📄 ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্ক
ভূমিকা: একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কিভাবে মুসলিম এবং অমুসলিমরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে থাকতে পারে, ইসলামী সভ্যতা শুধু এই নীতিমালা বলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মুসলিমরা কিভাবে অমুসলিম সম্প্রদায় এবং অমুসলিম বিশ্বের সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে, এই বিষয়টিও অনেক গুরুত্বসহ আমলে নিয়েছে ইসলাম। এজন্য ইসলাম এমন এমন নীতিমালা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যার মাধ্যমে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা সম্ভব হয়। এর দ্বারা ইসলামী সভ্যতার মাহাত্ম্য এবং উদার মানবতা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
ইসলাম শান্তির ধর্মঃ শান্তিই হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে; অর্থাৎ যারা পরিপূর্ণ মুসলমান, তাদেরকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হয়ে যাও। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
উক্ত আয়াতে ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—শান্তি। এটা এমন এক শান্তির ধর্ম, যদি কারও জীবনে তা থাকে, তাহলে তার জীবনে শান্তি। যদি কোনো ঘরে থাকে, তাহলে ঐ ঘরে শান্তি। যদি কোনো সমাজে থাকে, তাহলে ঐ সমাজে শান্তি। যদি কোনো রাষ্ট্রে থাকে, তাহলে ঐ রাষ্ট্রে শান্তি। এর নামই হলো ইসলাম।
ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম, এটা অত্যন্ত স্পষ্ট বিষয়। কেননা, আমরা দেখি—আরবীতে ইসলাম (الإسلام) শব্দটির মূল উৎস হলো سَلَم (সিলমুন)—যার অর্থ—শান্তি। আর শান্তি হলো ইসলামের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যদি শান্তিকে ইসলামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাও মানা হয়, তবুও শাব্দিক অর্থে ইসলামের মূল অর্থ হলো—শান্তি।
সুতরাং শান্তি হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যা একটা মানুষকে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা, সদ্ভাবহার এবং সমাজে শৃঙ্খলা আর পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করে। অমুসলিমরা যখন কোনো বিশৃঙ্খলা না করে শান্তিপূর্ণভাবে থাকে, তখন ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম-অমুসলিম সবাই মানুষ হিসেবে নিরাপদ।
মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে সর্বদা শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে। শান্তির জন্য আলাদা কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। যতদিন পর্যন্ত অমুসলিমরা মুসলমানদের সাথে যেকোনো ধরণের শত্রুতায় লিপ্ত না হবে, ততোদিন পর্যন্ত তারা কোনো রকম চুক্তি ছাড়াই শান্তি ও নিরাপত্তা ভোগ করবে।
অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক: ইসলাম ধর্ম সমস্ত মুসলমানদের উপর এটা ওয়াজিব বা আবশ্যক যে, তারা অন্য বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অমুসলিমদের সাথে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির সম্পর্ক রাখবে। এই মানবতাপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে মানবসকল! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও।”
উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়— “পরস্পর বিচ্ছিন্নতা-বিদ্বেষের জন্য আল্লাহ তাআলা জাতি-গোত্র ভাগ করেননি। বরং তাদের পরস্পর পরিচিতি, ভালোবাসা আর সদ্ভাব বৃদ্ধির জন্যই এই বিভক্তি।” এই আয়াতটি আরও স্পষ্ট হয় পবিত্র কুরআনের ঐ সকল আয়াত দ্বারা, যেখানে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—যদি কাফেররা তোমাদের সাথে শান্তিরীতি সম্পন্ন হতে চায়, তবে তাদের সাথে মিলেমিশে শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করো। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকেই আগ্রহী হও। আর আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করো।”
এই আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অমুসলিমদের প্রতি মুসলমানদের সহিষ্ণুতা এবং সদ্ভাবপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করে। শত্রু পক্ষ যখন শান্তিপূর্ণভাবে থাকার আগ্রহ দেখাবে, তখন এতে যদি মুসলমানদের কোনো রকম ক্ষতির আশংকা না থাকে এবং যেকোনো ধরণের ক্ষতি না হয়, তাহলে তারা এই শান্তিপূর্ণ চুক্তির আহ্বানে সাড়া দিবে। ইমাম যুহরী এবং ইবনে যায়েদ রহ. বলেন— “এই আয়াতের অর্থ হলো—যদি তারা তোমাকে সন্ধির আহ্বান করে, তাহলে তুমিও তাতে সাড়া দাও।”
এই আয়াতের পরবর্তী আয়াতে মুসলমানদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে—যাতে তারা সর্বদা শান্তি বজায় রাখে। এমনকি শত্রুপক্ষ যদি মুখে শান্তির বাণী বলে আর ভেতরে ভেতরে শত্রুতা পোষণ করে, সেক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অভয় দিয়ে বলেন— “পক্ষান্তরে তারা যদি তোমার সাথে প্রতারণা করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তি যুগিয়েছেন স্বীয় সাহায্যে আর মুসলমানদের মাধ্যমে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাই তোমাকে হেফাজত এবং সুরক্ষা দান করবেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সকল কাজে শান্তির কথা বিবেচনা করে তাদেরকে শান্তির পথ দেখিয়েছেন এবং সর্বদা শান্তিতে থাকার জন্য দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দুআর মধ্যে বলতেন— اللهم اني أسئلك العافية في الدنيا والآخرة (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও নিরাপত্তা চাই)। একবার তিনি সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বক্তৃতা দানকালে বলেন— “তোমরা শত্রুর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করো না। বরং তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। আর যখন তোমরা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তোমরা ধৈর্যের পরিচয় দাও।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হারব (যুদ্ধ) শব্দটাও অপছন্দ ছিলো। তিনি বলেন— “আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম—আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম—হারেস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো—হারব ও মুররাহ।”
টিকাঃ
২৯৮. সূরা বাক্বারাাহ, আয়াত নং-২০৮।
২৯৯. আল ইসলামু ওয়াল আলাকাতুদ দুয়ালিয়্যাহ:৩০৬।
৩০০. ইবনুল ইসলামু আক্বাইদুল্লু ওয়া শারিয়াতিহি:৪৫৩।
৩০১. আল নাব্যুমুল ইসলামিয়্যাহ লান্নাহওয়া ওয়া তাত্মিয়াতিহা:৯৪০।
৩০২. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং-১৩।
৩০৩. জান্নাতুল হাক্ব:১৮।
৩০৪. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬১।
৩০৫. ইসমাইল ইবনে আব্দুর রহমান আল-যুহরী। তিনি ছিলেন একজন তাবেঈ।
৩০৬. আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম। তিনি একজন ফকীহ ও মুফাস্সির।
৩০৭. তাফসীরে কুরতুবী:৮/৮৮-৪।
৩০৮. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬২।
৩০৯. তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৬০০।
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫০৭৪।
১৩২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২১০৪।
১৩৩. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৬৫০।
📄 মুসলিম-অমুসলিম সন্ধি-চুক্তি
ভূমিকাঃ মুসলমানদের সাথে অমুসলিমদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সন্ধি-চুক্তির বিধান ইসলামে আছে। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম হয়। আর মুসলিম-অমুসলিম এক ছায়াতলে এসে জমা হয়। মুসলমানদের সাথে অমুসলিমদের সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য হলো—সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা। এজন্য চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তি করা হয়ে থাকে। অথবা এমন মজবুত স্থায়ী শান্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যাতে চুক্তি বহাল থাকা পর্যন্ত নতুন করে আর কোনো শত্রুতা তৈরি না হয় এবং দু'পক্ষই যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। যুগযুগ ধরে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সন্ধি-চুক্তি করে আসছে।
সন্ধি বা চুক্তি কাকে বলে? সন্ধি বা চুক্তি হলো—এমন কিছু প্রতিশ্রুতি বা প্রতিজ্ঞা বা শপথ অথবা ওয়াদা, যা যুদ্ধকালীন বা শান্তিকালীন সময়ে কোনো মুসলিম দেশ অমুসলিম দেশের সাথে করে থাকে। সাধারণত যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ বিরতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তিকে সন্ধি বলা হয়ে থাকে। মুসলমানদেরকে যুদ্ধ বিরতি দিয়ে সন্ধি-চুক্তি করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহী হয়, তাহলে তোমরা তাদের আহ্বানে সাড়া দাও।”
ইসলামে সন্ধি-চুক্তির কিছু নমুনাঃ
মদীনার ইহুদীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
অমুসলিমদের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের যেসকল সন্ধি হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম সন্ধি হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় আগমনের পর মদীনার ইহুদীদের সাথে সন্ধি। এ সন্ধিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন— “ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে বসবাস করতে থাকবে, যতক্ষণ না তারা মুসলমানদের সাথে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বনী আওফের ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে একই উম্মত বলে গণ্য হবে। ইহুদীরা তাদের ধর্ম পালন করবে। মুসলমানরা মুসলমানদের ধর্ম পালন করবে। তারা নিজেরা এবং তাদের মিত্ররাও এই অধিকার ভোগ করবে। তবে যে জুলুম করবে এবং কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে, সে তার নিজের এবং পরিবারের শুধু ধ্বংসই ডেকে আনবে। বনু নাজ্জার, বনু হারেস, বনু সায়েদা, বনু জুশাম, বনু আউস এবং বনু শাতিবা’র ইহুদীরাও বনু আওফের ইহুদীদের মত সব অধিকার ভোগ করবে।
ইহুদীদের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো তাদের জীবনের মতই সম্মানযোগ্য। ইহুদীদের ব্যয়ভার ইহুদীরাই বহন করবে। আর মুসলমানদের ব্যয়ভার মুসলমানরাই বহন করতে হবে। কারও কোনো সমস্যা থাকলে তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে হবে। আর পরস্পরের মাঝে কল্যাণকামনা, সদুপদেশ ও মহানুভবতার সম্পর্ক থাকবে। কোনো অন্যায় কাজে একে অপরের শরীক হবে না। মজলুমের সাহায্য করা প্রত্যেকের কর্তব্য।
প্রতিবেশি যদি অপরাধী না হয় এবং কোনো ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত না হয়, তাহলে তার জান, মাল ও ইজ্জত নিজের জান, মাল ও ইজ্জতের মতই পূর্ণ নিরাপত্তার অধিকারী। এই সন্ধির অন্তর্ভুক্ত যারা আছে, তাদের মাঝে যেকোনো ধরণের ঝগড়া-বিবাদ ঘটুক না কেনো, এর ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের শরণাপন্ন হতে হবে। মদীনায় কেউ আক্রমণ করতে এসে এই সন্ধির অন্তর্ভুক্ত সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিরোধ করবে। যখন সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপনের আহ্বান জানানো হবে, তখন তারা আহ্বানকারীদের সাথে সন্ধি করবে। আল্লাহ তায়ালা এই সন্ধির আনুগত্যের ব্যাপারে সর্বাধিক সততা ও সত্যবাদিতা দেখতে চান। এই সন্ধিপত্র কোনো অত্যাচারী বা অপরাধীর জন্য রক্ষাকবচ নয়। আর জুলুম কিংবা অপরাধে লিপ্ত না হলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা নির্ভয়ে বসে থাকা লোকও মদীনার সীমানার ভেতরে নিরাপত্তা লাভ করবে।”
নাজরানের খৃষ্টানদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজরানের খৃষ্টানদের সাথে সন্ধি করেছিলেন। এ ব্যাপারে বলা হয়েছে— “নাজরান ও তার আশপাশের অধিবাসীদের জান, মাল, ধর্ম, জমিন, পরিবার, বংশ এবং তাদের অধীন কমবেশি সবকিছুই আল্লাহ ও তার রাসূলের জিম্মাদারিতে ছিলো।”
বনু জুমারার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু জুমারার সাথে সন্ধি করেছিলেন। তাদের সর্দার ছিলো—মাখশি’ ইবনে আমর আল-জমীরী। তিনি বনু মুদাদাজের সাথেও সন্ধি করেছিলেন। তিনি আরও সন্ধি করেছিলেন জুহাইনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে।
উমরী সন্ধি:-
ইসলামী সংবিধানের মধ্যে অন্যতম একটি সন্ধি হলো—ইলিয়া (বাইতুল মাকদিস) এর অধিবাসীদের সাথে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্ধি। ইতিহাসে এটাকে বলা হয়—উমরী সন্ধি।
ইসলামের এসব সন্ধির দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, মুসলমানগণ সর্বদা তাদের প্রতিবেশিদের সাথে শান্তি, নিরাপত্তা এবং সমঝোতামূলক পরিবেশ বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছেন। শুধু শুধু অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি; বরং সর্বদা যুদ্ধের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন শান্তিকে।
ইসলামে সন্ধির বিভিন্ন শর্ত এবং নীতিমালাঃ
শাইখ মাহমুদ শালতূত রহ. বলেন—ইসলাম মুসলমানদেরকে যে সন্ধি করার অধিকার দিয়েছে, এই সন্ধি সহীহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত মানতে হবে।
এক. সন্ধির শর্তগুলো কোনো ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সাধারণ আইন এবং শরীয়তের কোনো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো— “যেসকল শর্ত আল্লাহ তাআলার কিতাবের বিপরীত, সেগুলো বাতিল।”
দুই. সন্ধিটি দুই পক্ষের সম্মতিতে হতেই হবে। সুতরাং যেসব সন্ধি নির্যাতন, নিপীড়ন এবং জবরদস্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, ইসলামে এসব সন্ধি গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন— “কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে যে ব্যবসা করা হয়, তা বৈধ।”
তিন. সন্ধির প্রতিটি বিষয় হতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট। যেখানে প্রতিটি নীতিমালা, অধিকার এবং কর্তব্য ব্যাখ্যাসহ স্পষ্ট উল্লেখ করা থাকবে। যাতে সেখানে কোনো অপব্যাখ্যা বা ধোঁকার কোনো রকম সুযোগ না থাকে। দিকনির্দেশনা দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা স্বীয় কসমসমূহকে পারস্পরিক ধোঁকা-বাহানা বানিয়েও না। তাহলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আবার পা ফসকে যাবে।”
সন্ধি পূরণের বাধ্যকতাঃ
পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বহু হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, সন্ধি পূরণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহকে পূর্ণ করো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খাঁটি মুনাফিক বলে গণ্য হবে। ১. যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে। ২. যে অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে। ৩. যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ৪. যে কথায় কথায় ঝগড়া ও গালাগালি করে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “যদি কারও সাথে কোনো চুক্তির সন্ধি থাকে, তাহলে সন্ধির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা নবায়ন করা যাবে না, আবার ভঙ্গও করা যাবে না। যখন সন্ধির মেয়াদ শেষ হবে, তখন ঘোষণা দিয়ে তা শেষ করতে হবে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবিদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির উপর জুলুম করবে, বা তার প্রাপ্য কম দিবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষ বাদী হবো।”
ইসলামী ইতিহাসে এ জাতীয় আরও বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং জাতীয় স্বার্থ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোনো সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের সাথে যেসব চুক্তি করা হবে, মুসলমানরা কোনো চুক্তি ভঙ্গ করবে না; বরং তা পুরোপুরিভাবে পালন করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ তা ভঙ্গ না করে। শাইখ মাহমুদ শালতূত রহ. বলেন— “চুক্তি পূরণ করা একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি লঙ্ঘন করা ধোঁকা এবং বিশ্বাসঘাতকতা।”
ইসলামে দূতের নিরাপত্তা:
দূতের নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামী শরীয়তে চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো দূতকে হত্যা করা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ ফুকাহায়ে কেরাম মুসলিম শাসকদেরকেও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন— দূতদেরকে পূর্ণ সহায়তা এবং নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
হযরত আবু রাফে' রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “মক্কার কুরাইশরা আমাকে দূত হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পাঠালো। আমি তাকে দেখা মাত্রই আমার অন্তরে ইসলাম গ্রহণের প্রচণ্ড আগ্রহ জাগলো। আমি বললাম—হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আর কখনও তাদের কাছে ফিরে যাবো না। তিনি বললেন—আমি চুক্তি ভঙ্গ করি না। দূতকে আটকে রাখি না। তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও।”
ইমাম হাইছামী রহ. তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব— ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ এ জাতীয় হাদীসসমূহ নিয়ে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার নাম ‘দূত হত্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিষেধাজ্ঞা’। সেখানে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূতদের বলেছিলেন— “আমি যদি দূতদেরকে হত্যা করতাম, তাহলে এখন তোমাদের গর্দান উড়িয়ে দিতাম।” এভাবেই ইসলামী সভ্যতা দূতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
টিকাঃ
১৩৪. আল আলাকাতুল দুওয়ালিয়্যাহ ফিল ইসলাম: ৭৮।
১৩৫. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬১।
১৩৬. সীরাতে ইবনে হিশাম:৫০৪-৫০৬/১।
১৩৭. আল আলাকাতুদ দুওয়ালিয়্যাহ ফিল ইসলাম:৮৪।
১৩৮. সীরাতুন নববিয়্যাহ:৬/৪৮৫।
১৩৯. সীরাতে ইবনে হিশাম:১/১৮৫।
১৪০. তাবারী তাবারী:২/৪৪৩-৪৫০।
১১২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫৩৪।
১১৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫৩৪।
১১৪. সূরা নিসা, আয়াত নং-২৯।
১১৫. সূরা নাহল, আয়াত নং-৯৪।
১১৬. সূরা মাইদাহ, আয়াত নং-১।
১১৭. সূরা আনআম, আয়াত নং-১৫২।
১১৮. সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং-৩৪।
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৭।
১২০. শরহু মুসলিম লিন নববী:৪/৪৭।
১২১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭৩৭।
১২২. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৭৯৪।
১২৩. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৪৬৪।
১২৪. সূরা নাহল, আয়াত নং-৯১।
১২৫. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-৪।
১২৬. আল ইসলামু আকীদাতুহু ওয়া শরীয়াতুহু:৪৮৭।
০০৭. আল মুয়াত্তা: ৪/০০৭।
০০৮. আল শরহুল ইসলামিয়্যাহ ওয়াল ক্বানুনুদ দুওয়ালিল আ’ম: ১২৪।
০০৯. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ২৭৬২; মুসনাদে আহমাদ; মাজমাউয যাওয়ায়েদ।
📄 ইসলামে জিহাদ: কারণ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে— ‘ইসলামে শান্তিই হলো মূল’। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদেরকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন। এ দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “তোমরা শত্রুর সাথে সাক্ষাতের (জিহাদের) আকাঙ্ক্ষা করো না; বরং আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বদা শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো।” সুতরাং একজন মুসলমান স্বভাবগতভাবে ‘অন্যায়ভাবে হত্যা এবং রক্তপ্রবাহকে ঘৃণা করে’।
মুসলমানদেরকে জিহাদের অনুমতি তখনই দেওয়া হয়েছে, যখন শত্রুপক্ষ তাদের উপর আক্রমণ করে বসে। কারণ এ অবস্থায় নিজেদের জীবন এবং দ্বীন-ধর্ম বাঁচানোর জন্য তাদের সাথে জিহাদ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন— “জিহাদের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে, যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে।” উক্ত আয়াতে জিহাদের কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। তা হলো— ‘মুসলমানদের প্রতি অত্যাচার এবং তাদেরকে অন্যায়ভাবে নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দেয়া’।
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর আল্লাহ্র ওয়াস্তে তাদের সাথে জিহাদ করো, যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে। অবশ্য কারও প্রতি বাড়াবাড়ি করো না।” ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন— “এটি হলো জিহাদের আদেশ সম্বলিত সর্বপ্রথম আয়াত। মক্কায় থাকাবস্থায় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হুকুম ছিলো— ক্ষমা করুন এবং ভুল-ত্রুটি মাফ করুন। পরে যখন মুসলমানগণ মদীনায় গেলেন, তখন জিহাদের হুকুম দেওয়া হয়েছে।”
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—প্রথমে জিহাদের হুকুম দেওয়া হয়েছে ঐ সকল লোকের সাথে, যারা আগে যুদ্ধ করতে আসে। যারা শান্তি বজায় রেখে চলে, তাদের সাথে ইসলাম জিহাদের হুকুম দেয়নি। মুমিনদেরকে সতর্ক করে বলা হয়েছে— “আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না”। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা সবাই মিলে মুশরিকদের সাথে জিহাদ করো, যেভাবে তারা সবাই মিলে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে।” অর্থাৎ মুশরিকরা যেহেতু সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতো, তাই পাল্টা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
সুতারং যারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে জড়াবে না, তাদের সাথে জিহাদ করা জায়েয নেই। জিহাদ তখনই জায়েয হয়, যখন জুলুম-অবিচার এবং অন্যায় দমনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথবা যখন দ্বীন প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা কি সেই দলের সাথে জিহাদ করবে না, যারা নিজেদের শপথ ভঙ্গ করেছে এবং রাসূলকে বহিস্কারের সংকল্প করেছে? তারাই তো তোমাদের সাথে বিবাদের সূত্রপাত করেছে।” আয়াতে উল্লেখিত ব্যাখ্যামূহ থেকে দেখা যায়—কাফেররাই আগে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদীনও সেই পথ অনুসরণ করেছেন। কখনই মুসলমানগণ কাফেরদের সাথে অনর্থক যুদ্ধ শুরু করেননি। এই জিহাদের মাধ্যমে শত্রুকে প্রতিহত করা হয়, নিজের পরিবার ও দেশের হেফাজত করা হয় এবং দাওয়াতের পথ উন্মুক্ত রাখা হয়।
টিকাঃ
০০৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৬৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭৪২।
০০৯. সুরা হাজ্জ, আয়াত নং- ৪০-৩৯।
০০৯. সুরা বাকারা, আয়াত নং-১৯০।
০০৯. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত নং-৩৪; সুরা মাইদাহ, আয়াত নং-১৩।
০০৯. তাফসীরে কুরতুবী:১/৭১৬।
০০৯. সুরা তাওবাহ, আয়াত নং-৩৬।
০০৯. তাফসীরে কুরতুবী:৪/৭১৯।
০০৯. সুরা তাওবাহ, আয়াত নং- ১৩।
১১৪. তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৪০৪।
১২৪. বিমায়া ইনতাসাকুল মুসলিমুন: ৫৭-৬২।
📄 জিহাদের ময়দানে ইসলামের নৈতিকতা
ভালো ব্যবহার, নম্র আচরণ, দুর্বলদের প্রতি দয়া, প্রতিবেশি এবং নিকটস্থদেরকে ক্ষমা—এগুলো নিরাপদ এবং শান্তি বজায় থাকা অবস্থায় সবাই করে থাকে। কিন্তু যুদ্ধাবস্থায় শত্রুর সাথে নম্রতা, শিশু আর বৃদ্ধের প্রতি দয়া এবং পরাজিতদের ক্ষমা করা—এগুলো প্রত্যেকেই করতে পারে না। ইতিহাস আমাদের সামরিক বাহিনীকে বিজয়ী এবং মহান শাসক হিসেবে চিরস্থায়ী সম্মানের মুকুট পরিধান করিয়েছে। কারণ তারা প্রচণ্ড যুদ্ধের সময়ও প্রতিপক্ষের প্রতি দয়া, ন্যায়বিচার আর মানবতার কথা ভুলে যায়নি।
ইসলাম ধর্মে যুদ্ধ না করে শান্তি বজায় রাখাই হলো মূল। জিহাদের জন্য ইসলাম অনেক শর্ত-সীমা এবং নিয়ম-কানুনের লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। জিহাদ করার জন্য যেসকল নৈতিক শর্তাবলী মেনে চলতে হয়, এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
এক. নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদেরকে হত্যা না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জিহাদের জন্য কোনো সেনাবাহিনী পাঠাতেন, তখন তিনি তাদেরকে এই নসীহত করতেন—যাতে কোনো শিশুকে হত্যা না করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন— “তোমরা বৃদ্ধদেরকে হত্যা করো না। শিশুদেরকে হত্যা করো না। ছোটদেরকে হত্যা করো না এবং নারীদেরকে হত্যা করো না।”
দুই. ইবাদাতকারীদেরকে হত্যা না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন— “তোমরা গির্জায় অবস্থানকারীকে হত্যা করো না।” তিনি মুতার যুদ্ধে বলেছিলেন— “তোমরা আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদে বের হও। যারা গির্জায় বসে ইবাদাত করে, তাদেরকেও হত্যা করো না।”
তিন. গাদ্দারি না করা:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় নসীহত করতে বলতেন— “তোমরা গাদ্দারি করো না।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “যে কোনো কাফেরের জানের নিরাপত্তা দিয়ে আবার তাকে হত্যা করে দিলো, এরূপ হত্যাকারীর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; যদিও নিহত ব্যক্তি কাফের হয়।” হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতকালে এক সৈনিককে সতর্ক করে বলেছিলেন— “এমন ব্যক্তি যদি আমার নিকট পৌঁছে (যে নিরাপত্তা দিয়ে হত্যা করেছে), তাহলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিবো।”
চার. জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা:-
মুসলিম মুজাহিদরা জিহাদের ময়দানে চেষ্টা করে যাতে ঘর-বাড়ি ধ্বংস না হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সিরিয়া অভিমুখে প্রেরিত সেনাবাহিনীকে বলেছিলেন— “তোমরা খেজুর গাছ বিনষ্ট করো না এবং তা জ্বালিয়ে দিও না। কোনো প্রাণীকে হত্যা করো না। কোনো ফল গাছ নষ্ট করো না।”
পাঁচ. বন্দীকে আহার দান করা:-
বন্দীদেরকে দান করা এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা মুসলমানদের জন্য সওয়াবের কাজ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— “আর তারা আল্লাহর মুহাব্বাতে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদেরকে আহার করায়।”
ছয়. মৃত ব্যক্তির অঙ্গবিকৃতি না করা:-
ইসলামে মৃত ব্যক্তির অঙ্গবিকৃতি করা একদম নিষিদ্ধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লুটপাট এবং অঙ্গবিকৃতি করা নিষিদ্ধ করেছেন। ওহুদের যুদ্ধে মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় চাচা হামযাকে হত্যা করে তার অঙ্গবিকৃতি করেছিলো, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সীমাহীন কষ্ট পেয়েছিলেন। তবুও তিনি কখনও এর প্রতিশোধ নেননি এবং অঙ্গবিকৃতিও করেননি।
এই হলো যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের নৈতিকতা... যা শত্রুবাহিনীর সম্মানকে বিনষ্ট করে না। কোনো অবস্থাতেই ইনসাফকে ভুলে যায় না।
টিকাঃ
১২৫. সুরা মায়েদাহ, আয়াত নং-২৭।
১২৬. যাদুল মাআদ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৫।
১২৭. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭৩০।
১২৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৪৭৪।
১২৯. মুসনাদে আবী ইয়া'লা, হাদীস নং-২৫৮১।
১৩০. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭৩১।
১৩১. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৭০৫।
১০১. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ৫৪৮২।
১০২. আল মুওয়াত্তা:১৬৭৭।
১০৩. তারীখে দিমাশক: ২/৭৬।
১০৪. সুরা ইনসান, আয়াত নং-৪।
১০৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৩৪২।
১০৬. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৩৬৭।
১০৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৮৬৮।