📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 জিহাদের ময়দানে ইসলামের নৈতিকতা

📄 জিহাদের ময়দানে ইসলামের নৈতিকতা


ভালো ব্যবহার, নম্র আচরণ, দুর্বলদের প্রতি দয়া, প্রতিবেশি এবং নিকটস্থদেরকে ক্ষমা—এগুলো নিরাপদ এবং শান্তি বজায় থাকা অবস্থায় সবাই করে থাকে। কিন্তু যুদ্ধাবস্থায় শত্রুর সাথে নম্রতা, শিশু আর বৃদ্ধের প্রতি দয়া এবং পরাজিতদের ক্ষমা করা—এগুলো প্রত্যেকেই করতে পারে না। ইতিহাস আমাদের সামরিক বাহিনীকে বিজয়ী এবং মহান শাসক হিসেবে চিরস্থায়ী সম্মানের মুকুট পরিধান করিয়েছে। কারণ তারা প্রচণ্ড যুদ্ধের সময়ও প্রতিপক্ষের প্রতি দয়া, ন্যায়বিচার আর মানবতার কথা ভুলে যায়নি।

ইসলাম ধর্মে যুদ্ধ না করে শান্তি বজায় রাখাই হলো মূল। জিহাদের জন্য ইসলাম অনেক শর্ত-সীমা এবং নিয়ম-কানুনের লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। জিহাদ করার জন্য যেসকল নৈতিক শর্তাবলী মেনে চলতে হয়, এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

এক. নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদেরকে হত্যা না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জিহাদের জন্য কোনো সেনাবাহিনী পাঠাতেন, তখন তিনি তাদেরকে এই নসীহত করতেন—যাতে কোনো শিশুকে হত্যা না করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন— “তোমরা বৃদ্ধদেরকে হত্যা করো না। শিশুদেরকে হত্যা করো না। ছোটদেরকে হত্যা করো না এবং নারীদেরকে হত্যা করো না।”

দুই. ইবাদাতকারীদেরকে হত্যা না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন— “তোমরা গির্জায় অবস্থানকারীকে হত্যা করো না।” তিনি মুতার যুদ্ধে বলেছিলেন— “তোমরা আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদে বের হও। যারা গির্জায় বসে ইবাদাত করে, তাদেরকেও হত্যা করো না।”

তিন. গাদ্দারি না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় নসীহত করতে বলতেন— “তোমরা গাদ্দারি করো না।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “যে কোনো কাফেরের জানের নিরাপত্তা দিয়ে আবার তাকে হত্যা করে দিলো, এরূপ হত্যাকারীর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; যদিও নিহত ব্যক্তি কাফের হয়।” হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতকালে এক সৈনিককে সতর্ক করে বলেছিলেন— “এমন ব্যক্তি যদি আমার নিকট পৌঁছে (যে নিরাপত্তা দিয়ে হত্যা করেছে), তাহলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিবো।”

চার. জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা:-
মুসলিম মুজাহিদরা জিহাদের ময়দানে চেষ্টা করে যাতে ঘর-বাড়ি ধ্বংস না হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সিরিয়া অভিমুখে প্রেরিত সেনাবাহিনীকে বলেছিলেন— “তোমরা খেজুর গাছ বিনষ্ট করো না এবং তা জ্বালিয়ে দিও না। কোনো প্রাণীকে হত্যা করো না। কোনো ফল গাছ নষ্ট করো না।”

পাঁচ. বন্দীকে আহার দান করা:-
বন্দীদেরকে দান করা এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা মুসলমানদের জন্য সওয়াবের কাজ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— “আর তারা আল্লাহর মুহাব্বাতে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদেরকে আহার করায়।”

ছয়. মৃত ব্যক্তির অঙ্গবিকৃতি না করা:-
ইসলামে মৃত ব্যক্তির অঙ্গবিকৃতি করা একদম নিষিদ্ধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লুটপাট এবং অঙ্গবিকৃতি করা নিষিদ্ধ করেছেন। ওহুদের যুদ্ধে মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় চাচা হামযাকে হত্যা করে তার অঙ্গবিকৃতি করেছিলো, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সীমাহীন কষ্ট পেয়েছিলেন। তবুও তিনি কখনও এর প্রতিশোধ নেননি এবং অঙ্গবিকৃতিও করেননি।

এই হলো যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের নৈতিকতা... যা শত্রুবাহিনীর সম্মানকে বিনষ্ট করে না। কোনো অবস্থাতেই ইনসাফকে ভুলে যায় না।

টিকাঃ
১২৫. সুরা মায়েদাহ, আয়াত নং-২৭।
১২৬. যাদুল মাআদ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৫।
১২৭. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭৩০।
১২৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৪৭৪।
১২৯. মুসনাদে আবী ইয়া'লা, হাদীস নং-২৫৮১।
১৩০. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭৩১।
১৩১. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭০৫।
১০১. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ৫৪৮২।
১০২. আল মুওয়াত্তা:১৬৭৭।
১০৩. তারীখে দিমাশক: ২/৭৬।
১০৪. সুরা ইনসান, আয়াত নং-৪।
১০৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৩৪২।
১০৬. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৩৬৭।
১০৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৮৬৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00