফা অর্জন করব, তখন প্রত্যেক ব্যক্তি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সে কাজই করবে সমাজে যার প্রয়োজন রয়েছে। এর ফলে চারটি সমস্যাই আপনা আপনি এক বিশেষ ভারসাম্যের সাথে সমাধান হতে থাকবে। এখন প্রশ্ন হল, এ চার সমস্যা কিভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হবে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য কিঞ্চিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য :
১. মূলত এ পৃথিবীতে বহু প্রাকৃতিক বিধান কর্মরত আছে। যেগুলো সবসময় একই ধরনের ফলাফল সৃষ্টি করে। এ ধরনেরই একটি বিধান যোগান (Supply) ও চাহিদা (Demand)। যোগান বলা হয় বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে আনীত কোনো ব্যবসায়িক পণ্যের মোট পরিমাণকে। আর মূল্যের বিনিময়ে বাজার থেকে ক্রেতাদের ব্যবসায়িক পণ্য খরিদ করার আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় চাহিদা। যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধান হল, বাজারে যে বস্তুর যোগান চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তার মূল্য হ্রাস পায়। আর যে বস্তুর চাহিদা তার যোগানের তুলনায় বেশি হয়, তার মূল্য বৃদ্ধি পায়। যেমন ধরুন, গরমের মওসুমে যখন গরম খুব বেশি পড়তে থাকে তখন বাজারে বরফের ক্রেতা বেড়ে যায়। যার অর্থ, বরফের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যদি বরফের মোট উৎপাদন বা বাজারে প্রাপ্ত বরফের মোট
পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম হয় তাহলে নিঃসন্দেহে বরফের দাম বেড়ে যাবে। তবে সে সময় বরফের উৎপাদন যদি ততটুকু বৃদ্ধি পায় যতটুকু চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাহলে দাম বৃদ্ধি পাবে না। পক্ষান্তরে শীতের সময় বরফের ক্রেতা কমে যায়। তার অর্থ, বরফের চাহিদা কমে গেছে। এখন যদি বাজারে বরফের মোট পরিমাণ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বরফের মূল্য কমে যাবে। এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম। একে বলা হয় যোগান ও চাহিদাবিধি (Law of Demand and Supply)।
২. ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দর্শন বলে, প্রকৃতপক্ষে যোগান ও চাহিদার এ প্রাকৃতিক বিধিই কৃষি পেশার মানুষের জন্য নির্ধারণ করে, সে তার জমিতে কী উৎপাদন করবে। এ বিধিই নির্ধারণ করে, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোন্ বস্তু কী পরিমাণ বাজারে আনবে। এভাবে অর্থনীতির উল্লিখিত চারটি সমস্যাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যায়।
৩. যোগান ও চাহিদাবিধির মাধ্যমেও প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ হবে এভাবে: যদি আমরা প্রত্যেককে বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেই, তখন প্রত্যেক ব্যক্তি তার মুনাফা অর্জনের তাগিদে সে বস্তুই বাজারে আনার চেষ্টা করবে যার প্রয়োজন বা চাহিদা বেশি হবে, যাতে সে তার চড়া দাম পায়। কৃষক সে বস্তুর উৎপাদনকে প্রাধান্য দেবে বাজারে যার চাহিদা অধিক হবে। শিল্পপতি সে শিল্পদ্রব্য তৈরি করতে চেষ্টা করবে বাজারে যার কাটতি বেশি হবে। কেননা তারা যদি এমন জিনিস বাজারে আনে যার চাহিদা কম, তাহলে তারা বেশি লাভ পাবে না। তার ফলাফল হবে, প্রত্যেক ব্যক্তি যদিও নিজের মুনাফার জন্য কাজ করছে, কিন্তু যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক শক্তি তাকে বাধ্য করছে সমাজের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করতে। এমনকি যখন কোনো দ্রব্যের উৎপাদন বাজারে তার চাহিদার সমপরিমাণ এসে যায় তখন সে দ্রব্য আরো উৎপাদন করা যেহেতু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির জন্য লাভজনক হবে না, তাই সে তার উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। এভাবে শুধু সে দ্রব্যই প্রস্তুত হবে, সমাজে যার প্রয়োজন রয়েছে। ততটুকু পরিমাণ প্রস্তুত হবে প্রকৃতপক্ষে যতটুকু তার প্রয়োজন পূরণে দরকার। এর নামই প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ।
৪. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (Allocation of Resources) এর সম্পর্কও প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণের সাথে। যখন কোনো ব্যক্তি নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ করে নেয়, তখন সে হিসেবে বিদ্যমান উপকরণগুলোকে বিভিন্ন কাজে লাগায়। সুতরাং যোগান ও চাহিদাবিধি যেমনিভাবে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ করে, তেমনিভাবে সাথে সাথে সম্পদ বণ্টনের কাজও আঞ্জাম দেয়। যার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের উপকরণ, অর্থাৎ ভূমি মূলধন ও শ্রম সে কাজে ব্যবহার করে। যাতে সে এমন জিনিস বাজারে আনতে পারে যার চাহিদা বাজারে বেশি এবং তার লাভ বেশি হয়। সুতরাং যোগান ও চাহিদাবিধির মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের সমস্যাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যায়।
৫. তৃতীয় সমস্যা আয় বণ্টন। কতিপয় উৎপাদন কার্যক্রমের ফলে যে উৎপাদন বা আয় হল তা কিসের ভিত্তিতে সমাজে বণ্টন করা হবে? ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বক্তব্য হল, যে আয় হবে তা সেসব উপাদানের মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিৎ যারা উৎপাদনের কাজে অংশগ্রহণ করেছে। ধনতান্ত্রিক দর্শন অনুযায়ী এ উপাদান মোট চারটি: ১. ভূমি, ২. শ্রম, ৩. মূলধন, ৪. উদ্যোক্তা বা সংগঠক।
উদ্যোক্তা বা সংগঠক দ্বারা সে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে প্রাথমিকভাবে কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার উদ্দেশে প্রথম তিন উপকরণকে এ কাজের জন্য একত্র করে এবং লাভ-লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বক্তব্য হল, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলে যে আয় হবে তা বণ্টিত হবে এভাবে, ভূমিদানকারীকে দেয়া হবে ভাড়া। শ্রমিককে প্রদান করা হবে মজুরি। মূলধন সরবরাহকারীকে দেয়া হবে সুদ। আর এ উৎপাদন কার্যক্রমের মূল উদ্যোক্তা সংগঠককে দেয়া হবে লভ্যাংশ। অর্থাৎ ভূমির ভাড়া, শ্রমের মজুরি ও মূলধনের সুদ পরিশোধ করার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তাই হবে উদ্যোক্তার লভ্যাংশ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কিভাবে নির্ধারিত হবে, ভূমির ভাড়া কত প্রদান করা হবে, শ্রমের মূল্য কত দেয়া হবে, মূলধনের কি পরিমাণ সুদ দেয়া হবে। এসব প্রশ্নের উত্তরে পুঁজিবাদী দর্শন আবার সে যোগান ও চাহিদাবিধিকে উপস্থাপন করে। সে বলে, এ তিন উপকরণের বিনিময় তার
চাহিদা ও যোগানের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। এসব উপকরণের মধ্যে যে উপকরণের চাহিদা বেশি হবে তার বিনিময়ও তত বেশি হবে।
মনে করুন, যায়েদ একটি কাপড়ের কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে যেহেতু এ শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা এবং সে-ই লাভ-লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করে উৎপাদনের উপকরণগুলো সংগঠিত করার দায়িত্ব নিয়েছে। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় তাকে সংগঠক (Entrepreneur) বলা হয়। এখন তার কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন ভূমির। যদি তার কাছে ভূমি না থাকে তাহলে তা কারো থেকে ভাড়া নিতে হবে। ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ হবে জমির যোগান ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ জমি ভাড়াদানকারীর সংখ্যা যদি অনেক হয়, অর্থাৎ জমির যোগান বেশি এবং ভাড়া গ্রহণকারী তার তুলনায় কম হয়, অর্থাৎ চাহিদা কম হয়, তাহলে জমির ভাড়া কম হবে। আর যদি অবস্থা তার বিপরীত হয় তাহলে জমির ভাড়া বেশি হবে। এভাবে যোগান ও চাহিদাবিধি ভাড়া নির্ধারণ করে দেবে।
তারপর কারখানায় কাজের জন্য মজদুর প্রয়োজন হবে। অর্থনীতির পরিভাষায় যাকে শ্রম বলা হয়- তার পারিশ্রমিক দিতে হবে। এ পারিশ্রমিকের পরিমাণও যোগান এবং চাহিদাবিধির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ বহু মজদুর যদি কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে তার অর্থ শ্রমের যোগান বেশি। সুতরাং তার পারিশ্রমিক কম হবে। কিন্তু যদি এ কারখানায় কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিকের সরবরাহ না থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে, তার যোগান কম। সুতরাং তাকে বেশি পারিশ্রমিক দিতে হবে। এভাবে পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে মজুরি এমন পর্যায়ে নির্ধারিত হবে যেখানে যোগান ও চাহিদা উভয় একত্র হয়।
তেমনিভাবে কারখানা প্রতিষ্ঠাকারীর যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল প্রভৃতি ক্রয়ের জন্য মূলধনের প্রয়োজন হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এর উপর তাকে সুদ দিতে হবে। এ সুদের পরিমাণও নির্ধারিত হবে যোগান ও চাহিদাবিধির ভিত্তিতে। ঋণদাতা যদি বেশি থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে পুঁজির যোগান বেশি। সুতরাং অল্প সুদে কাজ চলে যাবে। কিন্তু যদি মূলধনের ঋণদাতা কম হয় তাহলে বেশি সুদ আদায় করতে হবে। এমনিভাবে সুদের পরিমাণও নির্ধারণ হবে যোগান এবং চাহিদার ভিত্তিতে।
যখন যোগান ও চাহিদার উল্লিখিত নিয়মে ভাড়া মজুরি ও সুদ নির্ধারিত হল, তখন কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলে যে আয় হবে তার অবশিষ্ট অংশ উদ্যোক্তা লভ্যাংশ হিসেবে পাবে।
এভাবে দেখা যাচ্ছে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আয় বণ্টনের মৌলিক বিষয়টিও যোগান এবং চাহিদাবিধির আওতায় সম্পন্ন হয়।
৬. অর্থনীতির চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে উন্নয়ন। অর্থাৎ সব অর্থনীতির জন্য জরুরি হল, সে তার উৎপাদনের অগ্রগতি নিশ্চিত করবে এবং পরিমাণ ও মানের দিক থেকে তার উৎপাদন আরো বৃদ্ধি করবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শন অনুযায়ী এ সমস্যাও যোগান এবং চাহিদার ভিত্তিতে সমাধান হয়।
কেননা, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যখন বেশি বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে, তখন যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধানই তাকে নতুন নতুন ও ভাল ভাল কোয়ালিটির পণ্য বাজারে আনতে উদ্বুদ্ধ করবে। যাতে তার শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বেশি হয় এবং লাভ বৃদ্ধি পায়।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলনীতি
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক মূলনীতি তিনটি:
১. ব্যক্তিমালিকানা (Private Property)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম মূলনীতি হচ্ছে, এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির এ অধিকার থাকে, সে তার ব্যক্তিমালিকানায় পণ্যদ্রব্যও রাখতে পারে এবং উৎপাদনের উপকরণও রাখতে পারে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী যদিও ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে, কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ যেমন ভূমি বা কারখানা সাধারণত ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে না। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যবহার্য সামগ্রী হোক বা উৎপাদনী সামগ্রী হোক, সব ধরনের বস্তু ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে।
২. ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা (profit Motive)
দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে, উৎপাদন কর্মকাণ্ডে যে প্রেরণা কাজ করে সেটা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণা।
৩. সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ততা (Laissez Faire)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে, সরকার ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না। তারা যেভাবেই কাজ করুক তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোরূপ বাধা প্রদান না করা সরকারের কর্তব্য। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উপর অতিরিক্ত বিধি-নিষেধ আরোপ করা উচিৎ নয়। সাধারণভাবে এ মূলনীতির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ততা (Laissez Faire) পরিভাষা ব্যবহার হয়। মূলত এটি ফরাসি শব্দ। অর্থাৎ 'সরকারের হস্তক্ষেপ না করার নীতি'। এর অর্থ হচ্ছে 'করতে দাও'। অর্থাৎ সরকারকে বলা হচ্ছে, যে ব্যক্তি তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সে যেভাবেই কাজ করছে তাকে সেভাবে করতে দাও। তার কাজে কোনো প্রকারে বাধা দিও না। সরকারের অধিকার নেই, সে লোকদের বলবে, অমুক কাজ কর আর অমুক কাজ করো না। ব্যবসা এভাবে কর, ওভাবে করো না- সরকারের একথাও বলার অধিকার নেই। এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তৃতীয় মূলনীতি এবং মৌলিক দর্শন।
পরবর্তীতে যদিও স্বয়ং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে ক্রমান্বয়ে এ নীতি
সীমিত করে দেয়া হয়েছে এবং কার্যত এমন হয় নি যে, সরকার একেবারেই হস্তক্ষেপ করে নি। বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে বহু বিধি-নিষেধ দেখা যায়। যেমন কখনো ট্যাক্সের মাধ্যমে অনেক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, বা কোনো কাজের প্রতি উৎসাহিত করার জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আজ সারা বিশ্বে এমন একটি দেশও নেই যেখানে ব্যবসা বাণিজ্যে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক দর্শন এটাই ছিল, সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না; বরং ব্যবসায়ীদের পুরো স্বাধীনতা দেবে। সুতরাং এর উপর ভিত্তি করেই বলা হয়ে থাকে, 'যে কর্তৃত্ব কম করে সে সর্বোত্তম সরকার' অর্থাৎ হস্তক্ষেপ না করে।
ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা কার্যকর থাকে, তাই তাকে 'ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা' বলে। তার অপর নাম হচ্ছে 'মার্কেট ইকোনোমি' (Market Economy) বাজার অর্থনীতি। এ কারণে এক্ষেত্রে মার্কেটের শক্তি (Market Forces) অর্থাৎ যোগান ও চাহিদা দ্বারা কাজ আদায় করা হয়।
সমাজতন্ত্র (Socialism)
সমাজতন্ত্র মূলত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিবাদ হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করেছে। পুঁজিবাদী দর্শনের পুরো জোর ছিল এর উপর, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য প্রত্যেকেই স্বাধীন। অর্থনীতির সকল সমস্যা মৌলিকভাবে শুধু যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে সমাধান হয়। এ কারণে এ দর্শনে জনকল্যাণ ও গরীবের স্বার্থ ইত্যাদির প্রতি কোনো সুস্পষ্ট গুরুত্ব ছিল না। আর সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় দুর্বল মানুষের নিষ্পেষিত হওয়ার প্রচুর ঘটনা ঘটে। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান অনেক বেড়ে যায়। এজন্য সমাজতন্ত্র এসব দোষ-ত্রুটি প্রতিহত করার দাবি নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করে অর্থনীতির উপরোল্লিখিত চার মৌলিক সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণা, ব্যক্তিমালিকানা ও বাজারশক্তির ভিত্তিতে সমাধান করার দাবি অস্বীকার করে।
সমাজতন্ত্র বলল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো যোগান ও চাহিদার এক অন্ধ বধির শক্তির উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের প্রেরণার ভিত্তিতে কাজ করে। জনকল্যাণের অনুভূতিই তার থাকে না। বিশেষত আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে এ শক্তি অবিচারমূলক ফলাফল বয়ে আনে। যার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলে তার মজুরি কমে যায়। কখনো শ্রমিক অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হয়। তার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে যে উৎপাদন হচ্ছে তার থেকে সে এতটুকু অংশও পাচ্ছে না, যা দ্বারা সে তার নিজের ও বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্য স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করতে পারে। যেহেতু তার শ্রমপ্রার্থী পুঁজিপতির এ ব্যাপারে কোনো ভাবনা নেই, যে মজুরিতে সে তার থেকে শ্রম নিচ্ছে সেটা বাস্তবিকপক্ষে তার শ্রমের উপযুক্ত বিনিময় এবং তার প্রয়োজনের প্রকৃত সমাধানকারী কিনা। তার তো কেবল ভাবনা, যোগানের পর্যাপ্ততার কারণে সে তার চাহিদা অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে মেটানো, যার দ্বারা তার মুনাফায় বৃদ্ধি ঘটবে। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক দর্শন অনুযায়ী আয় বণ্টনের জন্য যোগান ও চাহিদার ফর্মুলা
এমন একটি অনুভূতিহীন ফর্মুলা, যাতে গরীবদের প্রয়োজনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই; বরং সে পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার অনুগত এবং একেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
অনুরূপভাবে সমাজতন্ত্রের নিকট প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও যোগান এবং চাহিদার অন্ধ বধির শক্তির হাতে সমর্পণ করা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি তাত্ত্বিক দর্শন অনুযায়ী এটা ঠিক, ব্যক্তিগত মুনাফা প্রেরণার অধীনে একজন কৃষক বা একজন শিল্পমালিক ততক্ষণ পর্যন্ত তার উৎপাদন অব্যাহত রাখবে যতক্ষণ পর্যন্ত তার যোগান চাহিদার সমান না হয়। যখন যোগান চাহিদা থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকবে তখন সে উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। কিন্তু বাস্তব জগতে কোনো ব্যবসায়ী বা কৃষকের কাছে এমন কোনো নির্ধারিত মাপকাঠি নেই, যার সাহায্যে সে সময় মতো জানতে পারে, এখন অমুক উৎপাদিত দ্রব্যের যোগান চাহিদার সমান হয়ে গেছে। সুতরাং সে কখনো এ চিন্তা করে উৎপাদন অব্যাহত রাখে, এখনো এ পণ্যের যোগান প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় কম। অথচ বাজারে তখন প্রকৃত যোগান পর্যাপ্ত হয়ে গেছে। এ অবস্থার খবর সে অনেক পরে পায়। পরিণামে বাজারে কখনো এমন পণ্যের ছড়াছড়ি দেখা যায় যার চাহিদা সে পরিমাণ নয়। এভাবে অর্থনীতি মন্দার শিকার হয়ে পড়ে। ফলে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে পড়ে। আরো বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক অসুবিধা সৃষ্টি হয়। সুতরাং শুধু যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে উপরোল্লিখিত চারটি সমস্যার সমাধানের পদ্ধতি কী হওয়া উচিৎ? তার উত্তরে সমাজতন্ত্র এ দর্শন পেশ করল, উৎপাদনের উপাদান অর্থাৎ ভূমি ও কারখানাকে মানুষের ব্যক্তিমালিকানায় স্বীকৃতি দেয়াটাই মূল সমস্যার জন্ম দিয়েছে। হওয়া উচিৎ এমন, সকল উৎপাদন-উপাদান ব্যক্তির ব্যক্তিমালিকানায় না থেকে রাষ্ট্রের সমষ্টিক মালিকানায় থাকবে। যখন সব উপাদান রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকবে তখন সরকার জানতে পারবে তার কাছে মোট কী পরিমাণ উপাদান আছে। সমাজের প্রয়োজনগুলো কী কী। তার উপর ভিত্তি করে সরকার একটি
পরিকল্পনা তৈরি করবে। এতে নির্ধারণ করা হবে সমাজের কোন্ প্রয়োজনগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া যায়। কোন্ বস্তু কী পরিমাণে উৎপাদন করা হবে। বিভিন্ন উপাদানগুলোকে কোন্ নিয়মে কোন্ কোন্ কাজে ব্যবহার করা হবে। এতে যেন প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও উন্নয়ন- তিনটি কাজই সরকারের পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়িত হল। বাকি থাকল আয় বণ্টনের প্রশ্ন। সুতরাং সমাজতন্ত্র দাবি করল, প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের উপকরণ মাত্র দুটি। ভূমি ও শ্রম। ভূমি যেহেতু ব্যক্তিগত মালিকানা নয়; বরং সমষ্টিক মালিকানায় আছে, তাই তার উপর নির্দিষ্ট ভাড়া বা কর দেয়ার প্রয়োজন নেই। বাকি থাকে শুধু শ্রম। সরকার একথা চিন্তা করে তার পরিকল্পনার অধীনে শ্রমের মজুরির পরিমাণও নির্ধারণ করে দেবে যেন শ্রমিক তার উপযুক্ত বিনিময় পায়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেমনিভাবে উল্লিখিত চার মৌলিক সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা এবং বাজার শক্তির উপর ভিত্তি করে সমাধান করতে চেয়েছিল, তেমনিভাবে সমাজতন্ত্র এ চার সমস্যা সমাধানের জন্য একটাই মৌলিক সমাধান প্রস্তাব করল। অর্থাৎ সরকারি পরিকল্পনা। এ কারণে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে পরিকল্পিত অর্থনীতি (Planned Economy) বলা হয়। যার আরবী অনুবাদ করা হয়েছে اقتصاد موجهة বা اقتصاد مخطط ।
সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতি
সমাজতন্ত্রের উপরোল্লিখিত দর্শনের ফল হিসেবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে নিম্নলিখিত মৌলিক মূলনীতি কার্যকর হয়।
১. সমষ্টিক মালিকানা (Collective Property)
এ মূলনীতির অর্থ হচ্ছে, উৎপাদনের উপাদান, অর্থাৎ ভূমি এবং কারখানা ইত্যাদি কোনো লোকের ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকবে না; বরং তা জাতীয় মালিকানায় থাকবে। আর তা পরিচালিত হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে, কিন্তু উৎপাদনের উপাদান কোনো ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে না। এর পরিণাম হল, খাঁটি সমাজতান্ত্রিক দেশে শুধু জমি ও কারখানাই নয়; বরং ব্যবসায়িক দোকান-পাটও কোনো ব্যক্তি বিশেষের মালিকানায় থাকে না। সেখানে সব লোক সরকারের কর্মচারী। উৎপাদিত আয়ের পুরোটা সরকারি কোষাগারে যায়। আর কর্মচারীদের বেতন বা মজুরি সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রদান করা হয়।
২. পরিকল্পনা (Planning)
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বিতীয় মৌলিক নীতি হচ্ছে পরিকল্পনা। এর অর্থ, সবধরনের মৌলিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকার নিজস্ব পরিকল্পনার অধীনে বাস্তবায়ন করে। এ পরিকল্পনার মধ্যে সব অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং সকল অর্থনৈতিক উপাদানের পরিমাণ ও সংখ্যা একত্র করা হয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কোন্ উপাদান কোন্ জিনিসের উৎপাদনে লাগানো হবে। কোন্ বস্তু কী পরিমাণ উৎপাদন করা হবে। কোন্ বিভাগের শ্রমিকদের কী পরিমাণ মজুরি নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ধারণা মূলত সমাজতন্ত্র পেশ করেছিল। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে ধনতান্ত্রিক দেশগুলোও আংশিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের পন্থা অবলম্বন করতে শুরু করে। এর কারণ, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ক্রমে ক্রমে তার সে মূলনীতির উপর পরিপূর্ণরূপে অটল থাকতে পারে নি যে, রাষ্ট্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বরং বিভিন্ন সমষ্টিক স্বার্থের খাতিরে পুঁজিবাদী সরকারকেও ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু না কিছু হস্ত
ক্ষেপ করতে হয়েছে। এমনকি মিশ্র অর্থনীতি (Mixed Economy) নামে এক নতুন পরিভাষা অস্তিত্ব লাভ করেছে। এর অর্থ হচ্ছে, যদিও মৌলিকভাবে অর্থনীতি বাজার শক্তির অধীনেই পরিচালিত হবে, কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবসা ও শিল্পের কিছু বিভাগ সরকারি তহবিলেও থাকতে পারে। যেমন কিছু ধনতান্ত্রিক দেশে রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, এয়ারলাইন সার্ভিস ইত্যাদি সরকারি খাতে থাকে। যে ব্যবসা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চালানো হচ্ছে, সরকার তাও কিছু নীতিমালা ও বিধিবিধানের অধীন করে নেয়। প্রথম প্রকারের ব্যবসাকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিভাগ (Public Sector) এবং দ্বিতীয় প্রকারকে ব্যক্তিগত বিভাগ (Private Sector) বলা হয়। এ মিশ্র অর্থনীতিতে যেহেতু এক পর্যায়ে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকে, তাই আংশিকভাবে তাকে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। এ আংশিক পরিকল্পনার পরিণামে সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে তা আংশিক পরিকল্পনা। আর সমাজতন্ত্রের পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সকল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকারি পরিকল্পনার অধীন হয়।
৩. সমষ্টিক স্বার্থ (Collective Interest)
সমাজতন্ত্রের তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে সমষ্টিক স্বার্থ। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের দাবি হল, ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থের অনুগামী হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিকল্পনার মাধ্যমে মৌলিকভাবে সমষ্টিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
৪. আয়ের সুষম বণ্টন (Equitable Distribution of Income)
সমাজতন্ত্রের চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে, উৎপাদনের মাধ্যমে যে আয় হবে তা জনগণের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টিত হবে। ধনী দরিদ্রের মাঝে অতিরিক্ত ব্যবধান থাকবে না। উভয় শ্রেণীর আয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকবে। প্রথমে দাবি করা হয়েছিল, সমাজতন্ত্রে আয়ের সমতা হবে। অর্থাৎ সবার আয় সমান হবে, কিন্তু বাস্তবে এরূপ কখনো হয় নি। মানুষের মজুরি ও বেতন কমবেশি হতে থাকে। তবে সমাজতন্ত্রে অন্তত এ দাবি অবশ্যই করা
উভয় ব্যবস্থার পর্যালোচনা
সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব চলে আসছে। দর্শনগত দিক থেকে উভয়ের মাঝে তুমুল আলোচনা- সমালোচনা, তর্ক-বিতর্কও চলে আসছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে যুদ্ধাংদেহী ভাবও কার্যকর রয়েছে। উভয় পক্ষ থেকে পরস্পরের যে সমালোচনা হয়ে আসছে এবং এ বিষয়ে যত বই পুস্তক লেখা হয়েছে, যদি সেগুলো একত্র করা হয় তাহলে পুরো একটি গ্রন্থাগার পূর্ণ হতে পারে। এখানে তার সবগুলো সমালোচনা তুলে ধরা সম্ভব হবে না। তবে সংক্ষিপ্তভাবে উভয় ব্যবস্থার উপর মৌলিক কিছু পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যা আমি এখানে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করতে চাই।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা
প্রথমে সমাজতন্ত্রের উপর পর্যালোচনা করা এ হিসেবে যুক্তিযুক্ত, তার অনিষ্টগুলো বুঝা তুলনামূলকভাবে সহজ। সমাজতন্ত্রের এতটুকু কথা তো বাস্তবিকই সঠিক ছিল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে এতটা স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, যার ফলে জনকল্যাণের ধারণা হয় তো একেবারেই বাকি থাকে নি, নয় তো অনেক পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু তার যে সমাধান সমাজতন্ত্র প্রস্তাব করেছে সেটা ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী চিন্তা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ব্যক্তিকে এতটা স্বাধীন ও লাগামহীন ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে সে তার মুনাফার জন্য যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াতে পারে। তার বিপরীতে সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে এতটা চেপে ধরেছে, যাতে তার ব্যক্তিস্বাধীনতাটুকুও রহিত হয়ে গেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাকে সব সমস্যার সমাধান স্থির করেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্র এ প্রাকৃতিক বিধান মানতেই অস্বীকার করে। তার স্থানে
সাব্যস্ত করেছে। অথচ মানুষের নিজের তৈরি করা পরিকল্পনা সব জায়গায় কাজ করে না। বহু স্থানে একটি কৃত্রিম জোড় বন্ধন ছাড়া তার আর কোনো ফলাফল বয়ে আনে না।
মানুষের জীবনে অনেক সামাজিক সমস্যা আসে। এসব সমস্যা পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে সমাধান করা সম্ভব হয় না। যেমন একটি সামাজিক সমস্যা হল, প্রত্যেক পুরুষের বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী দরকার আর প্রত্যেক মহিলার জন্য দরকার উপযুক্ত পাত্রের। এ সামাজিক সমস্যা পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সমাধান হয়ে আসছে। প্রত্যেকেই তার নিজের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খোঁজে। যেখানে উভয় পক্ষের মতৈক্য হয় সেখানে বিবাহ সংঘটিত হয়। এ ব্যবস্থার পরিণামে নিঃসন্দেহে কিছু সমস্যাও সামনে আসে। যেমন এ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কোনো সময় ভুলও হয়ে যায়। যার ফলে অমিল অনৈক্য সৃষ্টি হয়। এমনও হয়, কোনো পুরুষ বা কোনো মহিলা বিবাহ থেকে বঞ্চিত থাকে তার প্রতি কারো কোনো আকর্ষণ হয় না বলে। কিন্তু এ সমস্যার এমন সমাধান আজ পর্যন্ত কেউ ভাবে নি, বিবাহ ব্যবস্থাপনাকে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের উপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের কাছে সমর্পণ করা উচিৎ। সে পরিকল্পনা তৈরি করবে কত পুরুষ ও কত মহিলা আছে, কোন্ পুরুষ কোন্ মহিলার জন্য অধিক উপযুক্ত। যদি কোনো সরকার বা রাষ্ট্র এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা করতে চায়, তাহলে সেটা হবে একটি অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম ব্যবস্থা। যা দ্বারা কখনো সন্তোষজনক ফল বের হয়ে আসতে পারে না।
অনুরূপভাবে একটি সমস্যা হল, মানুষ কোন্ পেশা গ্রহণ করবে, উৎপাদনের কোন্ কাজে কতটুকু অংশগ্রহণ করবে, কোন্ভাবে সমাজে তার অবদান পেশ করবে। এটা মূলত একটা সামাজিক বিষয়। এ বিষয় যদি শুধু নীরস পরিকল্পনার ভিত্তিতে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো সৃষ্টি হবে।
১. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিকল্পনা তৈরির কাজ সম্পন্ন করে। আর সরকার ফেরেশতাদের কোনো দলের নাম নয়। যাদের থেকে কোনো ত্রুটি বা দুর্নীতি প্রকাশ পাবে না। সরকার পরিচালনাকারীরাও রক্ত মাংসের মানুষ। তারা নিজেদের প্রবৃত্তি ও ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হতে
পারে। তাদের চিন্তার মাঝেও ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে যখন সারা দেশের সব উৎপাদন-উপকরণ এ শ্রেণীর মানুষের নিকট সমর্পণ করা হবে, তখন তাদের নিয়তে অসৎপ্রবণতা আসলে তার পরিণাম পুরো জাতিকেই ভোগ করতে হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যদি এক ক্ষুদ্র পুঁজিপতি সীমিত উৎপাদন-উপকরণের উপর স্বত্বাধিকার লাভ করে কিছু মানুষকে জুলুমের নিশানা বানাতে পারে, তাহলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কতিপয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি সমগ্র দেশের উৎপাদন-উপকরণের উপর অধিকার পেয়ে তার থেকে অনেকগুণ বেশি জুলুম-নিপীড়ন চালাতে পারে। এর পরিণাম হতে পারে এমন, বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজিপতি খতম হয়ে যাবে, আর তাদের স্থানে জন্ম নেবে বিরাট এক পুঁজিপতি। যে রাষ্ট্রের সব সম্পদ নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করবে।
২. সমাজতন্ত্রের পরিকল্পিত ব্যবস্থা একটি চূড়ান্ত শক্তিশালী; বরং স্বৈরাচারী সরকার ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং চলতেও পারে না। কারণ মানুষকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রের পরিকল্পনার অনুসারী করার জন্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন অত্যাবশ্যক। কেননা, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ ইচ্ছায় কাজ করার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অধীনে কাজ করতে হয়। এ পরিকল্পনা এক প্রবল স্বৈরাচারী শক্তি ছাড়া কাজ করতে পারে না। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিসমাপ্তি অবশ্যম্ভাবী। এভাবে সবদিক থেকে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিষ্পিষ্ট করা হয়।
৩. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেয়া হয়, এ কারণে মানুষের কর্মকাণ্ডে এর খারাপ প্রভাব পড়ে। মানুষ চিন্তা করে, সে উদ্দীপনা ও পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী আগ্রহের সাথে কাজ করুক বা অলসতা ও নিস্পৃহতার সাথে কাজ করুক, সর্বাবস্থায় তার আয় সমান। এ কারণে তার মধ্যে ব্যক্তিগত উত্তম কর্মস্পৃহা অবশিষ্ট থাকে না। ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা সাধারণভাবে খারাপ বিষয় নয়। বরং সেটা যদি সীমার মধ্যে থাকে তাহলে মানুষের যোগ্যতাকে বিকশিত করে। তাকে নতুন নতুন সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে। এ স্বভাবজাত স্পৃহাকে সীমার মধ্যে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণরূপে দমিয়ে
দিলে মানুষের অনেক যোগ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
এসব ত্রুটি বিচ্যুতি শুধু দর্শনগত ব্যাপার নয়। বরং সমাজতন্ত্রের প্রথম পরীক্ষাগার রাশিয়ায় চুয়াত্তর বছরের অভিজ্ঞতা এসব অনিষ্ট পুরোপুরি প্রমাণ করে দিয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সমাজতন্ত্র ও জাতীয়করণের বুলি আওড়ানো হত। যে ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে মুখ খুলত তাকে গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল এবং পুঁজিবাদের এজেন্ট বলা হত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় স্বয়ং রুশ প্রেসিডেন্ট ইয়েলিৎসন বলেন, "যদি সমাজতান্ত্রিক (Utopian)¹ দর্শনের পরখটা রাশিয়ার মতো একটা বিশাল দেশে না করে আফ্রিকার কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চলে করা হত, তাহলে তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি জানার জন্য চুয়াত্তর বছর লাগত না। -(নিউজ উইক)
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা
এবার সংক্ষিপ্তভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শন পর্যালোচনা করতে হয়। সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর পাশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে অত্যন্ত জোরেশোরে বগল বাজানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, বাস্তব জগতে যেহেতু সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অথচ ব্যাপার হল, সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশুদ্ধতা ছিল না; বরং তার কারণ ছিল, সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত ভুলগুলো সংশোধনের পরিবর্তে অন্য একটি ভুল পথ অবলম্বন করেছিল। সুতরাং এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দর্শনগত ভুলগুলো অধিক সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝা দরকার। বস্তুত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে এতটুকু কথা সঠিক ছিল,
অর্থনৈতক সমস্যা সমাধান করার জন্য ব্যাক্তগত মুনাফার প্রেরণা এবং বাজার শক্তি অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নেয়া জরুরি। কারণ এটা মানবীয় প্রকৃতির দাবি। কিন্তু ভুলটা মূলত এখানে হয়েছে, একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য লাগامহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না। সামগ্রিক কল্যাণের প্রতিও তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সুতরাং তার জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করাও বৈধ হয়ে যায় যার পরিণামে সে সর্বোচ্চ সম্পদশালী হয়ে বাজারের উপর নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একচ্ছত্র আধিপত্যের অর্থ হল, কোনো বিশেষ পণ্যের যোগান ও সরবরাহ করা কোনো এক ব্যক্তি বা এক গ্রুপের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সে ব্যক্তি বা গ্রুপ ছাড়া অন্য কেউ ঐ বস্তু উৎপাদন করতে পারে না। এ একচ্ছত্র আধিপত্যের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল, মানুষ সে বস্তু তার স্বেচ্ছাচার-নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য হয়। মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে লাগামহীন ছাড় দেয়া এবং তার উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোর দেয়ার ফলে যে অনিষ্ট পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তা সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নরূপ-
১. মুনাফা অর্জনের জন্য যেহেতু হালাল হারামের কোনো পার্থক্য ছিল না, এ কারণে তার থেকে বহু নৈতিক অনিষ্ট সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। কেননা, সর্বাধিক মুনাফা উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা অনেক মানুষের নিচু প্রকৃতিকে জাগ্রত করে তার কুপ্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর উপায় উপকরণ যোগান দেয়। যা দ্বারা সমাজে নৈতিক বিকৃতি ছড়ায়। সুতরাং এটাও পাশ্চাত্য জগতের উলঙ্গপনা ও অশ্লীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সেখানে উলঙ্গ ছবি ও চলচ্চিত্রের সয়লাব বইয়ে দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ ব্যক্তিগত মুনাফার আকাঙ্ক্ষা মেটাচ্ছে। নারীরা তাদের শরীরের এক একটি অঙ্গ এ আকাঙ্ক্ষার অধীনে বাজারে বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুসারে সার্ভিসের কারবারে মডেল গার্লসের কারবার সর্বাধিক লাভজনক। যারা নিজেদের ছবি শিল্পপতিদের নিজস্ব শিল্পদ্রব্যের উপর ছাপানোর জন্য বা প্রচারের মডেল বানানোর জন্য সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে তারা অত্যন্ত চড়া মূল্য আদায় করে। এমনকি আমেরিকায় এ শ্রেণী সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, তাদের যে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করা
হয় তা অবশেষে উৎপাদন-ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধে গিয়ে পড়ে। এভাবে পুরো জাতি এ সব অনৈতিকতার আর্থিক মূল্যও পরিশোধ করে।
২. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের উপর যেহেতু বিশেষ কোনো নৈতিক বিধি-নিষেধ নেই এ কারণে প্রয়োজনের অগ্রগণ্যতা নির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টনে জনকল্যাণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। যখন অধিক মুনাফা অর্জনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারিত হয় তখন এ অধিক মুনাফা যদি উলঙ্গ ফিল্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাহলে এক ব্যক্তি বাস্তুহীন মানুষের আবাসনের জন্য অর্থ কেন ব্যয় করবে? যখন এখাতে তুলনামূলক লাভ কম।
৩. ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার উপর হালাল হারামের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে সুদ, জুয়া, হুন্ডি ইত্যাদি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈধ। অথচ এগুলো এমন বস্তু যা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। যার একটা নিদর্শন হল, এর ফলে অধিক পরিমাণে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব একচেটিয়া আধিপত্য বর্তমান থাকতে বাজারের প্রাকৃতিক শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধান পঙ্গু হয়ে পড়ে, তা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। একদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাবি, আমরা বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদাবিধি থেকে কাজ নিতে চাই। অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দিয়ে তা একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। যা দ্বারা যোগান ও চাহিদার শক্তি অকার্যকর বা প্রভাবহীন হয়ে পড়ে।
এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হল, যোগান ও চাহিদা শক্তি অর্থনীতিতে ভারসাম্য সৃষ্টিকরণে তখনি কার্যকর হয়, যখন বাজারে স্বাধীন প্রতিযোগিতার (Free competition) পরিবেশ থাকে। কিন্তু যখন বাজারে কোনো ব্যক্তির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন মূল্যব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে না। আর অর্থনীতির চার মৌলিক সমস্যার ব্যাপারে হওয়া সিদ্ধান্ত গুলো সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন ও চাহিদার চিত্র তুলে ধরে না। এখানেও একটা কৃত্রিম ব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করে। এক দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টা বুঝা যাক। মনে করুন, চিনির উৎপাদন প্রয়োজন মোতাবেক এ পরিমাণ হওয়া উচিৎ যাতে যোগান ও চাহিদার মাধ্যমে বাজারে তার উপযুক্ত দাম
নির্ধারিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত দাম তখনি নির্ধারণ সম্ভব যখন চিনি প্রস্তুত করার জন্য বিভিন্ন কারখানা বিদ্যমান থাকে। আর ক্রেতাদের এ অধিকার থাকে, এক কারখানার চিনির দাম যদি বেশি হয় তাহলে সে অন্য কারখানা থেকে ক্রয় করতে পারবে। যদি বাজারে এ প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকে তাহলে কোনো কারখানাই দাম নির্ধারণে স্বেচ্ছাচার করতে পারবে না। এ অবস্থায় বাজারে চিনির যে দাম নির্ধারিত হবে তা প্রকৃতপক্ষে চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য অনুসারে হবে এবং তা হবে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য। কিন্তু যদি একজন মাত্র ব্যক্তি চিনির কারবারের ইজারাদার বনে যায়, আর মানুষ কেবল তার থেকেই চিনি ক্রয়ে বাধ্য হয়, তাহলে তার নির্ধারিত দামে চিনি ক্রয় করা ছাড়া মানুষের কাছে আর কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় চিনির যে দাম হবে তা নিঃসন্দেহে ঐ অবস্থা থেকে বেশি হবে যখন বাজারে একাধিক চিনি সরবরাহকারী থাকবে এবং তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থাকবে। মনে করুন, স্বাধীন প্রতিযোগিতার পরিবেশে চিনির মূল্য কিলোগ্রাম প্রতি আট টাকা। একচেটিয়া পরিবেশে সেটা কিলো প্রতি দশ বা বার টাকা হতে পারে। এখন যদি মানুষ বার টাকায় চিনি ক্রয় করে তাহলে এ লেনদেন তার প্রকৃত চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এক কৃত্রিম অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে, যা এক চিনি ব্যবসায়ীর একচেটিয়া আধিপত্য দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রকৃত যোগান ও চাহিদা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয়।
সুতরাং যদিও একথা বলাটা সঠিক ছিল, যোগান ও চাহিদা শক্তির অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর অনেকাংশে সমাধান করা উচিৎ। কিন্তু এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হালাল হারামের পার্থক্য ছাড়াই যখন ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণহীন ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তখন সে একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্ঠা করে নিজে যোগান ও চাহিদা শক্তির সঠিকভাবে কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করে। এভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি মূলনীতি কার্যত তার অন্য মূলনীতিকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
৪. পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল ধারণা যদিও এমন ছিল, কায়-কারবার ও ব্যবসা বাণিজ্যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না হোক, কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর কার্যত এ মূলনীতি পুরোপুরি বহাল থাকতে পারে নি। প্রায় সকল ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু হস্ত
ক্ষেপ হতে থাকে। যেমন সরকার বিভিন্ন আইনের বিশেষত ট্যাক্সের মাধ্যমে কোনো ব্যবসাকে উৎসাহিত আবার কোনো ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করতে থাকে। এখন সম্ভবত এমন কোনো ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই যাতে সরকারের পক্ষ থেকে কায়-কারবার ও ব্যবসায়ের উপর কোনো না কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় না। সুতরাং সরকারের হস্তক্ষেপ না করার (Laissez Faire) মূলনীতি সঠিকভাবে পালনকারী কোনো রাষ্ট্রের অস্তি ত্ব পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সরকারের এসব হস্তক্ষেপ কখনো হয় সরকারি আমলা ও ধনীদের পরস্পর গাঁটছড়া বাধার পরিণতি। যার সুফল শুধু প্রভাবশালী পুঁজিপতিদের কাছেই পৌঁছে। এ কারণে সামগ্রিক কল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষিত হয় না। এ বিধি-নিষেধগুলো যদি সরকারি আমলা ও ধনীদের গাঁটছড়া বাধা ও দুর্নীতি থেকে মুক্তও হয়, তবুও তা খাঁটি সেক্যুলার চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার পক্ষ নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার আলোকে যে বিধি-নিষেধ উপযুক্ত মনে করে তাই আরোপ করে। অথচ নিছক বিবেক সব মানবীয় সমস্যা সমাধান করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণেই এসব বিধি-নিষেধ অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঠিক প্রতিকার হতে পারে নি।
৫. পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশেষভাবে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা বৈষম্যের শিকার থাকে। এ বৈষম্যের এক বিরাট কারণ সুদ ও জুয়া। পরিণামে সম্পদের গতি প্রবাহ ধনীদের দিকে থাকে। দরিদ্র ও জনসাধারণের দিকে থাকে না। এর ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সম্পদ বণ্টন সম্পর্কিত আলোচনায় আসবে।
অর্থনীতির ইসলামী বিধান
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পর এখন সংক্ষিপ্তভাবে এ নিবেদন করতে চাই, অর্থনীতির যে চার মৌলিক সমস্যার কথা বর্ণনা করা হয়েছিল সে ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী? একথা পূর্বেই পরিষ্কার থাকা চাই, ইসলাম কোনো অর্থব্যবস্থার নাম নয়। বরং এটা একটা দ্বীন-জীবনব্যবস্থা। যার বিধান জীবনের প্রত্যেক বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে অর্থনীতিও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কুরআন ও হাদীস প্রচলিত অর্থে কোনো অর্থনৈতিক দর্শন বা মতবাদ পেশ করে নি। যা বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক পরিভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। সুতরাং প্রয়োজনের অগ্রগন্যতা নির্বাচন, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, আয় বণ্টন ও উন্নয়ন শিরোনামে কুরআন হাদীস বা ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রে সরাসরি কোনো আলোচনা বিদ্যমান নেই। কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিভাগের মতো ইসলাম অর্থনীতির ব্যাপারেও কিছু বিধান দিয়েছে। এসব বিধান সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন করে আমরা উদ্ভাবন করতে পারি, উল্লিখিত চার সমস্যার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী। এখন এ অধ্যয়ন ও উদ্ভাবনের সার-সংক্ষেপ পেশ করা হচ্ছে।
ইসলামের অর্থনৈতিক বিধান ও শিক্ষার উপর চিন্তা ভাবনা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে, ইসলাম বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধান মেনে নিয়েছে। ইসলাম অর্থনীতির সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য মোটের উপর যোগান ও চাহিদাবিধি ব্যবহারের সহযোগিতা প্রদান করে। আল-কুরআনের ঘোষণা: نحن قسمنا بينهم معيشتهم في الحياة الدنيا ورفعنا بعضهم فوق بعض درجات ليتخذ بعضهم بعضا سخريا -আমি তাদের মাঝে তাদের পার্থিব জীবনের জীবিকা বণ্টন করেছি, মর্যাদায় তাদের কাউকে কারো উপর উচ্চস্থান দিয়েছি, যাতে তারা একজন অন্যজন থেকে কাজ নিতে পারে। (সূরা যুখরুফ: ৩২)
উল্লিখিত আয়াতের মর্ম থেকে এ কথা স্পষ্ট, একে অন্যের থেকে কাজ এভাবে নেবে যে, কাজ গ্রহণকারী কাজের চাহিদা এবং কাজ প্রদানকারী কাজের যোগান। এ চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক টানাপড়েন ও মিল থেকে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি অস্তিত্ব লাভ করে। অনুরূপভাবে রাসূল সা.
এর যুগে যখন পল্লীবাসী তাদের কৃষিপণ্য শহরে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসত, তখন কিছু শহুরে মানুষ পল্লীবাসীদের বলত, তুমি তোমার পণ্য নিজে শহরে নিয়ে বিক্রি করো না; বরং এ মাল আমাকে দিয়ে দাও। আমি উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করে দেব, যাতে বেশি দাম পাওয়া যায়। রাসূল সা. এমন করতে নগরবাসীকে নিষেধ করেছেন। সাথে একথাও বলেছেন,
دعوا الناس يرزق الله بعضهم عن بعض
-মানুষদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও, আল্লাহ তাআলা তাদের কাউকে কারো মাধ্যমে জীবিকা দান করেন।
এভাবে রাসূল সা. বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তির হস্ত ক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন, যাতে বাজারে যোগান ও চাহিদার সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পল্লীবাসী যখন সরাসরি বাজারে কোনো জিনিস বিক্রি করবে তখন তার নিজের উপযুক্ত মুনাফা ধরেই বিক্রি করবে। কিন্তু তাকে যেহেতু তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে, তাই তার মজুদ করে রাখার কোনো অবকাশ নেই। আর সে নিজে বাজারে পৌঁছলে যোগান ও চাহিদার এমন মিশ্রণ হবে যা সঠিক মূল্য নির্ধারণে সাহায্য করবে। পক্ষান্তরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যদি তাদের মাঝখানে আসে এবং মালের মজুদ গড়ে তোলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তা যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। সুতরাং উপরোল্লিখিত হাদীস থেকেও একথা বুঝা যায়, রাসূল সা. যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছেন।
তেমনিভাবে যখন তাঁর কাছে আবেদন করা হল, আপনি বাজারে বিক্রীত পণ্যদ্রব্যের দাম সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে দিন, এ অবস্থায়ও রাসূল সা. ঘোষণা করেন:
ان الله هو المسعر القابض الباسط الرازق
-নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলাই মূল্য নির্ধারণকারী। তিনিই পণ্যের যোগানে হ্রাস-বৃদ্ধিকারী এবং তিনিই আহারদাতা।
উল্লিখিত হাদীসে আল্লাহ তাআলাকে মূল্য নির্ধারণকারী স্থির করার সুস্পষ্ট অর্থ, আল্লাহ তাআলা যোগান ও চাহিদার প্রাকৃতিক বিধান নির্ধারণ করেছেন। যার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে দাম নির্ধারিত হয়। এ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ছেড়ে কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণ করা পছন্দনীয় নয়।
কুরআন ও হাদীসের এ নির্দেশনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়, ইসলাম বাজার শক্তি, অর্থাৎ যোগান ও চাহিদার বিধানকে মোটামুটিভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তেমনিভাবে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা থেকেও মোটামুটিভাবে কাজ নিয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হল, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ প্রেরণাকে একেবারে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পরিণামে ঐ অনিষ্টগুলো সৃষ্টি হয়েছে যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণাকে বহাল রেখে, চাহিদা এবং যোগানের বিধানকে স্বীকৃতি দিয়ে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এর বাস্তবায়ন হলে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণা এমন ভুল পথে চলতে পারবে না যা অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে বা তার থেকে অন্য কোনো নৈতিক বা সামাজিক অনিষ্ট সৃষ্টি হয়। ইসলাম ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার উপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. খোদায়ী নিয়ন্ত্রণ
সর্বপ্রথম ইসলাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর হালাল হারামের কিছু চিরস্থায়ী বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা সর্বযুগে সর্বস্থানে কার্যকর। যেমন সুদ জুয়া হুন্ডি মজুদদারি গুদামজাতকরণ এবং অন্যান্য সকল নিষিদ্ধ ব্যবসা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তার কারণ, এসব সাধারণত একচেটিয়া ইজারাদারি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হয়। উপরন্তু এর দ্বারা অর্থনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে ইসলাম এমন সব পণ্যের উৎপাদন এবং ক্রয় বিক্রয় হারাম সাব্যস্ত করেছে যার দ্বারা সমাজ কোনো অনৈতিকতার শিকার হয়, মানুষের নিচু প্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে অবৈধ পন্থায় মুনাফা অর্জনের পথ সৃষ্টি হয়।
এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট থাকা দরকার যে, এ খোদায়ী বিধি-নিষেধ নিয়ন্ত্রণ কুরআন হাদীসের আলোকে আরোপ করা হয়েছে। এগুলোকে ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত বুদ্ধি-বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয় নি, যদি তার বিবেক উপযুক্ত মনে করে তাহলে এ বিধি-নিষেধ আরোপ করবে। আর উপযুক্ত মনে না করলে আরোপ করবে না। তার কারণ, কোনো বস্তু ভাল বা মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য কখনো মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনায় ভিন্নতা এবং মতানৈক্য হয়। কোনো একজন মানুষের বিবেক এক বস্তুকে ভাল এবং অন্য মানুষের বিবেক তাকে মন্দ ভাবতে পারে। সুতরাং এ
বিধি-নিষেধগুলোও যদি শুধু মানবীয় বিবেকের উপর ন্যস্ত করা হত, তাহলে সম্ভাবনা ছিল, মানুষ নিজের বিবেকের আলোকে এসব বিধি-নিষেধগুলো অনুপযুক্ত মনে করে সমাজকে তা থেকে মুক্ত করে দিত। আর যেহেতু আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে এসব বিধি-নিষেধ সর্বযুগে ও সর্বস্থানের জন্য জরুরি ছিল, এ কারণে ওহীর মাধ্যমে এসব বিধি-নিষেধকে চিরস্থায়িত্বের গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যাতে মানুষ তার বিবেকপ্রসূত ব্যাখ্যার আশ্রয়ে তার থেকে মুক্ত হয়ে অর্থনীতি এবং সমাজকে বৈষম্যের মধ্যে নিপতিত করতে না পারে।
এখানে একথা স্পষ্ট হয় যে, কুরআন ও হাদীসে আরোপিত এ খোদায়ী বিধি-নিষেধ পালন করা সর্বাবস্থায় অত্যাবশ্যক। তার যৌক্তিক দর্শন মানুষের বুঝে আসুক বা না আসুক।
যেমন পূর্বে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগে বেশিরভাগ ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রই ব্যক্তিগত মুনাফার প্রেরণার উপর কিছু না কিছু বিধি-নিষেধ অবশ্যই আরোপ করে। কিন্তু এ বিধিনিষেধ যেহেতু খোদায়ী ওহীনির্ভর নয়, এ কারণে সেটা সুষম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং ঐসব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কোথাও সুদ জুয়া হুন্ডি ইত্যাদির উপর কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় নি যেগুলো অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনেক বড় কারণ।
২. রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
আলোচিত খোদায়ী বিধি-নিষেধগুলো ছিল চিরস্থায়ী প্রকৃতির। তার সাথে ইসলামী শরীয়ত সমকালীন সরকারকে এ অধিকারও প্রদান করেছে, সে কোনো জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এমন কোনো বস্তু বা কাজের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যেগুলো মৌলিকভাবে হারাম নয়; বরং মুবাহ-র আওতাভুক্ত, কিন্তু তা দ্বারা সমাজের কোনো ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী প্রকৃতির হয় না, যা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক স্থানে কার্যকর হবে; বরং তার গুরুত্ব সাময়িক নির্দেশের মতো, যা সাময়িক প্রয়োজন অনুযায়ী হয়। তার একটি সরল দৃষ্টান্ত হল, ফুকাহায়ে কিরাম লেখেছেন, যখন কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটতে থাকে তখন সরকার তরমুজের ক্রয়-বিক্রয় এবং তা
পক্ষ থেকে আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তরমুজ খাওয়া এবং তার ক্রয়-বিক্রয় শরীয়তের দৃষ্টিতেও নাজায়েয হয়ে যাবে। এমনিভাবে উসূলে ফিকাহর মধ্যে 'سد ذرائع' (উপায়-উপকরণ প্রতিরোধ) নামের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে। যার অর্থ, কোনো কাজ যদিও মৌলিকভাবে জায়েয, কিন্তু তার আধিক্য যদি কোনো অপরাধ বা বিশৃঙ্খলার কারণ হয়, তাহলে সরকারের জন্য ঐ বৈধ কাজটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জায়েয।
এ মূলনীতির আলোকে সরকার সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নজরদারি করতে পারে। যেসব কর্মকাণ্ডের কারণে অর্থনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার শংকা দেখা দেয়, সরকার তার উপর উপযুক্ত বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে। কানযুল উম্মাল গ্রন্থে আছে, হযরত উমর ফারুক রা. একবার বাজারে এসে দেখলেন, এক ব্যক্তি কোনো একটি দ্রব্য প্রচলিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করছে। তখন তিনি সে লোককে বললেন:
اما ان تزيد في السعر و اما ترفع عن سوقى
-হয় তোমার পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি কর, নইলে আমাদের বাজার থেকে উঠে যাও।
বর্ণনায় একথা স্পষ্ট নয় যে, হযরত উমর রা. কোন্ কারণে তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তার কারণ হতে পারে, সে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য থেকে অনেক কম মূল্যে বিক্রি করে অন্য ব্যবসায়ীদের বৈধ মুনাফা অর্জনের পথ বন্ধ করে দিচ্ছিল। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাব্য কারণ এও হতে পারে, কম মূল্যে পাওয়ার কারণে লোকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্রয় করছিল। যা দ্বারা অপব্যয়ের রাস্তা উন্মুক্ত হয়। অথবা মানুষের জন্য মজুদদারির অবকাশ সৃষ্টি হয়। যাই হোক, এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, শরীয়তের মূল বিধান হল, এক জন মানুষ তার নিজস্ব মালিকানা বস্তু যে দামে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারে। সুতরাং উল্লিখিত ঘটনায় লোকটির নিজের পণ্য কম মূল্যে বিক্রি করা মৌলিকভাবে বৈধ ছিল। কিন্তু কোনো সমষ্টিক স্বার্থে হযরত উমর রা. তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অবশ্য পালনীয় হওয়ার উৎস কুরআনের এ
يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الأمر منكم
-হে মুমিনগণ, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের ও নিজেদের মধ্যেকার ক্ষমতাসীন লোকদের আনুগত্য কর।
এ আয়াতে اولی الامر (ক্ষমতাসীন লোকের) আনুগত্যকে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য থেকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার অর্থ, যে সব ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করে নি, সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের নির্দেশ অবশ্য পালনীয়।
এখানে উল্লেখ্য, সরকারের মুবাহ বিষয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এ অধিকার অসীম নয়। বরং তারও কিছু মূলনীতি, কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এর বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু দুটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। প্রথমত সরকারের সে নির্দেশই অবশ্য পালনীয় যা কুরআন ও হাদীসের কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। দ্বিতীয়ত সরকার এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের অধিকার শুধু তখনি পায় যখন কোনো সমষ্টিগত জনস্বার্থ তার আহ্বায়ক হয়। সুতরাং এক প্রসিদ্ধ ফিকহী মূলনীতিতে বিষয়টা এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: تصرف الامام بالرعية منوط بالمصلحة
-জনসাধারণের উপর সরকারের শাসন অধিকার জনস্বার্থের সাথে শর্তযুক্ত।
সুতরাং যদি সরকার কোনো সমষ্টিক স্বার্থ ব্যতীত কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে সেটা জায়েয হবে না। বিচারকের আদালত থেকে তা বাতিল করানো যেতে পারে।
৩. নৈতিক বিধি-নিষেধ
যেমন পেছনে বলা হয়েছে, খাঁটি অর্থে ইসলাম কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নাম নয়; বরং একটি দ্বীন বা জীবনবিধানের নাম। এ দ্বীনের শিক্ষা এবং বিধান জীবনের অন্যান্য বিভাগের ন্যায় অর্থনীতি সম্পর্কেও অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দ্বীনের শিক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তা থেকে অর্জিত বৈষয়িক উপকার মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। কুরআন ও হাদীসে সকল জোর একথার উপর দেয়া হয়েছে, পার্থিব জীবন সীমিত কয়েকদিনের
জীবনমাত্র। এরপর এমন এক অনন্ত জীবন আসবে যার কোনো শেষ নেই। মানুষের মূল কাজ হল তার পার্থিব জীবনকে সেই পরকালীন জীবনের জন্য সোপান বানানো। সেখানকার সুখের চিন্তা করা। সুতরাং অন্যের তুলনায় চার পয়সা বেশি উপার্জন করা মানুষের আসল সফলতা নয়; বরং তার সফলতা হল, পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে বেশি বেশি সুখ- শান্তির ব্যবস্থা করা। যার পথ হচ্ছে পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় এমন কাজ করা যা তার জন্য সর্বাধিক নেকী ও সওয়াবের কারণ হয়।
যখন মানুষের মধ্যে এ মানসিকতা সৃষ্টি হয় তখন তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয় শুধু এটা থাকে না যে, কোন্ অবস্থায় কেমন করে আমার আলমারি বেশি পূর্ণ হবে। বরং কখনো তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এ ভিত্তিতেও হয়, কোন্ কাজে আমার আখেরাতের লাভ বেশি হবে। এভাবে অনেক ব্যাপারে শরীয়ত কোনো অবশ্য পালনীয় নির্দেশ (Mandatory Order) দেয় নি বটে। তবে কোনো বিশেষ বিষয়ের পরকালীন ফযীলত মর্যাদার কথা বর্ণনা করেছে, যা একজন মুমিনের জন্য অনেক বড় আকর্ষণের কারণ। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেই নিজের উপর অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নেয়। নৈতিক নিষেধাজ্ঞা দ্বারা আমার উদ্দেশ্য এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা।
এর একটি সরল দৃষ্টান্ত হল, এক ব্যক্তির কাছে পুঁজি বিনিয়োগের দুটি পথ আছে। একটি হল, সে তার পুঁজি কোনো বৈধ বিনোদনমূলক কিন্তু ব্যবসায়িক প্রকল্পে খাটাতে পারে। এর মধ্যে তার অধিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় হল, সে এ পুঁজি গৃহহীন লোকদের জন্য বাড়ি নির্মাণ করে সস্তায় বিক্রি করার কাজে ব্যয় করতে পারে। এতে তুলনামূলক কম লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। একজন সেক্যুলার চিন্তাধারার মানুষ অবশ্যই প্রথম পথ গ্রহণ করবে। কেননা, তাতে লাভ বেশি। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্ত রে পরকালের চিন্তা গ্রথিত সে পথের বিপরীত এ চিন্তা করবে, যদিও আবাসন প্রকল্পে আর্থিক লাভ তুলনামূলক কম, কিন্তু গরীব মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করে নিজের জন্য পরকালে বেশি সওয়াব লাভ করতে পারি। এ জন্য আমাকে বিনোদনমূলক প্রকল্প গ্রহণ না করে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিৎ।
এখানে যদিও উভয় পথই শরয়ীভাবে বৈধ ছিল, কোনোটার উপরই
কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, কিন্তু পরকালীন বিশ্বাসনির্ভর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ঐ ব্যক্তির অন্তরে এক অভ্যন্তরীণ বাধা সৃষ্টি করে দিয়েছে। যা দ্বারা প্রয়োজনের উত্তম অগ্রগণ্যতা নির্বাচন এবং উত্তম উপকরণ নির্দিষ্টকরণ বিধি কার্যকর হয়েছে। এটা একটা ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু যদি প্রকৃতপক্ষেই কারো অন্তরে ইসলামের পরকালীন বিশ্বাস পরিপূর্ণভাবে বদ্ধমূল হয়ে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকে তাহলে সে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কল্যাণে অনেক বড় অবদান রাখতে পারে।
অনৈসলামী সমাজেও নৈতিকতার একটা অবস্থান আছে, তা আমি অস্বীকার করি না। সে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরও প্রভাব ফেলে। কিন্তু যেহেতু ঐসব নৈতিক ধারণার পেছনে পরকালের মজবুত বিশ্বাস বর্তমান নেই, এ কারণে সেটা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না। পক্ষান্তরে ইসলাম তার যাবতীয় শিক্ষাসহ ব্যাপকভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর হলে অর্থনীতির উপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তার নৈতিক শিক্ষার প্রভাব পড়বে। যেমন অতীতে তার অসংখ্য জীবন্ত দৃষ্টান্ত চোখে পড়েছে। সুতরাং নৈতিক বিধি-নিষেধের এ উপাদান খাঁটি ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে কোনোক্রমেই কোনো দুর্বল উপাদান নয়; বরং তার গুরুত্ব অনেক বেশি।

টিকাঃ
১. Utopian অর্থ 'নিরাশ্রয়'। মূলত এটা একটা বইয়ের নাম। প্রাচীন কালে কোনো ল্যাটিন বা গ্রিক রাজা লেখেছিলেন। এর মধ্যে এক কাল্পনিক রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। যেখানে সকল বস্তু মানুষের যৌথ মালিকানাধীন। প্রত্যেক ব্যক্তি যে বস্তু ইচ্ছা নিজের চাহিদামতো বিনামূল্যে লাভ করতে পারে। কারো প্রতি কোনো বিধি-নিষেধ নেই। এটা বাস্তবায়ন যেহেতু অসম্ভব ধারণা ছিল, তাই এ শব্দটি এক কাল্পনিক স্বর্গের অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। যা লাভ করার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং যে ব্যক্তি এ ধরনের কাল্পনিক পরিকল্পনা তৈরি করে তাকে Utopian বলে।

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদন ও বণ্টন

📄 সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদন ও বণ্টন


সমাজতন্ত্রের বক্তব্য হল, প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের উপাদান চারটি নয়; বরং দুটি মাত্র। একটি ভূমি, অপরটি শ্রম। এ দুয়ের অংশগ্রহণে উৎপাদন অস্তিত্ব লাভ করে। মূলধনকে উৎপাদনের উপাদান বলা যায় না। কারণ সে নিজেই কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফল। আর উদ্যোক্তাকেও উৎপাদনের স্বতন্ত্র উপাদান নির্ধারণ করার প্রয়োজন নেই, কারণ তার কাজ শ্রমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঝুঁকি গ্রহণ করার বৈশিষ্ট্য মেনে নেয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ কাজ সরকার করে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তির কারবারি উদ্যোগের অনুমতিও নেই এবং প্রয়োজনও নেই।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু উৎপাদনের প্রকৃত উপাদান শুধু ভূমি ও শ্রম। আর ভূমি কারো ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়। এ কারণে তাকে পৃথকভাবে বিনিময় দেয়ার প্রয়োজন নেই। সুতরাং সম্পদ বণ্টনের শুধু একটি খাত বাকি থাকে। আর সেটা হল মজুরি। যা সরকারি পরিকল্পনার অধীনে সম্পন্ন হয়। কার্ল মার্কসের প্রসিদ্ধ মতবাদ হল, কোনো বস্তুর মূল্য বৃদ্ধি কেবল শ্রমের মাধ্যমে হয়। এ কারণে মজুরি লাভের অধিকার শুধু শ্রমেরই আছে। মূলধনের সুদ, ভূমির ভাড়া এবং উদ্যোক্তার মুনাফা একটি ফালতু বিষয় যা কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ মতবাদকে বলা হয় 'উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব' (Theory of Surplus Value) এবং তার আরবী নাম 'نَظْرِيَّةُ الْقَدَر'.

📘 ইসলাম এবং আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়নীতি > 📄 ইসলামী শিক্ষা

📄 ইসলামী শিক্ষা


অর্থনীতির কোনো গ্রন্থে সম্পদ উৎপাদন ও সম্পদ বণ্টনের উপর যে ভঙ্গিতে আলোচনা করা হয়, কুরআন ও হাদীসে সে ভঙ্গিতে আলোচনা করা হয় নি। কিন্তু অর্থনীতির বিভিন্ন বিভাগে কুরআন ও হাদীস যে বিধান প্রদান করেছে তার উপর চিন্তা করলে একথা স্পষ্ট বুঝা যায়, ইসলামে মূলধন (Capital) ও সংগঠকের (Entrepreneur) ভিন্নতা স্বীকার করা হয় নি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কারবারের লাভ-লোকসানের ঝুঁকি সংগঠকের উপর ফেলা হয়। আর মূলধনকে নির্ধারিত হারে সুদ দেয়া হয়। ইসলামে যেহেতু সুদ হারাম। এ কারণে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি খোদ মূলধনের উপরই পতিত হয়। সুতরাং কোনো কারবারে মূলধন বিনিয়োগকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে লাভের প্রত্যাশার সাথে লোকসানের ঝুঁকিও গ্রহণ করতে হবে।
এটাকে এভাবে বলা যায়, ইসলামী শিক্ষার আলোকে যদিও মূলধন ও সংগঠক উৎপাদনের ভিন্ন ভিন্ন উপাদান, কিন্তু মূলধন সরবরাহকারী প্রত্যেক ব্যক্তি যেহেতু ঝুঁকিও গ্রহণ করে, এ কারণে সে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে সংগঠকও। তাই সম্পদ বণ্টনের বেলায় মূলধন ও সংগঠক উভয়েরই মুনাফা প্রাপ্য। অথবা এভাবে বলা যায়, মূলধন ও সংগঠক দুটি ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদন-উপাদান নয়। বরং একটাই এবং সম্পদ বণ্টনে সে মুনাফা পায়। যাই হোক, যেমনিভাবে ভূমির নির্দিষ্ট ভাড়া এবং শ্রমের নির্ধারিত মজুরি দেয়া হয়, তেমনিভাবে মূলধনকে নির্ধারিত সুদ দেয়া যায় না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মূলধনকে ভূমির সাথে তুলনা করা হয়। যেমনিভাবে ভূমি সরবরাহ করে এক ব্যক্তি নির্ধারিত ভাড়া উসূল করতে পারে, তেমনিভাবে মূলধন সরবরাহ করে নির্ধারিত সুদও উসূল করতে পারে। কিন্তু ইসলামী বিধানের আলোকে এ তুলনা সঠিক নয়। কেননা নিম্নলিখিত তিনটি কারণে ভূমি ও মূলধনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।
১. ভূমি নিজেই লাভজনক বস্তু। তার থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য সেটা ব্যয় করতে হয় না; বরং অস্তিত্ব ঠিক রেখে তা উৎপাদন- উপাদান হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। তা থেকে অন্য উপকারও পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং ভূমির ভাড়া মূলত সেসব উপকারের বিনিময়, যা সে সরাসরি প্রদান করছে। পক্ষান্তরে মূলধন এমন বস্তু যা নিজে লাভজনক নয়। সে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের কোনো উপকার করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা ব্যয় করে তার বিনিময়ে উপকৃত হওয়ার যোগ্য কোনো বস্তু ক্রয় করা না হয়। সুতরাং যে কাউকে অর্থ সরবরাহ করল সে এমন কোনো বস্তু সরবরাহ করল না, যা সরাসরি লাভজনক বস্তু। সুতরাং তার উপর ভাড়া পরিশোধের কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ ভাড়া হয় এমন বস্তুর যা থেকে উপকৃত হওয়া যায় তার নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে।
২. জমি ও মেশিনারি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি এমন বস্তু যা ব্যবহার করলে তার মূল্যমানে ঘাটতি হয়। এ কারণে এসব বস্তু যত বেশি ব্যবহার করা হবে তার মূল্যমান তত বেশি কমতে থাকবে। সুতরাং এসব বস্তুর যে ভাড়া আদায় করা হয় তার মধ্যে অবচয়ের ক্ষতিপূরণও অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে অর্থ এমন জিনিস, কেবল ব্যবহারের কারণে তার মূল্যে কোনো ঘাটতি হয় না।
৩. কোনো ব্যক্তি যদি কোনো ভূমি, যন্ত্রপাতি বা যানবাহন ভাড়া নেয়, তাহলে এ বস্তু তার জামানতে (Risk) থাকে না। বরং তার মূল মালিকের জামানতে থাকে। যার অর্থ হচ্ছে, ভাড়া গ্রহণকারীর অবহেলা বা অন্যায় ব্যতিরেকে যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বস্তুটি ধ্বংস হয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি ভাড়া গ্রহণকারীর নয়; বরং মূল মালিকেরই হবে। আর মূল মালিক যেহেতু তা ধ্বংসের ঝুঁকি গ্রহণ করছে এবং ভাড়া গ্রহণকারীকে এ ঝুঁকি থেকে মুক্ত রেখে নিজের মালিকানা স্বত্ব ব্যবহারের অধিকার প্রদান করছে, এ কারণে সে একটি নির্দিষ্ট এবং যুক্তিসংগত ভাড়ার হকদার। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কাউকে টাকা ঋণ প্রদান করছে সে টাকা তার জামানতে (Risk) থাকে না; বরং ঋণগ্রহীতার জামানতে চলে যায়। যার অর্থ হচ্ছে, ঋণগ্রহীতার হাতে যাওয়ার পর যদি সে টাকা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নষ্ট হয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায় তাহলে ক্ষতি ঋণদাতার নয়; বরং ঋণগ্রহীতার হবে। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা এ অবস্থায় ঋণদাতাকে সে পরিমাণ টাকা ফেরৎ দিতে বাধ্য থাকবে। এখানে যেহেতু ঋণদাতা ঋণ দিয়ে সে টাকার কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করে নি, এ কারণে সে তার কোনো বিনিময় গ্রহণের অধিকার রাখে না।
এ ব্যাখ্যার আলোকে সম্পদ বণ্টনের ইসলামী মূলনীতির সাথে পুঁজিবাদী মূলনীতির একটি মৌলিক পার্থক্য হল, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মূলধনকে নির্দিষ্টহারে সুদ দেয়া হয়। আর ইসলামে মূলধনের অধিকার মুনাফা লাভ করা। যা সে তখনি পাবে যখন সে লোকসানের ঝুঁকিও গ্রহণ করবে। অর্থাৎ মূলধনের মালিক কারবারের লাভ-লোকসান উভয়ের মধ্যে শরিক হবে। যার পদ্ধতি হচ্ছে শিরকাত বা মুদারাবা।
দ্বিতীয় মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, ধনতন্ত্র হোক বা সমাজতন্ত্র হোক, উভয় ব্যবস্থায় সম্পদের অধিকার শুধু সেসব উৎপাদনের উপাদানের মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে যারা বাহ্যিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। কিন্তু ইসলামী শিক্ষার সারকথা হল, প্রত্যেক বস্তুর উপর প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তাআলার। প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টির মূল কার্যক্রম আল্লাহই সম্পাদন করেন। যাঁর তাওফীক ব্যতীত কোনো উৎপাদন-উপাদান একবিন্দু পরিমাণও জন্ম দিতে পারে না। সুতরাং কোনো উৎপাদন-উপাদানই নিজে আয়ের মালিক ও হকদার নয়। বরং আল্লাহ তাআলা যাকে হকদার স্থির করবেন সে-ই হবে হকদার। অতএব আল্লাহ তাআলা যদিও আয়ের প্রাথমিক হকদার উৎপাদনের উপাদানকেই স্থির করেছেন, কিন্তু সে সাথে সম্পদের দ্বিতীয় পর্যায়ের হকদারের এক লম্বা তালিকা দিয়েছেন। যারা উৎপাদিত সম্পদের মধ্যে তেমনি হকদার যেমন স্বয়ং উৎপাদনের উপাদান নিজে হকদার। এ দ্বিতীয় পর্যায়ের হকদাররা সমাজের সেসব ব্যক্তি, যারা সম্পদ স্বল্পতার কারণে যদিও উৎপাদন কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে নি, কিন্তু এ মানব সমাজেরই সদস্য হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলার সৃজিত সম্পদে তাদেরও অংশ আছে। এ দ্বিতীয় পর্যায়ের হকদার পর্যন্ত সম্পদ পৌঁছানোর জন্য ইসলাম যাকাত, উশর, সাদাকাহ, খারাজ, কাফফারা, কুরবানী ও ওয়ারিসী বা উত্তরাধিকার বিধান প্রদান করেছে। যার মাধ্যমে সম্পদের বিরাট একটা অংশ দ্বিতীয় পর্যায়ের হকদারদের কাছে পৌঁছে যায়। সম্পদের প্রাথমিক হকদার অর্থাৎ উৎপাদনের উপাদান তাদের আয়, চাই ভাড়ার মাধ্যমে অর্জিত হোক বা মজুরির মাধ্যমে হোক বা মুনাফার মাধ্যমে হোক, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ দ্বিতীয় পর্যায়ের হকদারদের পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধ্য। এটা তাদের প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং প্রাপ্য অধিকার। সুতরাং কুরআন পাক ঘোষণা করেছে:
وفى اموالهم حق للسائل و المحروم
-আর তাদের সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অধিকার রয়েছে। (সূরা যারিয়াত-১৯)
অনুরূপভাবে কৃষি উৎপাদন সম্পর্কে ঘোষণা وأتوا حقه يوم حصاده:
-ফসল কাটার সময় তাদের হক আদায় করে দাও। (সূরা আনআম-১৪১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00